যাব কোথায়, যাচ্ছি কোথায়

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০ | ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

যাব কোথায়, যাচ্ছি কোথায়

প্রদীপ সাহা ১১:১৪ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৫, ২০২০

print
যাব কোথায়, যাচ্ছি কোথায়

পত্রিকার পাতা খুললে কিংবা টিভিতে সংবাদ দেখতে বসলেই সামনে উপস্থিত হয় একটির পর একটি অবাঞ্ছিত-লোমহর্ষক ঘটনা। প্রচার হতে থাকে বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া খুন, হত্যা, ধর্ষণ, দুর্নীতি এসবের খবর। নিয়মিত একটা রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে যেন এ ধরনের খবর প্রচার। অনেক সময় দেখা যায়, ভালো খবরের চেয়ে এ ধরনের অপরাধমূলক খবরই বেশি প্রচারিত হচ্ছে। বর্তমানে মহামারী করোনাভাইরাসে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে এবং রীতিমতো সবাই আতঙ্কিত। করোনা নিয়ে আতঙ্ক থাকলেও থামছে না নৃশংস হত্যাকা-, নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো পৈশাচিক ঘটনা। বাস্তবিক অর্থে, দেশে এসব ঘটনার মাত্রা বেড়েই চলেছে ক্রমশ। কোনো ভালো কাজের খবর কিংবা উন্নয়নমূলক কোনো খবর প্রচারের সঙ্গে যদি এ ধরনের নোংরা-লজ্জাজনক ও হৃদয়বিদারক খবর বেশি শোনা হয়, তবে সেই ভালো খবরটা তাৎক্ষণিকভাবে হারিয়ে যায়। স্বাভাবিকভাবেই অতিমাত্রায় আলোচিত হয়ে ওঠে সেসব ঘটনাগুলো। এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, দিন দিন বেড়েই চলেছে দুর্নীতি, খুন, হত্যা, ধর্ষণ ইত্যাদি। এসব বন্ধে নেই কোনো জোরালো পদক্ষেপ, নেই কোনো তড়িৎ প্রতিকার। ভুক্তভোগীরা অসহায় হয়ে অনেক সময় নীরবে চোখের জল ফেলে। কোনো সুবিচার না পেয়ে। বিচারের বাণী যেন নিভৃতে কেঁদে চলে বেশিরভাগ সময়ই।

সব ঘটনা এবং দুর্ঘটনার কথা আমরা জানতে পারি না। নীরবে-নিঃশব্দে অনেক ঘটনাই চাপা পড়ে যায়। আমরা কি জানতে চাই কখনও সেসব ঘটনা? বর্তমানে মিডিয়ার বদৌলতে অনেক চেপে থাকা ঘটনা সবার সামনে এসে হাজির হচ্ছে। বেরিয়ে আসছে প্রকৃত ঘটনার চিত্র। কোনো কোনো সময় প্রকৃত দোষী ধরাও পড়ছে আইনের শিকলে। অনেকের বিচার হচ্ছে শাস্তির কথা প্রচার হচ্ছে জনসম্মুখে। আবার অনেক বিচার বা অপরাধের শাস্তি অজানা বা রহস্যময়ই থেকে যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের এই স্বাধীন দেশে এরকম তো হওয়ার কথা ছিল না! স্বাধীন দেশে সবারই নিরাপদে-নির্ভয়ে থাকার কথা ছিল। কথা ছিল এখানে কোনো দুর্নীতি হবে না, কোনো খুন-হত্যা-ধর্ষণের মতো জঘন্য ঘটনা ঘটবে না। কিন্তু তারপরও ঘটে যাচ্ছে এসব ঘটনা আমাদের সব আশা-প্রত্যাশাকে বিসর্জন দিয়ে। বুক উঁচিয়ে ওরা ঘটিয়েই চলেছে একের পর এক এসব নোংরা-লোমহর্ষক এবং অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা।

বিবেকের দংশনে ওরা ক্ষত-বিক্ষত হয় না কখনো। ওরা নিজেদের অন্য সবার চেয়ে অনেক শক্তিশালী প্রমাণ করতে চায় ক্ষমতার দাপটে। যারা খুন করে, হত্যা করে তারা একটিবারও চিন্তা করে না যে, তারই দোসরদের হাতে ওই খুন হওয়া লোকটি হতে পারে তারই কোনো আপনজন, কোনো নিকটতম আত্মীয়। যারা ধর্ষণ করে, তারা একটিবারের জন্য চিন্তা করে না, তারই দোসরদের হাতে একদিন ধর্ষিতা হতে পারে তারই কোনো বোন কিংবা স্ত্রী কিংবা মা। তারা ভুলে যায় যাদের খুন করা হচ্ছে, যাদের ধর্ষণ করা হচ্ছে তারাও তারই মতো কোনো এক পরিবারের সদস্য। তারা কারও ভাই, কারও বোন কিংবা কারও কোনো আত্মীয়-আপনজন। অপরাধ করার আগে যদি কোনো অপরাধীর মনে এই চিন্তাটুকু আসে, তাহলে সে নিজেকে সহজেই শুধরে নিতে পারবে নিঃসন্দেহে। কিন্তু সেই চিন্তা করার সুযোগটি তাদের নেই। তারা ক্ষমতা আর অর্থের প্রচ- দাপটে অন্ধ হয়ে গেছে। এগিয়ে গেছে অনেক দূর, যেখানে এসব ভাবার সময় তাদের নেই।

আমাদের দেশ আজ উন্নয়নের সোপান তুলে হাঁটছে, বিভিন্নমুখী উন্নয়নের পথে অগ্রসর হচ্ছে। সারা বিশে^ আজ প্রশংসা পাচ্ছে। একসময় যে দেশটিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে সম্বোধন করত, আজ তারা সবাই গর্বিত সুরে দেশটির প্রশংসা করে। এটা আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার। আরও উন্নয়নের পরিকল্পনায় এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। অথচ আজ আমরা কোথায় যাচ্ছি? কোন অধঃপতনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি? কোনো অপরাধী যদি অপরাধ করে শাস্তি না পায়, ভুক্তভোগীরা যদি সুবিচার না পায় তবে তো এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন ব্যাপার! অপরাধীরা আরও বেশি অপরাধ করার জন্য উৎসাহ পাবে এটাই স্বাভাবিক! আমাদের দেশে আইন আছে, কিন্তু আইনের সঠিক বাস্তবায়ন নেই এ কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

এ কথা সর্বজন স্বীকৃত। অনেকক্ষেত্রে আবার কিছু দুর্বল আইনের কারণেও অপরাধীরা অপরাধ করার অনুপ্রেরণা পেয়ে যায়। আবার অনেকক্ষেত্রে জনগণের তীব্র আন্দোলন ও চাপের মুখে প্রচলিত আইনের সংশোধনীও করা হয়। সম্প্রতি দেশব্যাপী ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে ক্ষোভ-বিক্ষোভের জন্ম নেয়। তারা রাজপথে নেমে ধর্ষণের ঘটনায় প্রতিবাদের পাশাপাশি আইন সংশোধন করে মৃত্যুদ-ের বিধান করার দাবি জানান। আর এই জোরালো আন্দোলনের মুখে গত ১২ অক্টোবর ধর্ষণের শাস্তি বৃদ্ধি করে মৃত্যুদ-ের বিধান অনুমোদন করা হয়।

বর্তমানে আমাদের দেশে যে হারে খুন, হত্যা, ধর্ষণের মতো বিভিন্ন ধরনের অপরাধ বা অবাঞ্ছিত ঘটনা সংঘটিত হচ্ছে, তা উন্নয়নের পথে একটি বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে এতে কোনো সন্দেহ নেই। কোনো ঘটনার রেশ ধরে মানুষ রাস্তায় নামবে, আন্দোলন করবে, বিক্ষোভ করবেÑ আর তখনই প্রশাসনের টনক নড়বে, এটা সত্যিই লজ্জাজনক। অপরাধীরা যেন কোনোভাবে এ ধরনের ঘটনা ঘটাতে না পারে সেদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সজাগ ও কঠোর দৃষ্টি থাকতে হবে। প্রশাসনকে ঢেলে সাজাতে হবে প্রকৃত অপরাধীকে দ্রুত খুঁজে বের করার জন্য। কোনো অপরাধী যেন কোনোভাবে আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে বেরিয়ে যেতে না পারে, কেউ যেন অপরাধ করতে সাহস না পায় সেদিকে অবশ্যই আমাদের লক্ষ রাখতে হবে।

দেশ এখন উন্নয়নের পথে হাঁটছে। আমরা যেন এই উন্নয়নের সূত্র ধরে দেশ থেকে সহজেই অপরাধ নির্মূল করতে পারিÑ এ সেøাগান নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। অপরাধের কঠিন শক্ত শিকল ছিঁড়ে ফেলতে হবে, প্রকৃত অপরাধীকে যথাযোগ্য শাস্তি পেতে হবে। শুধু সাধারণ মানুষের আন্দোলনের ফলে আইন সংশোধন হবে, নতুন করে আইন সাজানো হবে কিংবা আন্দোলনের ফলে সবাই জেগে ওঠার পর কঠোর পদক্ষেপে শুধু তখনই অপরাধীরা ধরা পড়বে এবং শাস্তি পাবে তা যেন না হয়। দেশ থেকে সমস্ত অপরাধ দূর করে আমরা যেন উন্নয়নের চূড়ান্ত শিখরে সহজেই পৌঁছাতে পারি এটাই হোক আমাদের আজকের শপথ।

প্রদীপ সাহা : কবি ও লেখক
psaha09@yahoo.com