আলীবাবা ও চল্লিশ চোর!

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২০ | ১২ কার্তিক ১৪২৭

আলীবাবা ও চল্লিশ চোর!

কাজী সুলতানুল আরেফিন ১০:৩৬ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২০

print
আলীবাবা ও চল্লিশ চোর!

আমজনতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ইঁদুরের মতো কুটি কুটি করে কেটে দেশকে ছিদ্র করে দিচ্ছে কিছু দুর্নীতিবাজ। সেই সঙ্গে নিজেদের অবৈধ কারবারের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে কিছু কারবারি। এরা দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা, অবৈধ মাদক এবং সিন্ডিকেট ব্যবসায়ী। এদের একটিই উদ্দেশ্য- ‘যত পারো লুটে নাও!’

বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বেশি দুর্নীতি হচ্ছে। এটা সেটা কেনার নামে যে বিল করা হয় তা মাঝে মাঝে প্রকাশ হয়ে পড়ে। আর এসব ভুতুড়ে বিলের অঙ্ক দেখে মানুষের চোখ কপালে ওঠে। দেশের টাকা লুট হতে দেখে মানুষ শুধু হায় হায় করে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ দফতরের পিয়ন, কেরানি, ড্রাইভারের সম্পদ যেন রূপকথার গল্পকেও হার মানায়।

মাদক কারবারিরা দেশের আনাচেকানাচে আক্রান্ত করছে সমাজ। মাদকের পাশাপাশি সাম্রাজ্য বিস্তার করছে নানা উপায়ে। এর মধ্যে জুয়ার আসর ও পতিতালয় অন্যতম। এরা আবার যখন তখন ক্ষমতার দাপটও দেখায়! একশ্রেণির সিন্ডিকেট ব্যবসায়ী সামান্য অজুহাতে জিনিসের দাম বাড়িয়ে দেয়। এরা রাতারাতি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়িয়ে আকাশচুম্বী করে ফেলে। এসব সিন্ডিকেটের কাছে সাধারণ মানুষ আজ অসহায়। এর মধ্যে পেঁয়াজ নিয়ে প্রতি বছরই এমন নাটক হয়। রমজান এলেও একই চিত্র দেখা যায়। কিন্তু এসব সিন্ডিকেটের কিছুই হয় না!

দেশ এবং সমাজের অনিষ্টকারী এসব বদ মানুষের একটাই উদ্দেশ্য, ধনবান হওয়া। এদের চাহিদা মিটবার নয়। এ সমস্ত দুর্নীতিবাজের অসংখ্য বাড়ি, গাড়ি থাকে। এদের কেউ কেউ বিদেশেও সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে। দুর্নীতিবাজের সংখ্যা অনেক। এ দুর্নীতির জন্য সরকারের কোনো দোষ দিই না। কোনোকালেই এ দেশে দুর্নীতি আর দুর্নীতিবাজ কম ছিল না! অসংখ্য নীতিহীন মানুষের কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। দুর্নীতির টাকা বিদেশে পাচার হয়। শত শত কোটি টাকা পাচার হয়। হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়।

দুর্নীতি আর টাকা পাচারের এসব নিউজ দেখি আর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ি। বেশি দুর্নীতি হচ্ছে প্রকল্পের জিনিসপত্র কিনতে গিয়ে। দামের চেয়ে দশগুণ বেশি মূল্য দেখিয়ে অসৎ কর্মকর্তারা হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। আবার কিছু অবৈধ কারবারি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলে মিশে যায় শুধু ধান্দা করার জন্য! এসব চিত্রই এখন ফুটে উঠেছে। ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে ছবি তুলে তা ঝুলিয়ে রেখে অবৈধ কারবার চালানো হয়! বালিশ তুলা থেকে পর্দা ঝোলানো। কয়লাখেকো থেকে ধানের বীজখেকোর আবির্ভাব হয়েছে দেশে।

করোনা নিয়ে পজিটিভ-নেগেটিভ বাণিজ্য চলেছে। যেকোনো উপায়ে হোক এদের পেট ভরাতে হবে। আমরা দেখেছি এসব দুর্নীতিবাজের পেটের কোনো দৈর্ঘ্য, প্রস্থ বা গভীরতা নেই। তাই এদের ক্ষুধাও নিবারণ হওয়ার নয়। লুটে নিচ্ছে সব। চুষে নিচ্ছে সব। এদের থামানো যাচ্ছে না। কবে শান্ত হবে এ দেশের দুর্নীতিবাজ আর অবৈধ কারবারিরা? কত টাকা চায় এসব দুর্নীতিবাজ মানবরা? আর কত টাকা পাচার হবে দেশ থেকে!

দুর্নীতিবাজদের কাছে কত টাকা! কোটি টাকা নয়, শত শত কোটি টাকা। সব টাকা দুর্নীতিবাজ আর অবৈধ কারবারিদের কাছে। এ যেন টাকার পাহাড়, সম্পদের হিমালয়! রাখার জায়গা হচ্ছে না। সিন্ধুকভর্তি টাকা। রাখার ভয়ে আবার রাস্তাঘাটেও ফেলে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে এদের টাকা দিয়ে সারা দেশ ঢেকে দেওয়া যাবে। অথচ সামান্য কয়েকটি টাকার জন্য এই দেশে কত জীবনের হাহাকার তার হিসাব নেই।

আমার মতো মধ্যবিত্তের কাছে এক কোটি টাকা স্বপ্নের মতো! সারা জীবনে কয়েক লাখ টাকা একসঙ্গে দেখতে পাব কিনা সন্দেহ আছে। অথচ দেশে অবৈধ কারবারি আর দুর্নীতিবাজদের অফিস আর বাসাতেই নগদে মেলে কোটি কোটি টাকা। নামে-বেনামে ব্যাংকে কত আছে তার ধারণাই করা যায় না! প্রশ্ন হচ্ছে এদের চাহিদা কত? কত হলে এরা সন্তুষ্ট হবে? তার কোনো সীমানা আছে?

আরব্য রজনী উপন্যাসের আলী বাবাকে সৎ লোক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। তিনি চোরের জিনিস চুরি করেছিলেন। তাই নিজেও চোরের কাতারেই পড়েছিলেন। দেশেও এখন হয়েছে এই একই অবস্থা! চোরেও চুরি করছে। আবার চোরের জিনিসও আবার অন্য কোনো চোর চুরি করছে। আমরা এ করোনাকালে সরকারি চাল চোরও দেখেছি। পৃথিবীর ক্রান্তিলগ্নে যখন প্রায় সব মন্দ কাজ থেমে আছে ঠিক তখন দেশে চুরি বেড়েছে। ধরা পড়ছে অসংখ্য চাল চোর। এই চোরদের মধ্যে বেশিরভাগই জনপ্রতিনিধি। যারা কিনা আবার সাধারণের চারিত্রিক সনদ ইস্যু করে থাকেন। কিংবা বিভিন্ন প্রয়োজনে সাধারণদের স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন। কিছু চোর আবার পদ-পদবিতেও আছে। বড় মাপের কিছু চোর আবার করোনা নিয়েও বাণিজ্য করেছে।

এমন চিত্র দেখে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের আংশিক কানে বাজছে। ‘পশ্চিম পাকিস্তান সব সম্পদ নিয়ে চলে গেছে, আর আমার জন্য চোরগুলোকে রেখে গেছে’! কতটুকু আক্ষেপ থেকে বঙ্গবন্ধু আরও বলেছিলেন, ‘খুঁজে খুঁজে এই দেশের ডাকাতগুলোকে বের করতে হবে, খুঁজে খুঁজে এই দেশের দুর্নীতিবাজগুলোকে বের করতে হবে, খুঁজে খুঁজে এই দেশের দানবগুলোকে বের করতে হবে।’

বঙ্গবন্ধু জানতেন এ দেশে কিছু দানব আছে। দেশের ক্রান্তিলগ্নে যারা সরকারি চাল চুরি করে তারা আসলেই দানব। তাদের মধ্যে মনুষ্যত্ব নেই। সামাজিক মাধ্যমে রীতিমতো ঝড় উঠেছে চাল চোরদের নিয়ে। কেউ কেউ বলছে, দেশে করোনা রোগীর চেয়েও চাল চোরের সংখ্যা বেশি! আসলে দেশে অসৎ মানুষ যেমন আছে সৎ মানুষও আছে। তবে সৎ মানুষগুলো তেমন সুযোগ পান না প্রতিনিধিত্ব করার। আজ দেশের এমন চিত্রের পেছনের কারণ ভাবার সময় এসেছে। নৈতিক অবক্ষয় হওয়া এসব লোকদের সরাতে হবে দ্রুত। শুধু সরিয়ে ক্ষান্ত হলে চলবে না।

আইনি শাস্তি নিশ্চিত করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। আর প্রতিনিধি নির্বাচনের সৎ লোকদের অগ্রাধিকার দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। সুযোগ পেলেই চুরি করা। সুযোগ পেলেই লুটে নেওয়ার দৃশ্য আজ আলীবাবা ও চল্লিশ চোরের কাহিনিকেও যেন হার মানাচ্ছে! এই বিপদের দিনেও এসব চুরির কাহিনি আলীবাবা ও চল্লিশ চোরের কাহিনির মতো মানুষের মুখে মুখে রসের খোরাক জোগাচ্ছে।

সকল দুর্নীতিবাজই এক একজন চোর! এ মুজিব বর্ষে এ সমস্ত অবৈধ কারবারি, সিন্ডিকেট এবং দুর্নীতিবাজ চোরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে সরকারের ইমেজ আরও উজ্জ্বল করা হোক। মুজিব বর্ষেই এদের পতন চাই।

কাজী সুলতানুল আরেফিন : কথাসাহিত্যিক, ফেনী