খিচুড়ি প্রকল্পে যেন জগাখিচুড়ি না হয়

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২০ | ১৪ কার্তিক ১৪২৭

খিচুড়ি প্রকল্পে যেন জগাখিচুড়ি না হয়

রেজাউল করিম ১০:১৯ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২০

print
খিচুড়ি প্রকল্পে যেন জগাখিচুড়ি না হয়

কদিন ধরে গণমাধ্যমে জায়গা পেয়েছে খিচুড়িকাণ্ড। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বিষয়টি ঘুরপাক খাচ্ছে। অনেকেই বিষয়টি নিয়ে ট্রোল করছে। এক হাজার সরকারি কর্মকর্তাকে খিচুড়ি রান্না শিখতে বিদেশে পাঠানোর প্রস্তাব করেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর (ডিপিই)। স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় প্রশিক্ষণের জন্য তাদের বিদেশ পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন থেকে এর অনুমোদন পাওয়ার চেষ্টা করছে অধিদফতর। বিভিন্ন প্রকল্পের অভিজ্ঞতা অর্জনে বিদেশে যাওয়া সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য নতুন কিছু নয়। তবে সরকারি অন্তত এক হাজার কর্মকর্তাকে খিচুড়ি রান্না শিখতে বিদেশ পাঠানোর উদ্যোগ আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। জনগণের টাকা খরচ করে এ ধরনের সফরের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ডিপিই প্রাথমিকভাবে বিদেশ যাত্রার জন্য পাঁচ কোটি টাকা চেয়েছে। এছাড়া দেশেই প্রশিক্ষণের জন্য আরো ১০ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে।

যদিও পরে খিচুড়ি রান্না নয়, মিড-ডে মিল প্রশিক্ষণ নিতে বিদেশ ভ্রমণে পাঠানোর প্রস্তাব করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব আকরাম-আল-হোসেন। যেভাবে বলা হোক এসব ইস্যু নিয়ে প্রকল্প তৈরি করা জাতিকে ভাবিয়ে তুলেছে। অতএব খিচুড়ি পাকিয়ে দেশটাকে জগাখিচুড়ি করবেন না। প্রতিটি বিভাগকে উন্নয়ন করতে চাইলে অনেক প্রকল্প তৈরি করা যেতে পারে। তাই বলে খিচুড়ি রান্না শেখার প্রস্তাব আসতে পারে না। এমন অসংখ্য ঘটনা দিয়ে দেশটাকে জগাখিচুড়ি বানানোর চেষ্টা করছে এক শ্রেণির মহামানব। সরকারের উন্নয়ন এতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সরকার চায় দেশ এগিয়ে যাক। সাধারণ মানুষ চায় বাঁচার মতো পরিবেশ। উভয়ের চাওয়া-পাওয়া এসব নামধারী মহামানবদের জন্য নষ্ট হচ্ছে। এই প্রথম বাস্তবায়নের আগেই সমালোচনায় পড়ল প্রকল্পটি। অসংখ্য প্রকল্প আলোচনায় আসে বাস্তবায়নের পর। সেটাকে পরে দুর্নীতি হিসেবে সমালোচনা করা হয়।

বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাটা জরুরি। আর আগেও বেশ কয়েকটি ঘটনা আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। এমন ঘটনা জাতির জন্য অশুভ সংকেত। দেশ যখন উন্নয়নের পথে সেই পথটি দুর্গম করছেন কতিপয় কর্মকর্তা। সরকার যেখানে দেশটাকে বিশ্বের একটি রোল মডেল করতে ব্যস্ত কিছু কর্মকর্তা সেখানে চেটেপুটে খাচ্ছে। যে যেভাবে পারছে সে আর ছাড়ছে না। শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে আমাদের নৈতিকতা। তৃণমূল থেকে উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত মিশে আছে দুর্নীতি। মন্ত্রীর কালো বিড়াল থেকে ছাত্রনেতা। কর্মকর্তা থেকে কর্মচারী অনেকেই জড়িয়ে যাচ্ছে দুর্নীতিতে। তৃণমূলে দেশের সবচেয়ে বৃহৎ সেবা কেন্দ্র ইউনিয়ন তথ্য কেন্দ্রে। এখানে রয়েছে সীমাহীন দুর্নীতি আর হয়রানি। দুর্নীতি রোধে রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন। অথচ সেই দুর্নীতি দমন কমিশনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ৪০ লক্ষ টাকা ঘুষ গ্রহণের বিষয় আলোচনায় আসে। পুলিশ শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখবে। অথচ পুলিশ কনস্টেবল থেকে শুরু করে পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অহরহ দুর্নীতির অভিযোগ।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিচালক এবং পুলিশের এক ডিআইজির মধ্যে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ তদন্ত করে দুজনেরই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। যাদের ওপর দুর্নীতি দমন করার দায়িত্ব রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ প্রমাণ দিচ্ছে সাধারণ মানুষের অবস্থানটি আজ কোথায়?

আমাদের নৈতিকতার কতটুকু অবক্ষয় ঘটলে রাষ্ট্রের সম্পদকে আমাদের সম্পদ না ভেবে নিজের সম্পদ ভাবতে পারি। ‘বালিশ থেকে পর্দা’ একের পর এক এমন আলোচিত কা- সামনে আসছে। প্রথম পর্যায়ে এটা নিয়ে বিস্মিত না হলেও এখন অনেকটাই আতঙ্কিত। এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি কীভাবে ঘটছে? ভেবেছিলাম, পর্বটি অবক্ষয়ের মধ্যে কেটে গেলে ভবিষ্যৎ পর্বটা হয়তো শুধরে যাবে। কিন্তু বিশে^র শীর্ষ এক হাজার বিশ^বিদ্যালয়ের তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম না থাকায় আগামী প্রজন্মের অনিশ্চয়তা নিয়েও ভাবছি। কর্মকর্তারা কীভাবে দায়িত্ব পালন করছে? এদের কাজের জবাবদিহি কতটুকু? জবাবদিহি শূন্যের কোঠায় না থাকলে তো এমন ঘটনা বারবার দেখতে হতো না। ঘুরে দাঁড়ানোর সময় এখনি। দেশটাকে বাঁচাতে হলে কাজের জবাবদিহি প্রয়োজন। প্রয়োজন তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ।

২০১২ সালের রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের সঙ্গে হলমার্ক গ্রুপের সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা জালিয়াতির খবর শুনে ভেবেছিলাম, জানাজানি হওয়ার পর শুধরে নেবে। অথচ ২০১৩ সালের আগস্টে জামিন পান হলমার্কের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম। অবাক হলাম ৬ বছর পার হলেও টাকা ফেরত পায়নি ব্যাংকটি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভোল্টে জমা রাখা সোনা শংকর ধাতুর হওয়ার সংবাদ অস্বাভাবিক মনে হয়নি। ২২ ক্যারেটের সোনা ১৮ ক্যারেট হয়ে যাওয়াটাও মেনে নিয়েছি। ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের ভোল্টে অনুসন্ধান চালিয়ে প্রতিবেদনটি দিয়েছিল সরকাররে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতর।

দিনাজপুরের বড়পুুকুরিয়ার কয়লার খনি থেকে দেড় লাখ টন কয়লা গায়েব হলো। কতটুকু উদাসীন থাকলে ১৩ বছরেও কর্তৃপক্ষের নজরে পড়ে না। তদন্তেও কোনো নথিপত্র মেলে না অথচ কয়লার অভাবে খনিটির পাশে বন্ধ হওয়া ৫২৫ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু করতে কয়লা আমদানির পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
পাবনার রুপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এলাকায় প্রকল্প কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের থাকার জন্য গ্রিন সিটি আবাসন পল্লীতে প্রতিটি বালিশ কিনতে খরচ দেখানো হয়েছে ৫ হাজার ৯৫৭ টাকা। আর বালিশ ওঠাতে খরচ দেখানো হয়েছে ৭৬০ টাকা। রেফ্রিজারেটর, টেলিভিশন, বিছানা ও ওয়ার্ড্রোব ক্রয়মূল্য দেখানো হয়েছে আকাশছোঁয়া।

এরপর গণমাধ্যমে উঠে এসেছে কৃষি খামার থেকে প্রায় ৩ কোটি টাকার ১২৯ মেট্রিক টন ধানের বীজ পাচারের অভিযোগ। ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার দত্তনগর কৃষি খামারের তিন উপ-পরিচালকসহ চারজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। কর্মকর্তারা অতিরিক্ত বীজ উৎপাদনের পরিমাণ নিয়ম অনুযায়ী মজুদ ও কাল্টিভেশন রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করেননি। এমনকি অতিরিক্ত কোনো বীজ পাঠানোর কোনো চালান বা তথ্য প্রমাণ খামারে রাখেননি।

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩৭ লাখ টাকা দিয়ে কেনা হয়েছে আইসোলেশন কক্ষের পর্দা। একটি আমেরিকার তৈরি ভিএসএ অনসাইড অক্সিজেন জেনারেটিং পাঁচ কোটি ২৭ লাখ টাকা। মেসার্স অনিক ট্রেডার্স ৫১ কোটি ১৩ লাখ ৭০ হাজার টাকার বিভিন্ন ধরনের ১৬৬টি যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে। প্রতিটি যন্ত্র ক্রয়ে অধিক মূল্য দেখানোর কারণে ২০১৭ সালের ১ জুন অনিক ট্রেডাসের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে এটি রিট করে। আর্থিক ঘাপলার অভিমত ব্যক্ত করে হাইকোর্ট দুদককে তদন্তের দায়িত্ব দেয়।

খাগড়াছড়ির-৬ আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) ঘর মেরামতের কাজে দুই বান টিনের দাম ১৪ লাখ টাকা দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। যা মূল্যের তুলনায় ১০০ গুণেরও বেশি। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’র এক প্রতিবেদনে এমন খবর প্রকাশ হয়েছে। মেরামত শুরুর ২০ দিনের মধ্যেই বাজেটের ৭১ লাখ টাকা তুলে নেয়। অথচ মেরামত কমিটির সদস্য সচিবের দেওয়া ‘নোট অব ডিসেন্ট’ থেকে জানা যায়, চার মাসে মাত্র ১৫ ভাগ কাজ হয়েছে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (কেইস) প্রকল্পে ১০ কোটি টাকা মূল্যের কমপ্রেসড এয়ার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের (সিএএমএস) সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৪৬ কোটি টাকা। রক্ষণাবেক্ষণের নামে ওই টাকার বেশিরভাগই লুটপাট হয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটির সদস্যরা।

এ থেকে বোঝা যাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতির অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লুটপাট হচ্ছে। দুর্নীতির অবস্থা শীর্ষ ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের থেকে তৃণমূলে ছড়িয়ে পড়েছে মহামারীর মতো। এর ফলে অর্থনীতির একেবারে নিচের স্তর পর্যন্ত দুর্নীতিতে আচ্ছন্ন হয়েছে। এ ধরনের ‘দুর্নীতি, দলবাজি, স্বজনপ্রীতি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের ঠেকানো না গেলে সামনে দুর্দিন।

কক্সবাজারে অব. মেজর সিনহা হত্যায় অভিযুক্ত টেকনাফ থানার সদ্য প্রত্যাহারপ্রাপ্ত ওসি প্রদীপ কুমার দাশের যে সম্পদের হিসাব গণমাধ্যমে এসেছে সেটা অবাক করার মতো। এত সম্পদ কীভাবে হতে পারে? ঘটনার পরে না, ঘটনা চলাকালেই এসব জগাখিচুড়ি পাকানো মানুষগুলোকে আইনের আওতায় আনতে হবে। পাপিয়া, সাবরিনা ও সাহেদ এদের মতো খিচুড়ি পাকানো অসংখ্য মানুষ দেশে সাধারণ মানুষের টাকা দিয়ে নিজেরা খিচুড়ি পাকাচ্ছেন। তবে দেশ খিচুড়ি পাকানোর জন্য স্বাধীন হয়নি। দেশের সাধারণ মানুষকে তার অধিকার দিতে হলে এসব খিচুড়ি পাকানো মানুষগুলোকে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে।

রেজাউল করিম : সংবাদকর্মী
rezaulpress.bd@gmail.com