ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড : অতঃপর করণীয়

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড : অতঃপর করণীয়

স্বাতী চৌধুরী ১২:১৪ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৬, ২০২০

print
ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড : অতঃপর করণীয়

‘মন্ত্রিসভার অনুমোদন। আজ থেকেই কার্যকর। ধর্ষণ করলে শাস্তি ফাঁসি।’ দিন কয়েক আগের পত্রিকার পাতার শিরোনাম ও টেলিভিশন টকশো’র আলোচ্য বিষয় ছিল উল্লেখিত ছোট ছোট তিনটি বাক্য। গত কিছুদিন ধরে ধর্ষণের বিরুদ্ধে উত্তাল আন্দোলনে সারা দেশ চাপা পড়ার উপক্রম হলে অবশেষে সরকারের মন্ত্রিসভার এই সিদ্ধান্ত। এতে অনেকে খুব উৎফুল্ল। অনেকে সরকারকে বিশেষ করে সরকারের লোকরাই সরকারকে প্রশংসার বন্যায় এনভাবে ভাসিয়ে দিচ্ছেন যেন এ আইন করা মাত্র দেশে ধর্ষণ বন্ধ হয়ে গেল! সে যাই হোক, আমরাও সরকারকে ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জানাই, জনতার দাবির মুখে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ (ক) ধারা সংশোধনপূর্বক ধর্ষণের সাজা মৃত্যুদণ্ড করা হলো বলে।

কথা হচ্ছে, ধর্ষণের সাজা মৃত্যুদণ্ড করলেই কি দেশ থেকে রাতারাতি ধর্ষণ বন্ধ হয়ে যাবে? দেশে নারী নির্যাতন দমন আইন আছে, যৌতুক ও বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন আছে। নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০ আছে। মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২ আছে। উত্যক্তকরণ ও যৌন হয়রানি বন্ধ করার জন্য হাইকোর্টের রায় আছে। আছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। কিন্তু কোথায় কি? নারীকে রক্ষার জন্য এত এত আইন থাকা সত্ত্বেও কি দেশে একদিনের জন্যও নারী নির্যাতন থেমেছে? যৌতুক, বাল্যবিবাহ বন্ধ হয়েছে? যৌন হয়রানি, উত্যক্তকরণ কি বন্ধ হয়েছে? নারী হত্যা, নারী পাচার কি বন্ধ হয়েছে? ধর্ষণ ছাড়াও দেশে কতভাবে নারী নির্যাতিত হচ্ছে তার বর্ণনাও আমরা পত্রিকার পাতায় পাতায় প্রকাশ হতে দেখি। কিন্তু এসব অপরাধের বিপরীতে প্রতিকারমূলক আইন থাকা সত্ত্বেও দিনের পর দিন দেশজুড়ে অপরাধের মাত্রা বেড়েই চলে। তাহলে কি আইন কোনো কাজের নয়? তবে আর আইন প্রণয়নের জন্যইবা দাবি কেন ওঠে? এরকম প্রশ্নও করছে কেউ কেউ। আসলে এসব কোনো প্রশ্নই অবান্তর নয়।

হ্যাঁ, অপরাধ দমনের জন্য আইন প্রণয়ন, আইন থাকা অবশ্যই প্রয়োজন বটে। আইন প্রয়োগের জন্য আগে তো আইন থাকতেই হবে। কিন্তু আইন থাকা সত্ত্বেও যখন আইনের প্রয়োগ হয় না কিংবা আইনের ফাঁকফোকর গলে অপরাধী বেরিয়ে যায় কিংবা আইনকে যখন নিজের ইচ্ছেমতো প্রয়োগ করা হয় অপরাধীকে বাঁচানোর জন্য এবং নিরপরাধীকে ফাঁসানোর জন্য তাহলে তো শুধু এ আইন করা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। কাজীর গরু যদি কেবল কিতাবেই থাকে তাহলে সেই কিতাবে থাকা গরু দিয়ে কাজী সাহেবের না হয় হালচাষ, না হয় দুধ পান! অতএব এ গরু থাকা, না থাকা দুটোই সমান।

ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বিধানের পর দেশের বড় বড় ব্যক্তি যারা আইনকানুন নিয়ে কারবার করেন তাদের অনেকে বলেছেন এ আইন করার ফলে ধর্ষণ কমবে। অনেকে বলছেন শুধু আইন করলে হবে না এর প্রয়োগ করতে হবে। কেউ বলছেন, দরকার সঠিক বিচার এবং কেউ বলছেন শাস্তি দ্রুত নিশ্চিত করতে হবে। কেউ বলছেন কয়েকটা ঘটনার সঠিক বিচার করে দ্রুত সেটা কার্যকর করে অর্থাৎ ফাঁসি দিয়ে দিলে ধর্ষণ বন্ধ হয়ে যাবে। যেমন এসিড নিক্ষেপের বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল বলে এসিড নিক্ষেপের মতো অপরাধ দেশ থেকে কমে গেছে।

কিন্তু সত্যিই কি বিষয়টি এত সরলভাবে বিশাস করার অবকাশ আছে? আমার মনে হয় বিষয়টি এত সরল নয়। এসিড নিক্ষেপও একটি বর্বরোচিত নৃশংস অপরাধ তবু ধর্ষণ ও এসিড নিক্ষেপ দুটো আলাদা বিষয় এবং অপরাধ। প্রধানত কোনো দুষ্কৃতকারী প্রেম ও বিবাহের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার কারণে ক্রোধান্ধ হয়ে প্রতিশোধপরায়ণতা থেকে এসিড নিক্ষেপ করত। সম্পত্তিসহ নানা বিষয় নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে, এমনকি তুচ্ছ কারণেও প্রতিশোধ মেটাতে একপক্ষ আরেকপক্ষের মেয়ে বা স্ত্রীকে এসিড নিক্ষেপ করেছে। ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেলের অনুষ্ঠান ক্রাইম পেট্রোলে একবার দেখেছিলাম এক ছেলের মা সারাক্ষণ প্রতিবেশীর মেধাবী মেয়েটির প্রশংসা করায় আর নিজের ছেলেকে ওই মেয়েটির সঙ্গে তুলনা করে গালমন্দ করত বলেই ছেলেটি ওই মেয়েটির প্রতি প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে এবং অনেক পরিকল্পনা অবলম্বনের পর একদিন এসিড নিক্ষেপ করে যার ফলে মেয়েটির মৃত্যুও হয়। তা সে কারণ যা-ই হোক এসিড সন্ত্রাসের শিকার নারী বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রতিকারের জন্য বিচার দাবি করেছে এবং তার কোনো অঙ্গহানি হওয়ায় ও শরীরে দগদগে ঘা বহন করে চলায় প্রমাণ করাও সহজ হয়েছে কিন্তু ধর্ষণের ক্ষেত্রে যা হয় তা হলো আমাদের সমাজ মানস ও দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ধর্ষক ঘৃণিত হয় না, ঘৃণার পাত্রী হয়ে যায় নির্যাতনের শিকার নারী। সে ও তার পরিবার তখন লোকলজ্জার ভয়ে এ মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত জঘন্য অপরাধটি চেপে যায়। যেহেতু ধর্ষণের শিকার নারীকেই প্রমাণ করতে হয়, সে ধর্ষিত হয়েছে। প্রমাণ করতে গিয়ে তাকে থানা ও হাসপাতালে মেডিক্যাল পরীক্ষার সময়, আদালতে জেরার মুখে বারবার ধর্ষিত হতে হয়। তখন অনেক মেয়ে ও তার পরিবার ধর্ষকের বিরুদ্ধে লড়াই করতে চাইলেও এরূপ ভয়াবহ পরিস্থিতির ভয়ে পিছিয়ে আসে। আবার অনেক সময় থানা মামলা নিতে চায় না। নিলেও তদন্তের পর তদন্তের নামে বছরের পর বছর পেরিয়ে যায়। বিচার আর হয় না। অপরাধীকে আড়াল করার জন্য নানারকম যোগসাজশ চলে এবং একসময় ঘটনা চাপা পড়ে যায় ফলে ভিক্টিমসহ তার গোটা পরিবার আর্থিক মানসিক হয়রানির শিকার হয়। অপরাধীর হুমকিতে প্রাণনাশের শঙ্কাও থাকে। এসব কারণেও অনেকে বিচারপ্রার্থী হতে চায় না। তাহলে দেখা যাচ্ছে, ধর্ষণের অপরাধ শাস্তি সে মৃত্যুদ- বা যাবজ্জীবন যাই হোক না কেন বিচার প্রক্রিয়া বা পরীক্ষা পদ্ধতি যদি না পাল্টায় তবে নির্যাতিত নারী ও তার নিকটজনরা বিচারের দ্বারস্থ হতে আগ্রহী হয় না।

ইতোমধ্যে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড এ আইন অনুমোদনের সঙ্গে সঙ্গে আদালত একটি ধর্ষণ মামলার পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন আর এই রায়ের পরপরই জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থার প্রধান মিশেল ব্যাচলেট ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড এ অধ্যাদেশের বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়েছেন। তিনিও আপত্তি জানাতে গিয়ে যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তার সারমর্ম হলো এই, এমন কোনো প্রমাণ নেই শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হলে অপরাধ কমে যাবে বরং প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে বিচারকার্য দ্রুত সম্পন্ন হলেই অপরাধ হ্রাস পায়। কিন্তু জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার শিকার মানুষের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আদালতে বিচার পাওয়ার সুযোগ নেই।

প্রাসঙ্গিকভাবেই বলা যায়, মিশেল ব্যাচলেট যা বলেছেন তা যথার্থই বলেছেন তবে তিনি নতুন কথা বলেননি। গত কয়েক বছর ধরে এদেশে একের পর এক ঘটে যাওয়া আলোড়ন সৃষ্টি করা ধর্ষণ, গণধর্ষণ, শিশু ধর্ষণের একটা ঘটনারও সুষ্ঠু বিচার হয়নি। শুধুই কালক্ষেপণ হয়েছে। ধর্ষকের পরিবার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রভাবশালী ব্যক্তি, পুলিশ প্রশাসন, মন্ত্রী সকলেই কেউ না কেউ কোনো না কোনো সময় অপরাধীকে বাঁচাতে যতটা তৎপর হয়েছেন অপরাধের শিকার নারী ও তার পরিবারের সুবিচার প্রাপ্তির জন্য কোনো তৎপরতা তো দেখাননি। উল্টো কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিচার প্রক্রিয়াকেও বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। কখনো বিচার প্রার্থীকে হুমকিধামকি দিয়ে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর যেসব ঘটনা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয় না বা তেমন জানাজানি হয় না সেখানে গ্রাম/ মহল্লার সর্দার, মাতব্বর, ইউপি চেয়ারম্যান মেম্বাররা বা আরও একটু ওপরের স্তরের জনপ্রতিনিধিগণও ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধেরও সালিশ বসিয়ে অপরাধীর পক্ষ থেকে টাকাপয়সা জরিমানা করে নিজেরা ভাগ-বাটোয়ারা করে ক্ষতিগ্রস্তকে আপস করতে বাধ্য করেন। এসব গ্রাম্য সালিশে সচরাচর যা করা হয়ে থাকে তা হলো, ধর্ষণের শিকার মেয়েটির আর কোথাও বিয়ে হবে না এমন ভয় দেখিয়ে বিচার হিসেবে ধর্ষকের সঙ্গেই মেয়েটির বিয়ে দেওয়া হয়।

গত দশ বছরে অসংখ্য ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে নারী আন্দোলন ও মানবাধিকার কর্মীগণ এবং মানবিক বোধসম্পন্ন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই বারবার ধর্ষণ বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে দায়ী করেছেন। দ্রুত বিচারের জন্য দাবি করেছেন। কিন্তু কারওর টনক নড়েনি। তারা নাকে সর্ষে তেল দিয়ে ঘুমিয়েছেন। আর একটা ঘটনার আন্দোলনের রেশ না কাটতেই আরেকটি ঘটনা সে ঘটনাকে চাপা দিয়ে দিয়েছে আর প্রতিবাদের পর প্রতিবাদ হয়েই চলেছে। অপরাধীরা দেখেছে এরকম ঘটনা ঘটলে কী হয়? আন্দোলনকারীরা মানববন্ধন করে কিছু হৈচৈ হয়, টেলিভিশন টকশো আর পত্রিকার পাতা গরম হয়। শেষপর্যন্ত কিছুই হয় না। তারা হাসে আর দেশজুড়ে ধর্ষণের মচ্ছব করে। আমরা নিন্দা জানাই, ধিক্কার দিই আর বলি, সোহাগী জাহান তনুর ঘটনার যদি বিচার হতো, মিতু হত্যার যদি বিচার হতো, রূপা ধর্ষণ হত্যার যদি বিচার হতো, সুবর্ণচরের ঘটনার যদি বিচার হতো, এরকম বলতে থাকলে পাতার পর পাতা লিখেও শেষ হবে না তবে এটা বলা যায় দেশ আজ ধর্ষকের অভয়ারণ্য হয়ে উঠত না।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সারা দেশে রাজপথ কাঁপানো ধর্ষণবিরোধী উত্তাল আন্দোলন, ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের অধ্যাদেশ, পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড এত কিছুর পরও সেই ১৭ অক্টোবরের অনেকগুলো দৈনিকের প্রথম পাতার শিরোনাম ২৪ ঘণ্টায় নরসিংদী, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চাঁদপুরে চারজন যাদের মধ্যে গৃহবধূ ও কিশোরী গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। চাঁদপুরে গৃহবধূকে গণধর্ষণের ঘটনা ভিডিও করে তা ইন্টারনেটে ছেড়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মোটা অংকের টাকাও দাবি করেছে। দেখা যাচ্ছে, ধর্ষণ এখন ধর্ষকদের কাছে শুধু কোনো নারীকে শোষণ করার বিষয় নয়, টাকা কামানোর হাতিয়ারও হয়ে উঠছে।

তাহলে মোদ্দাকথা কী হলো? জাতিসংঘের মিশেল ব্যাচলেটের বক্তব্য আর আমরা এতদিন ধরে যা বলেছি তার মূল কথা একÑ শাস্তি যাবজ্জীবন হোক বা মৃত্যুদ- বিচার দ্রুত করতে হবে। তার আগে শোষিত নারী যখন বিচারপ্রার্থী হবেন তাও যেন দ্রুততার সঙ্গে, সততার সঙ্গে মানবিকতা ও সংবেদনশীলতার সঙ্গে গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং বিচার প্রক্রিয়া শুরুর যাবতীয় পদক্ষেপ দক্ষতার সঙ্গে করা হয়। আমার পরিচিত একজন বিজ্ঞ আইনজীবী তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে মতামত দিয়েছেন- ‘যেন শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার জন্য দায়ী অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে আর ধর্ষণের শিকার নারীকে নয়, ধর্ষককে প্রমাণ করতে হবে যে সে ধর্ষণ করেনি’ বিধান রেখে এ আইন করা হয়। বিজ্ঞ ওই আইনজীবীর প্রস্তাবটি যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত। এর সঙ্গে আরেকটা বিষয় যুক্ত করা দরকার যা দীর্ঘদিন ধরে নারী আন্দোলন দাবি করছে মেডিকেল পরীক্ষা কেবল নারী ডাক্তার দিয়ে করাতে হবে যাতে পরীক্ষার নামে কোনো মেয়ে দ্বিতীয়বার নির্যাতনের শিকার না হয়।

আইন ও বিচার প্রক্রিয়ার এ পদ্ধতি পরিবর্তন করা হলে শোষিত নির্যাতিত মানুষ বিচারালয়ের দ্বারস্থ হতে ভরসা পাবে। তবে এসবটুকুই যথেষ্ট নয়। আইন করতে হবে যারা ধর্ষককে বাঁচানোর জন্য ধর্ষণের মতো জঘন্য মানবতাবিরোধী অপরাধকে আড়াল করতে সহযোগিতা করে, যারা ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার বা টাকাপয়সা দিয়ে আপস করার জন্য নির্যাতিত ও তার পরিবারকে বাধ্য করে বা করার চেষ্টা করে সেই সব গ্রাম্য সর্দার মাতব্বর, মোল্লা হুজুর, ইউপি মেম্বার চেয়ারম্যানসহ যেকোনো জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ, প্রভাবশালী ব্যক্তি, পুলিশের ছোট বড় কর্তাসহ প্রশাসনের যে কেউ বা যারা ধর্ষকের পক্ষে কাজ করবেন তাদের শাস্তির জন্যও কঠোর আইন ও এর প্রয়োগ করে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

আরও কিছু কথা এ প্রসঙ্গে বলাটা খুবই জরুরি। উপরে যা বলা হলো, তা অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরের কথা। কিন্তু সত্যিই যদি ধর্ষণমুক্ত দেশ আমরা প্রতিষ্ঠা করতে চাই তবে শুধু প্রতিকারমূলক কার্যক্রম দিয়েই হবে না, প্রতিষেধকও প্রয়োগ করতে হবে। প্রশ্ন হলো, নারী কেন ধর্ষণের শিকার হয়! ধর্ষণ কেন বাড়ছে! এর উৎস, কারণ খুঁজতে হবে। কারণ চিহ্নিত করে এর মূল উৎপাটন করাও জরুরি। জরুরি সমাজ মানস ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।

আমরা সবসময় দেখি যখনই কোনো মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয় তখনই নারীর পোশাকের দিকে আঙুল তোলা হয়। নারীর বাইরে চলাফেরাকে দায়ী করা হয়। যেন ধর্ষকের কোনো অপরাধ নেই; সব অপরাধ নারীর বাইরে যাওয়ার, নারীর পোশাক পরার। অথচ বোরকা পরা নারীও ধর্ষিত হয়। ঘরের ভিতরেও নারী ধর্ষিত হয়। নারী নির্যাতন প্রতিরোধ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে যখনই কোনো আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয় সেখানে স্কুল-কলেজের পুরুষ শিক্ষক, এমনকি কিশোর বয়সী ছাত্ররাও ওই প্রশ্নটা তোলে প্রসঙ্গকে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে অন্য পুরুষ বক্তারা কখনোই এর প্রতিবাদ করে না যে কোনো মেয়ে সে যে কোনো পোশাক পরলেই একজন ধর্ষকের সেই নারীকে ধর্ষণ করার বা উত্যক্ত করার অধিকার জন্মায় না। আসলে এসব বক্তারা অধিকাংশই সজ্ঞানে তাদের এ বক্তব্যের মাধ্যমে ধর্ষকদের আসকারা দিয়ে যাচ্ছেন।

কিন্তু এর ব্যতিক্রমও আছে। সপ্তাহ দেড়েক আগে জেলা তথ্য অফিসের আয়োজনে একটি উপজেলায় শিশু ও নারী উন্নয়নে সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক যোগাযোগ কার্যক্রম বিষয়ক একটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। সেই কর্মশালায় বেশ কয়েকজন নারী কর্মকর্তা ছিলেন, যারা নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠায় নারী পুরুষের মাঝে বিরাজমান বৈষম্য দূর করার এবং জীবনের সকল ক্ষেত্রে নারী পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠার কথা বলছিলেন। কর্মশালার সভাপতি অনুষ্ঠান পরিচালনার ফাঁকে তাতে সহমত পোষণ করে যাচ্ছেন। কিন্তু একজন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সব কথা নিজের গায়ে মেখে প্রতিবাদী হয়ে উঠলেন এবং নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের জন্য নারীর পোশাক এবং অশালীন চলাফেরাকে দায়ী করলেন। কিন্তু এ প্রথম দেখলাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা যিনি একজন পুরুষ এবং বয়সেও তরুণ; তিনি তৎক্ষণাৎ চেয়ারম্যানের বক্তব্যের প্রতিবাদ করলেন এবং বেশ ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন- হ্যাঁ, ধর্মীয় অনুশাসনে নারীকে পর্দার কথা বলা হয়েছে তবে পুরুষকেও তার দৃষ্টি সংযত থাকার কথা বলা হয়েছে। আর একজন নারী কী পোশাক পরবেন তা নিজেই ঠিক করবেন। তিনি যে পোশাকে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন তাই পরবেন। এটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। এসব বলা ঠিক নয়। এসব বলে ধর্ষক বা উত্যক্তকারীকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়। তার এ মন্তব্যের পর চেয়ারম্যান সাহেব চুপ হয়ে যান। আর একটিও কথা বলতে পারেননি। প্রসঙ্গটির অবতারণা এ কারণে করলাম, যখনই কেউ এরূপ কথা বলবে তখনি তাকে উল্লেখিত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মতো থামিয়ে দিতে হবে। প্রত্যেকটি আলোচনাসভায় উক্ত ইউএনও মহোদয়ের মতো মানুষের সংখ্যা বাড়িয়ে তুলতে হবে।

ধর্ষণ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ার জন্য অনেকেই পর্নোগ্রাফির অবাধ প্রবাহকে দায়ী করছেন। আমরা অনেক আগে থেকেই বলে আসছি পর্নোগ্রাফি চ্যানেলসহ ইউটিউবে পর্নোগ্রাফি বন্ধ করতে। কিন্তু এর বিরুদ্ধে আজ পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। ছোট ছোট ছেলেদের হাতে স্মার্টফোন, বিশ ত্রিশ টাকায় মোবাইল ডাটা পাওয়া যায়, ঘরে ঘরে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে থাকা ওয়াইফাই কানেকশনও হাতের কাছে। সারাদিন ইন্টারনেটে যুক্ত হয়ে পর্নোসাইটে মগ্ন থাকে বিরাট একটা অংশ। এই পর্নোগ্রাফির সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ী ছাড়া আর কার কী লাভ হয়, রাষ্ট্রের কী লাভ হয় যে এসব বন্ধ করা যায় না?

আরেকটা কথা বলা খুবই জরুরি মনে করছি। আমাদের ভাষা, আমাদের শব্দভা-ারে যেসব শব্দ নারীকে অবদমন করে রাখে, যেসব শব্দ দিয়ে কেবল নারীকেই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য বা অপমান-অসম্মান করা হয় সেসব শব্দ আমাদের ব্যবহারিক জীবন থেকে তুলে দিতে হবে। যেমন সতী শব্দটির বিশিষ্ট অর্থে কখনো পুংলিঙ্গ পর্যায়ের শব্দ হয় না। তাই পুরুষের সতী হওয়ার কোনো দায় নেই। পুরুষ যা খুশি করতে পারে এমন লাইসেন্স বাতিল করতে হবে। আবার পতিতা শব্দটি দিয়ে নারীকে সমাজবহির্ভূত করার যে ব্যবস্থা আছে তারও কোনো পুংলিঙ্গ না থাকায় যে কাজের জন্য নারীকে পতিতা ডাকা হয়; তার জন্য পুরুষকে পতিত হতে হয় না বরং সে বুক ফুলিয়েই সমাজে স্বাভাবিক জীবনযাপন করে। একজন ধর্ষককে যদি পারিবারিক ও সামাজিকভাবে ঘৃণা করা হতো, বয়কট করা হতো তাহলে ওই কাজ করতে সে ভয় পেত। তাই ধর্ষণ বন্ধ করতে হলে আইনের প্রযোগ, কঠোর শাস্তি, দ্রুত বিচারের পাশাপাশি অব্যাহতভাবে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

স্বাতী চৌধুরী : কথাসাহিত্যিক ও মানবাধিকারকর্মী