অটো পাস নিয়ে প্রশ্ন

ঢাকা, রবিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২০ | ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

অটো পাস নিয়ে প্রশ্ন

সাজ্জাদ হোসেন ১০:৪৮ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২২, ২০২০

print
অটো পাস নিয়ে প্রশ্ন

করোনাভাইরাসের কারণে এবারের উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) বা সমমানের পরীক্ষা হবে না, সেই ঘোষণা ৭ অক্টোবর জানিয়ে দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। আর এ পরীক্ষায় পাস করানো হবে সকল শিক্ষার্থীকেই। তবে পরীক্ষার্থীর ফলাফল কী হবে সেটি ঠিক হবে তার জেএসসি ও এসএসসি এবং সমমানের পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে। এমন ধরনের সিদ্ধান্ত সত্যিই জাগরিত সমাজের সাধারণকে যথেষ্ট ভাবায়। একজন শিক্ষার্থী মাধ্যমিক পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় জিপিএ-৩ পাওয়ার দৃষ্টান্ত অহরহ রয়েছে। আমি নিজেই উচ্চ মাধ্যমিক বোর্ড পরীক্ষা দিয়েছিলাম এসএসসিতে ‘এ প্লাস’ পাওয়া এক ঝাঁক ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে। তাদের কেউ কেউ দু-এক বিষয়ে অকৃতকার্যও হতে দেখেছি। আমরা জানি পড়াশোনা পুরোটাই চর্চার ওপর নির্ভরশীল। তারা হয়তো সেই মনোযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল বিধায় তেমন ফলাফল পেয়েছেন।

২০১৯ সালের এইচএসসি পরীক্ষার গড় পাসের হারের দিকে তাকালে ব্যাপারটা আরও সুস্পষ্ট হবে। এইচএসসি ও সমমানের পাসের হার ছিল ৭৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ। মোট পরীক্ষার্থী ছিলেন ১৩ লাখ ৩৬ হাজার ৬২৯ জন। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছিল ৯ লাখ ৮৮ হাজার ১৭২ জন। সুতরাং এতটুকু অনুমান করাই যায় এ বছরেও সে সংখ্যাটি গত বছরের হারের আশপাশ ঘোরাফেরা করতো। আমার চিন্তার বিষয়, অনুমানকৃত ভবিষ্যৎ অকৃতকার্যের যে সংখ্যাটি বের হতো সেসব শিক্ষার্থীদের নিয়ে। তাদেরকে এক প্রকার ক্ষতির মুখে ফেলে দেওয়া হচ্ছে এমন পদক্ষেপের মাধ্যমে। এ কথা সত্য যে, এটিই তাদের জীবনের চূূড়ান্ত ধাপ নয়, কিন্তু উপরের সিঁড়িতে পদার্পণ করার জন্য যে ছোট ছোট সিঁড়িকে বেয়ে তবেই উপরের দিকে উঠতে হয়Ñ এ ব্যাপারে আমাদের সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। সেসকল ছাত্র-ছাত্রী কতটা সামনের দিকের পথচলায় সামলে নিতে পারবে এমন প্রশ্ন থেকেই যায়! ব্যাপারটা যাতে ঠুঁটো জগন্নাথের মতো না হয়— যেমনটা প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ গ্রাজুয়েটসদের শুধুমাত্র ডিগ্রি হাতে ধরিয়ে দেওয়ার মতো। সার্টিফিকেট, অ্যাওয়ার্ড-অনার রয়েছে ঠিকই কিন্তু পর্যাপ্ত চাকরি নেই। যদিও-বা রয়েছে তবে সেই চাকরি আর ডিগ্রিধারীর ন্যূনতম যোগ্যতা অনুযায়ী সামাজিক মর্যাদা নেহাৎ কম।


আরেক শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে যাদের সঙ্গে আমরা সরাসরি অবিচার করছি। জেএসসি, এসএসসিতে খারাপ ফলাফল করার পর যারা নিজের প্রসারের জন্য পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়ার চেষ্টা করে। পরিশ্রম করে সাফল্য অর্জন করার বিপুল সম্ভাবনাও থাকে তাদের। সেসকল শিক্ষার্থীরা তাদের সুযোগ থেকে প্রত্যক্ষভাবে বঞ্চিত হচ্ছে! কারণ, ফলাফল তো পূর্বের বোর্ড পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতেই গড়া হবে। এই শ্রেণির ঢের শিক্ষার্থীর ভাবনা থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের সুযোগ সৃষ্টি করা। পূর্বের ব্যর্থতা ভুলে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করার জন্য। এমন অনেক বিশ^বিদ্যালয় রয়েছে যা মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলের চাইতে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলকে গড়ে বেশি মূল্যায়ন করে থাকে। আর যারা ভেবে রেখেছেন এবার ইম্প্রুভের জন্য পুনরায় পরীক্ষা দেবেন; সেসকল শিক্ষার্থীর কাছে ব্যাপারটি আরও বেশি হতাশার। এই সিদ্ধান্ত তাদের প্রায় এক বছর পূর্বে থেকেই নেওয়া। পুরো বছরের পরিশ্রম বলা যেতে পারে গোল্লায় গিয়েছে। এমনকি পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার পরবর্তী ধাপে কী করবেন সেটিও আগে থেকে তাদের নির্ধারণ করা রয়েছে। এমতাবস্থায় তারা তাদের পরিকল্পিত পড়াশোনার গতি থেকে ছিটকে পড়বে! পাস করে দেওয়াটাই চূড়ান্ত সমাধান নয়। বোর্ড পরীক্ষাগুলোয় চ্যালেঞ্জ নিয়ে ভালো ফলাফল করা যতটা সহজ— পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি জায়গা দখল করা ততটা সহজ নয়। মূলত আবেদনকারীদের তুলনায় সিট সংখ্যা খুবই অপ্রতুল। এখানে ‘পয়েন্ট ফাইভ’ নম্বর কম পাওয়ার কারণে অনেকেই ভর্তির সুযোগ পান না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসঙ্গ তোলার উদ্দেশ্য এই যে, অনেকরই স্বপ্ন থাকে এরকম প্রাঙ্গণে নিজেকে গড়ার। আবার উচ্চ পরিমাণে সেমিস্টার ফি এর জন্য নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চিন্তা মাথাতেই থাকে না। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থাকে পছন্দের শেষে। কথাগুলো বলার সারমর্ম হচ্ছে— তৈরি না করে মাঠে নামিয়ে দেওয়া। উচ্চ মাধ্যমিক পাঠ্যক্রমের অনেক উপাদান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রস্তুতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই সেসকল বিষয়ে পাকাপোক্ত হওয়াটাও জরুরি। তাছাড়া, জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট বা জেএসসি পরীক্ষার ফলাফল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় মূল্যায়ন করা হয় না। কিন্তু অটো প্রমোশনে যেহেতু জেএসসি’র ফলাফলও যোগ করা হবে সেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতেও সে পরীক্ষার নম্বরকে বাধ্য হয়ে পরোক্ষভাবে সমর্থন করতে হবে। আমরা জানি অষ্টম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থীর মেধাস্তর অপরিণত থাকে। অনেকেই বেশ কিছু বিষয় বুঝে উঠতে দেরি হয়।

তাই জেএসসি’র ফলাফল দিয়ে এইচএসসি হোক কিংবা পরোক্ষভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে জিপিএ মূল্যায়ন হোক, এর কোনোটাই কাম্য নয়। আমি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এমন সিদ্ধান্তকে নৈতিক অর্থে শ্রদ্ধা জানাতে চাই, কিন্তু এখানে কি নৈতিকতায় সবকিছু? করোনাভাইরাসের কারণে পরীক্ষা না নেওয়া এবং ছাত্র-ছাত্রীরা দীর্ঘ সময় পড়াশোনা থেকে পিছিয়ে পড়েছে এ কথা যেমন সত্য, তবে এই কয়েক মাসে তারা অজ্ঞদের দলে যে চলে যায়নি এও সত্য। অর্থনীতির ‘বিকল্প ব্যবস্থা’ তত্ত্বটি আমাদের জ্ঞাত। যেহেতু শুধুমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যতিত সকল কার্যক্রম পূর্বের মতোই স্বাভাবিকভাবে চলছে, সেক্ষেত্রে সঠিক পরিকল্পনা ও পদক্ষেপের মাধ্যমে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা নেওয়াটা অসম্ভব ছিল না। স্বাস্থ্যবিধি মেনে যে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ ‘আইডিপি’ নামক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান— যা ইন্টারন্যাশনাল ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ টেস্টিং সিস্টেম বা আইইএলটিএস পরীক্ষা গ্রহণ করে থাকে। প্রতিষ্ঠানটি কয়েক মাস ধরে সুস্বাস্থ্য নিয়ম সংক্রান্ত যাবতীয় পরামর্শ মেনে পরীক্ষা গ্রহণ করছে। এমনকি যারা অসুস্থ এবং নির্ধারিত তারিখে পরীক্ষা দিতে পারবেন না তারা চাইলে তারিখ পরিবর্তন করতে পারে। সুতরাং আইডিপি পারলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় পারবে না কেন? তাছাড়া, আমরা বর্তমান সময়ে এসে করোনাভাইরাস স¤পর্কে সচেতনতায় কতটা অধঃপতন হয়েছে তা রাস্তাঘাটে বের হলেই বোঝা যায়। এখন পর্যন্ত সর্বাধিক মানুষের মাস্ক পরা নিশ্চিত করা যায়নি। হাত ধোয়া বা জীবাণুমুক্ত করাটা দূরের প্রসঙ্গ।

সাজ্জাদ হোসেন : শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান অনুষদ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
sajjathossain75200@gmail.com