ধ্বংসের পথে মৃৎশিল্প

ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২০ | ১৪ কার্তিক ১৪২৭

ধ্বংসের পথে মৃৎশিল্প

জয়নুল আবেদীন স্বপন ১:২৪ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২০

print
ধ্বংসের পথে মৃৎশিল্প

ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্পের মধ্যে মৃৎশিল্প উল্লেখযোগ্য। বর্তমান সময়ে মাটির জিনিসের ব্যবহার কমে যাওয়ায় মৃৎশিল্পের কারিগররা পেটের দায়ে অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত হচ্ছে। কিছু কিছু কারিগর বংশপরম্পরায় এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছে। সিলভার, প্লাস্টিক, মেলামাইন সামগ্রীর উৎপাদন ও ব্যবহারের কারণে মৃৎশিল্প চরম হুমকির সম্মুখীন। বর্তমানে যারা এ পেশায় আছেন তাদের সন্তানদের মধ্যে মৃৎশিল্পী হওয়ার আগ্রহ কম। তারা লেখাপড়া শিখে অন্য পেশা গ্রহণ করতে চায়। আয়ের পরিমাণ কমে আসায় কুমাররা অন্য পেশা গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছে।

একসময় কুমারখালির তৈরি মৃৎশিল্পের সুনাম ছিল দেশব্যাপী। মৃৎশিল্পের জন্য গাজীপুরও এক সময় বিখ্যাত ছিল। গাজীপুরে হাজার হাজার শিল্প কারখানা গড়ে ওঠায় মৃৎশিল্পের কাঁচামাল এঁটেল ও দোঁআশ মাটি সংগ্রহ করতে কুমারদের বেশি টাকা খরচ করতে হয়। মাটির অভাব থাকায় বেশি টাকায় কারিগররা মাটি কিনতে চান না। প্লাস্টিক ও পলিথিনের বর্জ্যে মাটি দূষণ বেড়ে যাওয়ায় মৃৎশিল্পের প্রধান উপকরণ পরিষ্কার এঁটেল মাটি সংগ্রহ করা কঠিন। এঁটেল মাটি আঠাল বলে ছানা বানানো সহজ। সাদা মাটি দিয়েও শৌখিন সামগ্রী তৈরি হয়। কুমার সম্প্রদায়ের বাইরেও অনেক মৃৎশিল্পী রয়েছে। কুমাররা মৃৎপাত্র তৈরির যে চাকা ব্যবহার করে তা নিজেরাই তৈরি করেন। মেয়েরাও কাজে সহযোগিতা করে।

আগে ঘরে ঘরে নানা তৈজসপত্র ছিল মাটির তৈরি। এক সময় কুমাররা কেবল গৃহস্থালির ব্যবহার্য মৃৎপাত্র তৈরি করত। মাটির হাঁড়ি, পাতিল, সরা, কলস, সানকি, গামলা, বাটি, টব, মুড়ি বানানোর ঝাঁঝর, জলকান্দা, ঘড়া, মাটির ব্যাংক ইত্যাদি নিত্যব্যবহার্য জিনিস ছিল মাটির। মাটির মূর্তি ছাড়াও হাতি, ঘোড়া, বাঘ, সিংহ, হরিণ, মাছ, পুতুল, ফুলদানি, বিভিন্ন খেলনা সামগ্রীও মাটির তৈরি।

সহজে হাতের কাছে পাওয়া যায়। মাটির কলসের পানি সবসময় ঠা-া থাকে। এ পানির স্বাদ আলাদা। কম টাকা খরচ করে শৌখিন মধ্যবিত্তরা ঘর সাজানোর কাজে ব্যবহার করে মাটির জিনিস। বর্তমানে মাটির তৈরি শৌখিন সামগ্রী কম টাকায় বেশি ক্রয় করে মানুষ। বাঙালি জাতির ঐতিহ্য ও গর্বের মৃৎশিল্প বর্তমানে কুটির শিল্প হিসেবে গুরুত্ব লাভ করেছে।

বৈশাখী মেলা ও বিভিন্ন উৎসবে মাটির তৈরি শৌখিন জিনিস কিনতে মানুষ ভিড় করে। বর্তমানে পোষা পাখিদের বাসার জন্য মাটির পাত্র ব্যবহার হচ্ছে। এখানে পাখিরা স্বচ্ছন্দে বসবাস করে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পাখিদের বংশবৃদ্ধির জন্য গাছে গাছে হাজার হাজার পাত্র বেঁধে দিচ্ছে কিছু সচেতন মানুষ। আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প। বাপ দাদার পেশাকে ধরে আছে অনেক মৃৎশিল্পী। তাদের সাহস ও উৎসাহ জোগাতে হবে।

স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের জন্য প্লাস্টিক সামগ্রীর ব্যবহার বন্ধ করে মাটির তৈরি জিনিসপত্র ব্যবহার করা উচিত। প্লাস্টিক পণ্যে কোণঠাসা মৃৎশিল্প। ধ্বংসের পথে মৃৎশিল্পকে বাঁচাতে এখনই এগিয়ে আসতে হবে। পরিবেশবান্ধব মৃৎশিল্প গৌরবময় ঐতিহ্য। তরুণ উদ্যোক্তাদের এ পেশায় আগ্রহী করে তুলতে হবে। প্রয়োজনে এই শিল্পে আগ্রহীদের ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। মৃৎশিল্পের প্রশিক্ষণ চর্চা শুরু হোক আবার। নতুন করে মৃৎশিল্পের কদর দেশজুড়ে প্রসারিত হোক।

জয়নুল আবেদীন স্বপন : শিশুসাহিত্যিক। শ্রীপুর, গাজীপুর