খোলা কাগজে খোলা আবেদন

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

খোলা কাগজে খোলা আবেদন

বিলেকাসা ১০:২৬ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৯, ২০২০

print
খোলা কাগজে খোলা আবেদন

প্রিয় বাবা মা এবং সম্মানিত বাবা মা, যাদের কাছে গচ্ছিত আছে ‘শিশু’ নামের প্রকৃতি জগতের সবচেয়ে কাক্সিক্ষত উপহার, জীবনের অমূল্য ধন আপনাদের সন্তান। যে শিশুর ওপর নির্ভর করছে একটি দেশের ভবিষ্যৎ। যে শিশু নিজেই বিশ্বের একটি সম্পদ। সেই শিশুর যত্নের ভার আপনাদের কাছে। ওর যত্নের মাঝেই আপনাদের আনন্দ। শিশুকে গড়ে তোলার মাঝেই আছে জীবনের পরিপূর্ণতা। মাঝে মাঝে নিজের সাধ্যের বাইরে গিয়েও নিজের সন্তান বা শিশুর যত্ন নিচ্ছেন এতে সন্দেহ নেই। তারপরেও, করোনাকালের সুযোগ নিয়ে ওদের হাত পরিষ্কার রাখার ব্যাপারে কিছু কথা বলার মাধ্যমে বড় একটি আবেদন করতে চাই। ইতোমধ্যেই ওদের শিখিয়েছেন কীভাবে হাত পরিষ্কার রাখতে হয়। এরপর হাতের ব্যাপারে আরও কয়েকটি ধাপ যদি দেখিয়ে দিতেন, তাহলে ওদের জন্য ভালো হতো। তারপরও একটু গুছিয়ে কথাগুলো আবার বলার চেষ্টা করছি। একদিন ওদের হাতেই থাকবে একটি শিক্ষা, সম্পদসহ দেশের সমস্ত কিছু।

হাত পরিষ্কার করার সঙ্গেই জড়িত আছে পানি এবং সাবানের ব্যবহার। হাত পরিষ্কার করতে গিয়ে যেন পানি এবং সাবানের অপচয় না করে এ শিক্ষাটা খুব জরুরি। হাতে সাবান লাগানোর সময় যেন কল বন্ধ রাখে। হাতে সাবান মাখানোর পর হাতে হাত ঘষার সময়টাতেও কল বন্ধ থাকবে। তারপর কল খুলে পর্যাপ্ত পানি দিয়ে হাত পরিষ্কার করবে। একই সঙ্গে ওদেরকে দেখিয়ে দিতে পারেন কীভাবে আরেকটু পানি কম ব্যবহার করে হাত ধোয়া যায়। তাই বলে ওর যতটুকু প্রয়োজন তার চেয়ে কমানোর কথা বলছি না। ঠিক একইভাবে গোসলের ক্ষেত্রেও পানি এবং সাবানের অপচয় কমানোর সঙ্গে সাশ্রয়ী হতে শেখানো যেতে পারে। গোসল এবং হাত পরিষ্কারের পর বেসিন এবং বাথরুমটা পরিষ্কার রাখা যে ওরই কাজ, চাইলে এটাও শিখিয়ে দিতে পারেন।

শিশুদের শেখাতে গিয়ে ওর কথাও শুনতে হবে। মাঝে মাঝে ওরাও দুই একটি বিষয় ভালো বুঝবে, আপনাদেরও সেভাবে কাজ করতে বলবে। তখন ওদের শেখানো নিয়মটাও যদি মানেন, তাহলে ওরা বুঝবে ওদের প্রতি আপনাদের সম্মান আছে। শুধু যে জোর করে চাপিয়ে দিচ্ছেন না, এটা বুঝতে পারলে শেখাটা খুব সহজ হবে। যে নিয়মটা ওর বুদ্ধিতে সঠিক মনে হলো, কিন্তু আপনি দেখছেন ব্যাপারটা পুরোটা সঠিক নয়, তারপরেও কিছুদিন ওর নিয়ম মেনে চলতে পারেন। তারপর এক ফাঁকে বুঝিয়ে বললেই হবে, তখন দেখবেন ওরাও বুঝতে পারবে। কিন্তু শুরুতেই ওদেরটা না মেনে শুধু নিজেদের নিয়ম ওদের ওপর চাপিয়ে দিলে ওরা বেঁকেও বসতে পারে।

এগুলোর পরবর্তী ধাপ হলো মোবাইল ফোন এবং ল্যাপটপসহ সব ধরনের ইলেকট্রনিক যন্ত্রের ক্ষেত্রে হাতের ব্যবহার। একটি মোবাইল ফোন এবং ল্যাপটপ বা কম্পিউটার হলো হাতের নাগালে এই যুগের সবচেয়ে আধুনিক যন্ত্র। এ যন্ত্র দুটিতে এক সঙ্গে অনেক কিছুই ঠাসা। এদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যবহার হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে জীবনের ভালো মন্দ প্রায় সমস্ত কিছুর সম্পর্কেই কিছু না কিছু তথ্য দিতে পারা। জ্ঞান বিজ্ঞান ইতিহাসসহ পৃথিবীর প্রায় সব ব্যাপারেই ইন্টারনেটে কিছু না কিছু তথ্য পাওয়া যাবেই। আর মোবাইল ফোন দিয়ে এই তথ্যের নাগাল পাওয়া খুবই সহজ। একই সঙ্গে ইন্টারনেটে এমন কিছু আছে, যা একজন শিশুর মানসিকতার ওপর সাংঘাতিক ধরনের বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। জীবনের মতো ইন্টারনেটেরও ভালো থেকে মন্দ আলাদা করার কোনো উপায় নেই। কিন্তু আস্তে আস্তে একজন শিশুকে যদি শেখানো হয় এবং যত্নের সঙ্গে ওর দেখভাল করা হয়, তাহলে হয়তো ও নিজে থেকেই ইন্টারনেটের সর্বনাশা ব্যাপারগুলো থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারবে।

করোনার সময়ে ইন্টারনেটের সঙ্গে হাতের ব্যবহার ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে আপনার শিশু যদি অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত থাকে। এখানে একটি বিশেষ দিক উল্লেখ করছি। পরীক্ষার সময় খুব সহজেই অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করে লেখা যায়। একই ভাবে চাইলে হোমওয়ার্ক এবং আসাইনম্যান্টেও অন্যেরটা দেখে লেখা যায়। এগুলো বন্ধ করার সহজ কোনো উপায় নেই। কিন্তু আপনার যত্নে হয়তো একটি শিশু নিজের হাতের ব্যবহারটা শিখে ফেললে নিজেই নিজেকে নকল থেকে দূরে রাখতে পারবে। এক্ষেত্রে ওকে ব্যাপারটা সম্মানের সঙ্গে বুঝিয়ে বলতে হবে এবং অন্যেরটা না দেখে একটু কম নম্বর পাওয়াকেও সম্মান করতে হবে। তারপর ভালো নম্বরের জন্যে আরও একটু চেষ্টার দিকে তাগিদ দেওয়া যেতে পারে। তা না হলে করোনার কারণে শুধু হাতের বাহ্যিক ময়লা দূর করতে পারলেও, হাতের যথেচ্ছা ব্যবহারে মনের ভিতর ময়লা ঢুকে যাবে। যে থেকে বের হয়ে আসা খুবই কঠিন। এবং যত বড় হতে থাকত তত হয়তো হাতের যথেচ্ছা ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে পড়তে পারে। যা ওর নিজের জন্যে, আপনার পরিবারের জন্যে, এমনকি দেশ ও জাতির জন্যেই মারাত্মক একটি হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

হাত পরিষ্কার রাখা এবং হাতের ব্যবহার সম্পর্কে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো ওরা ময়লা কোথায় ফেলবে। একটু কষ্ট করে ওদের শিক্ষা দিন, যেখানে সেখানে যেন ময়লা না ফেলে। খাবার সময় ময়লা ফেলার জন্যে ওকে একটি প্লেট দিন। আস্তে আস্তে শিখিয়ে দিন কীভাবে ময়লাটা সব সময় ময়লার ঝুড়িতে ফেলতে হবে। এটাকেই আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন। আপনার সন্তান রাস্তায় যেন কোনোভাবেই ময়লা না ফেলে। ময়লার ঝুড়ি না পেলে যেন বাসায় ময়লাটা নিয়ে ফিরতে পারে। তার জন্যে ওকে যেমন দেখিয়ে দিতে হবে, তেমনি কীসে করে ময়লাটা বাসায় আনবে, এরকম একটা ব্যবস্থাও যেন ওর সঙ্গে থাকে। এগুলো শেখাতে গিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ওর এসব কাজের প্রতি বাসার সবার যেন সম্মান থাকে। আজকের শিক্ষা থেকে বড় হয়ে ওরা একদিন বুঝবে কী করে রাস্তার ময়লা দূর করতে হবে। কারণ ওরাই আমাদের ভবিষ্যৎ!

যদিও মনে হতে পারে, হাত পরিষ্কার খুব ছোট একটি বিষয়, কিন্তু আদৌ তা নয়। একটি শিশু যদি জানে কীভাবে হাত পরিষ্কার রাখতে হয়, এবং কীভাবে হাতের ব্যবহার সংযত রাখতে হয় তাহলে ওর হাতের সঙ্গে চোখের দৃষ্টিও পরিষ্কার রাখতে পারবে। একই সঙ্গে ওর চিন্তাও পরিষ্কার রাখতে পারে। কারণ হাতের সঙ্গেই চোখ এবং মন বা চিন্তা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একটিতে ময়লা থাকলে অন্যগুলোতে ময়লা সহজেই ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই হাত-চোখ বা চিন্তার একটি পরিষ্কার রাখতে শিখলেই বাকিগুলোও পরিষ্কার রাখা অনেক সহজ হয়ে যায়। হাতের নাগালের মধ্যে এলেই যে সব কিছু ধরতে নেই, এ শিক্ষাটা খুব ছোটবেলা থেকেই দরকার।

আজ সমাজের দিকে তাকালে দেখা যায়, অনেক শিশুই অনেক ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। মোটা দাগে বলা যায় এসব শিশু জানে না কীভাবে হাত পরিষ্কার রাখতে হয়। হাত অপরিষ্কার রাখার সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি এবং চিন্তাতেও ময়লা ঢুকে গেছে। এটা আবার উল্টোভাবেও কাজ করতে পারে, হয়তো চিন্তায় ময়লা থাকার কারণে ওর হাত এবং দৃষ্টিতেও ময়লা জমতে শুরু করেছে। যাই হোক না কেন, মোটকথা ওদের সুস্থ জীবনের জন্যে কোথাও না কোথাও থেকে শুরু করতে হবে, যেন ওদের হাত, দৃষ্টি এবং চিন্তায় ময়লা না থাকতে পারে। কারণ একদিন ওদেরকেই একটি বড় অফিস চালাতে হবে। যদি ছোটকালের শিক্ষাটা ধরে রাখে, তাহলে অফিসের জঞ্জাল আস্তে আস্তে দূর করতে পারবে। আজকের শিশুদের হাতেই একদিন চলে আসবে রাষ্ট্রের সম্পদ। হাত পরিষ্কার রেখে রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়নে এ সম্পদ ব্যবহার করতে পারবে, একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় কমাতে পারবে। ছোটকালের শিক্ষার কারণেই হয়তো হাতের নাগালে বড় বড় অবৈধ সুযোগ এলেও ও গ্রহণ করতে চাইবে না। হাত, দৃষ্টি এবং চিন্তা পরিষ্কার থাকার কারণেই হয়তো ওদের মাঝে বড় একটি তাড়না আসবে, কী করে আমাদের প্রকৃতি পরিষ্কার রাখা যায়।

ছোটকালের এ তাড়না থেকেই ওরা একদিন এ দেশ থেকে সব ধরনের জঞ্জাল এবং ময়লা দূর করতে সচেষ্ট হতে পারবে। আমাদের রাস্তাঘাট ড্রেন থেকে নদী পর্যন্ত পরিষ্কার করার চিন্তা করবে। ভাবতে পারার সঙ্গে একটু গুছিয়ে লিখতে পারি বলেই লেখাটা লিখেছি। হাতের যথেচ্ছা ব্যবহারের সঙ্গে অপচয় থাকলে জীবনের স্বাভাবিক আনন্দগুলো খুব সহজেই হারিয়ে যেতে পারে। আমার নিজের জীবনের আলোকেই কথাগুলো বলেছি। ভাবতে পারলেও কথাগুলোর বাস্তবরূপ দেওয়াটা আমার পক্ষে সহজ নয়। তাই আবেদন করছি সবার প্রতি যদি তারা কথাগুলোর বাস্তব রূপ দিতে পারেন, বিশেষ করে নিজেদের জীবনে এবং নিজের সন্তানদের জীবনে। শিশুকে শেখাতে গিয়ে আমরাও আবার নতুন করে অনেক কিছুই শিখতে পারি এবং জীবনকে নতুনভাবে উপভোগ করতে পারি। কারণ সন্তানকে শেখানো মানেই নিজেকে শেখানোর দ্বিতীয় একটি সুযোগ। নিজের জীবনের ভুলগুলোতে অভ্যস্ত হয়ে গেলেও সন্তানের ভুলগুলো ঠিকই আমাদের চোখে পড়ে, যা আমাদের শোধরানোর দ্বিতীয় সুযোগ।

তাই প্রিয় এবং সম্মানিত বাবা-মাকে অনুরোধ করছি এই করোনার সুযোগে আপনার সন্তানের হাত পরিষ্কারের সঙ্গে হাতের অন্য ব্যবহারের দিকেও একটু বেশি নজর দিন। ওদের হাতে ধরে শিখিয়ে দিন, এবং একই সঙ্গে ওদের থেকেও শিখে নিন কীভাবে হাতের যথেচ্ছা ব্যবহার কমানো যায়। ওদের শেখান হাতের নাগালের মধ্যে হলেও যে সব কিছু ধরতে নেই, তাহলে একদিন ওরা আমাদের ভবিষ্যৎকে হয়তো পরিষ্কার রাখতে পারবে। আজ যদি আপনারা ওদের দুটো হাত পরিষ্কারভাবে গড়ে দিতে পারেন, কে জানে হয়তো ওরাই অদূর ভবিষ্যতে একটি পরিষ্কার দেশ গড়ে তুলবে!

বিলেকাসা : শিক্ষক এবং লেখক
mzamanphy@gmail.com