প্রশিক্ষণার্থে বিদেশ ভ্রমণ!

ঢাকা, শুক্রবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

প্রশিক্ষণার্থে বিদেশ ভ্রমণ!

এ টি এম মোসলেহ উদ্দিন জাবেদ ১২:০০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৬, ২০২০

print
প্রশিক্ষণার্থে বিদেশ ভ্রমণ!

যে কোনো সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের আগেই প্রকল্পের টাকার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অভিজ্ঞতা অর্জন বা প্রশিক্ষণের নামে সরকারি কর্মকর্তারা দল বেঁধে বিদেশ ভ্রমণ করেন। প্রকল্পের টাকায় বিদেশ ভ্রমণ সরকারি কর্মকর্তাদের ফ্যাশনে পরিণত হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী বারবার অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণকে নিরুৎসাহিত করার তাগিদ দিলেও প্রকল্পের টাকায় সরকারি কর্মকর্তাদের অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণকে রোধ করা যাচ্ছে না। এর মধ্যে খবর বেরিয়েছে শুঁটকি উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিখতে ৩০ জনকে বিদেশে পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি)। এজন্য ব্যয় ধরা হয়েছে এক কোটি ৭০ লাখ টাকা।

‘কক্সবাজার জেলায় শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প স্থাপন’ প্রকল্পের অধীনে এ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আমরা সহজে যেটা বুঝিÑ শুঁটকিপল্লি স্থাপন হলে সেখানে বেসরকারি ও ব্যক্তিপর্যায়ে বিনিয়োগ আসবে। বিনিয়োগকারীরা সেখানে শিল্প স্থাপন করে এ খাতকে এগিয়ে নেবে। কিন্তু সরকারি কর্মকর্তারা শুঁটকিপল্লি স্থাপন প্রকল্পের টাকা দিয়ে বিদেশ থেকে শুঁটকি তৈরির প্রশিক্ষণ নিয়ে এখাতে কী অবদান রাখবেনÑ বোধগম্য হচ্ছে না। বাংলাদেশে শুঁটকি তৈরি হয় ১০ থেকে ১২ হাজার টন। এর অধিকাংশ প্রাকৃতিক উপায়ে অর্থাৎ রোদে শুকিয়ে তৈরি হয় শুঁটকি। ইতোমধ্যে শুঁটকি তৈরিতে ১৬টি কারখানা গড়ে উঠেছে। যেখানে রোদের পরিবর্তে বিদ্যুতের তাপে মাছ শুকানো হয়। মাছের শুঁটকি তৈরি করা হয় কক্সবাজার, পটুয়াখালী, বরগুনা, চট্টগ্রাম, খুলনার সুন্দরবন এলাকার বিভিন্ন চর, বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও সিলেট অঞ্চলের হাওর-বাঁওড়, নাটোরের চলন বিল ইত্যাদি স্থানে। সারা বছর সমুদ্র থেকে মাছ ধরা হলেও শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ করা অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত। কক্সবাজার অঞ্চলে বছরের প্রায় নয়মাস শুঁটকি উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ হয়। এক কেজি শুঁটকি তৈরিতে প্রায় দুই থেকে তিন কেজি মাছ লাগে। গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের জন্য দক্ষতা বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণের জন্য প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এমন সব প্রকল্পে বা বিষয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরে কোটি কোটি টাকা খরচ করতে দেখা যাচ্ছে, যার আদৌ প্রয়োজন নেই।

সাম্প্রতিক সময়ে পুকুর খনন প্রশিক্ষণ, খিচুড়ি রন্ধন ও পরিবেশন প্রশিক্ষণ, বিল্ডিং দেখতে, এসব বিষয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের নামে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাস্যরসের সৃষ্টি করেছে। অবশ্য সরকারি কর্মকর্তাদের অহেতুক বিদেশ সফরের কারণে জনগণের অর্থের অপচয়ের বিষয়টি সর্বজনবিদিত। শিউরে ওঠার মতো তথ্য হলোÑ একটি ক্যামেরা কিনতে তিনজনের বিদেশ যাওয়া, নলকূপ খনন শিখতে একাধিক কর্মকর্তারা বিদেশ ভ্রমণ করার মতো নজিরও অহরহ সৃষ্টি করছেন কর্তাব্যক্তিরা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব বিদেশ সফর অপ্রয়োজনীয়। আবার অনেক সময় সফরে যাওয়া কর্মকর্তার সংখ্যা হয়ে যাচ্ছে অত্যধিক। পাশাপাশি টাকার অঙ্কও অনেক বেশি দেখানো হচ্ছে। গত বছরের জুলাই মাসের সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি দল যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ও মহাকাশবিষয়ক সংস্থা নাসা আয়োজিত এক প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়। তাদের পুরস্কৃত করতে নাসার পক্ষ থেকে ফ্লোরিডায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল দলটিকে। বিজয়ী দলের সদস্যদের সঙ্গে যাওয়ার জন্য তথ্য মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট আরেকটি প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মকর্তারও ভিসার আবেদন করা হয়। তবে শেষপর্যন্ত দেখা যায়, ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা থাকার কারণে নাসার আমন্ত্রণ পাওয়া বিজয়ী দলের চার সদস্যের কেউই যাওয়ার অনুমতি পায়নি। বিজয়ী প্রতিযোগীরা নেই, তাই কি বলে দেশের প্রতিনিধি থাকবে না! এমনটা মানতে পারেননি তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিরা। প্রতিযোগীদের ছাড়াই সহযোগী হিসেবে যাদের যাওয়ার কথা ছিল, সেই ৮জন কর্মকর্তা সরকারি খরচে ঘুরে এসেছেন মার্কিন মুলুক থেকে।

করোনাভাইরাসের প্রভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন, স্তব্ধ হয়ে পড়েছে সাবলীল জীবনযাত্রা। যার সবচেয়ে প্রকট প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে আর্থ-সামাাজিক ক্ষেত্রে। চরম অর্থনৈতিক মন্দার মুখে পড়েছে প্রতিটি রাষ্ট্র। দেশের সার্বিক অর্থনীতি অনেকটা স্থবির, দীর্ঘমেয়াদি বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা মন্থর। বিদেশি বিনিয়োগ অপ্রতুল। চাকরি হারিয়ে দিশেহারা বহু মানুষ। দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা অনেকটাই অচল। বিদেশি শ্রমবাজার ঋণাত্মক। সরকারের ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা যখন দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে তখন কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে খিচুড়ি রান্না, পুকুর খননের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য বিদেশ গিয়ে অপ্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ গ্রহণ জনগণের ট্যাক্সের টাকার অপচয় ছাড়া কিছুই নয়।

সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ২০১৯ সালের শেষ নাগাদ সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প ও কার্যক্রমের ব্যয় সংকুচিত করা ও অতিরিক্ত ব্যয় হ্রাসের ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব আরোপের আহবান জানায় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। যার মধ্যে অন্যতম খাত হিসেবে বিশে^র অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও চলমান পরিস্থিতিতে বিদেশ সফর খাতে অর্থ ব্যয় হ্রাস করার সিন্ধান্ত গ্রহণ করে। অথচ করোনা পরিস্থিতির শুরু থেকেই সরকারপ্রধানের নির্দেশনা আমলে নেওয়া তো দূরের কথা, উল্টো যেন অবান্তর ও অযৌক্তিক বিদেশ সফরের নামে অর্থ অপচয়ের প্রতিযোগিতায় নেমেছেন দায়িত্বশীল কর্তাব্যক্তিগণ। যে সকল হাস্যকর ও উদ্ভট ইস্যু উপস্থাপন করা হচ্ছে সেগুলো বিবেচনা করলেই বোঝা যায়, রাষ্ট্রস্বার্থে নয় বরং জনগণের টাকায় ‘হাওয়া বদলে’ শৌখিন বিদেশ ভ্রমণই একটি আমলা গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য।

জনগণের কষ্টার্জিত টাকার এমন ব্যবহার কখনোই কাম্য হতে পারে না। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদেশে প্রশিক্ষণ নিতে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকৃত। মূলত পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেই সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য এ সুযোগ রাখা হয়েছে। কিন্তু সুযোগটির অপব্যবহার হচ্ছে সব স্তরে। প্রশিক্ষণের নামে যারা বিদেশে যাচ্ছেন, তাদের একটা বড় অংশই যাচ্ছেন মূলত দেশ ভ্রমণ অথবা বিনোদনের উদ্দেশ্যে এবং সরকারি ভ্রমণ ভাতা পকেটে ঢোকাতে। এজন্য অহেতুক ও ঘনঘন এসব বিদেশ ভ্রমণে লাভ-ক্ষতি কী হচ্ছে, প্রকৃত প্রয়োজনীয় ব্যক্তিরা যাচ্ছেন কিনা, পাশাপাশি খরচের বিষয়গুলো যথাযথ অডিট এবং লোভনীয় টিএ-ডিএ কমিয়ে আনাসহ বিনা কারণে বিদেশ পাঠানোর নীতি পরিবর্তন করে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা গেলে পরিস্থিতির উন্নয়ন হতো বলে আশা করা যায়। পাশাপাশি, যেসব কর্মকর্তা পিকনিক মুডে বিদেশে গিয়ে আমোদ ফুর্তি করে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় করে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করছেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া বাঞ্ছনীয়। অন্যথায়, সরকার যেমন জনগণের আস্থা হারাবে তেমনই ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকবে প্রশাসনের পুরো সিস্টেম।

এ টি এম মোসলেহ উদ্দিন জাবেদ : কলাম লেখক