বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নের কাণ্ডারি শেখ হাসিনা

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২০ | ১২ কার্তিক ১৪২৭

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নের কাণ্ডারি শেখ হাসিনা

মোতাহার হোসেন ১০:৫৩ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২০

print
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নের কাণ্ডারি শেখ হাসিনা

যুগে যুগে সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যতিক্রমী কিছু মানুষের বিরল উপস্থিতি এ পৃথিবীকে মহিমান্বিত করেছে। এ রকম একজন আলোকপ্রদীপ হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যার জন্ম না হলে হয়ত এখনো আমরা পরাধীন থাকতাম। বঙ্গবন্ধু একটি আবেগের নাম। বঙ্গবন্ধু একটি চেতনা, সর্বোপরি বঙ্গবন্ধু একটি আদর্শের নাম। তার কথা মনে হলেই আমরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি। কারণ বঙ্গবন্ধুর জীবন, তার কর্মস্পৃহা, তার দূরদর্শিতা আর দশজন মানুষের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। টুঙ্গিপাড়ার রাখাল রাজার জন্ম হয়েছিল পরাধীন জাতিকে মুক্ত ও স্বাধীনতা দিতে। এই লক্ষ্যে তিনি সুদূর প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে ছাত্রাবস্থায় আন্দোলন, সংগ্রাম শুরু করে ছিলেন। ধীরে ধীরে সমগ্র জাতিকে তার স্বপ্ন পূরণের সারথি করে, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়েছেন অভীষ্ট লক্ষ্যে। অন্যায়ের কাছে জেল-জুলুম, হুলিয়া, এমনকি মৃত্যু পরোয়ানার কাছেও মাথা নত করেননি জনগণের এ নেতা।

বঙ্গবন্ধু কখনো পাকিস্তানের নেতা বা মন্ত্রী হতে চাননি। তিনি রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই পাকিস্তানের অর্থনৈতিক শোষণ, বৈষম্য, নিপীড়ন, নির্যাতনের বিরুদ্ধে ছিলেন সোচ্চার এবং আপসহীন বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। তিনি বাঙালির স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক মুক্তি, বৈষম্য শোষণ থেকে মুক্তি চেয়েছেন। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে আন্দোলনের সূতিকাগার হিসেবে ছাত্রলীগ গঠন, পরবর্তীকালে বাঙালি জাতির ঐতিহাসিক মহান মুক্তি সনদ ৬ দফা, তারও পরে ১১ দফা দাবি আদায়ে রাজপথ থেকে গ্রাম প্রধান দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেঠোপথে দুর্বার ছাত্র গণআন্দোলন গড়ে তুলে তা ছড়িয়ে দেন দেশময়।

এই মহান লক্ষ্য অর্জনের আন্দোলনে সম্পৃক্ত হন দেশের আপামর ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক, চাকরিজীবী, খেটেখাওয়া মানুষসহ সর্বস্তরের মুক্তিকামী লাখো জনতা। বঙ্গবন্ধুর আপসহীন নেতৃত্বে ’৬৯ সালের গণআন্দোলন, ১৯৭০ সালের নির্বাচন, নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিজয়ী, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি, তালবাহানা, আলোচনার নামে প্রহসন, একদিকে বিজয়ী দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে লোক দেখানো আলোচনা, অন্যদিকে পূর্বপাকিস্তানের রাজধানী ঢাকাসহ বাংলার সব বিভাগীয় শহর, জেলা শহরে সৈন্য সমাবেশ ঘটানো, চট্টগ্রামে, ঢাকায় পাক সৈন্যদের হাতে আন্দোলনরত মানুষের ওপর নির্বিচারে গুলি বর্ষণ, মানুষ হত্যায় এক নরকে পরিণত হওয়ার পথে বাংলাদেশ। এমনি অবস্থায় বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আয়োজিত লাখো জনতার উপস্থিতিতে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণে কৌশলে স্বাধীনতা, মুক্তির জন্য মরণপণ আন্দোলনের আহ্বান করেন। পরোক্ষভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। মূলত সেদিন থেকে প্রশাসন, এ বাংলার শাসনভার, রাষ্ট্র পরিচালিত হয় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে। 

সুদীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অবশেষে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে ঠাঁই পায়। এ জন্য ত্রিশ লাখ শহীদ, দু’লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম, অযুত-নিযুত সম্পদের ক্ষতি হয়। যুদ্ধকালে পাকবাহিনী দেশের সকল রাস্তাঘাট, পুল, কালভার্ট, ব্রিজ, স্থাপনা ধ্বংস করে, ব্যাংক লুট করে। বাংলাদেশকে শ্মশানে পরিণত করে।

এমনি একরকম এক কঠিন পরিস্থিতিতে সরকার পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করতে হয়। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার ও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করতে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগকে। কিন্তু তখনও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগারে। সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত বাংলাদেশকে ধ্বংসস্তূপ থেকে ধীরে ধীরে উত্তরণে, উন্নয়নের চিন্তা করেন তিনি। পাকিস্তানের কারাগার থেকে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি মুক্ত পেয়ে মাটি আর মানুষ নিয়ে ভাবেন। স্বাধীনতার তিন বছর ৭ মাসের মধ্যে দেশকে অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী করে তুলেছিলেন দেশকে। এ কারণে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে তাকে জীবন দিতে হয়েছে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শুধু একজন মহান নেতাকে হত্যা করা হয়নি, পুরো বাঙালি জাতিকে হত্যার চেষ্টা হয়েছিল, স্বাধীনতাকে হত্যা করার অপচেষ্টা হয়েছে ফের কনফেডারেশন করে পাকিস্তানের তাঁবেদার হতে চেয়েছেন বঙ্গবন্ধুর খুনিচক্র। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ষড়যন্ত্রকারীদের সে স্বপ্ন আজ দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের কাছে উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর আজীবনের স্বপ্ন ক্ষুধামুক্ত, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণ, বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলা হতে যাচ্ছে। তবে ষড়যন্ত্র এখনো থেমে নেই।

বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের শুধু রাজনৈতিক মুক্তি নয়, অর্থনৈতিক মুক্তিও চেয়েছেন। তিনি তার সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই পাকিস্তানের শোষণের বিরোধিতা করেছেন। তিনি চেয়েছেন এ দেশের মানুষ উদ্যোক্তা হবে। এজন্য তিনি দেশ স্বাধীনের পর দ্রুত বিসিক গঠন করেন। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানে বিশ্বাস করতেন না। এজন্য তিনি সর্ব পাকিস্তানের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হননি। বঙ্গবন্ধুর মতো সৎ রাজনৈতিক নেতা পৃথিবীতে বিরল। তিনি সবসময় দেশ ও মানুষের কথা ভাবতেন। আইয়ুব খান তাকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি। ১৯৪৭ থেকে ধীরে ধীরে বাংলার মানুষকে একত্র করেছেন। দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করেছেন। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের জিয়াউর রহমান পুরস্কার হিসেবে বিদেশে চাকরি দিয়েছেন।

খালেদা জিয়া সংসদে বসিয়েছেন। জিয়া-খালেদা জিয়া স্বাধীনতাবিরোধীদের হাতে মুক্তিযুদ্ধের সময় শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তে রঞ্জিত স্বাধীনতার পতাকা তুলে দেন। এরপর ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা তারাই করেছে। ১৫ আগস্ট ও ২১ আগস্ট একই সূত্রে গাঁথা। একটা গোষ্ঠী চেয়েছে বাংলাদেশ হবে অনুন্নত দেশের মডেল। কিন্তু শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মডেল হয়েছে। বঙ্গবন্ধু প্রসারিত চিন্তা ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। দেশ স্বাধীনের পরে বৈদেশিক মুদ্রা ছিল না। বিনিময়ের মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানি হতো। তখনই তিনি রপ্তানি বহুমুখীকরণের চিন্তা করতেন। নিরাপদ দেয়াশলাই, বৈদ্যুতিক তার, মধু কীভাবে রপ্তানি করা যায় সে বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে সকল পাটকল জাতীয়করণ করলেও পরিচালনায় আগের মালিক ও কর্মীদের রেখেছিলেন। পরে বাংলাদেশিদের মালিকানার পাটকল বেসরকারি খাতে ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে আশির দশকেই বাংলাদেশ আজকের অবস্থানে চলে যেত।

শুধু ভৌগোলিক স্বাধীনতা নয় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে বাঙালি জাতির মুক্তি চেয়েছেন। কিন্তু তিনি তা সমসয়ের অভাবে করতে পারেননি। এখন তারই সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দুর্নীতি দমন, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দেশ সেদিকেই যাচ্ছে। এটি ভুলে গেলে চলবে না, বঙ্গবন্ধুর কারণে আজকের বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পরবর্তী ২১ বছরে কিছু মানুষ, কিছু স্বাধীনতাবিরোধী কুচক্রী বাংলাদেশকে পেছনে ঠেলতে চেয়েছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও শেখ হাসিনার শক্তিশালী নেতৃত্বের কারণে তা পারেনি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার কথা ছিল। কিন্তু তা আর হয়নি। বঙ্গবন্ধু চাইলে বিলেতে গিয়ে আইনে পড়তে পারতেন। কিন্তু তিনি রাজনীতি করার জন্য লন্ডনে পড়তে যাননি। মানুষের জন্য তিনি ছাত্রজীবন থেকেই নিবেদিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও মানুষের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন। এর ফল দেশবাসী পাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু কখনো মৃত্যুকে ভয় পাননি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কিছু বিপথগামী সেনাসদস্য কালের মহানায়ক বঙ্গবন্ধুসহ তার পরিবারের সদস্যদের ওপর গুলি চালিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এমন একজন আদর্শবান ব্যক্তির বুকে গুলি কেমন করে চালানো হয় তা কল্পনাতীত। হয়ত সেদিন গুলি করে তারা জাতির পিতাকে দৈহিকভাবে নিঃশেষ করেছে, কিন্তু তার আদর্শ? সেটা তো অমর, যে আদর্শে এদেশ সোনার বাংলায় রূপান্তরিত হতে চলেছে।

তাই বলা যায়, এক মুজিব লোকান্তরে লক্ষ মুজিব ঘরে ঘরে। পৃথিবীর বুকে বাঙালি যতদিন বেঁচে থাকবে, শেখ মুজিবুর রহমান প্রত্যেক বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন ততদিন। এটি চিরসত্য যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু আওয়ামী লীগের নেতা নন, তিনি বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের নেতা। তিনি বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছিলেন তৎকালীন সাত কোটি মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য। বঙ্গবন্ধুর জীবন ও আদর্শ বুকে ধারণ করে তার জীবনী থেকে আমরা শিক্ষা গ্রহণ করব এবং দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাব। তাহলেই বঙ্গবন্ধুর বিদেহী আত্মা শান্তি পাবে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ অন্তরে ধারণ করেই তার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমরা এগিয়ে যাব বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে। এই হোক আজকের শপথ।

মোতাহার হোসেন : সাংবাদিক
motaherbd123@gmail.com