দ্রব্যমূল্য লাগামহীন, বাজারে অস্থিরতা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০ | ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

দ্রব্যমূল্য লাগামহীন, বাজারে অস্থিরতা

হাসনা হেনা ১১:০২ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৪, ২০২০

print
দ্রব্যমূল্য লাগামহীন, বাজারে অস্থিরতা

হু হু করে দ্রব্যমূল্য বেড়েই চলেছে। বাজারে চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, আলু, মরিচ শাকসবজি থেকে শুরু করে বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম ক্রমেই সীমিত আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। একদিকে করোনা মহামারীর তা-ব অন্যদিকে ভয়াবহ বন্যায় মানুষের দুর্ভোগ, নষ্ট হয়ে গেছে কৃষকদের ফসল। অনেক জায়গায় যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল, এ অবস্থায় কৃষকরা ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত। নগর ও গ্রামীণ অর্থনীতির মন্দায় দিন আনে দিন খায় মানুষগুলো ন্যূনতম উপার্জন থেকে বঞ্চিত। এ অবস্থায় গত কিছু দিন ধরে নিত্যপণ্যের বাজার লাগামহীন। দরিদ্র-অতি দরিদ্র মানুষের প্রধান খাদ্যদ্রব্য মোটা চাল ও আলুর দাম কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা কেউ আন্দাজ করতে পারছেন না।

আমাদের নগরসভ্যতার নেপথ্য কারিগর শ্রমিক, দিনমজুর। তাদের পরিশ্রমের উপর ভর করে গড়ে ওঠে দালান, রাস্তা, সেতু, দৃষ্টিনন্দন ইমারত। একজন কৃষকের ফলানো ফসলেই উদরপূর্তি হয় সভ্যসমাজের সুশীল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের। কল-কারখানা কিংবা গার্মেন্ট শ্রমিকদের নিরলস শ্রম সচল রাখে অর্থনীতির চাকা। কিন্তু দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রভাব এ কারিগরদের উপর কতটা চাপ সৃষ্টি করে, কেউ তা অনুভব করতে পারব কি? ওদের দিন কাটে হতাশা আর টানাপোড়েনের অনিশ্চিত অন্ধকারে। এমন অবস্থায় মানুষগুলোর পরিবার পরিজন নিয়ে নাভিশ্বাস উঠে যায়। বিশেষ করে যাদের স্বল্প আয় কিন্তু পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেশি তাদের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। নিত্যপ্রয়োজনীয় বর্ধিত দ্রব্যমূল্যের ধাক্কা সামলাতে রীতিমতো দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায় তাদের।

যখন একটি পণ্যের সংকট দেখা দেয় তখন বাজারে অন্যটির দাম বাড়ানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়। বলতে গেলে এটা অতি পরিচিত চিত্র। অনেকেই মনে করেন নিয়মিত বাজার মনিটরিং না হওয়ার কারণে এসব অযাচিত ঘটণা ঘটছে। সবাই জানি, দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে জীবনযাত্রার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। মানুষ তার দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে বাজার থেকে নানাবিধ পণ্য ক্রয় করে। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেড়ে গেলে তার দুরবস্থার সীমা থাকে না। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, দারিদ্র্য, অপুষ্টি, দুর্নীতি ও অবক্ষয়ের মতো অভিশাপকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

মধ্যবিত্তরা না পারছে নামতে, না পারছে উঠতে। যারা বেসরকারি খাতে আছেন তারা নানা রকম টানাপোড়েনের মাঝে যেটুকু সঞ্চয় করে রাখেন, সেই সঞ্চয়ও খরচ করতে হয়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি মধ্যবিত্তকে অনেক সময় ঋণগ্রস্ত করে। একে তো করোনা দুর্যোগে মানুষের জীবনযাত্রা স্থবির, অনেকে বেকার অবস্থায় হতাশায় চারপাশে অন্ধকার দেখছেন। অনেকের ব্যবসা কোনরকম চলছে, কারো বা বন্ধ হয়ে গেছে এরকম অবস্থায় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি মড়ার উপর খাড়ার ঘায়ের মতোই।
চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা, কৃত্রিম অভাব সৃষ্টিকারী, সিন্ডিকেট, মজুদদারি, মুদ্রাস্ফীতি, কালোবাজারি ইত্যাদির কারণে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেছেন। যদিও সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে, সরকারকে আরও আন্তরিকতার সঙ্গে জনবান্ধব হয়ে এ অবস্থায় জনগণের পাশে থাকা উচিত বলে মনে করি। দরিদ্রপ্রধান দেশে সরকারের প্রয়োজন দারিদ্র্যের জন্যে ভর্তুকি দিয়ে খাদ্যপণ্যের ব্যবস্থা করা। সরকারিভাবে আরও বেশি চাল মজুদ করতে হবে। যেন বাজারের সংকটময় মুহূর্তে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

অন্যান্য সবজির বাজার চড়া হলে সাধারণ মানুষের শেষ ভরসার জায়গায় থাকে আলু। শেষ ভরসার জায়গায় যখন ভাটা পড়ে তখন সাধারণ মানুষের আর কিছুই করার থাকে না। সরকারের পক্ষ থেকে আলুর মূল্যবৃদ্ধিতে সিন্ডিকেটকে দায়ী করা হচ্ছে। শুধু কি সিন্ডিকেট দায়ী নাকি নেপথ্যে আরও কোনো গল্প আছে? খোলা বাজারে আলু বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা করে। অন্য সব সবজির সঙ্গে তুলনা করলে যদিও এ মূল্য তেমন বেশি বলা যাচ্ছে না। তবে ভাবনার জায়গায় একটু ফাঁক থেকেই যাচ্ছে। এক সপ্তাহ আগে যে আলুর মূল্য ছিল ৩৫ টাকা কেজি সেই আলুর মূল্য লাফিয়ে লাফিয়ে ৫০-৫৫ টাকায় উঠে গেল কীভাবে? এছাড়াও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আলুর দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে ৩০ টাকা কেজি। তারপরও বাজারে আলু প্রতি কেজি ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে! ফলে বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পরও বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিক্রেতারা বলছেন, সবজির মৌসুম না হওয়ায় প্রতি বছর এ সময়ে শাক সব্জির দাম বাড়তি থাকে। বাজার চড়া থাকলেও কৃষকরা সবজির ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না।

হাসনা হেনা : লেখক ও শিক্ষক। শ্রীপুর, গাজীপুর
shishirbhor01@gmail.com