বঙ্গবন্ধুকে কেন হত্যা করা হয়েছিল

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৭ আশ্বিন ১৪২৭

বঙ্গবন্ধুকে কেন হত্যা করা হয়েছিল

মেহেদী হাসান ৬:১৪ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১৩, ২০২০

print
বঙ্গবন্ধুকে কেন হত্যা করা হয়েছিল

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। কী কারণে জাতির পিতাকে জীবন দিতে হয়েছে তা বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিরা পরবর্তীকালে স্বীকার করেছেন। শুধু এদেশীয় একপাক্ষিক চক্রান্তে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়নি তা ইতিহাস ঘেঁটে পাওয়া যায়। একটি স্বৈরাচারী সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম দেওয়া নায়ককে বৈশ্বিক চক্রান্ত করে হত্যা করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, একজন গণতান্ত্রিক বিশ্বনেতাকে তার পরিবারসহ হত্যার পেছনে উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িকতা বড় ভূমিকা পালন করেছে। বঙ্গবন্ধু তার জীবনে এসবের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থানে ছিলেন। অপরদিকে বৈশি^ক রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধু ছিলেন এক বড় নিয়ামক।

জাতির পিতা মারা যাওয়ার ঠিক ২ বছর আগে ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বর মাস। জোট নিরপেক্ষ ৭৩ জাতি (ন্যাম) শীর্ষ সম্মেলন আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে। সদ্য জন্ম নেওয়া স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে বঙ্গবন্ধু উপস্থিত। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীসহ মিশরের আনোয়ার সাদাত, লিবিয়ার কর্নেল গাদ্দাফি, ফিলিস্তিনের ইয়াসির আরাফাত, সাবেক যুগোসøাভিয়ার মার্শাল টিটো, কিউবার ফিদেল ক্যাস্ত্রো ও সৌদি আরবের কিং ফয়সল সেখানে উপস্থিত। সম্মেলনের পর কয়েক বছরে বিভিন্ন মেয়াদে উপস্থিত এসব নেতাদের হত্যা করা হয়েছে।

১৯৭৫ সালে আগস্ট মাসে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ১৯৭৫ সালের জুলাই মাসে হত্যা করা হয় সৌদি আরবের কিং ফয়সলকে। তারপর শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের লেলিয়ে হত্যা করা হয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে, চরমপন্থী মুসলিম ব্রাদাহুড জঙ্গিদের দ্বারা হত্যা হন মিশরের আনোয়ার সাদাত, শরীরে স্লো পয়জন প্রবেশ করিয়ে হত্যা করা হয় ইয়াসির আরাফাতকে, সবশেষে হত্যা করা হয় লিবিয়ার গাদ্দাফিকে।

বিশ্বের এসব প্রভাবশালী নেতা হত্যার পেছনে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক কূটনৈতিক ইন্ধন ছিল বলে মনে করেন ইতিহাসবিদরা। আরবের কিং ফয়সলকে হত্যার কারণ তিনি মুসলমানদের আল-আকসা মসজিদ এক বছরের মধ্যে ইসরায়েলের দখলমুক্ত করতে চেয়েছিলেন। অপরদিকে ১৯৭২ সালের সংবিধান রচনা ও ৭১-এর পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে বিদেশিদের দালালরা হত্যা করে বঙ্গবন্ধুকে। পাকিস্তানপন্থি বাঙালিরা পাকিস্তানের মতো এক সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র চেয়েছিল কিন্তু তাতে সফল না হওয়ায় বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে জীবন দিতে হয়েছে।

পশ্চিমা শক্তি শুরু থেকেই এই জোটের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। তারা চায় বিশ্ব নিজেরাই শাসন-শোষণ করবে। প্রভাবশালী দুই নেতা নেহেরু ও নাসেরের মৃত্যু হওয়ার পর জোটের হাল ধরেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। পশ্চিমা শক্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জোটকে এগিয়ে নিতে জোটের নেতৃত্বে আসেন ইন্দিরা গান্ধী, মার্শাল টিটো ও বঙ্গবন্ধু। পরবর্তীকালে ইন্দিরা গান্ধী, বঙ্গবন্ধু হত্যা হয়। সেই সঙ্গে কিছুকাল পরে মারা যান মার্শাল টিটো। ভেঙে পড়ে ন্যাম। প্রকৃত ক্ষমতা চলে যায় পশ্চিমা বিশে^র কাছে। যেমনটি তারা চেয়েছিল। আর এ ন্যাম শীর্ষ সম্মেলনে ফিদেল ক্যাস্ত্রো বলেছিলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি, কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি।’

উনিশ শতকের বিশ^ব্যাপী ভয়াল সাম্রাজ্যবাদের বিষবৃক্ষ আজ হৃষ্টপুষ্ট হয়েছে। সারা মধ্যপ্রাচ্যে বিস্তার করেছে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ। বঙ্গবন্ধুর শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের যে দৃঢ় আকাক্সক্ষা ছিল তা তিনি স্বচক্ষে দেখে যেতে পারেননি। তার সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ভূমিকা, ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রায়িকতার বিরুদ্ধে আজীবন সংগ্রাম রচনার শেষ পৃষ্ঠা অধরাই থেকে গিয়েছে। তিনি বেঁচে থাকলে বিংশ শতাব্দীর নয়া আগ্রাসন থেকে মানুষকে শান্তির জন্য স্বাধীনতা রক্ষার জন্য আবারও জীবন বিলিয়ে দিতে উদ্বুদ্ধ করতেন নিশ্চিত।

মেহেদী হাসান : সদস্য, রাজশাহী কলেজ রিপোর্টার্স ইউনিটি