কেন হতাশা, কেন আত্মহত্যা

ঢাকা, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২০ | ১০ কার্তিক ১৪২৭

কেন হতাশা, কেন আত্মহত্যা

সুনান বিন মাহাবুব ১০:১২ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২০

print
কেন হতাশা, কেন আত্মহত্যা

হতাশায় পড়ে আত্মহত্যা করছে বিশ্বের অনেক মানুষ। কেন এ হতাশা? সকল ধর্মেই হতাশাকে না বলা হয়েছে। হতাশা এবং ধৈর্যহীনতাকে ইসলামে বারণ করা হয়েছে। আমরা জীবনের প্রতি বিমুখ হয়ে অধিকাংশ সময় ভুল পথ বেছে নিই। মনের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার চিন্তা করি। আত্মহত্যা মানে হল নিজেকে হত্যা করা। নানাবিধ কষ্টে তরুণ থেকে বৃদ্ধ অধিকাংশ মানুষ নিজেকে হত্যা করছে। অথচ হতাশার সময়টুকু যদি একটু ধৈর্য ধরা যায় তাহলে এই জঘন্য কাজটি করতে হয় না। একটু গভীরভাবে ভাবলে পুরো ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে যাবে।

আপনি হঠাৎ করে কোনো একটি মানুষের কাছ থেকে কষ্ট পেলেন। কষ্ট পেয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেন। জীবন ভালো লাগছে না। মনকে সান্ত¡না দিত পারছেন না। অস্থির লাগছে। কী করবেন বুঝতে পারছেন না। এমন অবস্থায় যদি সঠিক পথ খুঁজে পান তাহলেই ভুল পথে পা বাড়াবেন না। সঠিক পথ খুঁজে না পেলে আপনি হয়তো আত্মহত্যা করবেন অথবা নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়বেন। প্রশ্ন হলো, তাহলে কী করব? মনকে তো সান্ত¡না দেওয়া যায় না। কষ্ট কি সেটি শুধু নিজের মন বুঝতে পারে। আমরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়া লোকজনের কাছ থেকে তখনই শুনি যখন তার কোনো উপায় থাকে না। পরিবারের কাছ থেকে কষ্ট পেয়েও ভেঙে পড়েছেন অথবা অন্য কোনো কারণে ভেঙে পড়েছেন এমন লোকজনের সংখ্যা বাংলাদেশেও বৃদ্ধি পাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় বর্তমানে এ ধরনের হতাশার বাক্যই বেশি দেখা যাচ্ছে। গত কয়েক মাসে বেড়েছে আত্মহত্যা, নির্যাতন, হতাশা। ব্যবসায় সফল না হয়ে হতাশায় ভুগে আত্মহত্যা করছে, প্রেমে সফল না হয়ে হতাশায় ভুগে আত্মহত্যা করছে, পারিবারিক কলহের জেরে আত্মহত্যা করছে। অথচ স্বাভাবিকভাবে চিন্তা করলে বোঝা যাবে, এ হতাশা সাময়িক। 

ব্যবসায় সফলতা পাননি। খুব খারাপ অবস্থা। কী করবেন, কোনো উপায় নেই। পরিবারের কারো কাছ থেকে সহযোগিতা নিতে পারছেন না। বন্ধু-বান্ধবী কাউকে পাচ্ছেন না। এমন অবস্থায় বেঁচে থাকার ইচ্ছে চলে গেছে। তাৎক্ষণিক মনের মধ্যে খুব কষ্ট হচ্ছে। সহ্য করতে পারছেন না।

কিন্তু এই সহ্য না করার ক্ষমতাটাই হতাশার জন্ম দেবে। হতাশা, অস্থিরতা কিছুদিন অথবা কিছুক্ষণের জন্য যদি আপনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন তাহলেই ভবিষ্যতে সমাধান পাবেন। কিন্তু যদি আত্মহত্যা অথবা জীবন নষ্ট করে ফেলেন তাহলে ভবিষ্যতে কী হবে দেখার সুযোগ পেলেন না!

আল কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আমি অবশ্যই তোমাদের কিছু না কিছু দিয়ে পরীক্ষায় ফেলবই: মাঝে মধ্যে তোমাদের বিপদের আতঙ্ক, ক্ষুধার কষ্ট দিয়ে, সম্পদ, জীবন, পণ্য-ফল-ফসল হারানোর মধ্য দিয়ে। আর যারা কষ্টের মধ্যেও ধৈর্য-নিষ্ঠার সঙ্গে চেষ্টা করে, তাদের সুখবর দাও।’ (আল-বাক্বারাহ : ১৫৫)।

সনাতন ধর্মে বলা হয়েছে, ‘যে কাজটিতে ব্যর্থ হবেন সেটি বারংবার চেষ্টা করুন নতুন করে নয়া উদ্যমে তৈরি করার। একদিন না একদিন আপনি সাফল্য পাবেনই।’

এখন প্রশ্ন আসতে পারে যে মনকে কীভাবে শান্ত রাখব? এখানে একটি কথাই বলার আছে। আপনি নেশা করলে মন শান্ত থাকবে না। অল্প সময়ের জন্য মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটবে। যার ফলে আপনি যে কোনো খারাপ কাজ করতে আগ্রহী হবেন। যে ব্যক্তির জন্য মনের চিন্তা বৃদ্ধি পেয়েছে সে আপনাকে খারাপ ভাববে।

এক্ষেত্রে আপনি যদি কষ্ট সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন তাহলে তো মরেই গেলেন! ভালো অথবা খারাপ যা-ই হোক জানতে হবে, যার জন্য কষ্ট পেলেন তার সমাধান কী? এই অবস্থায় যদি বন্ধু-বান্ধবীর সঙ্গে সময় কাটান সেটিও মানসিক চিন্তা থেকে দূরে রাখবে। সুহৃদদের বিভিন্ন কথায় মনকে চিন্তামুক্ত রাখতে পারবেন। তবে এতে হিতে বিপরীতও হয়। কারণ অনেক সময় বন্ধু-বান্ধবের প্ররোচনায় নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে চিন্তাগ্রস্ত ব্যক্তি। এক্ষেত্রে মুসলিম ধর্মের চিন্তাগ্রস্ত ব্যক্তি হলে সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হল নামাজ আদায়।

নামাজ আদায় করলে মনকে সান্ত¡না দিতে হবে না। আল্লাহ আপনার মনের মধ্যে প্রশান্তি এনে দেবে। প্রশ্ন হলো, নামাজ আদায় তো সবসময় করতে পারব না। তাহলে কীভাবে সারাক্ষণ মনের প্রশান্তিতে থাকব? উদাহরণস্বরূপ বলব, লেখকের জেলাধীন এক ব্যক্তি পারিবারিক কোনো একটি কারণে ২ মাস আগে প্রচ- রকম মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ব্যক্তি তাৎক্ষণিক লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্দেশ্যে। কিন্তু লেখক ভাবলেন ব্যবস্থা গ্রহণ করলে ভবিষ্যতে ভালো কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও সেটি এখন নষ্ট হয়ে যাবে। লেখক বললেন, আপনি ধৈর্য ধরেন। যেহেতু আপনি প্রাপ্তবয়স্ক তাই নেশা করে চিন্তা দূর না করে অন্য উপায়ে চিন্তা দূর করুন। এখন নামাজ আদায় করুন। নামাজ আদায় করে মনের অবস্থাটি আমাকে জানাবেন।

নামাজ আদায় শেষে হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তিটিকে জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান, মনের মধ্যে কিছুটা প্রশান্তি অনুভব করছেন। লেখক আরও বললেন, নিয়মিত নামাজ আদায় করতে থাকেন। দেখবেন হতাশা কেটেছে। যে কারণে হতাশা তার ভালো ফল আপনি ধৈর্য ধারণের ফলে পেয়ে যাবেন। ঠিক কিছুদিন পর তার পারিবারিক হতাশার সমাধান পেয়ে গেলেন।

তাই যে ধর্মেরই হোক হতাশাগ্রস্ত হয়ে ভেঙে পড়ার আগেই সেই ধর্মের নির্দেশ পালন করলে হতাশা কেটে যাবে। সমাজের কাছে প্রশ্ন করুন, আমরা কেন হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছি? কেন আত্মহত্যা করছি? মৃত্যুর মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান যদি হতো তাহলে দুনিয়াতে এলেন কেন! পৃথিবীতে এসেছেন যখন পৃথিবীর সমস্যাটি সমাধানের চেষ্টা করুন। মানুষের পথ অসীম। জীবনে শুধু একটি পথ খোলা থাকে না। বিকল্প কিছু সবার জীবনেই থাকে। যেটি খুঁজে বের করার মতো চিন্তা এবং চেষ্টা থাকা জরুরি। আপনাকে যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনি পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন বেঁচে থাকার জন্য।

যতদিন বেঁচে থাকবেন ততদিন স্রষ্টার কথা স্মরণ করে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। হতাশাগ্রস্ত হলে বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ দুটিই হারাবেন। হতাশা আপনাকে সামনে এগিয়ে যেতে দেবে না। হতাশায় ভেঙে না পড়ে হতাশা কীভাবে কাটিয়ে উঠবেন সেই পথ ভাবুন। ধর্মীয় পথ যদি আপনার কাছে শ্রেষ্ঠ মনে হয় তাহলে ধর্মীয় পথ অবলম্বন করুন। হতাশা ও আত্মহত্যা কোনো সমাধান নয়। এটা জীবনের সংকট সমাধানের পন্থা হতে পারে না।

সুনান বিন মাহাবুব : সাংবাদিক ও ছড়াকার
sunanptk0@gmail.com