টাকার মালিক মালেক ও দুর্নীতির রসায়ন

ঢাকা, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২০ | ৫ কার্তিক ১৪২৭

টাকার মালিক মালেক ও দুর্নীতির রসায়ন

হাসনাত মোবারক ১০:৪৬ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২০

print
টাকার মালিক মালেক ও দুর্নীতির রসায়ন

যে দেশে দর্শনের চেয়ে গালির কদর বেশি সে দেশে পিয়ন, ড্রাইভার, কেরানি আর চাপরাশিরা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেবে এটাই তো স্বাভাবিক। বলা হয়ে থাকে, শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড! আসলে এ দেশে তো শিক্ষাই নেই। মেরুদ- থাকবে কীভাবে! যে দেশের মানুষের শিক্ষার প্রথম টার্গেট রুজি-রোজগার। সে দেশের মানুষের কাছে সেবার আশা করাটাও বোকামি। বিদ্যাশিক্ষার প্রাথমিক ধাপে যারা নিয়োজিত আছেন, এদের কাজটিই সবচেয়ে শ্রমসাধ্য বলে মনে হয়। দুদিন আগে বিশ্ববিদ্যলয়পড়ুয়া এক ছোট বোন বলল, ভাইয়া, ২ ঘণ্টা টিউশনি করি মাথার ব্যথা থাকে ৪ ঘণ্টা।

দায়ে ঠেকেই বেশিরভাগ ছেলেমেয়ে ছোট ছোট বাচ্চাদের পড়াই। আর দ্বিতীয়টি হল, এ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সুযোগ সুবিধাই কম। যদিও বাজারে প্রচলিত আছে, তুলনামূলকভাবে কম মেধাবীরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হন। এটাকে আমি গ্রাহ্য করি না। যে ব্যাপারটিকে মোটাদাগে উপস্থাপন করা দরকার সেটা হলো শ্রম অসন্তোষ। সবচেয়ে শ্রমসাধ্য কাজ, অল্প মজুরি সেই সেই পেশাতেই নিয়োজিত হওয়ার জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ দিতে হচ্ছে! অর্থাৎ কুঁড়িতেই তারা দুর্নীতির সঙ্গে পরিচয় হচ্ছে। আর এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের কথা তো ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না! 

সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি। এমন একটা সেক্টর নেই সেখানে দুর্নীতি নেই। এজন্যই নীরদচন্দ্র চৌধুরী ‘আত্মঘাতী বাঙালী’ গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছিলেন, ‘আজ বাঙালি জীবনে যে জিনিসটা প্রকৃতপক্ষেই ভয়াবহ সেটা এই : মৃত্যুযন্ত্রণারও অনুভূতি নাই; আছে হয় পাষাণ হইয়া মুখ বুজিয়া সহ্য করা; অথবা সংজ্ঞাহীন হইয়া প্রাণ মাত্র রাখা।’ নীরদ বাবু ঠিকই বলেছেন।

একের পর একটা টপিক এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে মাত করে রাখছে। এতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চাপা পড়ে যাচ্ছে। এমন কিছু টপিক ভাইরাল হয়, যেগুলোতে আমাদের জাতীয় চরিত্রেরও একটা বহিঃপ্রকাশ ঘটে। রুচিবোধের মাপকাঠিও হয়ে দাঁড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। তবে বেশ গুরুত্বপূর্ণ কাজও হয়ে থাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। বিশেষ করে সরকারের কতিপয় উচ্চপদস্থ আমলাদের কাণ্ডজ্ঞানহীনতার খবর প্রকাশ পেলে হয়! সেটা নিয়ে ধুয়ে দেয়। সম্প্রতি খিচুড়ি কাহিনি তো দেখলাম। এটা সামাজিক যোগাযোগের ভালো দিক।

সম্প্রতি আলোচিত টপিক স্বাস্থ্য অধিদফতরের ডিজির গাড়ি চালক আব্দুল মালেক। শত কোটি টাকার মালিক মালেক। টাকার মালিক আব্দুল মালেক। দুর্নীতির কালো বেড়ালটি বেড়িয়ে আসার পর তাকে বা তাদের নিয়ে নানান ট্রল, গালমন্দ, আরও কত কত কেচ্ছায় মেতে উঠি। অথচ ওই দুর্নীতিবাজ মানুষটি আমার আপনার পৃষ্ঠপোষকতায় ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান গড়েছে। সেই অর্থে আমরাই বেশি দায়ী। সেক্ষেত্রে মালেক ড্রাইভারদের অপরাধের চেয়ে আমাদের অপরাধটা বেশি। কেননা আমরাই এসব ড্রাইভার চাপরাশিদের গড়ে তুলেছি। ড্রাইভার পেশাটিকে ছোট করছি না। পেশার প্রতি সম্মান জানিয়েই বলছি। একজন সরকারি অফিসের ড্রাইভার বা অফিস সহকারী যখন সামজিক অনুষ্ঠানে গিয়ে একজন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তার চেয়ে বেশি টাকা দান করে। তখন আমরা কিছুই বলি না। সাদরে গ্রহণ করি।

এমনকি ওই চাপরাশিদের আসনও দিই। নিজে দেখেছি, এসব দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষকে নিয়ে সামাজিকভাবে আলোচনা করা হয়। আমি যেহেতু ৬১টি জেলার বিভিন্ন উপজেলার গ্রামে-গঞ্জে গিয়েছি। চায়ের দোকানে, মুদিখানার দোকানে, সেলুনে বসে আড্ডা দিয়েছি। গ্রামের কে কত টাকার মালিক এসব নিয়ে আলোচনা করতে শুনেছি। খুব কম শুনেছি, অমুকে একটা ভালো কাজ করেছে। অমুক রাস্তায় দশটি গাছ লাগিয়েছে। একটা বাঁশের সাঁকো তৈরি করে দিয়েছে মানুষ পারাপারের জন্য। এসব ভালো মানুষ যে দেশে নেই, তা কিন্তু অস্বীকার করছি না। এ ভালো কাজ করা মানুষদের নিয়ে আলোচনা বা এই ভালো কাজের প্রতি সম্মান নিদর্শন করা খুব কম হয়। বলতে শুনেছি অনেক বাবার মুখ থেকে। তার ছেলে এত টাকা বেতন পায় আর উপরি ইনকাম এত। এবার ঈদে সে একে একে এই পরিমাণ উপহার দিয়েছে। আমার নাতির স্কুলের মাসিক বেতন এই পরিমাণ। এতটুকুও লজ্জা করে না ওই বাবার। তার ছেলের যে টাকা মাসিক বেতন, তার চেয়ে বেশি মাইনে নাতির স্কুলে দিতে হয়। এসব কথা আবার বলে বেড়ায়! লোক সমাজে এসব কথা যখন বলা হয়। আমরা সেগুলো টলারেট করি। এমনকি বিয়ের বাজারেও এসব কথা বলা হয়। আমার ছেলের এত টাকা মাসিক বেতন আর উপরিতে এত! আর আমরাও সেটাতে সায় দিই। গদগদ করে বিয়ে দিয়ে দিই। প্রতিবাদহীনতা। মেনে নেওয়া। পরিবর্তনটা দরকার রুট পর্যায় থেকে।

এদের সামাজিকভাবে হেয় করা হয় না। যাতে করে এসব দালাল, চোর, বাটপাড়দের শেকড় এখন সমস্ত শরীরে আঁকড়ে ধরেছে। আসলে সত্যি কথা বলতে কী, এসব দুর্নীতির সংবাদ দেখলে আসলে হাসি পায়। কেননা এই দুর্নীতিবাজরা তো আপনাকে আমাকেই দিয়ে দুর্নীতির পাহাড় গড়ে তুলছে। তারা তো অন্য কোথাও গিয়ে দুর্নীতি করে না বাংলাদেশে ফেরে না। তাদের দুর্নীতির চারণভূমি প্রিয় স্বদেশ। বরং এ স্বদেশের বুক থেকেই দুর্নীতি, চুরি, ঘুষের মাধ্যমে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা সংগ্রহ করে পশ্চিমের দেশে গিয়ে মাথা ঠুকে পাপটুকু ঝেড়ে ফেলে আসে। এটাই তো তাদের বদ্ধমূল ধারণা। রাজা পরশুরাম যেমন পাপ করে করতোয়া নদীতে স্নান সেরে পাপমুক্ত হতেন। তেমনি এ সময়ের দুর্নীতিবাজদের পাপমুক্ত হওয়ার মাধ্যম হিসেবে ধরে নেয়, তীর্থভূমিতে গিয়ে মাথা ঠুকলেই হলো!

দুর্নীতির ক্ষেত্রে যখন বলা হয়, জিরো টলারেন্স। ব্যাপারটিতে আমার মনে সংশয় জাগে। যে দেশের প্রত্যেকটি সেক্টরে দুর্নীতির ভূত ঢুকে পড়ছে, কীভাবে সম্ভব! ঘুষ, সুদ, দুর্নীতিবাজ বা খারাপ প্রবৃত্তির মানুষদের দখলে প্রায় সব সামাজিক প্রতিষ্ঠান।

সামাজিক মূল্যবোধের এমন অবক্ষয় ঘটছে। যেটা অনুমান করে তল পাওয়া যাবে না। সাধারণত বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা বা সৎভাবে জীবিকা চালিয়ে মানুষ খেয়ে পড়ে বাঁচে। এই তো। একটা সময় ছিল এই সৎ মানুষজন সামাজিকভাবে গুরুত্ব পেতেন। এখনো যে ভালো মানুষ সমাজে নেই। সেটা কিন্তু আমি বলছি না। সৎ মানুষদের সামাজিক স্থানটি যেমন মহল্লার সভাপতি বা সমিতির সেক্রেটারি এগুলোতে ওই চোর-বাটপাড় বা ঘুষখোর ও সুদখোরদের দখলে। এজন্য সমাজের মধ্যে নীতি নৈতিকতার বালাই খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আপনারা এখন আমাকে প্রশ্ন করুন। দুর্নীতিবাজদের নিয়ে তো সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিবাদের ঝড় তোলা হয়। তরুণ সমাজ বেশ সরগরম। তাই তো! এসব প্রশ্নই তো? আহারে! প্রতিবাদটা তো আপনারা ধরা পড়ার পর করছেন। একজন আব্দুল মালেক দুর্নীতিবাজ হয়ে দীর্ঘকাল সমাজে দাপিয়ে বেড়িয়েছে। এমনও তো হতে পারে, মহাপরিচালকের কাছে পৌঁছানোর মাধ্যম হিসেবে ওই চালক মালেকদের আপনারাই ব্যবহার করেছেন।

মালেক ড্রাইভারদের যারা ব্যবহার করেছেন, সিঁড়ি হিসেবে তাদের বিচারও হওয়া উচিত। আর এমন নয় যে দেশে এমন কাণ্ড এবারই প্রথম! অতীতেও এমন ঘটেছে। ভবিষ্যতেও আরও ঘটবে। কেন হবে? এর পেছনে শক্তিশালী যুক্তি- বিচারহীনতা। আর যারা দুর্নীতি করে ধরা খায় এদের লজ্জা-শরম নেই। যদি এমন হতো, দুর্নীতিবাজদের সঙ্গে মানুষ আত্মীয়তা বন্ধ করে দিত। সামাজিকভাবে বয়কট করা হতো। তা তো করি না। আমাদের দয়ার শরীর। চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের নাম গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয় না। এসব দুর্নীতিবাজের বুকে নেমপ্লেট থাকে না। তাহলে কীভাবে দুর্নীতি কমবে! বলেন?

হাসনাত মোবারক : কবি ও প্রাবন্ধিক