জাপানি মায়ের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড

ঢাকা, শনিবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২০ | ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

জাপানি মায়ের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড

রাহমান মনি ১১:০৪ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৭, ২০২০

print
জাপানি মায়ের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড

মা, ব্যঞ্জনবর্ণের সঙ্গে স্বরবর্ণ যুক্ত হওয়া বাংলা অভিধানের সবচেয়ে মূল্যবান এবং বহুল উচ্চারিত একক?একটি শব্দ। মা হচ্ছেন একজন পূর্ণাঙ্গ নারী। পূর্ণাঙ্গ একটি প্রতিষ্ঠান। অভিধানে স্থান নেওয়া মা নিজেই একটি অভিধান। বর্তমান বিশ্বের প্রায় ৭,০৯৯-এর মতো ভাষার অস্তিত্ব রয়েছে। (সূত্র : ইন্টারনেট, জুন ২০১৭)। আর সব ভাষাতেই মাকে নিয়ে যত গল্প, কবিতা, উপন্যাস বা গান লেখা হয়েছে অন্য কাউকে নিয়ে এত কিছু রচনা করা হয়নি। আর সব ধর্মেই মাকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। তাই, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে একজন মা শুধুই মা। সন্তান জন্মদানের সময় কত মা যে ইহলোক ত্যাগ করেন তার হিসাব ক’জন-ইবা রাখেন! সেই সকল মায়ের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং তাদের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি।

জাপানে মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে নিম্নতম। ২০১৯ সালের তথ্যমতে, জাপানের মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি এক লাখে মাত্র চারজন। আর বিশ্বে নবজাতক শিশুমৃত্যুর হারও সবচেয়ে কম জাপানে। ইউনিসেফের তথ্য অনুসারে প্রতি এক হাজার একশত এগারজন শিশু জন্মের সময় মাত্র একজন শিশু মারা যায় জাপানে। আর এর বিপরীতে রয়েছে পাকিস্তান। দেশটিতে জন্মের সময় প্রতি ২২ জনে একজন শিশু মারা যায়। জাপানে শিশুমৃত্যু হার সবচেয়ে কম থাকার কারণ হচ্ছে উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা, স্বাস্থ্যবিধির নীতিমালা এবং গণসচেতনতা। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি যার অবদান তিনি সন্তানের মা। তার সচেতনতাই যে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। একটি শিশু যখন জন্ম নেয় তখন সে একাই কেবল জন্ম নেয় না। জন্ম নেন একজন মা, জন্ম নেয় একজন বাবা, দাদা-দাদি, নানা-নানি, চাচা-চাচি, মামা-মামি, ফুপা-ফুপু, খালা-খালু বা এই জাতীয় অসংখ্য সম্পর্কের। বিশ্বের সকল মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আজ একজন জাপানি মায়ের সন্তানের প্রতি দায়িত্ব, দৈনন্দিন কর্ম পরিচালনা নিয়ে পাঠকদের জানাতে চাই।

জাপানে একজন নারী যখন জানতে পারেন তিনি মা হতে চলেছেন তখন থেকেই শুরু হয়ে যায় তার সচেতনতা এবং আগত সন্তানের প্রতি দায়িত্ববোধ। তবে সবকিছু স্বাভাবিক রেখে। আর আমাদের দেশে একজন নারী যখন জানতে পারেন সন্তানসম্ভবা হতে চলেছেন তখন আর তাকে পায় কে। নিজে এবং পারিপার্শ্বিকতা এমনভাবে ঝেঁকে বসে তার বেশিরভাগই কুসংস্কারে আচ্ছন্ন। এটা করা যাবে না, ওটা করা যাবে না। করলে সন্তানের এই হবে, সেই হবে। তখন সন্তানসম্ভবা মা কিছুটা একঘেয়েমি জীবনধারণে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। দিনের অনেকটাই অলস সময় পার করেন সন্তানসম্ভবা মা। গ্রামের কথা অবশ্য ভিন্ন। সেখানে যাবতীয় কাজকর্ম সমাধা করেই সন্তানসম্ভবা মাকে সময় পার করতে হয়। অথচ একজন জাপানি নারীর বেলায় তা ভিন্ন। তিনি যখন জানতে পারেন মা হতে চলেছেন তখন থেকেই শুরু হয় তার সতর্কতা। কিছুটা সতর্কতার সঙ্গে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবন যাপনেই অভ্যস্ত থাকেন। প্রথমেই ছুটে যান স্থানীয় সিটি অফিসে। সিটি অফিস থেকে প্রথমেই একটি নোটবুক সংগ্রহ করেন। যাকে স্থানীয় ভাষায় বলে। ‘বোশি তেচো’ বা Maternity?Book। এ নোটবুকেই তার সন্তানের যাবতীয় তথ্য (গর্ভধারণ থেকে শুরু করে শিশুকাল পর্যন্ত) লিপিবদ্ধ করা থাকে। ভবিষ্যতে শিশুকাল সংক্রান্ত যে কোনো তথ্য এ নোট থেকে অনায়াসেই পাওয়া যায়। বিশেষ করে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়ে।

এই Maternity?Book নামের নোটটিতে হেলথ চেকআপের তথ্যগুলো শুরু থেকে শেষপর্যন্ত নিয়মিত লিপিবদ্ধ করা হয়। এমনকি জন্মের পরও বাচ্চার রেগুলার হেলথ চেকআপ ও ভ্যাকসিনেশন রেকর্ড এ বইয়ে লিপিবদ্ধ করা হয়। যা দেখে যে কোনো ডাক্তার সহজেই মা ও শিশুর শারীরিক অবস্থা ও হেলথ হিস্টোরি বুঝতে পারেন।

সন্তানসম্ভবা মা বিভিন্ন সময় ডাক্তারের বিভিন্ন পরামর্শ, গর্ভে বেড়ে ওঠা শিশুর বিভিন্ন ছবি, শারীরিক বৃদ্ধি থেকে শুরু করে সবকিছুই লিপিবদ্ধ করে রাখেন। অনাগত শিশুর পরিচর্যার শিক্ষা নিতে মাতৃ বিদ্যালয়ে নিয়মিত যাতায়াত করেন। এসব বিদ্যালয়ে সন্তানসম্ভবা মায়েদের কীভাবে শিশুদের কোলে নিতে হবে, কীভাবে ব্রেস্ট ফিডিং করাতে হবে, কীভাবে গোসল করাতে হবে অর্থাৎ শিশুর পরিচর্যাবিষয়ক সবকিছুই শিক্ষা দেওয়া হয়। এছাড়াও জাপানে একজন সন্তানসম্ভবা মা সন্তান জন্মের আগে থেকেই সন্তানকে কীভাবে লালন-পালন করতে হবে, তাকে কী খাওয়াতে হবে, কোন ঋতুতে কী ধরনের পোশাক পরাতে হবে, ছোটখাটো সমস্যা হলে বাড়িতে বসেই কী করে তার সহজ সমাধান করতে হবে ইত্যাদি বিষয়ে জানার চেষ্টা করেন নিজ থেকেই, বিভিন্ন বইপত্র ঘেঁটে।

আর বর্তমান নেটের যুগে একটি ক্লিকের মাধ্যমে সবকিছুই বর্ণনাসহ চলমান সচিত্র প্রতিবেদন কাগজ কলমের শিক্ষা থেকে অনেক সহজেই অনুমেয়। জাপানে শতভাগ না হলেও প্রায় ৯৯ শতাংশ লোক শিক্ষিত এবং ইন্টারনেটও সহজলভ্য। তাই তাদের জন্য এটি করা সহজ।
স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য অনুযায়ী জাপানে একজন অন্তঃসত্ত্বা মায়ের প্রায় ১৫ বার নিয়মিত এন্টিনেটাল হেলথ চেকআপ ও আলট্রাসনোগ্রাফি করতে হয়। অর্থাৎ গর্ভাবস্থা সময় ৪০ সপ্তাহ হলে, ৮, ১২, ১৬, ২০, ২৪, ২৬, ২৮, ৩০, ৩২, ৩৪, ৩৬, ৩৭, ৩৮, ৩৯ ও ৪০তম সপ্তাহে প্রতিবার নিয়মিত আলট্রাসনোগ্রাফি টেস্ট, ভ্যাজাইনাল টেস্ট, প্রেশার, ওয়েট, ফিটাল হার্টবিট ও ওয়েট চেকআপ করতে হয়।

এসব কয়টিই ডাক্তাররা অত্যন্ত যতœসহকারে, বিনয়ের সঙ্গে তত্ত্বাবধান করেন এবং প্রতিবার আলট্রাসনোগ্রাফি ছবি এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে চাহিদা অনুসারে ভিডিও ফুটেজ প্রদান করা হয়। যার মাধ্যমে একটি শিশু ভ্রুণ থেকে কীভাবে বড় হয়, সে সম্পর্কে একজন মা ও ডাক্তার সম্পূর্ণ অবগত থাকেন। এ ছবিগুলোও বোশি তেচো-তে স্থান পায়। অতি সম্প্রতি আবার মাতৃ উদরে ভ্রুণের নড়াচড়া এমনকি তার আচরণের ভিডিও ধারণও করা যাচ্ছে প্রযুক্তির আধুনিকতার ছোঁয়ায়।

এরপর নিজ স্বাস্থ্যের নজর দেন সন্তানসম্ভবা মা। নিজে সুস্থ থাকলে যে সুস্থ সন্তান জন্ম দেওয়া যায় এ উপলব্ধিটি একজন শিক্ষিতা মায়ের ভালো করেই জানা। জাপানি মায়েরা কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত নন। তারা স্বশিক্ষা এবং সুশিক্ষায় শিক্ষিত একটি জাতি।
ব্যবহারিক শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয় কিন্ডার গার্টেন থেকেই। তাই, অনাগত শিশুর সুস্বাস্থের জন্য নিজে স্বাভাবিক কাজ করার পাশাপাশি হালকা ব্যায়ামও করে থাকেন চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী। জাপানিরা এটা বিশ্বাস করে, একটি সুস্থ-সবল জাতি উপহার দেওয়ার জন্য নরমাল ডেলিভারির বিকল্প নেই।

এখানে বলে রাখা ভালো, জাপানে সবসময়ই নরমাল ডেলিভারির জন্য উৎসাহিত করা হয়। অনেক ইউরোপীয় দেশ ও আমেরিকার তুলনায় এখানে সিজারিয়ানের হার অনেক কম। এমনকি এখানে ব্যথামুক্ত প্রসব অর্থাৎ epidurl anesthesia হার অনেক কম। মাত্র ৫ দশমিক ২ শতাংশ।
একটি শিশুর জন্মের পর থেকে দেখভালের দায়িত্ব মা নিজেই করে থাকেন। অন্যের সাহায্য ছাড়াই। এখানে বাবুর দুধ গরম করে আনার জন্য বা ফুটফরমায়েশ খাটার জন্য হোম হেল্পারের কোনো সিস্টেম নেই। জাপানে একজন মা বেল্টের সাহায্যে দুই বাচ্চাকে পিঠে বেঁধে সাইকেলের সামনের ও পেছনের বেবি সিটে নিয়ে সাইকেল চালান। সকালে কাজে যাওয়ার আগে ডে-কেয়ারে রেখে কাজ শেষে আবার ডে-কেয়ার থেকে সন্তান নিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা শেষ করে বাসায় ফিরে সব কাজ নিজেই সামাল দিয়ে থাকেন।

সন্তানকে বিদ্যালয়ের জন্য তৈরি করা, বিভিন্ন ক্লাব, পার্ক, গ্রন্থাগার কিংবা শরীরচর্চা কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া সব কিছু মা-ই করে থাকেন জাপানে।
তবে জাপানি মায়েদের একটি বিষয় লক্ষণীয়। খেলার সময় কিংবা চলাফেরা করার সময় সন্তান পড়ে গেলে কিংবা হোঁচট খেলে দৌড়ে গিয়ে সোনামানিক, লক্ষ্মীসোনা জাতীয় শব্দ ব্যবহার করে বুকে না নিয়ে সন্তানকে নিজে নিজে উঠে দাঁড়ানোয় উৎসাহ প্রদান করে। স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে মায়েরা শিশুকে শিক্ষক ও সহপাঠীদের সঙ্গে ওঠা-বসা, আচার-ব্যবহার, আদব-কায়দা, রাস্তা পারাপারে সিগনাল মানা, হাত তুলে রাস্তা পার হওয়া, পুলিশের সাহায্য নেওয়া, নিজ হাতে খাওয়া ও নিজে বাথরুমে যাওয়ার প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন।

ডে-কেয়ার থেকে শুরু করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাতায়াতকালীন শিক্ষক এবং অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগের একটি নোটবুক থাকে। জাপানে যাকে ‘রেনরাকু চো’ বলা হয়। জাপানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬ বছর শিক্ষাকালে প্রতি বছর একটি রেনরাকু চো থাকে। এই রেনরাকু চো-তে বাড়িতে শিশুর দৈনন্দিন জীবনযাত্রার হিস্টোরি মা লিখে থাকেন, আর প্রতিষ্ঠানের হিস্টোরি লিখে থাকেন শিক্ষক। রেনরাকু চো একটি শিশুর দৈনন্দিন জীবনের খুঁটিনাটি বিষয় সবই লিপিবদ্ধ করা থাকে। একজন মা-ই জানেন এবং পারেন তার সন্তানের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করে সঠিকপথে পরিচালিত করার রোড ম্যাপ করে সেই ট্রাকে উঠিয়ে দিতে। একজন জাপানি মা-ই পারেন সেই কাজটি দক্ষ নাবিকের মতো লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছে দিতে। জাপানের মায়েরা যে কেবল বাড়িতে এবং বিদ্যালয়ের কাজকর্মেই দক্ষতার পরিচয় দিয়ে থাকেন তা কিন্তু নয়। এক বছর বয়স হওয়ার আগেই শিশুরা জাপানে পাবলিক লাইব্রেরির সদস্য হতে পারে। মা তার সন্তানের নামে প্রতি সপ্তাহে তিনটি বই ধার করতে পারেন। এছাড়াও বিভিন্ন উৎস একটু বড় হওয়ার পর মা সন্তানকে নিয়মিত লাইব্রেরিতে নিয়ে আসেন। গল্প ও ছবির বই পড়ে শোনান। হাঁটি হাঁটি পা পা করছে এমন শিশুও সেলফ থেকে নিজের পছন্দমতো ছবি অথবা ছড়া গল্পের বই এনে মায়ের কাছে নিয়ে আসে পড়ে দেওয়ার জন্য। মা শিশুকে কোলে বসিয়ে বেশ যত্ন করে পড়ে শোনান। এ সময়ে শিশুমনের বিভিন্ন প্রশ্নেরও উত্তর দিয়ে থাকেন।

সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্টের অনুপ্রেরণায় অনুপ্রাণিত জাপানে মনে করা হয়, প্রতিটি ভালো ছাত্রের পেছনে একজন নিবেদিত মা থাকেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি নিজে নিয়মিত সন্তানকে পার্কে, সাঁতারের ক্লাসে এবং পিয়ানো অথবা নৃত্যের ক্লাসে নিয়ে যান। মা রাতে সবার পরে বিছানায় যান কিন্তু ভোরে ওঠেন সবার আগে। কারণ, স্বামী সন্তানের পছন্দমাফিক স্বাস্থ্যসম্মত এবং মানসম্পন্ন ও কালারফুল আলাদা টিফিনবক্স প্রস্তুত করার জন্য তার বেশ সময় প্রয়োজন হয়।

একজন জাপানি মা তার সন্তানকে প্রাতিষ্ঠানিক, পারিপার্শ্বিক বাহ্যিক এবং ব্যবহারিক শিক্ষায় যেভাবে শিক্ষা দিয়ে থাকে তা অন্য কোনো জাতি সেভাবে পারে কিনা আমার জানা নেই। এখানে মা তার নাড়িছেঁড়া জঠরের ধন সন্তানকে নামের আগে মিস/মিস্টার সম্বোধন করে ডেকে থাকেন। নামের বিকৃতি চর্চা জাপানে নেই বললেই চলে।

জাপানে সন্তান তার মা-বাবাকেও ডাকার সময় সম্বোধন শেষে আগে মি. বা মিস বলে সম্বোধিত করে থাকে। তবে কিছু কিছু সময় কেবল মাকে ‘অফুকোরো’ বলে ডেকে থাকে। যার বাংলা অর্থ থলে। অর্থাৎ মায়ের পেটে থাকাকালীন একটি থলের মধ্যে বড় হওয়ায় মা সবসময় সন্তানের কাছে থলে হিসেবেই বিবেচিত। সুখ-দুঃখের শেষ ভরসা। শেষ আশ্রয়স্থলও। সেই অর্থে মাকে থলে বলে সম্বোধিত করে থাকে।

জাপানি শিশুরা বিদ্যালয় ছাড়াও বিভিন্ন ক্লাব বা অন্যান্য সংগঠনের সঙ্গে জড়িত থাকে। এগুলো সাধারণত মায়েরাই দেখভাল করে থাকেন। আর এসব কর্মকা- সাধারণত সাপ্তাহিক ছুটি অর্থাৎ বিদ্যালয় বন্ধকালীন পরিচালিত হয়ে থাকে।

সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়া সত্ত্বেও মা তার সন্তানের জন্য কাকডাকা ভোরে উঠে নিজ, স্বামী, সন্তানের ভোরের নাস্তা তৈরি করে সবাইকে পরিবেশন করিয়ে সব গোছগাছ করার পর দুপুরের টিফিন (জাপানি ভাষায় বেনতো বা প্যাকেটজাত খাবার) নিয়ে বাইসাইকেল, বাস কিংবা রেলে করে বিভিন্ন শহরে সন্তানের অংশগ্রহণে খেলাধুলায় উৎসাহ জুগিয়ে থাকেন।

শুধু স্নেহময়ী মা হিসেবেই নয়, কর্তব্যপরায়ণ স্ত্রী হিসেবেও জাপানি রমণীদের তুলনা নেই। কথায় বলে, ঘরে জাপানি বউ, হাতে ডলার, চায়নিজ খাবার এবং পালিত হিসেবে যদি একটি জার্মান কুকুর থাকে সঙ্গে, তার চেয়ে সুখী মানুষ আর এই ভুবনে নেই। অন্যান্য অনুসর্গের কথা জানা না থাকলেও একজন জাপানি স্ত্রী যে তার সবটুকু দিয়ে স্বামী সেবায় ব্রত থাকেন একথা নিজ অভিজ্ঞতায় নির্দ্বিধায় বলা যায়।

জাপানে গৃহকর্তার যাবতীয় কাজ গৃহকর্ত্রী নিজেই করে থাকেন। এমনকি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাহেবের বেতনের অর্থটা খরচের দেখভালও গৃহকর্ত্রীই করে থাকেন। মাস শেষে গৃহকর্তা কেবল মাসিক হাতখরচটা পেয়ে থাকেন তার কাছ থেকে। সাহেবের এটা হলো না কেন, ওটা গেল কই? এগুলো বলার জন্য বা করে দেওয়ার জন্য কারওর অস্তিত্ব থাকে না।

সব দেশে সব জাতিধর্মেই দু’চারটি ব্যতিক্রম থাকে। জাপানে যে অন্যায় হয় না, তা কিন্তু নয়, জাপানেও অন্যায় হয়ে থাকে। তবে তা ধর্তব্যে পড়ে না। আনুপাতিক হারে যা খুবই নগণ্য। শিশু নির্যাতনের বেলায়ও তা-ই। যাও ঘটে থাকে আইনের কঠোর প্রয়োগে তার সুরাহাও করা হয়। জাপানে আইনের শাসন এবং প্রয়োগ এতটাই কড়া, শুধু রুই-কাতলাই নয় তিমি-হাতি হলেও নিস্তার নেই।

আর আমাদের দেশে বর্তমানে রুই-কাতলা হওয়ার আগে অর্থাৎ চুনোপুঁটি হলেই ধরাকে যে সরা জ্ঞান মনে করে আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে, বলার অপেক্ষা রাখে না। আইন তাদের জন্য নয় বরং তাদের মুখের কথাই সেখানে আইন। এভাবেই একজন জাপানি নারী তার জীবদ্দশায় একজন স্ত্রী, একজন মা, একজন অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে নারীত্বের পূর্ণতা আনেন।

রাহমান মনি: জাপান প্রবাসী সাংবাদিক
rahmanmoni@gmail.com