অর্থনীতির সংকটকাল ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি

ঢাকা, রবিবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২০ | ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

অর্থনীতির সংকটকাল ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি

মোহাম্মদ কামরুজ্জামান ১১:৪৩ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২১, ২০২০

print
অর্থনীতির সংকটকাল ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি

এ বছর ৮ এপ্রিল এক বৈঠকে জাতিসংঘের উপ-সেক্রেটারি-জেনারেল আমিনা জে মোহাম্মদ করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেছিলেন, “আমরা একটি মন্দায় চলে এসেছি, যা ২০০৮ সালে আমরা যে পরিস্থিতি ভোগ করেছিলাম তার থেকেও খারাপ হবে।” ইতিহাস থেকে জানা যায়, মহামারী কেবল অসংখ্য মানুষের প্রাণই কেড়ে নেয় না, একটি দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেয় মারাত্মকভাবে। মহামারী দীর্ঘায়িত হলে অর্থনীতিতে মহামন্দার সৃষ্টি হয়। মানুষের আয় কমে যায়, অনেক মানুষ চাকরি হারায়, ক্রয়ক্ষমতা (purchasing power) কমে যায়। এর ফলে দামস্তর (price level) কমে গিয়ে মুদ্রাসংকোচন (deflation) ঘটে। মুদ্রাসংকোচন মুদ্রাস্ফীতি থেকেও খারাপ। এর ফলে অর্থনীতি সংকুচিত হয়ে যায়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (economic growth) কমে যায়, কখনো কখনো ঋণাত্মক হয়ে যায়, যা অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে ভয়ানক সংকটের সৃষ্টি করে।

বর্তমান পৃথিবীতে করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট মহামারীর সময়কাল দশ মাস পেরিয়ে গেছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আরও কিছু মাস ভাইরাসটি তার অবস্থান বেশ দাপটের সঙ্গেই বজায় রাখবে। এই দীর্ঘ দশ মাসে বিশ্বের শক্ত অর্থনীতির দেশগুলো ইতোমধ্যে ভালোভাবেই ধরাশায়ী হয়েছে। ১ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখে প্রকাশিত এক আন্তর্জাতিক গবেষণা রিপোর্টে জানা যায়, বিশ্বের ৩৯টি মধ্যম ও উচ্চ আয়ের দেশের চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিক (second quarter) শেষে জিডিপির ভিত্তিতে আগের বছরের তুলনায় অর্থনীতির আকার ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, স্পেন এবং ইটালির অর্থনীতি প্রায় ২০ শতাংশ আর যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং জার্মানির অর্থনীতি প্রায় ১০ শতাংশের মতো কমে গেছে। তালিকার একমাত্র ব্যতিক্রম দেশের নাম চীন, যাদের অর্থনীতির আকার না কমে বরং ৩.২ শতাংশ বেড়েছে, যদিও প্রথম প্রান্তিকে তাদের অর্থনীতি ৬.৮ শতাংশ সংকুচিত হয়েছিল।


বাংলাদেশে মহামারী মানুষের জীবনযাত্রার ওপর ঠিক কী ধরনের প্রভাব ফেলেছে, তার সঠিক চিত্র তুলে ধরার মতো তেমন কোনো জরিপ বা গবেষণার খবর আমাদের জানা নেই। পিপিআরসি’র পরিচালিত এক জরিপের তথ্য থেকে জানা যায়, বস্তিতে বসবাসকারী গরিব এবং চরম গরিব (hardcore poor) মানুষের আয় প্রায় ৮০ ভাগ কমে গেছে এবং ৬৩ শতাংশ নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। এর ফলে বস্তিতে থাকা মানুষগুলোর মাথাপিছু আয় ফেব্রুয়ারির তুলনায় জুনে এসে ৮২ শতাংশ কমে গেছে। এর প্রমাণ হিসেবে, আমরা দেখেছি, নিম্ন আয়ের অসংখ্য মানুষ তাদের কর্ম হারিয়ে গ্রামে ফিরে গেছে দলে দলে। বিআইডিএসের রিসার্স ডিরেক্টর বিনায়ক সেন পরিচালিত আরেক জরিপে উঠে এসেছে, বাংলাদেশে জুন পর্যন্ত নতুন করে ১ কোটি ৬৪ লাখ মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে নেমে গেছে, যার ফলে দারিদ্র্যের হার ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৯ শতাংশ হয়েছে।

অন্যদিকে, সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্যমতে, সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশে কনজিউমার প্রাইস ইন্ডেক্স (CPI) রেকর্ড পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮৮.১২ শতাংশ। উল্লেখ্য, একটি দেশের শহুরে জনগোষ্ঠী তাদের দৈনন্দিন তালিকায় যে পরিমাণ খাদ্য ও সেবাসামগ্রী বরাদ্দ রাখে, তার গড় মূল্যের ভিত্তিতে CPI পরিমাপ করা হয়। আর সময়ের ব্যবধানে এর শতকরা ধনাত্মক পরিবর্তনকে মুদ্রাস্ফীতি বলে। বাংলাদেশে সেপ্টেম্বর মাসে মুদ্রাস্ফীতির হার আগের মাসের ৫.৬৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫.৯৭ শতাংশ দাঁড়িয়েছে, যা মহামারীর আগে অর্থাৎ মার্চে ছিল ৫.৫০ শতাংশ। তবে সেপ্টেম্বরে গড় মূল্যস্ফীতি ৫.৯৭ শতাংশ হলেও খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির হার (food inflation) ছিল ৬.৫০ শতাংশ।

বাংলাদেশের মানুষের ব্যয় নির্বাহের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মোট ব্যয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ খাদ্যসামগ্রীতে খরচ হয়। তবে নিম্ন আয়ের মানুষদের, যারা দারিদ্রসীমার নিচে বাস করে, আয়ের সিংহভাগই খাদ্য কিনতে খরচ হয়। তাই মুদ্রাস্ফীতি সব শ্রেণির মানুষের ওপর একই ধরনের অভিঘাত সৃষ্টি করে, এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। কারণ গরিব মানুষের কাছে চালের দাম ১০ শতাংশ বৃদ্ধি আর জামা-কাপড়ের দাম ১০ শতাংশ বৃদ্ধি এক অর্থ বহন করে না।

২ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখে আমেরিকা থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিন ‘পলিটিকো’তে প্রকাশিত এক রিপোর্টে বলা হয়, জেপি মর্গান, মুডি’স এবং আইএমএফ-এর এক যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে, পৃথিবীর বড় বড় অর্থনীতির দেশগুলো বর্তমান শক কাটিয়ে উঠে মহামারীপূর্ব অবস্থায় ফেরত যেতে (যদি করোনার দ্বিতীয় ঢেউ প্রকট হয়ে না আসে) ২০২১ সালের শেষ নাগাদ লেগে যেতে পারে। আর সেটা সত্য হলে কর্মসংস্থান, আয়স্তর, ক্রয়ক্ষমতা, মুদ্রাস্ফীতি- এই সূচকগুলোর নিম্নগামীতা ঐসব দেশের অর্থনীতিকে মহামন্দার দুষ্টচক্রের মধ্যে ফেলে দিতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য মোটেই স্বস্তি বয়ে আনবে না।

বৈশ্বিক অর্থনীতির এমন আশঙ্কাজনক পূর্বাভাসের মধ্যে আমাদের দেশে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির দামস্তরের এই হঠাৎ উল্লফন কিন্তু ভিন্ন ইঙ্গিত দেয়। কারণ, তথ্যমতে দামস্তর বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হতে পারে সামগ্রিক অভ্যন্তরীণ চাহিদার (Aggregate internal Demand) বৃদ্ধি পাওয়া, যা এই মন্দাবস্থায় অনেকটাই কাক্সিক্ষত।

এখানে বলে রাখা দরকার, অর্থনীতিতে দামস্তর বৃদ্ধির মোটা দাগে দুটি কারণ থাকতে পারে- বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থার ঘাটতি অথবা মানুষের আয় বেড়ে যাওয়া। বাংলাদেশের বাজারে এই মুহূর্তে সবুজ শাকসবজি ছাড়া (শীতকালীন সবজি এখনো যেহেতু বাজারে আসেনি) নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সরবরাহে তেমন একটা ঘাটতি রয়েছে বলে মনে হয় না। কারণ, মহামারীকালে আমাদের কৃষি তথা গ্রামীণ অর্থনীতি সেভাবে আক্রান্ত হয়নি, যা অত্যন্ত সুখের বিষয়। সত্যি বলতে কি, করোনাকালে এই গ্রামীণ অর্থনীতিই এখন পর্যন্ত আমাদের জাতীয় অর্থনীতির ভিত্তিকে টিকিয়ে রাখতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। তাছাড়া টানা তিন মাস (এপ্রিল থেকে জুন) আমদানি (রপ্তানিসহ) স্থবির থাকার পর জুলাই থেকে আবার ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করেছে, যা এখন অনেকটাই স্বাভাবিক। সুতরাং দেশীয় বা বিদেশি উৎস হতে প্রাপ্ত পণ্যসামগ্রীর সরবরাহ ব্যবস্থায় (supply chain) তেমন কোনো সমস্যা যে নেই, এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

অন্যদিকে আয়স্তর বৃদ্ধিকে দামস্তর বৃদ্ধির যৌক্তিক কারণ হিসেবে ধরে নিলে মানুষের আয় বৃদ্ধির সুস্পষ্ট কোনো আলামত কিন্তু দৃশ্যমান হচ্ছে না। এটা ঠিক যে জুন মাস থেকে লকডাউন খুলে দেওয়ার মতো সরকারের সাহসী সিদ্ধান্তের ফলে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকা- ধীরে ধীরে গতি পেতে শুরু করেছে। এর সঙ্গে সরকারের প্রণোদনার প্যাকেজের কারণে, বিশেষ করে গার্মেন্ট শিল্পকে কয়েক দফা আর্থিক সহায়তা প্রদান করায়, আমাদের অর্থনীতির সূচকগুলো প্রায় উলম্বভাবে (যাকে বলে V-shaped recovery) ফিরে আসছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। তারপরও এখনো অসংখ্য মানুষ তাদের হারানো কর্ম ফিরে পায়নি, অসংখ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এখনো তাদের স্বাভাবিক কর্মকা- শুরু করতে পারেনি। তাই বর্তমান বাস্তবতায় দামস্তর উল্লফনের কারণ হিসেবে আয়স্তর বৃদ্ধিকে কোনোভাবেই দায়ী করা যাচ্ছে না।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণ বিশ্লেষণে অর্থনীতিতে প্রচলিত তত্ত্বগুলো (সরবারহ কমে যাওয়া অথবা ভোক্তার আয় বেড়ে যাওয়া) তেমনভাবে কাজ করছে না। তাই সঙ্গত কারণেই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির জন্য আমাদেরকে তৃতীয় কোনো কারণ খুঁজতে হবে।

অনেকগুলো গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের দেশে বাজার ব্যবস্থার মধ্যে এক ধরনের মৌলিক ত্রুটি রয়েছে, যা মূলত ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা থেকে সৃষ্ট। এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী কর্তৃপক্ষের দুর্বল ব্যবস্থাপনা বা তদারকির সুযোগ নিয়ে নানা রকম কারসাজি করে পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দেয়। এটা আমরা সবাই জানি যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমাদের বাজার নিয়ন্ত্রিত হয় বড় বড় সিন্ডিকেট চক্রের মাধ্যমে, যাদের শক্তি আর বিত্তের কাছে অনেক সময় সরকার মহাশয়কেও হার মানতে হয়। সুযোগ পেলেই এই সিন্ডিকেট চক্র বাজারকে অস্থিশীল করে তোলে অতি মুনাফার আশায়। আর রাজনৈতিক এবং বাণিজ্যিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা সমীকরণের মধ্যে পড়ে সরকারও এই চক্র ভাঙতে পারে না, কি জানি, হয়তো ভাঙতে চায়ও না।

অথচ, সরকার চাইলে বাজার ব্যবস্থায় সিন্ডিকেটিং নামের এই দুর্বৃত্তায়ন সহজেই ভাঙতে পারে। তথ্যপ্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের এই যুগে ডিজিটাল পদ্ধতিতে বাজার তদারকি এবং নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতি মুহূর্তে বাজারের উঠা-নামা, গতি-প্রকৃতি, সরবরাহ-চাহিদার ঘাটতি (emand-supply gap)- সব কিছুর তথ্য পাওয়া সম্ভব। মাগুরার একটি পাইকারি বাজারে আজকের টমেটোর সরবরাহ পরিস্থিতি কি কিংবা কুড়িগ্রামে কাঁচামরিচের দাম কেমন তা মুহূর্তের মধ্যেই জেনে ফেলা সম্ভব। ঠিক একইভাবে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজের পাইকারি দামের সঙ্গে ঢাকার কাওরান বাজারের দাম তুলনা করে, কোনো কারসাজি হচ্ছে কিনা তার খবর মুহূর্তের মধ্যে পাওয়া সম্ভব। এখানে দরকার শুধু রাষ্ট্রযন্ত্রের একটুখানি আন্তরিকতা আর আধুনিক বাজার ব্যবস্থাপনায় দক্ষ কিছু জনবল এবং নীতিকাঠামো। মনে রাখা দরকার, বাজার ব্যবস্থাপনা একটি চলমান প্রক্রিয়া আর এর সঠিক বাস্তবায়নে সরকারকে অবশ্যই মনোযোগী হতে হবে। কারণ, মহামারীর এই দুর্যোগকালে কর্মহীন, কড়িহীন অসহায় মানুষের কাছে ন্যায্যমূল্যে খাবার পৌঁছে দেওয়ার থেকে বড় কাজ সরকারের দ্বিতীয়টি আছে বলে মনে হয় না।

জাতিসংঘের সেই উপ-সেক্রেটারি-জেনারেল আমিনা জে মোহাম্মদের আরও একটি উদ্ধৃৃতি দিয়ে লেখাটি শেষ করবো- “আমরা একটি ভয়ানক মানব সঙ্কটের মুখোমুখি হয়েছি, আমাদের সামাজিক বুনন ও সংহতি চাপের মধ্যে রয়েছে।” তাই আমাদের সবার উচিত ভয়াবহ এই মানব সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আরও বেশি মানবিক হওয়া। সরকারের পাশাপাশি আমাদের ব্যবসায়ী মহলও এই সত্যটি উপলব্ধি করবে সেই প্রত্যাশাই করছি।

মোহাম্মদ কামরুজ্জামান : ব্যাংকার ও কলাম লেখক
kzamanabbl@gmail.com