বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে সেই কালো আগস্ট

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৭ আশ্বিন ১৪২৭

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে সেই কালো আগস্ট

ফকির ইলিয়াস ৬:২২ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১৪, ২০২০

print
বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে সেই কালো আগস্ট

তিনি বেঁচে থাকলে এই বছরেই তার ১০০ বছর পূর্ণ হত। এই আয়ু মানবজীবনের জন্য খুবই বিরল। কিন্তু একজন মানুষের জীবনে ৫৫ বছর সময় তো খুবই কম! এই সময়ে তিনি এক যুগেরও বেশি সময় ছিলেন কারাগারে। রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন মাত্র সাড়ে তিন বছর সময়! কেমন ছিল সেদিনের বাংলাদেশ, যেদিন জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান নিজ দেশে ফিরে এসেছিলেন! আমি স্বচক্ষে সেই বাংলাদেশ দেখেছি। তাই কী পরিমাণ ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়েছিল বাংলাদেশ- সেই ব্যাখ্যা আমার দেওয়ার প্রয়োজন নেই। এই বাঙালি জাতিসত্তা, বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। পারেননি। তাকে করতে দেওয়া হয়নি। কেন দেওয়া হয়নি, এর উত্তর দিনে দিনে আমরা জানছি।

২০২০ সালে ঘটা করে বাংলাদেশ, জাতির পিতার জন্মশতবর্ষ পালন করার কথা ছিল । নানা পরিকল্পনা ছিল দেশে বিদেশে। কিন্তু করোনাভাইরাসের দুর্যোগের কারণে এবার তা হয়ে ওঠেনি। জাতির পিতা একটি অসাম্প্রদায়িক মানবিক বাংলাদেশ চেয়েছিলেন। তার একটি ভাষণের অংশ এখানে উল্লেখ করা দরকার মনে করি। ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৩ বলেছিলেনÑ ‘শাসনতন্ত্রে লিখে দিয়েছি যে কোনো দিন আর শোষকরা বাংলার মানুষকে শোষণ করতে পারবে না ইনশাআল্লাহ। দ্বিতীয় কথা, আমি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। জনগণের ভোটে জনগণের প্রতিনিধিরা দেশ চালাবে, এর মধ্যে কারও কোনো হাত থাকা উচিত নয়। তৃতীয়, আমি বাঙালি। বাঙালি জাতি হিসেবে বাঁচতে চাই সম্মানের সঙ্গে। চতুর্থ, আমার রাষ্ট্র হবে ধর্মনিরপেক্ষ। মানে ধর্মহীনতা নয়। মুসলমান তার ধর্ম-কর্ম পালন করবে, হিন্দু তার ধর্ম-কর্ম পালন করবে, বুদ্ধিস্ট তার ধর্ম-কর্ম পালন করবে। কেউ কাউকে বাধা দিতে পারবে না। তবে একটা কথা হলো, এই ধর্মের নামে আর ব্যবসা করা যাবে না।’

যে চেতনা, স্বপ্ন এবং প্রত্যাশার লক্ষ্যে স্বাধীন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির অভ্যুদয় হয়েছিল তা আজ কতটা বাস্তবতার পরশ পেয়েছে, সে প্রশ্নটি উত্থাপিত হচ্ছে বারবার। প্রায় পাঁচ দশক সময়, একটি জাতি এবং রাষ্ট্র পুনর্গঠনে কম সময় নয়। রাষ্ট্রের রাজনীতিকরা চাইলে অনেক কিছুই হতে পারত। কিন্তু হয়নি। কেন হয়নি সে প্রশ্নের জবাব কারোরই অজানা নয়। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির মৌলিক মূলনীতি ছিল গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং জাতীয়তাবাদ। একটি দেশে গণতন্ত্রের পাশাপাশি সমাজতন্ত্র চলতে পারে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। তারপরও ঊনসত্তর-সত্তর-একাত্তরে জাতীয় রাজনৈতিক ঐক্যমতের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল ঐ চার মূলনীতির পক্ষে। যার ওপর ভিত্তি করে সংগঠিত হয়েছিল মহান মুক্তিযুদ্ধ।

সময় যত যাচ্ছে- ততই জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও মেধার কথা জানতে পারছে এই প্রজন্ম। এর সঙ্গে কেউ কেউ বঙ্গবন্ধুর কাতারে কোনো কোনো নাম যুক্ত করার অপচেষ্টাও করছেন। যারা ঊনসত্তর-সত্তর-একাত্তরে নাবালক/নাবালিকা ছিলেন তারাও লিখছেন ইতিহাস।

প্রথমেই যে কথাটি বলতে চাই- বাঙালির জন্য একজন শেখ মুজিবেরই জন্ম হয়েছিল। ঐ সময়ে শেরেবাংলা, সোহরাওয়ার্দী, ভাসানীসহ বেশ কয়েকজন নেতাই ছিলেন। কিন্তু বাঙালির একটি স্বাধীন দেশ চাই- একথা আর কেউই বলতে পারেননি। জোর গলায় বলতে পারেননি- আমরা স্বাধীনতা চাই।

যে প্রত্যয় নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মহান মুক্তিযুদ্ধের ডাক দিয়েছিলেন, তা দ্বিগুণ হয়েছিল স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর। পাকিস্তানি হায়েনাদের জল্লাদখানা থেকে মুক্তি পেয়ে বাংলার মাটিতে পৌঁছার পরপরই তার চিত্তের উদারতা আরও বিশালতায় রূপ নিয়েছিল। তিনি তার মহানুভবতা দিয়ে দেখেছিলেন চারপাশ। বঙ্গবন্ধু কখনোই ভাবেননি, এই বাংলার মাটিতে কেউ তার শক্র হতে পারে। এমনকি সেই পরাজিত রাজাকার চক্রও আবার ফুঁসে উঠতে পারে সেটা ছিল তার কল্পনার বাইরে।

অস্বীকার করার উপায় নেই বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শিতা এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার কারণেই ভারত বাংলাদেশের মাটি থেকে দ্রুত সরিয়ে নেয় মিত্রবাহিনী এবং তা সম্ভব হয়েছিল ইন্দিরা-মুজিব পারস্পরিক গভীর শ্রদ্ধাবোধের কারণেই। মার্কিন কবি অ্যালেন গিনসবার্গ তার জীবদ্দশায় একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, যদি সেসময় ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী না থাকতেন, তবে ভারত এতটা সমর্থন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে দিত কিনা- তা নিয়ে আমার সন্দেহ হয়। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ অমর কবিতার জনক কবি অ্যালেন গিনসবার্গের মতে, ইন্দিরা গান্ধীর মতো একজন জননন্দিত নেত্রীর সাহসী সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করেছিল। আর এর নেপথ্যের কারণ ছিল ইন্দিরা-মুজিবের রাজনৈতিক মনন। সেই ‘ইন্দিরা-মুজিব’ চুক্তির আলো ধরেই বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়েছে ২০১৫ সালে। যা আর কারো দ্বারাই সম্ভব ছিল না।

স্বাধীন বাংলাদেশের অবকাঠামো পুনর্গঠনে শেখ মুজিবকে কাজ করতে হয়েছিল ঘরে-বাইরে। দেশ গঠনে আন্তর্জাতিক সমর্থন সংগ্রহে তাকে কম বেগ পেতে হয়নি; কিন্তু সেসব দুরূহ কাজ সাধন করতে পেরেছিলেন গণমানুষের ভালোবাসার কারণেই। তিনি বিশ্বের ঘরে ঘরে পৌঁছাতে চেয়েছিলেন বাঙালির পরিচয়।
১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ তারিখে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। এর পরপরই সরকারপ্রধান হিসেবে ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলা ভাষায় দেওয়া সে ভাষণে তিনি বাংলাদেশে রক্তাক্ত, নৃশংস গণহত্যার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি পেশ করেন বাঙালি জাতি এবং বিশ্ব মানবের কল্যাণে চিন্তা-চেতনার রূপরেখা। ভাষণে বিশ্বে নারী সমাজের অগ্রগতি, শিক্ষা, খাদ্য, স্বাস্থ্য, পানি, বিদ্যুৎ বিষয়াদিসহ তার সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা তুলে ধরেন। বঙ্গবন্ধু, কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে বাংলাদেশে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে অধিক ফসল ফলানোর প্রয়োজনীয় সাহায্যও চান বিশ্ব নেতৃবৃন্দের কাছে। ডাক দেন সবুজ বিপ্লবের।

বঙ্গবন্ধুর জাতিসংঘে ভাষণ দৃষ্টি কাড়ে গোটা বিশ্বের রাষ্ট্রনায়কদের। ফিলিস্তিনের কিংবদন্তি নেতা ইয়াসির আরাফাত শেখ মুজিবকে গণমানুষের মহানায়ক উল্লেখ করে জানান, মেহনতি মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে মুজিবকে সর্বতোভাবে সাহায্য করবেন তিনি। একই সহযোগিতার কথা ব্যক্ত হয় সমাজতন্ত্রী নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রোর পক্ষ থেকেও।

শেখ মুজিব বাংলাদেশকে, বাঙালি জাতিকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে বিভিন্ন কর্মপদ্ধতি প্রণয়ন করতে চেয়েছিলেন। কৃষিখাতে বিপ্লবী ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে চেয়েছিলেন তিনি। তার এই অদম্য কর্মযজ্ঞ কারও কারও হিংসার কারণ হয়েছিল বৈকি। বিশ্বের ইতিহাস প্রমাণ করে যারা ফন্দি-ফিকির করে মহামানব নেলসন ম্যান্ডেলাকে কারাগারে পুরে রেখেছিল, পরবর্তী সময়ে তারাই ম্যান্ডেলার ভক্ত-অনুরাগী বলে বিশ্বে পরিচিত হয়েছে। কিংবা যারা মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ নেতা মার্টিন লুথার কিংকে হত্যার ইন্ধন যুগিয়েছিল, তারাই পরবর্তী সময়ে কিংকে বিশেষভাবে সম্মানিত করতে চেয়েছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মোড়ল মনোভাবাপন্নদের জন্য আতঙ্কের কারণ ছিল ঠিক একইভাবে। তা না হলে যারা মানবতার ধ্বজাধারী বলে নিজেদের ঢোল নিজেরা পেটায়, সেই মার্কিন প্রশাসন একাত্তরে বাংলাদেশের গণহত্যার নিন্দা জানায়নি কেন? কেন রক্তবন্যায় মদদ দিয়েছিল তারা? আমি স্পষ্ট করেই বলতে পারি, পঁচাত্তরে জাতির জনককে হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা- এই চার মূলনীতির সমাধিই শুধু রচিত হয়নি, একটি জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। তা করা হয়েছিল পরিকল্পিতভাবে। যারা একাত্তরের মুক্তি সংগ্রামকে মনেপ্রাণে মেনে নিতে পারেনি, যারা দায়ে পড়ে মুক্তিযোদ্ধা সেজেছিল, মুজিব হত্যায় তাদের নেপথ্য ইন্ধন ছিল। এসব কথা আজকের প্রজন্মকে জানাতে হবে। তাদের জানাতে হবে আমাদের অতীত সংগ্রামের উজ্জ্বল ইতিহাস। যে ইতিহাস কখনোই কালিমাপূর্ণ ছিল না।

এই প্রজন্মের মুখের দিকে তাকিয়েই আজ সকল রাজনীতিকের উচিত, মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের স্বরূপ সন্ধান করা। স্বাধীনতা হচ্ছে মানুষের অন্যতম জন্মগত অধিকার। কিন্তু সেই স্বাধীনতা যদি দীর্ঘসময় কোনো অপশক্তি দ্বারা শাসিত হয় তবে তা কতটা অর্থবহ হতে পারে? এ প্রসঙ্গে মহাত্মা এডওয়ার্ড সাঈদকে আবারও স্মরণ করা যেতে পারে। সাঈদ বলেছিলেন, ‘স্বাধীনতার শত্রুরা তৎপর থাকে দিনরাত। আর স্বাধীনতাভোগীরা তৎপর থাকে শুধু দিনের বেলা। তাই ওই শত্রুরা মাঝে মাঝে মহাপরাক্রমশালী হয়ে উঠতে পারে।’ আমরা বাঙালিরা আসলেই আত্মভোলা জাতি! যদি না হতাম তবে অনেক ঐতিহাসিক সত্যই ভুলে যেতাম না। ২৬ মার্চ কিংবা ১৬ ডিসেম্বর আমাদের সে সব সত্য বারবার মনে করিয়ে দেয়। ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ গান গাইতে আমাদের বুক কাঁপে।

ফকির ইলিয়াস : সাহিত্যিক ও কলাম লেখক
oronik@aol.com