মনুষ্যত্ব অর্জনের চর্চা প্রয়োজন

ঢাকা, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২০ | ১০ কার্তিক ১৪২৭

মনুষ্যত্ব অর্জনের চর্চা প্রয়োজন

হাসনা হেনা ১:০৯ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২০

print
মনুষ্যত্ব অর্জনের চর্চা প্রয়োজন

মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের কারণ হলো তার মনুষ্যত্ব, মানবিকবোধ সম্পন্ন বিবেক ও বুদ্ধি। আমরা জানি শিক্ষা মানুষকে মানবিকবোধ সম্পন্ন জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করে। কিন্তু আমাদের দেশের সামাজিক প্রেক্ষাপট অন্য কিছু বলছে। আমাদের দেশে শিক্ষিত মানুষের অভাব নেই কিন্তু সুশিক্ষায় শিক্ষিত মানবিক মানুষের অভাব। বিভিন্ন সরকারি অফিস-আদালত, ব্যাংক , মন্ত্রণালয়, প্রশাসনিক ক্ষেত্রগুলোতে দুর্নীতিতে সয়লাব। আর এসব অন্যায়কারীরা সবাই বড় বড় ডিগ্রিদারী। বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজের অশিক্ষিত বা স্বল্প শিক্ষিতদের চেয়ে উচ্চশিক্ষিতদের অপরাধের পাল্লা ভারি। এদেরকে কী আদৌ শিক্ষিত বলা যায়? দেশ ও জাতি এসব শিক্ষিতদের কাছ থেকে কতটুকুই বা আশা করতে পারে? আসলে একজন মানুষ শিক্ষিত হওয়ার চেয়েও ভালো মানুষ হওয়া খুব বেশি প্রয়োজন। কথায় আছে, দুর্জন বিদ্বান হলেও পরিত্যাজ্য। হার্বাট রিড বলেছেন, মানুষকে মানুষ করাই হলো শিক্ষা।

আসলে শিক্ষিত হয়েও মানুষ হতে না পারলে এ শিক্ষা মূল্যহীন। আদর্শ মনুষ্যত্ব অর্জনকেই শিক্ষা বলে অভিহিত করেছেন দার্শনিক কান্ট। একটি সমাজের ইতিবাচক বিকাশের জন্য প্রয়োজন আদর্শ ও মনুষ্যত্ব বোধসম্পন্ন মানুষের। একটি উন্নয়নশীল দেশের পূর্বশর্ত নৈতিকতা ও মূল্যবোধসম্পন্ন মানবসম্পদ। দেশে শিক্ষিত মানবসম্পদ তৈরি হচ্ছে, কিন্তু নৈতিক, মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষিত মানুষ তৈরি হচ্ছে খুব কম। বাংলাদেশে পুঁথিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার হার বাড়ছে। তবে সুশিক্ষার প্রসার হচ্ছে না। 

হযরত মোহাম্মদ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সর্বশক্তিমান আল্লাহকে বিশ্বাস করে এবং মানুষকে ভালোবাসে, সে প্রকৃত মুসলমান।’ অর্থাৎ এমন এক মানুষের কথা বলা হয়েছে, যার অন্তরে থাকবে পরস্পরের প্রতি স্নেহ, ভালোবাসা ও আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস। হিন্দুধর্মের অন্যতম প্রধান পুরুষ স্বামী বিবেকানন্দ বলে গেছেন, ‘জীবে প্রেম করে যেইজন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।’ অর্থাৎ তার মতে প্রাণ মাত্রই ঈশ্বরের সমতুল্য। কিন্তু বর্তমান মানবসমাজের অমানবিক পরিস্থিতি তার বিপরীত চিত্র দেখাচ্ছে।

শিক্ষিত হওয়া আর মনুষ্যত্ব অর্জন করা এক কথা নয়, দুটো সম্পূর্ণই ভিন্ন। আমরা পরিশ্রমের মাধ্যমে বড় বড় ডিগ্রি অর্জন করতে পারছি তবে মনুষ্যত্ব অর্জন করতে পারছি না। মানুষই একমাত্র জীব যার মনুষ্যত্ব অর্জনের জন্য চর্চার প্রয়োজন হয়। মনুষ্যত্ব অর্জনের চর্চাটাই আমাদের সমাজে তথা পরিবারে নেই। আমাদের সমাজের বেশিরভাগ মানুষের চিন্তা-ভাবনাই উচ্চবিলাসী। শিক্ষিত হয়ে বড় বড় ডিগ্রি অর্জন করে বড় কোনো অফিসার, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখি আমরা।

আমাদের শিক্ষিত হওয়ার উদ্দেশ্যও এমনটাই। আসলে আমরা বাবা, মায়েরা পরিবার থেকেই আমাদের শিশুদের মনে এমন একটা স্বপ্নের বীজ বপন করে দিচ্ছি। ভাবতেই অবাক লাগে আমরা নিজ হাতে আমাদের সন্তানদেরকে টাকা উপার্জনের মেশিন হিসেবে তৈরি করতে মরিয়া হয়ে ছুটছি কিন্তু তাদের মানবিক শিক্ষার দিকে নজর দিচ্ছি না।

আপনি যদি ৫০ জন শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করেন- তুমি বড় হয়ে কী হতে চাও ? উত্তরে হয়তো ৪৭ জনই বলবে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা সরকারি বড় অফিসার হতে চাই। দুঃখের বিষয় হলো হয়তো একজনও বলবে না আমি শিক্ষিত হয়ে একজন ভালো মানুষ হতে চাই। একবার ভেবে দেখুন আমরা বড় বড় ডিগ্রি অর্জন করে সেবামূলক বিভিন্ন পেশায় জড়াচ্ছি ঠিকই, কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য সে পেশাকে আমরা টাকা উপার্জনের পথ হিসেবেই নিচ্ছি।

পৌরনীতির ভাষায় পরিবারকে বলা হয় ‘মানবিক গুণাবলি অর্জনের প্রথম শিক্ষাগার।’ নৈতিক ও মানবিক গুণাবলি বিকাশে পরিবারের ভূমিকাই প্রধান। কারণ পরিবারের মধ্যেই এসবের বীজ প্রোথিত হয়। পারিবারিক বন্ধনই নৈতিকতা ও মূল্যবোধ গড়ে তুলতে পারে। একজন শিশুর জীবনে সবচেয়ে বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো তার পরিবার। যেখানে বাবা-মা, পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন প্রত্যেক সদস্যই শিক্ষকের ভূমিকা পালন করে। তাই শিশুদের নৈতিকভাবে বিকশিত করতে হলে পরিবারের সদস্যদের নৈতিক গুণাবলিসম্পন্ন হওয়া খুবই জরুরি।

মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার হচ্ছে শিক্ষা। এ শিক্ষাক্ষেত্রেও ইতোমধ্যে বাংলাদেশের দৃশ্যমান সাফল্য চোখে পড়ার মতোই। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে দেশে সাক্ষরতার হার প্রায় ৭৪ শতাংশ। শিক্ষায় নারী-পুরুষের সমতা অর্জনেও বাংলাদেশ অনেকটাই এগিয়েছে। শিক্ষা অবকাঠামোতেও বেশ উন্নতি সাধিত হয়েছে। উচ্চশিক্ষার কথা বলতে গেলে বলতে হয়- ইউজিসির ওয়েবসাইট বলছে, বর্তমানে দেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৪৬, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১০৬ এবং আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় ৩টি। সরকারি পর্যায়ে মেডিকেল কলেজ আছে ৩০টি এবং বেসরকারি মেডিকেল কলেজের সংখ্যা ৬৫। এ পরিসংখ্যান থেকে দেশে শিক্ষাক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

বাবা-মায়ের পরই ছেলেমেয়েরা শিক্ষকদেরই তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ জন হিসেবে বিবেচনা করে। তাই শিক্ষার্থীদের নৈতিক, মানবিক ও সামাজিক বিকাশ ঘটাতে হলে প্রথমে শিক্ষকদের নৈতিক, মানবিক ও সামাজিক গুণাবলি ধারণ ও লালন করতে হবে। শিক্ষার্থীদের নৈতিক, মানবিক ও সামাজিক বিকাশ ঘটাতে হলে সকল স্তরের শিক্ষাক্রমে নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ সংক্রান্ত বিষয়াদি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

একটি উন্নয়নশীল দেশের পূর্বশর্ত হলো নৈতিকতা ও মূল্যবোধসম্পন্ন মানবসম্পদ। দেশে শিক্ষিত মানবসম্পদ তৈরি হচ্ছে সন্দেহ নেই; কিন্তু নৈতিক, মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষিত মানুষ তৈরি হচ্ছে না। ফলে নাড়িছেঁড়া ধন সন্তানের হাতে পিতা-মাতা হত্যার মতো ঘটনাও হরহামেশাই ঘটছে। নৈতিক ও মানবিক বোধ বিবেচনা বর্জিত কোমলমতি শিশু, কিশোর ও যুবসমাজ জড়িয়ে পড়ছে মাদকাসক্তি, জঙ্গিবাদ, খুন, ধর্ষণের মতো মারাত্মক নানা অপরাধমূলক কাজে। পেশাজীবী ও কর্মজীবী মানুষ নির্দ্বিধায় ঘুষ-দুর্নীতির মতো অনৈতিক কাজে জড়িয়ে যাচ্ছে। তাদের অনৈতিক কাজের ফল হিসেবে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বিশ্ববাসী বাংলাদেশকে চিনছে। বর্তমান সমাজে সুশিক্ষার অভাবে মানুষ হয়ে উঠেছে আত্মকেন্দ্রিক।

তারা সর্বদাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। তারা নিজের চিন্তায় এতটাই মগ্ন যে, জন্মদাতা পিতা-মাতার সুখ-দুঃখ নিয়ে চিন্তা করার সময় তাদের থাকে না। মানুষের এ স্বার্থান্বেষী রূপ ক্রমেই নিজের আত্মীয়-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। অনেক সময় দেখা যায় উচ্চশিক্ষিত, উচ্চপদস্থ চাকরিজীবি সন্তানের বাবা, মায়েররও স্থান হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে, এটা সত্যিই দুঃখজনক। নিজেকে প্রকৃত মানুষরূপে গড়ে তুলতে হলে সর্বপ্রথম নিজের ভেতরের মনুষ্যত্বকে জাগ্রত করতে হবে। অন্তরচেতনাকে জাগ্রত করতে হবে। শুধু পুঁথিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার হার বাড়লেই হবে না। সুশিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। সুশিক্ষা হলো সেই শিক্ষা, যে শিক্ষা মানুষকে নৈতিক, মানবিক ও নীতিনিষ্ঠ মূল্যবোধ সম্পন্ন করে তোলে। মানুষকে মিথ্যা, অন্যায় ও অসৎ পথ পরিহার করতে শেখায়। মিথ্যা পরিহার করে সত্যের আবিষ্কারই প্রকৃত শিক্ষা। এজন্য যথার্থই বলা হয়, শিক্ষা ও নৈতিকতা মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, একটা ছাড়া আরেকটা অসম্পূর্ণ। নৈতিকতা ও মানবিক গুণাবলি বর্জিত শিক্ষা কুশিক্ষারই নামান্তর। আর এ কুশিক্ষা মানুষকে পশুর চেয়েও অধম করে দেয়।

‘অন্ধকার আর অবক্ষয়ই একমাত্র সত্য নয়
সত্যের আলো অতি-সন্নিকটেই রয়’

আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অন্যায় পরিহার করে, সত্যের পালে জোর হাওয়া দেবে, আমরা সেভাবেই ওদের তৈরি করতে চেষ্টা করতে হবে। একদিন এ পৃথিবীকে নতুন রূপে, নতুন চিন্তা-চেতনায়, সত্যিকারের মনুষ্যত্বে ভরিয়ে তুলবে ওরাই। এ জন্য চাই প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত প্রজন্ম। চাই ঘরে ঘরে মনুষ্যত্বের চর্চা। চাই মনুষ্যত্বের জাগরণ।

হাসনা হেনা : শিক্ষক ও লেখক, শ্রীপুর, গাজীপুর
hasnahenaliza1999@gmail.com