রাজনীতি থেকে আদর্শ কত দূর!

ঢাকা, শনিবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২০ | ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

রাজনীতি থেকে আদর্শ কত দূর!

মোহাম্মদ নজাবত আলী ১১:৩০ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২১, ২০২০

print
রাজনীতি থেকে আদর্শ কত দূর!

কবি হেলাল হাফিজ বলেছেন, এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার সময় তার। মূলত যুব তরুণ সমাজই দেশ জাতির অগ্রগতির উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ তারুণ্য শক্তির ধ্বংস নেই, বিনাশ নেই। কিন্তু এই যৌবনের অধিকারী তরুণ যুব বা ছাত্রসমাজ যখন রাজনীতিতে আদর্শের বলি দিয়ে নীতিহীন অপরাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে তখন যুব সমাজের মধ্যে দেখা দেয় নানা অনাচার, অসঙ্গতি, নানা অবক্ষয় যেটা জাতির জন্য বড়ই দুর্ভাগ্য যে শক্তি ও সাহস কর্ম উদ্দীপনা দেশ জাতির কল্যাণে নিবেদিত হওয়ার পরিবর্তে তারা এখন বিপথগামী।

ছাত্ররাই দেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধার। তারাই একদিন দেশকে নেতৃত্ব দেবে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখবে। এ জন্য তাদেরকে সুস্থ পথে সঠিক পথে থাকতে হয়। দেশের উন্নতি, অবনতি, তাদের বিভিন্ন কার্যকলাপের ওপর নির্ভরশীল। তারা যদি নিজেদের প্রকৃত নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারে, দেশের নানা অন্যায়, অবিচার রোধ করতে পারবে। এজন্য তাদেরকে অবশ্যই সচেতন ও দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হতে হবে তাদের ভাবতে হবে এদেশটি তারাই নেতৃত্ব দেবে, এগিয়ে নিয়ে যাবে সামনের দিকে। উন্নতির দিকে, প্রগতির দিকে, শান্তির দিকে। সমাজ জীবনে নানা ধরনের অন্যায়, অবিচার, ঘুষ, দুর্নীতির বিরদ্ধে তাদের প্রতিবাদী হতে হয়। কিন্তু তারা যদি নিজেরাই নানা ধরনের অপকর্মে লিপ্ত হয় তাহলে সেটা হবে জাতির জন্য বড় দুর্ভাগ্য ও হতাশাব্যঞ্জক। ইংরেজিতে একটি কথা আছে, Truth is beauty, beauty is truth অর্থাৎ সত্যই সুন্দর, সুন্দরই সত্য।

এ কারণে একজন ছাত্রকে সভ্যতার পথে সত্য, ন্যায়ের পথে থেকে জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি দেশ ও জাতির সেবায় মনোনিবেশ করতে হয়। কারণ একদিন তারাই দেশের নেতৃত্ব দেবে। আবার মহাত্মা গান্ধী বলেছেন, The Students are the future leaders of the country who could a fulfill countries hopes being capable. কিন্তু বর্তমান ছাত্রসমাজ বিভিন্ন দল উপদলে বিভক্ত। মূল দলের অঙ্গ সহযোগী সংগঠন হিসেবেও নানা কারণে ছাত্রসমাজ আজ বিপদগ্রস্ত, বিতর্কিত। যার কারণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দলীয় রাজনীতিতে একটি পরিচ্ছন্ন ভাব ধারা গড়ে তোলার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন।

অথচ একটি সমাজের বৃহৎ অংশ যুব সমাজ। তারা অমিত শক্তির অধিকারী। কেননা আজকের তরুণরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। যুব সমাজের ভিতর যে শক্তি সাহস লুকিয়ে ছিল তার বিস্ফোরণ ঘটে ৫২ থেকে ৭১’এ। এজন্য যুব সমাজকে নিয়ে অনেক কবি সাহিত্যিক অনেক আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তাদের নিয়ে অনেক গান কবিতা লেখা হয়েছে। বিশ^ কবি বলেছেন, ‘ওরে নবীন ওরে আমার কাঁচা আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা...চির যুবা, তুই চিরজীবী জীর্ণ জরা ঝরিয়ে দিয়ে প্রাণ অপুরান ছাড়িয়ে দেদার দিবি।’ সুতরাং আজকের যুব সমাজের মধ্যে যে শক্তি সাহস রয়েছে কবি গুরু তার কবিতায় তাদের স্তুতি গেয়েছেন। শুধু যদি সুষ্ঠু পরিকল্পনার মধ্যে দিয়ে তাদেরকে সঠিকভাবে দিক নির্দেশনা দিতে পারত তবে তারা দেশ ও জাতির কল্যাণে বিশেষ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হতো। কিন্তু বিভিন্ন কারণে তারা যেমন বিপথগামী হচ্ছে যার কারণে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে, চরম মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটছে। একাধিক কারণগুলোর মধ্যে রাজনীতি অন্যতম। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া বিপুল সংখ্যক তরুণ যুবকরা কোন কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ায় নষ্ট রাজনীতির চোরাবালিতে পা দিয়ে তাদের সোনালী ভবিষ্যৎ অন্ধকারে নিমজ্জিত হচ্ছে। অথচ এক সময় ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত তরুণ যুবকরা ছিল আমাদের সূর্য সন্তান। ৫২-৭১ পরবর্তীকালে ৯০ দশক পর্যন্ত এসমস্ত যুবকদের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়।

৯০ দশকের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে তরুণ ছাত্র সমাজের ভূমিকা ছিল দেশ জাতির স্বার্থে। তারা নিজের জীবন বিপন্ন করে হলেও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে তারা ছিল নিবেদিত। মূলত ৯০ দশকের পর থেকে তরুণ ছাত্র সমাজের মধ্যে অনুপ্রবেশ ঘটে নানামুখী নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়। এসময় থেকে তারা তাদের মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে তারা হয় বিপথগামী। এজন্য তরুণ যুবক বা ছাত্র সমাজ, শিক্ষিত, অশিক্ষিত ছাত্র, যুবকরা রাজনীতির নামে রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ আধিপত্য বিস্তার টেন্ডারবাজি সহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। যে যুব সমাজের চোখে ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্ন দেশ জাতির গৌরব তরুণ যুব সমাজ আজ বিপথগামী। রাজনীতির আড়ালে যুব সমাজের চরম অবক্ষয়, পথভ্রষ্ট।

একটি শিশু যেমন আগামী দিনের ভবিষ্যৎ তেমনি আজকের যুবসমাজ সমৃদ্ধ দেশ জাতি গঠনে মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি যেখানে চারিদিকে বিভিন্ন সমস্যা নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র দৃশ্যমান। এ অবক্ষয় থেকে যুবসমাজও রক্ষা পাচ্ছে না। যুবসমাজ আজ পথভ্রষ্ট হয়ে রাজনীতির নামে ধ্বংসের দিকে ক্রমান্বয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। বেকারত্ব, সন্ত্রাস, অপরাজনীতির নেতিবাচক প্রভাবে তারা সুস্থ জীবনের পরিবর্তে অসুস্থ জীবনযাপন তথা অবক্ষয়ের চরম সীমানায়। ইংরেজিতে একটি কথা আছে, Youth is the best period life অর্থাৎ যৌবনকাল হচ্ছে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় আর এই যৌবনকাল বলতে সাধারণত তরুণ যুব সমাজকেই বোঝানো হয়। এ সময়টা হচ্ছে নিজের জীবন গড়া ও ভবিষ্যৎ স্বপ্ন সম্ভাবনা পূরণের সময়। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য যে এ জীবন থেকে তারা আজ অনেক দূরে। বিভিন্ন লোভ লালসার বশবর্তী হয়ে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে। সৎ আদর্শভিত্তিক জীবনযাপন থেকে বিচ্যুত হয়ে আদর্শের নামে মিথ্যাচার, রাজনীতির নামে অপরাজনীতি, জনসেবার নামে ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে আজকের যুবসমাজ। নীতি নৈতিকতা ভুলে গিয়ে রাজনীতির নামে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। কিছু সংখ্যক বড় বড় নেতাদের নাম ভাঙিয়ে বিভিন্ন অপকর্মে লিপ্ত হচ্ছে যা আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ। অর্থের লোভে টেন্ডারের টাকা ভাগাভাগি, আধিপত্য বিস্তারের নামে যুবসমাজের অবক্ষয় আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের শুদ্ধি অভিযানের রাজনীতির নামে, দলবাজির নামে নানা বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে যুব তথা ছাত্রসমাজ।

আমি আগেই উল্লেখ করেছি, ছাত্র তরুণ যুবসমাজের মধ্যে যে অস্থিরতা নৈতিক অবক্ষয়ের জন্ম নিয়েছে এজন্য বর্তমান রাজনীতি কম দায়ী নয়। সুন্দর সুস্থ রাজনীতির বিপরীতে যখন কোনো রাষ্ট্রে অসুস্থ রাজনীতির বীজ দানা বাঁধে তখন সার্বিক দিক থেকে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সমাজের ওপর। আর আমাদের সমাজেরই একটি বড় অংশ তরুণ যুবসমাজ। যারা বিভিন্ন কলেজ বিশ^বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। আর এ সমস্ত কলেজ বিশ^বিদ্যালয়গুলোকে বলা হয় মানুষ গড়ার কারখানা। অথচ দেশের শীর্ষ বিদ্যাপীঠগুলো যেন তরুণ প্রজন্মের নৈতিক অধঃপতন সন্ত্রাসের কারখানা। রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়ে তরুণরা অরাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। পড়াশোনা শেষ করে নিজস্ব মেধা মনন দিয়ে পরবর্তী জীবনে নিজের জীবন যেমন গড়ে তুলবে তেমনি দেশের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করবে। কিন্তু বর্তমান রাজনীতিতে তরুণ ছাত্র যুবসমাজের অবক্ষয়ের মধ্যে দেখা দিয়েছে সামাজিক অবক্ষয়। ফলে তারা নানা ধরনের অপরাধ করে চলেছে অবাধে। রাজনীতির চক্রান্তে পড়ে তারা ক্রমান্বয়ে বড় বড় মাস্তান সন্ত্রাসীতে পরিণত হচ্ছে যা দেশ ও জাতির জন্য বিপজ্জনক। সুস্থ সমাজ নির্মাণের পরিবর্তে অসুস্থ সমাজ নির্মাণের শক্তিতে পরিণত হচ্ছে যা নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, শঙ্কার কারণ একই সঙ্গে দুঃখজনক। সাম্প্রতিককালে রাজনীতির নামে এভাবে তরুণ প্রজন্ম নিজেদের নিঃশেষ করে দিচ্ছে।

মানুষ সামাজিক জীব। অর্থাৎ মানুষ নিয়েই সমাজ গঠিত। সামাজিক জীব হিসাবে সমাজকে সামনের দিতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সমাজকে গতিশীল করবে তরুণ প্রজন্ম আজকের যুবসমাজ। কারণ তারুণ্যশক্তির কোনো ধ্বংস নেই বিনাশ নেই। তারা অফুরন্ত প্রাণশক্তির অধিকারী। কিন্তু তারা আজ বিভ্রান্ত বিপথগামী। তাদের মধ্যে একধরনের হতাশা লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে বেকার যুবকরা কোনো কর্ম না পেয়ে ভবঘুরে জীবনযাপন করে। প্রয়োজনীয় অর্থ না পেয়ে তারা অসৎ পথে টাকা উপার্জনে নামে। তখন তারা বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজ করতেও দ্বিধা করে না। আবার অনেক সময় জীবনের প্রতি প্রচণ্ড ঘৃনা ও ক্ষোভের জন্ম নেয়। তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে ভিড়ে গিয়ে নেশা জাতীয় দ্রব্যে আসক্ত হয়ে পড়ে। ফলে তাদের বিবেক লোপ পায়। মানসিক দিক থেকে অসুস্থ হয়ে পড়ে। আর এ অসুস্থ মানসিকতা বিভিন্ন অপরাধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যুবসমাজের অধঃপতন ঘটে। যুব সমাজের অবক্ষয় খুবই মারাত্মক।

বিশ্বাস, অবিশ্বাস, আস্থাহীনতা, দ্বন্দ্ব সংঘাত, প্রতিহিংসার রাজনীতির কারণেই বিভিন্ন অপরাধের জন্ম হয়। অর্থাৎ আমি বলতে চাচ্ছি এর ফলে রাজনীতি হয়েছে কলুষিত। এ রাজনীতিতে তারুণ্য শক্তির অবক্ষয় দেখা দিয়েছে। দেশের বড় বড় কলেজ বিশ^বিদ্যালয় আজ সন্ত্রাসের আখড়া। অথচ বিশ^বিদ্যালয় হচ্ছে জাতি গঠনের কারখানা। সৃজনশীলতার বিকাশ, জাতির জীবনীশক্তি বৃদ্ধি, মেধা মনন, জ্ঞান অর্জনের তীর্থভূমি কলেজ বিশ^বিদ্যালয়গুলো। কিন্তু সেখানে আমরা কি দেখছি? ছাত্রসমাজ রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন সন্ত্রাসমূলক কর্মকাণ্ড ঘটাচ্ছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার পরিবেশ বিনষ্ট হয়। অভিভাবকরা সমসময় এক ধরনের আতঙ্কের মধ্যে থাকেন। নষ্ট রাজনীতিতে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞান অর্জনের তীর্থভূমির বিপরীতে কুরুক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। আর সাধারণ মেধাবী তরুণ ছাত্ররা রাজনীতির যাঁতাকলে নিষ্পেষিত হচ্ছে। তাদের শিক্ষা জীবন স্থবির হয়ে পড়ছে। এভাবে দিনের পর দিন মাসের পর মাস বছরের পর বছর রাজনীতির আড়ালে তরুণ ছাত্র যুবসমাজের জীবন বিপন্ন হচ্ছে। বুয়েট ও সিলেটের ঘটনায় তার বড় প্রমাণ।

এ নেতিবাচক রাজনীতির হাত থেকে তরুণ যুব সমাজকে রক্ষা করতে হলে প্রয়োজন সুস্থ ধারার রাজনীতি। সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ। আর রাজনৈতিক নেতাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য হওয়া উচিত তরুণ ছাত্র ও যুবসমাজকে রাজনীতির স্বার্থে ব্যবহার না করা। তাদের দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখা। রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা। তাহলে কিছুটা হলেও যুবসমাজ বিপথগামী থেকে রক্ষা পাবে। অবক্ষয় থেকে মুক্তি পাবে।

মোহাম্মদ নজাবত আলী : শিক্ষক ও লেখক