জাতির পিতার শিক্ষা দর্শন

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৭ আশ্বিন ১৪২৭

জাতির পিতার শিক্ষা দর্শন

লিটন দাশ গুপ্ত ৫:৩৯ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১৪, ২০২০

print
জাতির পিতার শিক্ষা দর্শন

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে জাতির জনক শাহাদত বরণ করেন। সেই হিসাবে এবার সারা দেশে জাতির পিতার ৪৫তম শাহাদত বার্ষিকী পালিত হচ্ছে। তার শততম জন্মবার্ষিকীর বছরে।

এই শোকাবহ দিনে, এই মহান নেতাকে নিয়ে লেখা শুরু করতে গিয়ে মর্মাহত হয়েছি। ব্যাকুল হৃদয়ে বেদনাবিধুর হয়ে ভাবছি কী ধরনের বিশেষণে বিশেষায়িত করে শুরু করব এই লেখার গৌরচন্দ্রিকা। কোনও বিশেষণে বিশেষায়িত করা সম্ভব নয় এই মহান নেতাকে। যিনি অবিসংবাদিত বিশ্ববরেণ্য মহান নেতা, যিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, যিনি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি, যিনি স্বাধীন বাংলার প্রথম প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি, যিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু, তিনিই শেখ মুজিবুর রহমান।

কেবল অতি উচ্চস্তরে নিরপেক্ষভাবে সূক্ষাতিসূক্ষ চিন্তা করলে অনুভব করা যায়, যার জন্ম না হলে আমরা স্বাধীন ভূখণ্ডের মানচিত্র পেতাম না; যার জন্ম না হলে আমরা পৃথিবীর বুকে স্বকীয় মহিমায় লাল সবুজের পতাকা ওড়াতে পারতাম না; যার জন্ম না হলে এপার বাংলার বাঙালি জাতি টাইটানিকের মতো মহাসাগরে নিমজ্জিত হত; তিনিই বাংলা রাষ্ট্রের সৃষ্টিকর্তা, উন্নত জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা, সকল উন্নয়নের প্রথম স্রষ্টা শেখ মুজিবুর রহমান। আজকের এই দিনে হাজার বছরের এই শ্রেষ্ঠ বাঙালির প্রতি রইল আমার লাখো সালাম।

স্বাধীন বাংলাদেশের যাত্রা যেমন এই মহান নেতার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে, একইভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের শিক্ষার অগ্রযাত্রাও তার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশে চতুর্দিকে ছিল ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন ও অভাব আর অভাব। বাড়িঘর, হাটবাজার, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আগুনে পুড়ে ছাইভস্ম, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছিল অর্থশূন্য। চরম অর্থ সংকটের এমন দিনেও বঙ্গবন্ধু সাধারণ, গরিব-মেহনতি মানুষের সন্তান যাতে বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ পায়, তার জন্যে প্রায় ৩৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারিকরণ করেন। একইসঙ্গে দেড় লক্ষাধিক শিক্ষককেও প্রজাতন্ত্রের সরকারি কর্মচারীতে উত্তীর্ণ করে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এক মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু এতেই তিনি সন্তুষ্ট হতে পারেননি। বঙ্গবন্ধুর এই অতৃপ্তির কথা, তার সরকারের তৎকালীন অর্থমন্ত্রী সৈয়দ তাজউদ্দীন আহমেদ শিক্ষকদের বেতন স্কেল সম্পর্কে সেই সময়ে বলেন, চরম আর্থিক সংকটের মধ্যে সরকার শিক্ষকদের যথাযোগ্য ন্যায্য সম্মান ও অর্থ দিতে পারছেন না, দেশ আগামীতে সমৃদ্ধ হলে, উন্নত দেশের মতো শিক্ষকদের বেতন কাঠামো গড়ে তোলা হবে।

আমরা জানি, শত শত বছর ধরে বাঙালি জাতি পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে নিষ্পেষিত, শোষিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত, নিগৃহীত হওয়ার পর শেষপর্যন্ত একাত্তর সালের ১৬ ডিসেম্বর, একান্তই নিঃস্ব ও শূন্য হাতে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল। সেই নিঃস্ব ও শূন্যতাকে পূর্ণতা দান করেছিল বঙ্গবন্ধুর সৎ ব্যক্তিত্বে, বলিষ্ঠ নেতৃত্বে, আদর্শ কর্তৃত্বে সুপরিচালিত সরকার। তাই তিনি সদ্য স্বাধীন দেশে মাত্র ছয় মাসেই নতুন প্রজন্মের আশা আকাক্সক্ষা প্রতিফলনের জন্যে গঠন করেন প্রথম শিক্ষা কমিশন। বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ ড. কুদরত-ই-খুদার নেতৃত্বে আঠার সদস্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমে এই কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটির সুপারিশে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষার জন্যে সংস্কার ও উন্নয়নের নিমিত্তে কতকগুলো বিশেষ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশমালা পেশ করা হয়। সেই অনুযায়ী প্রত্যেক শিক্ষাস্তরে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি বৃত্তিমূলক শিক্ষার বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করেন। তিনি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে গবেষণার মাধ্যমে জ্ঞানের নবদিগন্ত উন্মোচন করে সামাজিক অর্থনৈতিক সমস্যা বিশ্লেষণ করে, যথাযথ সমাধানের পথ খুঁজে নেওয়ার জন্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তার নির্দেশে উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ল্যবরেটরি, লাইব্রেরি, গবেষণাগার প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন ভৌত অবকাঠামো সংস্কারের ব্যবস্থা করেন।

আগেই বলেছি, সদ্য স্বাধীন দেশে অভাব অনটনের মধ্যেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিক্ষাক্ষেত্রে ছিলেন নির্ভীক। তাই তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কচিকাঁচা শিশু শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে বই, খাতা, পেন্সিল বিতরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। শুধু তাই নয়, এসব ছাত্র-ছাত্রীর জন্যে দুধ, ছাতু, বিস্কুট ইত্যাদি নিয়মিতভাবে বিতরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। শিক্ষকদের অবস্থা বিবেচনা করে অলিম্পিয়া টেক্সটাইল মিল থেকে সাধারণ শিক্ষকদের ন্যায্য মূল্যে কাপড় সরবরাহের ব্যবস্থা করেন। শুধু প্রাথমিকে নয়, প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চশিক্ষা স্তর পর্যন্ত শিক্ষার প্রতিটি ক্ষেত্রে তার পবিত্র পরশে সমৃদ্ধ হয়েছে।

যেমন- যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশে অর্থাভাবের মধ্যেও সকল শিক্ষকের নয় মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধ করেন, যুদ্ধকালে সকল শিক্ষার্থীর বকেয়া বেতন মওকুফ করেন, আর্থিক সংকট থাকা সত্ত্বেও অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক ঘোষণা করেন, নয়শ’ কলেজ ভবন, চারশ’ উচ্চবিদ্যালয় পুনঃনির্মাণ করেন, জাতীয় সংসদে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস করে বিশ্ববিদ্যালয় সমূহকে স্বায়ত্তশাসন প্রদান করেন, সামরিক বাহিনী থেকে শুরু করে দেশের সকল সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বাংলা ভাষায় শিক্ষা ও বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করেন, বাংলা একাডেমিতে বাংলার মুদ্রাক্ষর যন্ত্র সরবরাহ ও নথি লেখার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। এককথায় শিক্ষার সকল ক্ষেত্রে সফল অগ্রযাত্রায়, বঙ্গবন্ধুর অবদান জাতি চিরকাল স্মরণ করবে।

সবশেষে বলা যায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতিকে কেবল একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র উপহার দেননি; যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন দেশে হাজারও সমস্যায় আক্রান্ত ভঙ্গুর দেশকে, অতি কম সময়ে পুনর্গঠন করে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছেন। যা বিশ্ব মানচিত্রে অন্য কোনও সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব হয়নি। এখানে আলোচনা করলাম কেবল শিক্ষা ক্ষেত্রের কীর্তি নিয়ে। বাংলার প্রতিটি ক্ষেত্রে রয়েছে তার অমর কীর্তি। তাই কবি অন্নদাশঙ্কর রায়ের কবিতা থেকে বলতে চাই-
যত দিন রবে পদ্মা যমুনা
গৌরী মেঘনা বহমান,
তত দিন রবে কীর্তি তোমার
শেখ মুজিবুর রহমান।

লিটন দাশ গুপ্ত : শিক্ষক ও কলাম লেখক
liton_dg@yahoo.com