বিমল গুহ: বোধ ও বিস্ময়ের কবি

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

বিমল গুহ: বোধ ও বিস্ময়ের কবি

হাসনাত মোবারক ১০:১৭ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৯, ২০২০

print
বিমল গুহ: বোধ ও বিস্ময়ের কবি

কবিতা কী এমন প্রশ্নের সদুত্তর দেওয়া বা পাওয়ার বিস্তর ব্যাখ্যায় না গিয়ে বলতে হয়, ‘কবিতা মানুষের বোধের নীরব দরজায় সচেতন শব্দগুচ্ছের তীক্ষè স্বরাঘাত।’ সেজন্য কবিতা সাহিত্যের অন্যান্য শাখা-প্রশাখা থেকে সর্বোচ্চ স্থানে অধিষ্ঠিত। তাই উচ্চস্বরে বলতে হয়, কবিতাই শেষ আশ্রয়স্থল। কবিতাই টিকে থাকে। দশকে-দশকে, শতকে-শতকে এমনকি সহস্রকাল ধরে মানুষ কবিতাই লিখবে, কবিতাই লিখে চলছে। মানুষ একটি খাঁটি কবিতাই পাঠ করবে অনাদিকাল ধরে। কবিতা হলো শব্দের বন্দরে ভেড়ানো ফেরি। কবিরা সেই ফেরিতে বহন করে চলছে অজস্র স্বপ্ন। কবিরা মূলত স্বপ্নের ফেরিওয়ালা। সেসব স্বপ্ন জাতিকে প্রতিনিধিত্ব করতে শেখায়। একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষা করে চলে, সে জাতির কৃষ্টি ও সংস্কৃতি। আর সংস্কৃতির উৎকৃষ্ট মাধ্যম হলো কবিতা। কবি বিমল গুহ সেই কবিতাই লিখে চলছেন এখন অবধি।

অনির্বাণ চেতনায় ভর করে আলোকসম্পাতের সুর পৌঁছে দিতে চেয়েছেন কাব্যকলা করে। তাই কবি লিখেছেনÑ ‘অলৌকিক সুই সুতোয় তোমাকে সেলাই করি শিল্পের কাঁথায়।’ (আলোকবর্তিকা)।

উপর্যুক্ত পঙ্ক্তিতে কবির শিল্পমান সচেতনতার বিষয়টি খুব ভালোভাবে পরিস্ফুটিত হয়েছে। বোধ আর বিস্ময়ের যবনিকাপাত একটি খাঁটি কবিতা। একজন কবি শব্দের বাগান পরিচর্যাকারী। যে কবি বাগানকে যত বেশি পরিচর্যা করতে পারবেন, সেই ফুলবাগানে স্নিগ্ধ পরশ ছুঁয়ে যাবে মানসে। কবি বিমল গুহের কবিতা পাঠান্তে যা পাওয়া যায়, ভরা নদীর উচ্ছল বাঁক। হ্যাঁ। নদীর সৌন্দর্য মেলে ধরে তার বুকের ঢেউ। নদীর ঢেউয়ের তালে তালে এক ধরনের দ্যোতনার সৃষ্টি হয়। নৌকা দোল খায় ঢেউয়ের তালে তালে। তেমনি একটি ভালো কবিতার শরীরে নদীর ঢেউয়ের মতো বাঁক থাকবে। যা পাঠক পাঠ করতে করতে দোল খাবে। যতবার সেই কবিতাটি পাঠ করবে, ঠিক ততবারই আলাদা একটা অনুভূতি নিয়ে ফিরবে। তাহলেই সেটাকে বলা যাবে, একটি সফল কবিতা বা খাঁটি কবিতা।

বিমল গুহের কবিতার একটি বিশেষ বিষয় উপস্থাপন করা এই গদ্যের মূল লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য নয়। কেননা বিমল গুহের প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা দশ। দশটি কাব্যগ্রন্থের আদ্যোপান্ত পাঠ শেষে অনুধাবন করা যায়। তার কবিতায়, পাহাড় ঘেরা বনবনানীর ছবি, ফুল-পাখি ও তরুলতার নিপাট বর্ণনা। তার কবিতা কপচালে বের হয় পাহাড় দুহিতার অশ্রু। কবিতার অঙ্গসৌষ্ঠবে পাওয়া যায় ফুলের সুবাসমাখা ঘ্রাণ। আবার নারীর শরীরী ঘ্রাণ। বিমল গুহের কবিসত্তার উন্মেষকাল ছিল, আজকের বাংলাদেশের মানুষের কাছে এক দুরূহ এবং ক্রান্তিলগ্ন। সেই ভাষ্যতেও তিনি কবিতা লিখেছেন প্রচুর। কবিতায় এঁকেছেন দেশের মানুষের কথা, মাটির কথা ও মুক্তির কথা। শব্দবন্ধনীতে বাঙালির অধিকার মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেছেন। কবিতায় তিনি অঙ্কন করেছেন রমণীর মুখাবয়ব। রমণীর কাছে আবির্ভূত হয়েছেন প্রেমিক যুবারূপে। কবিতার রেখায়িত পথ স্নায়ুকোষের ভাঁজে ঠাঁই নিয়েছে। ভাবনার বীজ বপন করা হয়েছে তার দশটি কাব্যগ্রন্থ ও অন্যান্য রচনাবলিতে। সৃজনপ্রয়াসী বিমল গুহের কবিতায় নান্দনিক মধুমাত্রা বিধৃত হয়েছে। তাই তার কবিতার তাবৎ বিষয় ও আঙ্গিকতা নিয়ে কিছুটা আলোকপাত করব।

বিমল গুহ যেমন শব্দকুশীলব, তেমনি সঠিক স্থানে যথোপযুক্ত শব্দপাতের মাধ্যমে পরিস্ফুটিত করেছেন কবিতার শরীর। কবিতাতে ছন্দ ও মাত্রার ব্যবহারের পারঙ্গমতা দর্শনীয় বটে। তার কবিতা প্রসঙ্গে বলতে দ্বিধা নেই, তিনি একজন ছন্দসচেতন শব্দশিল্পী। যদিও বলা হয়, মাত্রা আর মুড নিক্তি দিয়ে মেপে মেপে কবিতার বিচার অসম্ভব। তা করাটা ঠিকও নয়। কাল-ঘটনা বা পরিপ্রেক্ষিত অনুযায়ী কখনো স্লোগানও কবিতায় ব্যবহৃত হয়েছে। কবিতায় স্লোগান সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করে মাত্র। অগ্রজ কবি শামসুর রাহমান বর্ণনাধর্মী কবিতাই বেশি লিখেছেন। আবার তারই সমসাময়িক কবি আল মাহমুদ গ্রামীণ আবহ ও লোকজ কোলাজকে উপজীব্য করে কবিতা লিখেছেন।

যা হোক প্রসঙ্গ-কথায় আসি। বিমল গুহও গ্রামীণ আবহ, ভরা নদীর বাঁক, উচ্ছ্বল হাঁসের পাল আবার সমর-সংগ্রামের চিত্রও ধারণ করেছে কবিতায়। একজন কবি সমকালের প্রধান নিরীক্ষক। সমকালকে উপজীব্য করেও কবিতা লিখতে হয়। বিমল গুহ কবিতা লিখছেন বিস্তৃত বিষয়-আশয় নিয়ে। তার প্রথম দিককার কাব্যগ্রন্থের ধরন-প্রকরণ একরকম। কবিতার ট্রেন্ড পরিবর্তিত হয়েছে পরবর্তী কাব্যগ্রন্থগুলোতে। ‘অহংকার, তোমার শব্দ’ তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ। এ কাব্যগ্রন্থে কবিকে হেঁটে যেতে দেখেছি, প্রখর রৌদ্রবনের ফেরিওয়ালা রূপে। যেখানে একজন কবিকে স্বপ্নভুক মানুষ দেখা গেছে। স্বপ্নতাড়িত হয়ে কবি বিমল গুহ শব্দের বাগান পরিচর্যা করেছেন। তাপ-অনুতাপে দগ্ধিত কবি লিখলেন, ‘বিশ্বাসের ব্যর্থ ক্ষোভে বাতাসে উড়ছে সরু চুল/ অনড় শরীরে দ্যুতি নেই, জমে আছে মায়া উর্ণাজাল।’ (অবেলার ডাক)।

কবিতাটিতে মানবতার অতলকে স্পর্শ করে। যুগে-যুগে উল্লেখযোগ্য কবিকুল কবিতা লিখে চলছেন। প্রত্যেক কবিই চায় আলাদা একটা প্যাটার্ন গড়তে। বৃত্তের বাইরে এসে লাটিম ঘোরাতে। ভিন্ন মেজাজের একটা সৌধ নির্মাণের প্রত্যয়ে কবিরা লেখেন। সেই সৌধটি নির্মাণ করতে পারাটা অনেক শ্রমসাধ্য কাজ। এক্ষেত্রে বিমল গুহের বেলাতে ব্যত্যয় ঘটেনি। বিমল গুহ যে সময় থেকে কবিতা লিখতে শুরু করেছেন, সেই সময়ের অন্যসব কবিদের কবিতা থেকে তার কবিতার ঢং ও রং স্বতন্ত্র সত্তা বহন করে।

বিমল গুহের কবিতাকর্মের বয়স চার দশকেরও বেশি সময়। পূর্বেই উল্লেখ করেছি, বিমল গুহের প্রথম দিককার কবিতার চেয়ে শেষের দিকের কবিতার প্যার্টান ও গাঁথুনি অনেকটা অন্যদিকে ধাবিত হয়েছে। ‘বিবরের গান’, ‘প্রত্যেকেই পৃথক বিপ্লবী’ দুটি কাব্যগ্রন্থের ভিতরে দেখা যায় কবির নস্টালজিয়া এবং সময়কে ধারণ করার প্রয়াস। এক্ষেত্রেও তিনি এক ধরনের উদারতার পরিচয় দিয়েছেন বটে। আমরা দেখতে পাই বিদগ্ধ এক কবিকে ‘উনিশশ নব্বই’ নামক কবিতায়। নব্য স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের বুকে ঘটে গেল এক অনভিপ্রেত ঘটনা। সামরিক জান্তার রোষানলে এদেশের লক্ষ কোটি জনতা। ওই সময়ে এদেশের সংস্কৃতিকর্মীরা কবিতা দিয়ে সংগ্রাম করার একটা নজির স্থাপন করেছিলেন। কবিতার চরণ দিয়ে তরুণ তুর্কিরা রাজপথ গরম করে তুলেছিল। সেক্ষেত্রে বিমল গুহকে একজন সংগ্রামী শব্দ সৈনিক হিসেবে দেখা যায় তার দ্রোহের পঙ্ক্তিমালায়। তবে একটা বিষয় খুব পরিষ্কারভাবে বলা দরকার অসামান্য বিনয়ী ও তুখোড় শব্দ শ্রমিক বিমল গুহের ব্যক্তিমানসের ভিতর গুরুগিরি লক্ষণ একেবারেই দেখা যায় না। তবে তার কবিতা পাঠের ভিতরে এক ধরনের সরল বাতায়ন পাওয়া যায়। যেটি এদেশের মুক্তবুদ্ধির চর্যার সহায়ক হিসেবে পরিগণিত। তার সৃজনধারাতে সমাজ-সাহিত্য-শিল্প ও সংস্কৃতির সহজ ও সাবলীল কল্পপ্রতিমার স্বাক্ষর বহন করে।

‘স্বপ্নে জ¦লে শর্তহীন ভোর’ কাব্যগ্রন্থের নামটির ভিতরে মূল বিষয়টি পরিস্ফুটিত হয়েছে। গ্রন্থলোকে ‘বর্ণবাদী পাংশুটে গিঁট’ কবিতায় কবি রৌদ্রদীপ্ত ভাবাবেগের তীরে বিদ্ধ করেছেন। এখানে খাপখোলা তরবারির মতো ঝলসে উঠেছে কবির স্বগতোক্তি। মানবসত্তার অন্বেষণ মিলবে এখানে ‘তোমার দক্ষিণজুড়ে বৃষ্টিসম্ভবা মেঘ পুরনো আকাশ ছেয়ে আছে/ আগামী বৃষ্টির গানে আমরাও রোমাঞ্চিত হই/ প্রবল বর্ষণে সব হিংসা ও বিদ্বেষ মুছে গেলে/ মানুষ নামের এই শব্দ থেকে মুছে যাবে হিংস্র জড়তা।’ (বর্ণবাদী পাংশুটে মেঘ)।

এখানে মানবতার স্পষ্ট আর্তি লক্ষ্য করা যায়। দেশকালের সমস্যা-সঙ্কুলতা নিয়ে তিনি যতটুকু না হতাশাগ্রস্ত তারচেয়ে বেশিটুকু তিনি আশান্বিত। সেটা আমরা তার এই কারুকর্মের ভিতরে দেখতে পাই। কবিতাটিতে কবি আমিত্ববাদকে পরিহার করেছেন সফলভাবে। আমাদের ভূ-খ-ের কবিদের কবিতার দিকে তাকালে দেখা যাবে, প্রায় কবিই শুরুটা করেছেন কিন্তু আমিত্ববাদ ও রোমান্টিসিজম দিয়ে। বিমল গুহের বেলাতেও ব্যত্যয় ঘটেনি। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থের প্রকাশকাল ১৯৮২। কিন্তু কবিতাগুলো লেখা হয়েছে তারও এক দশক আগ থেকে। এ কবির রোমান্টিসিজমের কথা বলা হচ্ছিল। হ্যাঁ। তিনিও এই একই দিকে ধাবিত হয়েছেন। আমরা দেখি ‘ভালোবাসার কবিতা’ নামে তার একটি কাব্যগ্রন্থ আছে। সেটির প্রকাশকাল ১৯৮৯। এ কাব্যদেবীর রচনাকাল ১৯৭২-৮৯। প্রেমের কবিতা তিনি প্রথম দিক থেকেই লিখেছেন। শুধু তার প্রকাশ প্রকরণটি পরিশীলিত ও সূচিবদ্ধ। প্রেম বা রোমান্টিসিজমের পাশাপাশি বিমল গুহের কবিতায় স্থান পেয়েছে দেশকাল ও সমাজ। ইতিহাস ঐতিহ্যের নির্যাস পাওয়া যায়। লোকঐতিহ্য ও মেঘসাম্পানের ওপর ভর করে একজন কবি কবিতা লিখে চলছেন। লিখবেন।

হাসনাত মোবারক: কবি ও প্রাবন্ধিক
hasnatmobarak@gmail.com