শিক্ষাব্যবস্থার সংকটগাথা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০ | ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

শিক্ষাব্যবস্থার সংকটগাথা

আরাফাত শাহীন ১১:০৯ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৪, ২০২০

print
শিক্ষাব্যবস্থার সংকটগাথা

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে গুণীজনদের মধ্যে নানা ধরনের প্রশ্ন অনেক আগে থেকেই রয়েছে। বর্তমান সময়ে শিক্ষাখাতে যে বেহাল দশা বিরাজ করছে সেটা যে কোনো চিন্তাশীল মানুষই একবাক্যে স্বীকার করে নেবেন। এর ওপর করোনা মহামারী এসে আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থাকেও দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। মার্চ মাস থেকে সকল ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে রয়েছে। এমনিতেই আমাদের শিক্ষার্থীরা সুযোগ পেলে পড়াশোনায় ফাঁকি দিতে কার্পণ্য করে না। এমন একটা বড় ছুটি পেয়ে অনেকের পড়াশোনাই যে লাটে উঠেছে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু সমস্যা সেখানে নয়। করোনা একদিন অবশ্যই বিদায় নেবে এবং আমাদের সবকিছু ঠিকভাবে পরিচালনা করতে হবে। শিক্ষা নিয়ে আমাদের দেশে যে সমস্যাগুলো বিরাজ করছে তাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার উপায় নেই কিছুতেই। এটা স্বীকার করতেই হবে, শুধু উন্নত দেশই নয় বরং আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের চেয়েও শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছি।

সরকার বারবার বলছে, শিক্ষা নিয়ে তাদের ভাবনাচিন্তা বিস্তর। দেশের মানুষকে শতভাগ শিক্ষিত করে তুলতে বদ্ধপরিকর। এবং সেই লক্ষ্যে ইতোমধ্যে কাজও চলছে। সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে আমাদের কারও কোনো প্রশ্ন নেই। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে নিশ্চয়ই অনেক উচ্চশিক্ষিত মানুষের দরকার রয়েছে। প্রত্যেক জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। ইতোমধ্যেই আমরা দেখেছি, সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। খুবই অল্প সময়ের মধ্যে অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে এবং সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে আরও অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অচিরেই হয়ত সেগুলো প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম শুরু হবে। এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে অনেক উচ্চশিক্ষিত যুবক বের হয়ে আসবে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি গাছের গোড়া শক্তিশালী না হলে তার পক্ষে টিকে থাকা মুশকিল। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাতেও সেই সমস্যাটা প্রকটভাবে বিরাজ করছে। আমি গাছের গোড়া বলতে প্রাথমিক শিক্ষার কথাই বলছি।

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা একটি সুস্থিত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারেনি আজও। অথচ স্বাধীনতার পর সবার আগে এদিকে দৃষ্টি দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। এটা ঠিক, এখন দেশের বেশিরভাগ ছোট ছেলেমেয়েকে শিক্ষার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু আমরা তাদের কোন মানের শিক্ষা প্রদান করছি? প্রাথমিক পর্যায়ে নানা ধরনের প্রতিষ্ঠান রয়েছে। একদিকে রয়েছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, অপরদিকে ইংলিশ মিডিয়াম ও কিন্ডারগার্টেন স্কুল। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মধ্যে এতটাই বৈপরীত্য রয়েছে যে এসব শিক্ষার্থী যখন বড় হয়ে অভিন্ন শিক্ষাপদ্ধতির আওতায় আসে, তখন তাদের মেলবন্ধন কষ্টকরই হয়ে যায়। তাছাড়া বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পিতামাতা ভালো মানের শিক্ষার জন্য যে অঢেল পরিমাণ টাকা ঢেলে থাকেন শেষপর্যন্ত তা ফলোদয় হয় না। একটা সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আর কিছু না হোক অন্তত নীতিনৈতিকতার শিক্ষা দেওয়া হত। কিন্তু এখন সেসবের বালাই নেই। স্কুল পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ওপর একদিকে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে গাদা গাদা বই; অপরদিকে সেসব বই পড়ানোর জন্য নিয়োগ দেওয়া শিক্ষকদের সবাই দক্ষতাসম্পন্ন নন। এর বাস্তব প্রমাণ স্কুলগুলোতে গেলেই দেখা যাবে। শহরের অবস্থা অতটা সংকটপূর্ণ না হলেও গ্রামের অবস্থা মোটামুটি ভয়াবহ। তাহলে ছোট্ট বাচ্চারা কীভাবে নিজেদের গঠন করতে পারবে?

আজ থেকে বহু বছর পূর্বে বাংলার প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মন্তব্যটা এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘স্কুল বলিতে আমরা যাহা বুঝি সে একটা শিক্ষা দিবার কল। মাস্টার এই কারখানার একটা অংশ। সাড়ে দশটার সময় ঘণ্টা বাজাইয়া কারখানা খোলে। কল চলিতে আরম্ভ হয়, মাস্টারেরও মুখ চলিতে থাকে। চারটের সময় কারখানা বন্ধ হয়, মাস্টার-কলও তখন মুখ বন্ধ করেন, ছাত্ররা দুই-চার পাতা কলে-ছাঁটা বিদ্যা লইয়া বাড়ি ফেরে। তার পর পরীক্ষার সময় এই বিদ্যার যাচাই হইয়া তাহার উপরে মার্কা পড়িয়া যায়।’
(সূত্র : বাংলা শিশুসাহিত্য : ফিরে দেখা, তারেক রেজা)।
আজ শতবর্ষ পরে এসেও এই অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন হয়েছে একথা বলার উপায় নেই।

খ.
এতক্ষণ আমরা দেখলাম প্রাথমিক শিক্ষা কোন দশায় চলছে। এবার দৃষ্টি দিতে চাই মাধ্যমিক শিক্ষার দিকে। অনেকদিন ধরেই শিক্ষাকাঠামোতে একটা পরিবর্তন নিয়ে আসার আভাস দেওয়া হচ্ছে। নতুন কাঠামোতে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষার আওতাভুক্ত হবে বলে বলা হচ্ছে। উন্নত দেশের অনুকরণে এই সিস্টেম চালু হলেও যে বিশেষ লাভ হবে সেটা মনে করার কোনো কারণ নেই। গাড়ি যতই ভালো হোক না কেন চালক যদি দক্ষ না হয় তাহলে কী হতে পারে সেটা সহজেই অনুমেয়। প্রাথমিক পর্যায়ে তবুও অনেক স্কুল সরকারি হয়েছে এবং সরকারিভাবে সেখানে শিক্ষক নিয়োগ হয়। কিন্তু এদেশে হাতেগোনা কিছু মাধ্যমিক বিদ্যালয় সরকারি, বাকিগুলো কোনোমতে দিন পার করছে।

নিজ এলাকার স্কুলগুলোর কথা বলতে পারি। সেখানে শিক্ষক নিয়োগে কোন পর্যায়ের দুর্নীতি হয় সেটা স্বচক্ষে না দেখলে সত্যিই বিশ্বাস করা কঠিন। ক্লাসের সবচেয়ে দুর্বল ছাত্রটি এসে যখন বলে- অমুক স্যার কিছুই পড়াতে পারে না। তখন আমাদের কারও বুঝতে বাকি থাকে না ওই শিক্ষকের দক্ষতা আসলে কতটুকু। মাধ্যমিক শিক্ষা হলো একটি জাতির কোমর। এ শিক্ষায় যদি কোনো ফাঁক থেকে যায় তাহলে কোমর সোজা করে দাঁড়ানো মুশকিল। বিগত বছরগুলোতে কেমন শিক্ষা পেয়েছে আমাদের ছেলেমেয়েরা তা বর্তমান চিত্র দেখে সহজেই অনুমান করে নেওয়া সম্ভব। এসএসসি পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করা শিক্ষার্থীকে যখন ‘আমি জিপিএ ফাইভ পেয়েছি’র ইংরেজি জিজ্ঞেস করা হয় তখন তার উত্তর যদি হয় ‘আই অ্যাম জিপিএ ফাইভ’ তখন আমাদের বুঝতে বাকি থাকে না মাধ্যমিক শিক্ষা কোন অবস্থায় আছে। আমার এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন পরিচালনা করি। বেশ কয়েকটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় নিয়ে আমাদের কার্যক্রম। সেখানে কাজ করতে গিয়ে রীতিমতো ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন হয়েছি। শিক্ষার্থীরা প্রবলভাবে পড়াশোনাবিমুখ। অতিসত্বর এর কারণ খুঁজে বের করে প্রতিকারের ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে পরে কিন্তু আর কোনো উপায় থাকবে না।

সিলেবাসকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য প্রতি বছরই নতুন নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। সেই সঙ্গে আরেকটি কাজও প্রচুর গুরুত্বসহকারে করা হয়েছে। সেটা হলো বই পাল্টানো। গত দশ বছরে প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক স্তরে কতবার বই পাল্টানো হয়েছে সেটা হিসাব করে বের করতে হবে। এর ফলাফল আসলে কী দাঁড়িয়েছে? ছোটবেলায় বইয়ে নীতি-নৈতিকতার যে অধ্যায়গুলো পড়ে এসেছি আজ তার তেমন কিছুই দেখতে পাই না। আবার যেটুকু রয়েছে সেটুকুও কোমলমতি শিক্ষার্থীরা যথাযথভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ পাচ্ছে না। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। আমরা অবাক হয়ে দেখি স্কুলের ছেলেমেয়েরা প্রকাশ্যে মাদক গ্রহণ করছে, তারা হাত তুলছে শিক্ষাগুরুর গায়ে। একটা অসুস্থ প্রজন্ম গড়ে তোলার সমস্ত আয়োজন যেন সম্পন্ন করে রেখেছি আমরা। মুখস্থবিদ্যা থেকে শিক্ষার্থীদের দূরে সরিয়ে রাখার জন্য প্রথমে কাঠামোবদ্ধ এবং পরে সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি প্রণয়ন করা হলো। এসব পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা কতটুকু বাড়িয়েছে সে প্রশ্ন আমরা করতেই পারি। আমার মনে হয়, বারবার পাঠ্যপুস্তক এবং পরীক্ষাপদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার ফলে সেটা শিক্ষার্থীদের মনে নেতিবাচক প্রভাবই ফেলেছে।

গ.
আমরা যারা উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোতে ঘোরাফেরা করছি, তারা এসব প্রতিষ্ঠানের অন্তঃসারশূন্যতা খুব সহজেই অনুধাবন করতে পারছি। আমাদের পিতামাতা বহু স্বপ্ন এবং আশা নিয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়ে থাকেন। কিন্তুএখানে এসেই তাদের সে স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছি। কারণ, নিজেদের নষ্টামির স্রোতে ভাসিয়ে দেওয়ার সমস্ত আয়োজন এখানে প্রস্তুত হয়ে আছে যেন। বিশ্ববিদ্যালয় হলো একটা উন্মুক্ত প্রান্তর। এখানে এসে যেমন অভিভাবকরা কিছুতেই আমাদের খোঁজখবর নিতে পারেন না; আবার এখানে ইচ্ছে করলেই একজন শিক্ষার্থী ভালো কিংবা মন্দ যেকোনো দিকেই যেতে পারে। অনেক সময় উচ্চশিক্ষার প্রাঙ্গণে পা দিয়ে অনেকেই ভুল পথে ধাবিত হয়। তাদের সঠিক পথ বাতলে দেওয়ার মানুষটি এখানে পাওয়া কঠিন।

অতীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে মাদকের এতটা ছড়াছড়ি ছিল কিনা জানি না। তবে বর্তমান অবস্থা তো ভয়াবহ। ছাত্ররাজনীতি দিনেদিনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে রীতিমতো আতঙ্কে পরিণত হচ্ছে। প্রায়ই ক্যাম্পাস উত্তপ্ত হয়ে উঠছে অজানা কোনো শঙ্কায়। আমরা নিকট অতীতে বেশ কয়েকটি হত্যাকা- ঘটতে দেখেছি। সুস্থ রাজনৈতিক চর্চা প্রতিষ্ঠানগুলোতে হয় না বললেই চলে। অতীতে কখনো এমন অবস্থা ছিল বলে মনে হয় না।

যখন একটা সুন্দর, সুস্থ মন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করি, তখন চাইলে অতি সহজেই আমাদের জাতির কল্যাণের জন্য প্রস্তুত করে তোলা যেত। কিন্তু আসলে কী হয়? মাথায় প্রথমেই ঢুকিয়ে দেওয়া হয় বিসিএস নামক সোনার হরিণের চিন্তা; নয়ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন। এ দুর্বিষহ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে আমরা অচিরেই খেই হারিয়ে ফেলি এবং সমস্ত সৃজনশীলতাকে ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলে দিই।

বিশ্ববিদ্যালয় হলো মুক্তভাবে জ্ঞানচর্চার জায়গা। এখানে এসে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা মিলে জ্ঞানের নিত্যনতুন দ্বার উন্মোচন করবেন। কিন্তু এসবের কিছুই আসলে হয় না। কারও সঙ্গে কারও কোনো সমন্বয় নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বায়ত্তশাসনের কথা মুখেই শুধু বলা হয়। কিন্তু বাস্তবে এর তেমন অস্তিত্ব দেখতে পাই না। আমরা রাষ্ট্রের জনগণের টাকায় পড়াশোনা করি। প্রত্যেকের মধ্যে রাষ্ট্র এবং মানুষের জন্য কিছু একটা করার তাড়না থাকার দরকার ছিল। সত্যি কথা হলো, আমাদের মধ্যে এমন তাড়নার খুবই অভাব। শুধু শিক্ষার্থীই নয়, শিক্ষকরাও ক্রান্তিলগ্নে তেমন কোনো আশার বাণী শোনাতে পারেন না।

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রথম ও প্রধান কাজ হওয়া উচিত গবেষণার মাধ্যমে নিত্যনতুন জ্ঞানের দরজা উন্মুক্ত করা যাতে পরবর্তী প্রজন্ম সেখান থেকে নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু আমরা হতাশ হয়ে দেখি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সৃজনশীলতার পরিবর্তে মুখস্থবিদ্যাকে সর্বক্ষেত্রে প্রাধান্য দেওয়া হয়। শিক্ষকের লেকচার পরীক্ষার খাতায় ভালোমতো উগড়ে দিতে পারলেই বেশি নাম্বার পাওয়া যায়। আমরা সবাই চিন্তা ও গবেষণার দিকে না ছুটে শুধু ভালো রেজাল্টের দিকেই ছুটছি। আখেরে এটা ভালো ফল বয়ে আনবে না কিছুতেই। সবচেয়ে লজ্জার বিষয় হলো, শিক্ষকগণও আজ গবেষণাকর্মের কঠিন পরিশ্রমকে ভয় পেয়ে নগদ লাভের দিকে ছুটছেন। ফলে আমরা যখন জানতে পারি মানুষ গড়ার মহান কারিগররা অন্যের গবেষণা চুরি করে অতঃপর ধরা খান, লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে যায়।

ঘ.
সদ্যই এইচএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট ঘোষণা করা হয়েছে। আমরা সেখানে দেখেছি পরীক্ষা গ্রহণ না করেই জেএসসি এবং এসএসসির রেজাল্টের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি করা হয়েছে নতুন রেজাল্ট। সরকারের পক্ষ থেকে যদিও বলা হয়েছে অন্য কোনো উপায় ছিল না। তবে দেশের অধিকাংশ মানুষ; যারা দেশের শিক্ষা নিয়ে অল্পবিস্তর চিন্তাভাবনা করেন, তারা মন থেকে এটা মেনে নিতে পারেননি। এদিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জানিয়েছেন, তারা এইচএসসির রেজাল্টের ভিত্তিতে নতুন শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীদের ভর্তি করাতে প্রস্তুত। অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যগণও যদি এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে শুরু করেন, তাহলে আখেরে তার ফল ভালো হবে না মোটেও। এমনিতেই দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে প্রতি বছর অসংখ্য দুর্বল শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় পড়াশোনার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। এ পদ্ধতি আগুনে ঘি ঢালার মতোই হবে। সুতরাং যেভাবেই হোক ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে নতুন শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের ভর্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

শিক্ষা নিয়ে আমরা এখন সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় আছি। একটি জাতি গঠনমূলক শিক্ষা ব্যতীত কোনোভাবেই ঘুরে দাঁড়াতে পারে না। আমরা সব সময় উন্নয়নের কথা বলে থাকি। কিন্তু এটা চিন্তা করে দেখি না উন্নত ধরনের বাস্তবসম্মত শিক্ষা ব্যতীত কিছুতেই বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে পারব না। আজ আমরা আমাদের আচরণ ও সংস্কৃতিতে পশ্চিমকে অন্ধভাবে অনুকরণ করে চলেছি। এটা ভালো কিংবা মন্দ সেই তর্কে এখন যাচ্ছি না। তবে কথা হলো পশ্চিমের সবকিছু গ্রহণ করলেও সর্বাপেক্ষা কার্যকরী উন্নত শিক্ষাব্যবস্থাকে কেন আমরা গ্রহণ করতে পারছি না? পশ্চিমা বিশ্বই শুধু নয়, এশিয়ার অনেক দেশই আজ তথ্য-প্রযুক্তির ক্ষেত্রে রীতিমতো বিপ্লব সংঘটিত করে ফেলেছে। তাহলে আমরা কেন পেছনে পড়ে থাকব? অপরিকল্পিতভাবে এত বেশি সংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্তকে কিছুতেই মন থেকে মেনে নিতে পারি না।

আমার কথায় অনেকেই হয়ত মন খারাপ করতে পারেন। কিন্তু বাস্তব দিকটাও ভেবে দেখতে হবে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় নতুন যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্থাপন করা হয়েছে তাতে এত বেশি অব্যবস্থাপনা বিরাজ করছে যে প্রায়শই সেসব ঘটনা বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ পেয়ে যাচ্ছে। অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয় তো ভাইস চান্সেলর ছাড়াই চলছে। শিক্ষার্থীদের শিক্ষার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি না করে এভাবে হুটহাট সিদ্ধান্ত নেওয়া মঙ্গলজনক হতে পারে না। তাই মনে করি, সবার আগে প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক শিক্ষাস্তরের দিকে নজর দিতে হবে। যদি সেখানে শিক্ষার্থীদের সঠিকভাবে পরিচর্যা করে গড়ে তুলতে পারি তাহলে জাতির জন্য সেটা মঙ্গলজনক বলে বিবেচিত হবে। সর্বোপরি, শিক্ষা নিয়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার সময় এসেছে। এ সুযোগ হেলায় হারালে পরবর্তী সময়ে বড় ধরনের বিপদে পড়তে হতে পারে।

আরাফাত শাহীন : শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
smshaheen97@gmail.com