ওষুধ ক্রয়ে সতর্ক হন

ঢাকা, শুক্রবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২০ | ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

ওষুধ ক্রয়ে সতর্ক হন

হাসনা হেনা ১২:০৫ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২১, ২০২০

print
ওষুধ ক্রয়ে সতর্ক হন

রাসায়নিক দিক থেকে ওষুধ একটি ক্রিয়াশীল পদার্থ। তাই বলা হয়, নির্দিষ্ট মাত্রায় ও নির্দিষ্ট রোগে নির্ভেজাল ওষুধ ব্যবহৃত না হলে প্রাণনাশক বিষে পরিণত হতে পারে। ওষুধ সেবনে অসতর্কতা কেড়ে নিতে পারে আমাদের মূল্যবান জীবন। ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পাড়া বা মহল্লার মোড়ে মোড়ে ব্যাঙের ছাতার মতোই মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে ফার্মেসি। আমরা সহজেই হাতের নাগালে পাচ্ছি যে কোনো ধরনের ওষুধ। তবে তা ক্রয়ের ক্ষেত্রে আমরা কতটা সচেতন? ফার্মেসিগুলোতে রেজিস্টার্ড ফার্মাসিস্ট নিয়োগের যে বিধান রয়েছে, তা প্রশাসন থেকে নিশ্চিত করা হচ্ছে তো? যে কোনো ওষুধ ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া ক্রয় বা বিক্রয় করা অবশ্যই বিপদজনক। আমাদের ওষুধ ক্রয় করার সময় অবশ্যই ওষুধের মেয়াদ এবং ওষুধটা নকল না আসল যাচাই করে দেখে ক্রয় করতে হবে। মাথায় রাখতে হবে ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ব্যবহারের ফলে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারি আমরা। বিভিন্ন ওষুধ রাখার নিয়ম আলাদা। ওষুধের মোড়কে সেকথা লেখা থাকে। নিয়ম অনুযায়ী উপযুক্ত পরিবেশে ওষুধ রাখলে তার কার্যকারিতা বজায় থাকে দীর্ঘদিন। তাই ওষুধ ক্রয় করার সময় এ বিষয়ও মাথায় রাখতে হবে।

ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ আপনাকে নিরাময় না দিয়ে আরও বেশি অসুস্থ করতে পারে কিংবা দীর্ঘমেয়াদি নানা রকম রোগে ভুগতে হতে পারে। খুব তাড়াহুড়ো করে ওষুধ ক্রয় করলে অনেক সময় ভুল হয়ে যেতেও পারে, তাই ওষুধ ক্রয়ের সময় আমাদের বাড়তি সতর্কতা জরুরি। ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের হিসেবে, দেশে ফার্মেসির সংখ্যা এক লাখ ২৪ হাজারের মতো। তবে এসব লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের বাইরেও ব্যক্তি উদ্যোগে পরিচালিত হয় কয়েক হাজার ফার্মেসি। অধিদফতরের উপ-পরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলছেন, বাজারে নতুন উদ্বেগ হিসেবে দেখা দিয়েছে স্যাম্পল হিসেবে দেওয়া ওষুধগুলো দোকানে চলে আসা। বিভিন্ন কোম্পানি তাদের উৎপাদিত ওষুধ চিকিৎসকদের দিয়ে থাকেন। এগুলোতে অনেক সময় মেয়াদ উল্লেখই থাকে না। কোন মাধ্যম হয়ে এসব ওষুধ ফার্মেসিতে চলে আসছে। যেগুলো বিক্রেতারা দিচ্ছেন ক্রেতার হাতে। আমরা ক্রেতারাও না বুঝে ক্রয় করছি এসব ওষুধ।

ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মুস্তাফিজুর রহমান বলছেন, এটি অনৈতিক যদি কেউ ইচ্ছে করে স্যাম্পল ওষুধ রাখেন ও বিক্রি করেন। বাজারে ওষুধের ক্ষেত্রে আরেকটি সমস্যা হলো আন-রেজিস্টার্ড ওষুধ। দুঃখের বিষয় হলো, জীবন বাঁচাতে আমরা যে ওষুধের উপর ভরসা করি, সেই ভরসার জায়গাটিতে ও ভেজাল। বাজার ছেয়ে গেছে ক্যান্সার, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন জটিল রোগের নকল ওষুধে। এসব ওষুধ পরখ করতে ভোক্তাসহ হিমশিম খেতে হয় খোদ ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের কর্মকর্তাদেরও। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি চক্রের মাধ্যমে এসব নকল, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধই ছড়িয়ে পড়ছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন ফার্মেসিতে।

ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ আমরা কীভাবে চিনব? সাধারণত সকল ওষুধের প্যাকেটে মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ দেওয়া থাকে। যারা খুচরা পাতা বা পিস হিসেবে ওষুধ ক্রয় করে থাকেন সে ক্ষেত্রে হয়ত একটু বেশি সতর্কতা প্রয়োজন। অনেকেরই জানা থাকে না মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ কোথায় কীভাবে দেওয়া থাকে। ওষুধের স্ট্রিপের গায়ে উপরে বা নিচের অংশে স্পষ্ট কিছু ইংরেজি সংখ্যা এবং অক্ষরে ঐ ওষুধের মেয়াদোত্তীর্ণের সময় লেখা আছে। ওষুধ কেনার সময় যদি পুরো বক্স না কেনা হয়, খুচরো কিংবা পিস হিসেবে কেনা হয় তাহলে ওষুধের পুরো প্যাকেট বা বক্স নিজের হাতে নিয়ে চেক করা যেতে পারে। ধরা যাক : EO322। এখানে E তে Expire বোঝানো হয়েছে, প্রথম দুটো সংখ্যা মাসকে বোঝায়, পরের দুটো সংখ্যা দিয়ে বছরকে বোঝানো হয়েছে। মানে, এখানে বোঝানো হয়েছে ২২ সালের ০৩ মাস পর্যন্ত ওষুধের মেয়াদ আছে। বাংলাদেশের জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বলছে, ঢাকার ৯৩ শতাংশ ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি করা হয়।

অধিদপ্তর ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের মার্চ সময়কালে সংস্থার নিয়মিত বাজার অভিযানে যেসব ফার্মেসি বা ওষুধ বিক্রির দোকান পরিদর্শন করা হয়েছে তাতে ৯৩ শতাংশ ফার্মেসিতেই তারা মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ পেয়েছেন। ভেজাল বা নকল ওষুধ শনাক্তে সরকারের পাশাপাশি নাগরিকেরও দায়িত্ব রয়েছে। একজন নাগরিক যখন ওষুধ কিনতে যান তখন তিনি খুব সহজেই সেটি যাচাই করে নিতে পারেন। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী পণ্য যাচাই-বাছাই করা ভোক্তার অধিকার। কেউ যাচাই-বাছাইয়ে বাধা দিলে তার শাস্তিরও বিধান রয়েছে। কারিগরি উন্নয়নের ফলে যদিও আজকাল আসল আর নকল ওষুধের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা মুশকিল হয়ে পড়েছে। রাসায়নিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে শুধু জানা যায়, কোনটা আসল আর কোনটা নকল ওষুধ। তারপরও কিছু চিহ্ন আর বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে নকল ওষুধ চেনা যেতে পারে। নকল ওষুধের অদ্ভুত ধরনের গন্ধ, স্বাদ ও রং থাকে। নকল ওষুধ অতি সহজে ভেঙে গুড়া হয়ে যায়। ওষুধের প্যাকেটের গুণগতমান তেমন ভালো থাকে না।

ওষুধের প্যাকেটের গায়ে যে সিল থাকে সেটি ভালো করে দেখতে হবে। কোথাও কোনো গলদ আছে কিনা। প্রয়োজনে একই কোম্পানির অন্য একটি ওষুধের প্যাকেট হাতে নিয়ে দুই প্যাকেটের সিল মিলিয়ে দেখতে হবে। দু’টির সিল ও অন্যান্য লেবেল একই আছে কিনা। আগে যদি আপনি একই ওষুধ কিনে থাকেন পরেরবার কেনার সময় আগের প্যাকেটের সঙ্গে প্যাকেজিং, অক্ষরের ফন্ট, বানান, রং এগুলো মিলিয়ে দেখতে হবে। ওষুধ কেনার পর যখন খাবেন বা ব্যবহার করবেন তখন খেয়াল করতে হবে ওষুধের রং, আকার, গন্ধ ঠিক আছে কিনা। ওষুধের দাম আপনার কাছে অসম্ভব কম বা বেশি হলে সেটি সন্দেহের একটি কারণ। নকল বা ভেজাল ওষুধ আসল ওষুধ থেকে কম দামে বিক্রি হতে পারে। এটাও লক্ষ্য রাখতে হবে। দেশে প্যানাসিয়া ডট লাইভ নামে একটি ওয়েবসাইট রয়েছে যেখানে গিয়ে ওষুধ যাচাই করতে পারবেন। প্যানাসিয়ার আওতায় থাকা প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট ওষুধের প্রতিটি পাতায় একটি করে আলাদা কোড থাকে। কেনার আগে ওষুধের গায়ে থাকা নির্দিষ্ট কোডটি ‘২৭৭৭’ নম্বরে এসএমএস করে পাঠালে প্যানাসিয়ার ডাটাবেইসে থাকা কোডের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই যাচাই হবে। আর তাৎক্ষণিকভাবে একটি ফিরতি এসএমএসে (ইংরেজি ও বাংলায়) জানিয়ে দেওয়া হবে ওষুধটি আসল নাকি নকল।

বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে অসংখ্য ওষুধের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েকগুণ। এ সুযোগটি দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ীরা গ্রহণ করেছে। বিভিন্ন পত্রিকার প্রতিবেদনে এসেছে, ওষুধ উৎপাদনের নাম করে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানি কাঁচামাল কিনে নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদন করে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করছে। এরকম ভয়াবহ অসৎচর্চার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। ফার্মেসিসহ ওষুধ কোম্পানিগুলোতেও সরকার সংশ্লিষ্টদের আরও কড়া নজরদারি প্রয়োজন।

হাসনা হেনা: শিক্ষক ও লেখক
shishirbhor01@gmail.com