অদৃশ্য চক্রে অস্থির আলুর বাজার

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০ | ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

অদৃশ্য চক্রে অস্থির আলুর বাজার

সাহাদাৎ রানা ১১:২৮ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৫, ২০২০

print
অদৃশ্য চক্রে অস্থির আলুর বাজার

আলু বাঙালির রসনাতৃপ্তির বড় জায়গা জুড়ে রয়েছে। বিশেষ করে এর বহুমাত্রিক ব্যবহারের কারণে। আলু এমন একটি সবজি যা মাছ-মাংস থেকে শুরু করে প্রায় সব তরকারির সঙ্গেই বেশ মানানসই। আলুকে তাই সব তরকারির সবজিও বলা হয়। শুধু তাই নয়, আলু ভাজি বা গরম ভাতে আলুর ভর্তার তুলনা নেই। আলুর কদর ধনী-গরিব সবার কাছে। তবে গরিবের খাদ্য হিসেবে আলুর বেশ সুনাম রয়েছে। কারণ অন্যসব সবজির চেয়ে আলুর দাম তুলনামূলক কম। তাই চালের দাম বাড়লে ভাতের বিকল্প হিসেবে আলু খাওয়ার কথা ওঠে মাঝে মাঝে। অবশ্য সময়ের স্রোতে আলু এখন উঠে এসেছে চাইনিজ কিংবা ফাস্টফুডের মতো অভিজাত রেস্টুরেন্টে। যেখানে আলু ফ্রেঞ্চ ফ্রাই হয়ে দামি খাদ্য যেমন হয়ে যাচ্ছে তেমনি বাড়ছে এর জনপ্রিয়তা। আর আলুর চিপস, সে তো অনেক পুরনো জিনিস। যা প্রায় সব বয়সী মানুষের পছন্দের খাদ্য। এবার আসা যাক আলুর পুষ্টিগুণের কথা।

খাদ্যমান ও পুষ্টিগুণের দিক দিয়ে আলুর মূল্যও অনেক। আলুতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে কার্বহাইড্রেড। আলু নিয়ে এত কথা বলার কারণ আলু, বর্তমান সময়ে সবার কাছে আলোচিত নাম। আলোচিত খাদ্যদ্রব্যও। আমাদের দুর্ভাগ্য বা সৌভাগ্য যাই বলি না কেন, প্রতি বছর যে কোনো একটি খাদ্যপণ্য অতি মূল্যবান হয়ে সবার সামনে উপস্থিত হয়। কখনো পেঁয়াজ, কখনো মরিচ আবার কখনোবা চাল। অবশ্য কয়েক বছর ধরে এসব পণ্য নিজ মূল্যের কারণে প্রায় সব সময়ই সংবাদ শিরোনাম হয়েছে, এখনও হচ্ছে। তবে এবার আলু নামক সবজিটির মূল্য অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। মূল্য বৃদ্ধির কারণে আলুকে এখন আর গরিবের খাদ্য বলা যাবে না।

আলু এমন একটি সবজি যা সব তরকারির সঙ্গে যায়। তাই সারা বছরই এর ব্যাপক চাহিদা থাকে। উৎপাদনও হয় ব্যাপক। কিন্তু কখনো আলুর মূল্য ৫০ টাকা কেজিতে যায়নি। তবে এবার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আলু অর্ধশতক হাঁকিয়েছে। আলু অর্ধশতক হাঁকিয়েছে বললে ভুল বলা হবে। আলুর মূল্য বাড়েইনি। মূল্য বাড়িয়েছে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। যারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের অহেতুক মূল্য বাড়িয়ে বাড়তি মুনাফা আদায় করে নেয়। এবারও আলুর ক্ষেত্রে তাই হয়েছে। অথচ আলু নিয়ে এমনটি হওয়ার কথা নয়। কারণ দেশে প্রতিবছরই আলুর উৎপাদন বাড়ছে। বরং বিপরীতে অভ্যন্তরীণ বা রপ্তানি চাহিদা প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়ছে না। ফলে প্রতিবছরই আলু উদ্বৃত্ত থাকে। কিন্তু এবার তেমনি হয়নি। এবার আলুর মূল্য অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। কিন্তু আলুর এমন মূল্য বৃদ্ধিতে অবশ্য কৃষকদের খুশি হওয়ার কারণ নেই। কারণ আলুর যতই মূল্য বাড়ুক প্রকৃতপক্ষে কৃষক শ্রেণি লাভবান হন কম। সবসময় প্রায় সব পণ্যের ক্ষেত্রেই এমন হয়। এখানে এমন মূল্য বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হন বা হচ্ছেন মধ্যস্বত্বভোগীরা। আলুর ক্ষেত্রেও এবার তাই হচ্ছে। যারা হাজার হাজার বস্তা আলু হিমাগারে রেখে দিয়েছেন তারা সিন্ডিকেট করে আলুর মূল্য বাড়িয়ে লাভবান হচ্ছেন। কিছু ব্যবসায়ী আলু হিমাগারে জমা করে রেখেছে আরও বেশি মূল্য পাওয়ার আশায়।

তারা এখনই আলু বাজারে ছাড়তে রাজি নন। এসব অসাধু ব্যবসায়ীর দৃষ্টি মূল্য আরও বৃদ্ধির দিকে। আলু সারা বছর চাষ হয় না। তবে সারা বছর আলুর চাহিদা থাকে। অবশ্য বর্তমানে আলু এখন আর কৃষকদের কাছে নেই। সব বড় বড় ব্যবসায়ী ও মজুদদারদের কাছে রয়েছে। তাদের ইচ্ছায় দাম বাড়ে এবং কমে। এক্ষেত্রে কৃষক শ্রেণির কোনো লাভ নেই। তারা অনেক আগেই কম মূল্যে আলু বিক্রি করেছেন। এখন সিন্ডিকেট করে শুধু মুনাফা করছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। অথচ, যে কৃষক মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আলু উৎপাদন করে থাকেন আলুর মূল্য বৃদ্ধির অর্থ দিয়ে তাদের ভাগ্য পরিবর্তন হয় না।

মধ্যস্বত্বভোগীরাই সবসময় লাভবান হয়। কিন্তু যখন কৃষকরা আলুর সঠিক মূল্য পান না তখন তাদের পাশে মধ্যস্বত্বভোগীরা উপস্থিত হয় না। এবার আলুর মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে সংবাদ শিরোনাম হয়েছে। আলুর মূল্য না পেয়ে আলু রাস্তায় বা নদীতে ফেলে দিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শনের খবরও আমরা বিভিন্ন সময় দেখেছি। তখন মধ্যস্বত্বভোগীরা আলু কিনে নিয়ে কৃষকদের পাশে দাঁড়ায়নি।

আলুর মূল্য বৃদ্ধির পর অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে আলুর মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। মূলত কৃষি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনক্রমে ও কৃষি বিপণন আইন-২০১৮ এর ৪(ঝ) ধারা অনুযায়ী এ দাম নির্ধারণ করা হয়। তবে বাস্তবতা হলো, সরকার নির্ধারিত দামে আলু বিক্রি হচ্ছে না। বিক্রি না হওয়ার কারণ সঠিক মনিটরিংয়ের অভাব। আর অদৃশ্য সিন্ডিকেটের প্রভাব। অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকে মনিটরিং জোরদার করার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু দাম না কমার তথ্য প্রমাণ করে মনিটরিং ঠিকমতো হচ্ছে না। ইতোমধ্যে নির্ধারিত মূল্যে টিসিবি আলু বিক্রি শুরু করেছে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। শুধু আলু নয়, বর্তমানে প্রায় সব সবজির মূল্য বাড়ছে। যেসব সবজির মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে এর মূল্য বৃদ্ধির পেছনে নেই যৌক্তিক কোনো কারণ। কোনো কারণ ছাড়াই ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমতো বাড়াচ্ছে দাম। দেখা যায় আজ এক দামে কোনো একটি সবজি কিনে নিয়ে গেলে পরদিন সেই সবজির দাম কেজিতে বেড়ে গেছে কয়েক টাকা। এ বিষয়ে দোকানির সহজ ও সেই গতানুগতিক যুক্তি চাহিদার চেয়ে পণ্যের জোগান কম।

আবহাওয়া খারাপ, এমন যুক্তিও মাঝে মাঝে দেখানো হয়। শুধু তাই নয়, পাইকারি বাজারের সঙ্গে নেই খুচরা মূল্যের সামঞ্জস্যও। অথচ দুঃখের বিষয়, বাজার থেকে সাধারণ ক্রেতা যে দামে পণ্য কিনছেন, উৎপাদক সেই দাম কল্পনাও করতে পারেন না। এর সুফল নিচ্ছে এক শ্রেণির প্রতারক মধ্যস্বত্বভোগীরা। যারা সাধারণ ক্রেতাদের জিম্মি করছে, জিম্মি করছে কৃষকদেরও। কিন্তু যারা নিজেদের সর্বোচ্চ শ্রম দিয়ে পণ্য উৎপাদন করছেন, সেই কৃষক বঞ্চিত হচ্ছেন ন্যায্যমূল্য থেকে। এক্ষেত্রে শুধু লাভবান হচ্ছে একশ্রেণির ব্যবসায়ীরা। ঠকছেন কৃষক ও সাধারণ ক্রেতা। এমন ঘটনা আমাদের জন্য অবশ্য নতুন নয়। এসব বিষয় যেন অলিখিত নিয়ম হয়ে গেছে আমাদের জন্য। এক্ষেত্রে কবে উত্তরণ সম্ভব তা বলা মুশকিল। আলু এখন দেশের অন্যতম অর্থকরী ফসলও। বর্তমানে বিশে^ আলু উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। এমন সংবাদের পাশাপাশি আশার খবর হলো প্রতি বছরই আলুর উৎপাদন বাড়ছে। তবে বিপরীতে দুঃখের খবর হলো দেশে আলুর বাম্পার ফলন হলেও কৃষকরা ন্যায্য দাম পান না। তবে ক্রেতাকে কিনতে হয় বেশি দামে। এখানে সুফল ভোগ করছে মধ্যস্বত্বভোগীরা।

আমাদের জন্য দুর্ভাগ্য হলো, বেশির ভাগ সময় উৎপাদক শ্রেণি মানে কৃষকরা প্রাপ্য পান না। অথচ, তাদের কেন্দ্র করে কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় এক্ষেত্রে সেই উৎপাদক শ্রেণিই সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হয়। মাঝে সবচেয়ে বেশি লাভবান হন মধ্যস্বত্বভোগীরা। বাস্তবতা হলো, একটি পণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে বিপণন পর্যন্ত কৃষক ও ব্যবসায়ীর গুরুত্ব রয়েছে। উৎপাদক ও ব্যবসায়ী শ্রেণি হচ্ছে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। এদের মধ্যে যথাযথ সমন্বয় হলে বাজার ব্যবস্থাপনায় সাফল্য আসবে। তবে উৎপাদক শ্রেণির মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা সবার আগে জরুরি। কৃষকদের মধ্যে বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে, তারা যে পণ্য উৎপাদন করবেন তার সঠিক ও ন্যায্য মূল্য পাবেন। কোনো সিন্ডিকেট বা মধ্যস্বত্বভোগীর কাছে তাদের প্রাপ্য মূল্য চলে যাবে না। তাদের কাছে থাকবেন না জিম্মি হয়ে। মূল্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট একটি সাধারণ বিষয়। আমাদের দেশে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পেছনে সিন্ডিকেট ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। মূলত রাজনৈতিক কারণে অধিকাংশ সময়ে সিন্ডিকেট হয়। আরও পরিষ্কার করে বললে রাজনৈতিক ব্যবসায়ীদের সংশ্লিষ্টতার কারণেই সিন্ডিকেটগুলো বেশি প্রভাবশালী হয়। এসব সিন্ডিকেটগুলো এতটাই শক্তিশালী যে সবাই তাদের কাছে অসহায়। বাজার নিয়ন্ত্রণ রাখতে হলে সবার আগে এসব সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। মাঝে মাঝে বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য অভিযান পরিচালনা করা হয়। কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ে অভিযান পরিচালনা না করে সারা বছরই অভিযান পরিচালনার দিকে এখন আরও বেশি মনোযোগ দিতে হবে। যারা অসাধু ব্যাবসায়ী ও সিন্ডিকেট করে পণ্যের মূল্য বাড়ান তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর বিচার হলে সবাই এ বিষয়ে সতর্ক হবেন।

এবার অনেক বছর পর আলুর দাম বেড়েছে এটা সবার জন্য স্বস্তির খবর হতো যদি এর সঠিক মূল্য কৃষকরা পেতেন। কিন্তু কৃষকরা যখন আলু বিক্রি করেছেন তখন তারা সেভাবে মূল্য পাননি। যারা বেশি লাভের আশায় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি আলু হিমাগারে মজুদ করেছে তারা এখন বাড়তি লাভ করছে। অতিরিক্ত লাভের পাশাপাশি আলুর বাজারকে করে তুলেছে অস্থির। মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্যে আলুর বাজার অস্থির হয়েছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত। অতিরিক্ত দামে আলু কিনতে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠছে তাদের। সীমিত আয়ের মানুষের পক্ষে অতিরিক্ত দামে আলু বা অন্যসব পণ্য কেনা সত্যিই কষ্টকর। বিশেষ করে করোনার কঠিন সময়ে। বাংলাদেশে করোনার কারণে অনেকের জীবনযাত্রায় এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। কাজ হারিয়ে বেকার হয়েছেন অসংখ্য মানুষ। অনেকের কমে গেছে আয়ের পরিমাণও। ঠিক এমন সময়ে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির খবর সত্যিই অস্বস্তির। এখন এমন অস্বস্তি দূর করার দায়িত্ব সরকারের। সরকারের পক্ষ থেকে আরও কঠোর হতে হবে। নিয়মিত বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা না থাকায় খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা তাদের খেয়ালখুশিমতো দাম বাড়াচ্ছে। আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের ইচ্ছাই মূল্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। তাই এদের লাগাম টেনে ধরতে হবে। নিয়মিত বাজার মনিটরিং পরিচালনা করতে হবে। তবেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

বেশি করে আলু খান, ভাতের ওপর চাপ কমান। এমন স্লোগানকে সামনে রেখে অনেক দরিদ্র পরিবার বেশি করে আলু খান। কিন্তু এখন চালের মূল্য আর আলুর মূল্য প্রায় এক। সেই সব দরিদ্র পরিবারের জন্য এখন আলু খাওয়া বিলাসিতার পর্যায়ে চলে এসেছে। তাই এসব দরিদ্র পরিবার থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের কথা ভেবে আলুর দাম কমাতে সরকারকে আরও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তবে শঙ্কার বিষয় হলো, আমাদের দেশে কোনো একটি খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়লে সেটা আর কমতে চায় না। দিন দিন শুধু বাড়তেই থাকে। আলুর ক্ষেত্রে যেন এমন না হয়। পাশাপাশি অনেক কষ্ট করে যেসব কৃষক আলু বা অন্যসব পণ্য উৎপাদন করছেন তারা যেন সবসময় উপযুক্ত মূল্য পান। আবার ভোক্তা শ্রেণির কথাও ভাবতে হবে। তারা যেন ন্যায্য মূল্যে আলু বা অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী কিনতে পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারকে আরও উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে কৃষি ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সাহাদাৎ রানা : সাংবাদিক ও কলাম লেখক