তৈরি পোশাক শিল্প ও অর্থনীতি

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২০ | ৭ কার্তিক ১৪২৭

তৈরি পোশাক শিল্প ও অর্থনীতি

রনি সরকার ১:২৭ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২০

print
তৈরি পোশাক শিল্প ও অর্থনীতি

তৈরি পোশাক শিল্প ও রেমিট্যান্স খাত জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। দেশের অর্থনীতিকে অত্যন্ত প্রাণবন্ত করতে পোশাক শিল্প ও রেমিট্যান্স খাতের কোনো বিকল্প নেই। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করতে উক্ত খাত দুটিই অন্যতম। যেকোনো দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা নিঃসংকোচে সে দেশের শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বের অন্যতম উন্নত দেশগুলো অত্যন্ত শিল্পনির্ভর। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হলেও এখানে শিল্পের গুরুত্ব অপরিসীম। আর এক্ষেত্রে গার্মেন্ট শিল্প ও রেমিট্যান্স খাতের অবদান একেবারেই অনস্বীকার্য। ইতোমধ্যেই সারা বিশ্বে পোশাক শিল্পে বাংলাদেশ বেশ সুখ্যাতি অর্জন করেছে।

এদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বাণিজ্যে এক গুরুত্ববহ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। বিপুল অংকের বৈদেশিক আয়ের উৎস ও লক্ষাধিক বেকারত্বের ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে যাওয়া এ শিল্প ধীরে ধীরে আমাদের গর্ব, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। অসংখ্য পোশাকের পেছনে সেঁটে দেওয়া Made in Bangladesh ট্যাগটি দেশের জন্য শুধু গর্বই বয়ে আনেনি, বরং গোটা বিশ্বে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং ভ্যালু প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। দেশীয় কর্মসংস্থানের প্রায় ৬৫ শতাংশ ও বৈদেশিক আয়ের প্রায় ৮১ শতাংশ অর্জিত হয় এই শিল্পের মাধ্যমে। তৈরি পোশাক শিল্পের কারণে এদেশে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৫০ লক্ষ বেকারের। যার মধ্যে ৮০ শতাংশ নারী। বাংলাদেশ বিদেশে সর্বপ্রথম পোশাক রপ্তানি শুরু করে ১৯৭৮ সালে, যার মাঝে ছিল সুতি কাপড়, বোনা কাপড় ও শীতবস্ত্র। পরবর্তী প্রায় দুই দশকে দেশের এই শিল্পখাত বিস্ময়করভাবে উন্নতি লাভ করে। ১৯৮১ সালে এই খাতের আয় ছিল প্রায় ৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যেটি ২০০৭ অর্থবছরে বৃদ্ধি পেয়ে হয় ১০ দশমিক ৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। 

বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্ব করোনাভাইরাস সংক্রমণজনিত কারণে বিশাল সংকটের মধ্যে আছে। ফলে, গার্মেন্ট খাত বেশ কিছুদিন বন্ধ থাকায় শ্রমিকরা কাজ করতে পারেননি। যার প্রভাব দেশের অর্থনীতির ওপর সরাসরি আঘাত হেনেছে। উৎপাদন অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে বেশ কিছু পরিকল্পনা প্রয়োজন। যা পোশাক শ্রমিকের স্বাস্থ্য সুরক্ষাসহ সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। ফ্যাক্টরিগুলোতে শ্রমিকদের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব অব্যশই বজায় রাখতে হবে। সেই সঙ্গে পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা ও শ্রমিকরা যাতে ২/১ ঘণ্টা পর পর হাত ধুয়ে নিতে পারে সে ব্যবস্থা রাখতে হবে। লাঞ্চ পিরিয়ড পৃথক করে দিতে হবে। একসঙ্গে কোনোভাবেই সবাইকে বের হতে দেওয়া যাবে না। এই নিয়মগুলো মানা একেবারেই অত্যাবশ্যকীয়।

যতদিন পর্যন্ত করোনাভাইরাস সংক্রমণ স্বাভাবিক না হয়। অন্যথায়, রোগটি ভয়ানক আকারে ছড়িয়ে পড়বে, তাহলে আবার পোশাক শিল্প স্থবির হয়ে যাবে। মালিকদের স্বার্থেই এই নীতিমালার বাস্তবায়ন দরকার। আমরা আশা করি, কর্তৃপক্ষ যথাযথ সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করেই গার্মেন্টগুলো চালু রাখবে এবং সুরক্ষার বিষয়ে কোনো ছাড় দেবে না। তারা অবশ্যই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সরকারের দিক নির্দেশনার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটাবেন। তবে বিষয়টি শুধু মালিকশ্রেণির হাতে ন্যস্ত করলেই চলবে না। শ্রমিকদের নিরাপত্তা, উৎপাদন সচল রাখা ও সার্বিক সুরক্ষার বিষয় চিন্তা করে উৎপাদনে যাওয়া গার্মেন্টগুলো নিয়মিত তদারকির আওতায় আনতে হবে। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা শিল্প পুলিশকেই নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, গার্মেন্টে আমাদের দেশের প্রায় ৪৫ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। দেশের রপ্তানির প্রায় ৮০ ভাগই এ শিল্পের অবদান।

সুতরাং বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সামান্য শিথিলতা এ শিল্পের জন্য ভয়ানক পরিণতির কারণ হতে পারে। সেই সঙ্গে, করোনা পরিস্থিতির প্রভাবে আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে। পরিবর্তিত পরিবেশে তৈরি পোশাক শিল্পের যথেষ্ট উন্নয়ন ঘটাতে আরও কিছু বিষয়ের প্রতি গুরুত্বারোপ করতে হবে।

প্রথমত, এটি অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, তৈরি পোশাক শিল্পের কারণে পুরো পৃথিবীতে বাংলাদেশের একটি ব্র্যান্ড ভ্যালু তৈরি হয়েছে। তবে এটাও সত্য, প্রযুক্তিগত দিক থেকে বাংলাদেশ এখনো স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় বেশিরভাগ ভারী যন্ত্রপাতি এখনো বিদেশ থেকে নিয়ে আসতে হয়। সেগুলোকে কাজের জন্য সঠিক উপায়ে প্রস্তুত করতে গেলেও দেশীয় প্রকৌশলীদের অনেক ক্ষেত্রে হিমশিম খেতে হয়। অর্থাৎ, তৈরি পোশাক শিল্প যতটা প্রযুক্তিবান্ধব হওয়ার কথা ছিল এই সুদীর্ঘ সময়ে ততটা বাস্তবে হয়নি।

এটি দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের অন্যতম বড় একটি সীমাবদ্ধতা। তাই তৈরি পোশাক শিল্পকে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তিগত দিক থেকেও অগ্রগামী হতে হবে এবং প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে এই শিল্পের যথেষ্ট উন্নয়ন সাধিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কর্মীদের বেতন-ভাতা বাড়াতে হবে এবং অংকটা অবশ্যই জাতীয় দারিদ্র্যসীমার চেয়ে বেশি হতে হবে। তৃতীয়ত, কর্মীদের বেতন বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত হতে হবে। চতুর্থত, কর্মক্ষেত্রে যথাযথ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। পঞ্চমত, দুর্ঘটনার জন্য দায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। ষষ্ঠত, বিভিন্ন দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে আর্থিকভাবে সহায়তা করে যেতে হবে। আশাজাগানিয়া এ খাতে সরকারকে অবশ্যই সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

অর্থনীতির জীবনীশক্তি রেমিট্যান্স খাতে। বিশ্ব পরিসরে বাংলাদেশ ছোট দেশ হলেও সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক বিভিন্ন সূচকে অভাবনীয় সাফল্য অর্জনের মাধ্যমে পুরো বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্ববাসীর কাছে এক দুর্দান্ত অনুপ্রেরণার নাম। দেশের এই অর্থনীতির অগ্রযাত্রা যে কয়টি খাতের ওপর নির্ভরশীল, তার মধ্যে অন্যতম প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। তারা উপার্জিত অর্থ দেশে পাঠাচ্ছে। তাদের পাঠানো এ অর্থকে বলে রেমিট্যান্স। রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় দেশের অর্থনীতির চাকাকে অত্যন্ত প্রাণবন্ত করে রেখেছে। দেশের মোট জিডিপিতে রেমিট্যান্সের অবদান ১৩ শতাংশের মতো। প্রবাসীদের কষ্টার্জিত রেমিট্যান্সের ফলে বর্তমান ব্যাংকে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে ১৭৪টি দেশে প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিচরণ।

বিশেষ করে, মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি প্রবাসীদের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২৪ লাখ। মধ্যপ্রাচ্যে রয়েছে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি, তাদের সংখ্যা প্রায় ১ দশমিক ২ মিলিয়ন। এ ছাড়াও অন্যান্য দেশে প্রবাসীদের বসবাস রয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর অল্পসংখ্যক প্রবাসী রপ্তানির মাধ্যমে এই যাত্রা শুরু হয়, যা ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯৭৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে সীমিত আকারে যাওয়া প্রবাসীদের সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ৮৭ জন। এখন ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের ভাষ্য অনুসারে, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে ৮-৯ লাখ মানুষ বিভিন্ন দেশে যায়। এসব রেমিট্যান্স ফাইটাররা বছরে ১৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠায়, যা স্থানীয় মুদ্রায় ১ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা এবং দেশের মোট রপ্তানি আয়ের অর্ধেকের বেশি। এ বিশাল সংখ্যক রেমিট্যান্স ফাইটাররা দিনরাত পরিশ্রম করে শুধু পরিবারের অন্নের সুব্যবস্থা করেননি, বরং সচল ও চাঙ্গা রেখেছে দেশের অর্থনীতির চাকাও। সম্প্রতি আমরা লক্ষ করেছি, এক সৌদি প্রবাসী তার পরিবারের চাহিদা মেটাতে নিজের জীবনবাজি রেখে গত ১ বছরে শুধু ডালভর্তা খেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করেছে।

২০১৫ সালে প্রবাসীরা ১ লাখ ৩০ হাজার ২৯৪ দশমিক ৬১ কোটি টাকা পাঠিয়েছে দেশে। এটি দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দাঁড়ায় ১৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলারে। করোনার এ দুঃসময়ে ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রবাসীরা রের্কড সংখ্যক রেমিট্যান্স পাঠায়, যার পরিমাণ ১ হাজার ৮২০ কোটি ৩০ লাখ, যা ২০১৮-১৯ অর্থবছরের চেয়ে ১০ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেশি। আবার বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে অবৈধ চ্যানেলে ডলারের চাহিদা কিছুটা কমেছে।

এরকম পরিস্থিতিতে সামগ্রিকভাবে প্রবাসীরা খারাপ অবস্থায় থাকলেও ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স বাড়ছে। দেশের এই জীবনীশক্তি চাঙ্গা রাখার জন্য রেমিট্যান্স ফাইটারদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে গুরুত্বারোপ করতে হবে। যেমন- প্রবাসীদের ভোগান্তি দূর করে গোড়া থেকে কাজ করতে হবে এবং প্রবাস সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। সাধারণ মানুষ যাতে দালাল চক্রের ফাঁদে না পড়ে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। সাধারণ লোকদের বিদেশ পাঠানোর নামে মানব পাচারকারীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি দিতে হবে।

দালাল চক্র নির্মূলে সর্বদাই সচেতন থাকতে হবে। প্রবাসীদের জন্য পর্যাপ্ত ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের শ্রমশক্তিকে দক্ষ শ্রমশক্তিতে রূপান্তর করার লক্ষ্যে কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। রেমিট্যান্স প্রবাহ ঠিক রাখতে দক্ষ শ্রমিকদের অগ্রাধিকার প্রদান করতে হবে। রেমিট্যান্স ফাইটার হিসেবে তাদের সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। বিমানবন্দরে ভোগান্তি দূরীকরণসহ অভিবাসন ব্যয় কমাতে হবে। দূতাবাসগুলোকে স্বদেশি ও স্বজনপ্রীতি মনোভাব নিয়ে কাজ করতে হবে। দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে রেমিট্যান্স ফাইটারদের স্বদেশি স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে।

রনি সরকার : শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর
ronysarker11111@gmail.com