সার্কুলার লাইফ বনাম শিক্ষার উদ্দেশ্য

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

সার্কুলার লাইফ বনাম শিক্ষার উদ্দেশ্য

মোহাম্মদ কামরুজ্জামান ১০:১২ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৮, ২০২০

print
সার্কুলার লাইফ বনাম শিক্ষার উদ্দেশ্য

মানুষ জন্ম থেকেই বৃত্তবন্দি। অদৃশ্য এক বৃত্ত-বলয়ের মাঝে সে জন্ম নেয়, বড় হয়, বুড়ো হয়। আর শেষে একদিন মারা যায়। মানুষের এইরূপ যাপিত জীবনের একটা নাম আছে; ‘সার্কুলার লাইফ’ বা ‘চক্রাকার জীবন’। মানুষের মতো আরও অনেক প্রাণী এই সার্কুলার লাইফ যাপন করে। মানুষ ছাড়া অন্য সকল প্রাণীর মৌলিক চাহিদা দুটি- খাদ্য আর বাসস্থান। এ দুটো মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য প্রাণিকুলকে কিছু কৌশল রপ্ত করতে হয়। এই শিক্ষা সে তার পরিবেশ ও প্রকৃতি থেকে পেয়ে থাকে।

 

এই গ্রহে মানুষই সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী। বুদ্ধির জোরেই মানুষ অন্যসব প্রাণিকুল থেকে নিজেকে আলাদা করেছে। বুদ্ধি (intelligence) মানুষের মূলশক্তি হলেও বুদ্ধিটা আসে কিন্তু শিক্ষা (education) থেকে। শিক্ষা মানে সঠিক ও মানসম্পন্ন শিক্ষা। আর এই শিক্ষার কোনো সীমানা নেই, কোনো পরিসর নেই। শিক্ষার সঙ্গে জ্ঞানের (knowledge) এবং বিজ্ঞতা (wisdom) এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে, যেমনটি রয়েছে শিক্ষার সঙ্গে বুদ্ধির। তবে সব জ্ঞানী ব্যক্তি বুদ্ধিমান নাও হতে পারে। আবার অনেক বুদ্ধিমান ব্যক্তিরও শিক্ষালব্ধ জ্ঞানের ঘাটতি থাকতে পারে। অন্যদিকে চিন্তা (thinking) এবং কল্পনা (imagination) হলো মানুষের বিশেষ দুটি গুণ, যা অন্যসব প্রাণিকুল থেকে মানুষকে অদ্বিতীয় ও অপ্রতিম করেছে। মানুষ যদি জ্ঞান এবং বুদ্ধির সঙ্গে তার চিন্তা ও কল্পনা শক্তির সঠিক সংযোজন ঘটাতে পারে, তবে সে সাধারণ মানুষ থেকে হয়ে উঠতে পারে অসাধারণ। মূলত মানুষ অনন্য যতটা না তার জ্ঞান ও বুদ্ধির কারণে, তারচেয়ে বেশি তার চিন্তাশক্তি ও কল্পনাশক্তির কারণে।

বিজ্ঞানী নিউটনের কথাই ধরুন। তিনি তার বিখ্যাত গতিসূত্রগুলো কিন্তু কাগজে কলমে আনার আগে মাথায় এনেছেন। আপেলের পতন নিয়ে চিন্তা করতে করতে আবিষ্কার করে ফেলেছেন মাধ্যাকর্ষণ শক্তি। তারপর অংক কষে সেটাকে প্রমাণ করেছেন। একইভাবে বিজ্ঞানী আইনস্টাইন এর বিখ্যাত থিওরি অব রিলেটিভিটির জন্ম হয়েছিল তার অসামান্য কল্পনাশক্তি থেকে। তাই কল্পনা বা ইমাজিনেশনই হচ্ছে মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি, আর এই শক্তি সৃষ্টিকর্তা কেবল মানুষকেই দিয়েছেন। যারা কল্পনা করতে পারেন, তারা সৃষ্টি করতে পারেন। সেই মানুষগুলোকে বলা হয় সৃজনশীল বা সৃষ্টিশীল(creative) মানুষ। আর শিক্ষার আসল উদ্দেশ্যে হলো, সৃষ্টিশীল মানুষ তৈরি করা।

আমাদের পৃথিবীতে সত্যিকারের সৃজনশীল মানুষের সংখ্যা খুব কম। লাখে একজন, এমনকি কোটিতেও একজনকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তারপরও যুগে যুগে এই অল্পসংখ্যক মানুষই কিন্তু পৃথিবীকে বদলে দিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তাদের নানা আবিষ্কার ও তত্ত্ব মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

সব দেশে সব যুগে সৃজনশীল মানুষের সৃষ্টির সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দুটি শক্তি- একটা সামাজিক প্রথা, অন্যটা ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কার, যদিও ধর্মগুলো মানুষের কল্যাণের জন্যই প্রবর্তন করা হয়েছে। ধর্ম প্রবর্তকরা প্রায় সকলেই গভীর চিন্তাশীল মানুষ ছিলেন। অথচ, দুঃখজনক হলো, ধর্মানুরাগীরা অনেকেই মানুষের স্বাধীন চিন্তাশীলতাকে কিংবা মন ও মননের উন্মুক্ত বিকাশকে সেভাবে মেনে নিতে পারেন না।

সৃজনশীল মানুষরা সবসময় তাদের চারপাশের বৃত্তকে ভাঙতে চায়। এই বৃত্ত গতানুগতিক চিন্তা-চেতনার বৃত্ত, প্রাচীন ধ্যান-ধারণার বৃত্ত। সৃষ্টিকর্তা প্রতিটি মানুষকে অসীম ক্ষমতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না; জানতে চায় না। তারা চক্রাকার জীবন পছন্দ করে। বৃত্তের বাইরে যেতে তাদের বড় ভয়! অধিকাংশ মানুষ কেবল পুকুরের পানিতে সাঁতার কাটতে চায়। বিশাল সমুদ্রের জলরাশিতে অবাধ বিচরণ করতে তারা একেবারেই অনাগ্রহী।

মানুষ আজ জ্ঞান-বিজ্ঞানে যে এত উন্নতি সাধন করেছে, তা কিন্তু এই কিছু সংখ্যক মানুষের চক্র ভাঙার কারণেই। আজ থেকে প্রায় দুই হাজার বছর আগে টলেমি নামক একজন জোতির্বিজ্ঞানী ও দার্শনিক পৃথিবী কেন্দ্রিক মহাবিশে^র তত্ত্ব দিয়েছিলেন। এই তত্ত্বে পৃথিবীকে মহাবিশে^র কেন্দ্রে ধরে বলা হয়েছিল সূর্য, অন্যান্য নক্ষত্র, গ্রহ সবই পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। তারও আগে দার্শনিক সক্রেটিস ও এরিস্টটল এই একই মত দিয়ে গিয়েছিলেন। তাদের এই মহাকাশ তত্ত্ব দেড় হাজার বছর ধরে চালু ছিল। তখনকার দিনের ধর্মযাজকরা এই একই মত বিশ^াস করতেন বলে কেউ এর বিরুদ্ধে বলা তো দূরের কথা, চিন্তা করারই সাহস করতে পারেনি।

তারপর পনেরশ’ শতকের গোড়ার দিকে কোপার্নিকাস নামে আরেকজন জোতির্বিজ্ঞানী, গণিতবিদ ও দার্শনিক স্রোতের বিপরীতে চিন্তা করার সাহস দেখান এবং বলেন, পৃথিবীকে কেন্দ্র করে নয়, বরং পৃথিবীসহ অন্যান্য গ্রহ, উপগ্রহ সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। কিন্তু তিনি নিজে একজন ধর্মযাজক হওয়ায় তার এই মত প্রকাশ করতে ইতস্তত করেন এবং তেরো বছর সময় নেন। তারপরে এসে বিখ্যাত বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলি নিজের আবিষ্কৃত আধুনিক মানের টেলিস্কোপের সাহায্যে অধিকতর পর্যবেক্ষণ করে কোপার্নিকাসের তত্ত্বকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন।

আসলে আমরা সবাই যেভাবে চিন্তা করি, বিখ্যাত ব্যক্তিরা যদি সেভাবে চিন্তা করতেন তবে হয়তো আমরা আজকের এই পৃথিবী পেতাম না।
দুঃখের বিষয় হলো, আজকের যুগে চিন্তা ও কল্পনা করার মানুষের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এখন প্রতিটি মানুষ অতি ব্যস্ত। পুঁজিবাদ ও বিশ্বায়নের এই সময়ে মানুষ খুবই গতিময়। ধনসম্পত্তি ও প্রভাব প্রতিপত্তি অর্জন করে বিলাসবহুল জীবনযাপনের জন্য মানুষের নিরন্তর ছুটে চলা। এটাও এক ধরনের বৃত্তবন্দি জীবন, নতুন ধরনের সার্কুলার লাইফ।

কষ্টের বিষয় হলো, আমাদের আজকের ছাত্র-ছাত্রীরা কেবল পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য পড়ে, ভালো চাকরি পাওয়ার জন্য পড়ে। তারা সত্যিকার অর্থে, জ্ঞানার্জনের জন্য পড়ে না, চিন্তা করার জন্য পড়ে না। শিক্ষা ও জ্ঞান তাদের মধ্যে কল্পনাশক্তি জাগিয়ে তোলে না। দুঃখজনক হলো, আমাদের পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে সামগ্রিক শিক্ষা কাঠামো আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের চিন্তাশীল বা কল্পনাপ্রবণ করে তোলার জন্য যথেষ্ট নয়।

তাই জাতি হিসেবে আমরা ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ছি। আমাদের প্রজন্ম সামগ্রিক বিবেচনায় অনেকটা বন্ধ্যা, অনুপযুক্ত ও অক্ষম হয়ে বেড়ে উঠছে। নতুন নতুন জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিশ্ব পরিমণ্ডলের আমাদের অবস্থান আজ অতি নগণ্য। বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিম-লে আমরা হয়তো ক্ষুদ্র হলেও একটা ছাপ ফেলতে পেরেছি, কিন্তু আধুনিক শিক্ষা তথা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষে আমাদের অবস্থান অতি নগণ্য। আমাদের বর্তমান প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের চলমান ধারাকে ভারসাম্যপূর্ণ, দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই করতে হলে সবার আগে দরকার বিজ্ঞানভিত্তিক আধুনিক শিক্ষা, যা শিক্ষার্থীদের সৃষ্টিশীল মানুষে রূপান্তর করবে। নতুন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে শিক্ষা ব্যবস্থার এই দিকগুলো বিশেষভাবে ভেবে দেখা দরকার।

মোহাম্মদ কামরুজ্জামান : ব্যাংকার