নিউইয়র্কে প্রথম ভার্চুয়াল বইমেলা

ঢাকা, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১০ আশ্বিন ১৪২৭

নিউইয়র্কে প্রথম ভার্চুয়াল বইমেলা

ফকির ইলিয়াস ৮:৩৩ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১১, ২০২০

print
নিউইয়র্কে প্রথম ভার্চুয়াল বইমেলা

কোভিড-১৯ বদলে দিয়েছে গোটা বিশ্বের চালচিত্র! কী এক অদ্ভুত সময় পার করছে এই প্রকৃতি। কথা ছিল ২০২০-এর মুক্তধারা নিউইয়র্ক বইমেলা হয়ে অত্যন্ত জমজমাট আয়োজনের। বছরটি জাতির পিতার জন্ম-শতবর্ষের। মেলা ?উৎসর্গ করা হয়েছিল তাকেই। কিন্তু করোনাকাল পাল্টে দিয়েছে অনেক পরিকল্পনা। তাই বলে জীবন তো থেমে থাকার নয়। মানুষ চলমান। গ্রহ চলমান।

একটা চ্যালেঞ্জই নেওয়া হয়েছে বলা যায়। এবারই বিশ্বের প্রথম ভার্চুয়াল বইমেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে নিউইয়র্কে। ‘যত বই তত প্রাণ’ সেøাগান নিয়ে জাতির পিতাকে নিবেদিত নিউইয়র্কে ১০ দিনব্যাপী ভার্চুয়াল বাংলা বইমেলা শুরু হতে যাচ্ছে। আগামী ১৮ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর-২০২০ এই মেলা অনুষ্ঠিত হবে। যা গোটা বিশ্বের মানুষের কাছে খুলে দেবে নতুন বাতায়ন। সবাই অংশ নিতে পারবেন, বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে। অনুষ্ঠান দেখতে পারবেন। বই কিনতে পারবেন। ঢাকা, কলকাতার নামকরা প্রকাশনাগুলো মিলিয়ে বিশ্বের অধিক ভার্চুয়াল বইয়ের স্টল থাকছে এবারের বইমেলায়। যা থেকে পাঠক তার পছন্দের বই কিনতে পারবেন।

মুক্তধারা ফাউন্ডেশন আয়োজিত এবারের বইমেলা তার ২৯ বছর পার করছে। ‘মুক্তধারা’ এবং ‘বাঙালির চেতনা মঞ্চ’ নামে দুটি সংস্থা ও সংগঠনের উদ্যোগে বইমেলা শুরু হয় নিউইয়র্কে ১৯৯২ সালে। ‘বাঙালির চেতনা মঞ্চ’ ছিল মূলত একঝাঁক শাণিত তরুণের সাংস্কৃতিক ফোরাম। প্রবাসে বাংলা ভাষা সাহিত্য, সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং লালন করার প্রত্যয় নিয়েই জন্ম নেয় সংগঠনটি। মহান ভাষা দিবস উপলক্ষে জাতিসংঘ চত্বরে অস্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ করে একুশে ফেব্রুয়ারি পালন ও শুরু হয় এই মুক্তধারা ও বাঙালির চেতনা মঞ্চের উদ্যোগে।

নিজ কাঁধে বইয়ের বাক্স বহন করে ফিরে বইমেলা জমাবার প্রত্যয়ী ছিলেন মুক্তধারার কর্ণধার বিশ্বজিত সাহা। আমি দেখেছি, চোখে বুকে একটিই স্বপ্ন, প্রবাসে পরিশুদ্ধ পাঠক শ্রেণি গড়ে উঠবে। আমি এখনও ভাবি, এক সময়ের তুখোড় সাংবাদিক বিশ্বজিত সাহা তো প্রবাসে এসে অন্য পেশাও গ্রহণ করতে পারতেন। তিনি তা করেননি কেন? করেননি এজন্য, বাংলা ভাষা-সাহিত্য সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন প্রবাসী বাঙালির মাঝে। প্রশ্নটির উত্তর আমি এখন পেয়ে যাই খুব সহজে। যখন দেখি জ্যাকসন হাইটেসের সুপরিসর ‘মুক্তধারা’ গ্রন্থকেন্দ্রে বসে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কিংবা ড. হুমায়ুন আজাদ, আনিসুল হক, হাসান আজিজুল হক, সমরেশ মজুমদার তাদের বইয়ে পাঠককে অটোগ্রাফ দিচ্ছেন, দিয়েছেন।

নিউইয়র্কে ১৯৯২ সালে প্রথম বইমেলাটির উদ্বোধক ছিলেন ড. জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত। ১৯৯৩ সালে কবি শহীদ কাদরী মেলা উদ্বোধন করেন। ১৯৯৪ সালে ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল, ১৯৯৫ সালে পূরবী বসু, ১৯৯৬ সালে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, ১৯৯৭ সালে হুমায়ূন আহমেদ, ১৯৯৮ সালে সৈয়দ মোহাম্মদ উল্লাহ, ১৯৯৯ সালে দিলারা হাশেম, ২০০০ সালে ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন, ২০০১ সালে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বইমেলা উদ্বোধন করেন। ২০০১ সালে দশম বইমেলার বর্ণিল আয়োজনে একযোগে এসেছিলেনÑ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, হুমায়ূন আহমেদ ও ইমদাদুল হক মিলন। ২০০২ সালে বইমেলা উদ্বোধন করেন ড. হুমায়ুন আজাদ। ২০০৩ সালে কবি জয় গোস্বামী আসেন উদ্বোধক হিসেবে।

মুক্তধারার উদ্যোগে ২০০৪ সালে দুটি বইমেলা অনুষ্ঠিত হয় যুক্তরাষ্ট্রে। ওই বছর নিউইয়র্কে বইমেলা উদ্বোধন করেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ও লসএঞ্জেলেসে রাবেয়া খাতুন। ২০০৫ সালের বইমেলার উদ্বোধক ছিলেন ড. আবদুন নূর। ২০০৬ সালে পঞ্চদশ বইমেলা উদ্বোধন করেন কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক। যুক্তরাষ্ট্রে নতুন আঙ্গিকে বইমেলা শুরু হয়েছে ২০০৭ সাল থেকে। বইবিপণি ‘মুক্তধারা’র সহযোগী সংগঠন ‘মুক্তধারা ফাউন্ডেশন’-এর উদ্যোগে বইমেলা রূপ নিয়েছে আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসবে। এই উৎসবের অংশ হিসেবে চারটি বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে ২০০৭ সালে। নিউইয়র্কে ড. গোলাম মুরশিদ, ডালাসে ড. আনিসুজ্জামান, লসএঞ্জেলেসে সমরেশ মজুমদার এবং নিউজার্সিতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এসব বইমেলা উদ্বোধন করেন।

২০০৮ সালে বইমেলা উদ্বোধন করেন কবি রফিক আজাদ। ২০০৯ সালে বইমেলা উদ্বোধন করেন হাসান আজিজুল হক। ২০১০ সালে বইমেলা উদ্বোধন করেন কবি সৈয়দ শামসুল হক। ২০১১ সালে বইমেলা উদ্বোধন করেন তপন রায় চৌধুরী। ২০১২ সালে বইমেলা উদ্বোধন করেন শামসুজ্জামান খান। ২০১৩ সালে বইমেলা উদ্বোধন করেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। ২০১৪ সালে বইমেলা উদ্বোধন করেন কবি মহাদেব সাহা। ২০১৫ সালে বইমেলা উদ্বোধন করেন অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। ২০১৬ সালে বইমেলা উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। ২০১৭ সালে ২৬তম বইমেলা উদ্বোধন করেন করেন বিশিষ্ট লেখক এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক পবিত্র সরকার। ওই বইমেলায় অতিথি হয়ে এসেছিলেন ভারত থেকে অধ্যাপক পবিত্র সরকার এবং বাংলাদেশ থেকে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। ২০১৮ সালে উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। ২০১৯ সালের ১৪, ১৫, ১৬, ১৭ জুন ছিল এই মেলা। এটি উদ্বোধন করেন কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী।

১৪ জুন ২০১৯ ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ সেøাগানে ডাইভার্সিটি প্লাজা থেকে বর্ণাঢ্য র‌্যালির মাধ্যমে শুরু হয় এ বইমেলা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন, কন্সাল জেনারেল সাদিয়া ফয়জুননেসা, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী, কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, আনিসুল হক, নাট্যব্যক্তিত্ব জামালউদ্দিন হোসেন, মুক্তিযোদ্ধা-বিজ্ঞানী-লেখক ড. নূরন্নবী, ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগের প্রধান রোকেয়া হায়দার, জ্ঞান ও সৃজনশীল সমিতির নির্বাহী পরিচালক মনিরুল হক, প্রকাশক মেসবাহউদ্দিন আহমেদ প্রমুখ।

খুবই আনন্দের কথা, বিশ্বজিত সাহা ও মুক্তধারা আমাদের এই ঊনত্রিশ বছরে এসব গুণীজনের সান্নিধ্য পাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। অভিবাসী প্রজন্মের হাতে লেগেছে এসব মহান মানুষের হাতের পরশ। সময় এসেছে অভিবাসী লেখকদের মূল্যায়ন করার। যেসব বাঙালি লেখক উত্তর আমেরিকায় বাংলা ভাষায় লেখালেখি করেন তাদের সম্মান জানানোর। আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মান জানানো যেতে পারে আমেরিকায় জন্ম নেওয়া প্রজন্মকে, যারা ইংরেজি ভাষায় লেখালেখি করছে। একুশের চেতনা এবং বইমেলাকে উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য আরো তৎপরতা বাড়ানোর সময়টিও এসেছে এখন।

এই বইমেলার অর্জন অনেক। ২০১৯ সালে এই বইমেলায় মুক্তধারা সাহিত্য পুরস্কার দেওয়া হয়েছে কথাসাহিত্যিক দিলারা হাশেমকে। তার গলায় উত্তরীয় পরিয়ে দিয়েছিলেন আরেক কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। ক্রেস্ট তুলে দেন বইমেলার আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম। আর পুরস্কারের অর্থ ২ হাজার ৫০০ ডলারের চেক তুলে দেন গোলাম ফারুক ভূঁইয়া। তার আর্থিক সহযোগিতাতেই এই পুরস্কারের প্রচলন হয়।

চতুর্থ লেখক হিসেবে মুক্তধারা-জিএফবি সাহিত্য পুরস্কার সাহিত্য পুরস্কার অর্জন করেছিলেন দিলারা হাশেম। এর আগে এই পুরস্কার পেয়েছেন কবি নির্মলেন্দু গুণ, প্রাবন্ধিক শামসুজ্জামান খান ও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।

২০২০ সাল থেকে এই বইমেলা উপলক্ষেই আরেকটি সাহিত্য পুরস্কার প্রবর্তন করা হয়েছে। ‘অভিবাসী লেখক সাহিত্য পুরস্কার’ নামে পুরস্কারটি প্রতিবছর পাবেন বাংলাদেশের বাইরে বসবাসকারী একটি বইয়ের জন্য একজন লেখক। যা এই ভার্চুয়াল বইমেলায়ই ঘোষণা করা হবে। ১০ দিনের অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিন থাকবে চতুর্থ শিশু-কিশোর মেলা। ২৫ সেপ্টেম্বর থাকছে ‘মুজিববর্ষ ও বাংলাদেশি ইমিগ্র্যান্ট ডে’ নামক বিশেষ অনুষ্ঠান। প্রতিদিনের অনুষ্ঠান দেখা যাবে নিউইয়র্ক বইমেলার ওয়েবসাইট, ফেসবুক, ইউটিউব চ্যানেল ও সরাসরি টেলিভিশনে।

এছাড়া পৃথিবীর সকল দেশ থেকেই বই ক্রয় করার ব্যবস্থা থাকবে। নিউইয়র্ক বাংলা বইমেলা ২০২০-এর আহ্বায়ক, বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও ইমেরেটাস অধ্যাপক ড. জিয়াউদ্দীন আহমেদ ২০২০ সালের বইমেলা নিয়ে আমাদের স্বপ্নই ছিল আলাদা। জাতির জনকের জন্মশতবর্ষ। বছর শুরু হওয়ার আগে জাতির জনকের নিবেদনে নানান প্রক্রিয়া শুরু করে মুক্তধারা ফাউন্ডেশন।

নিউইয়র্ক স্টেট সিনেটে জাতির জনকের শতবর্ষ উদযাপনের রেজুলেশন পাস এবং ২৫ সেপ্টেম্বর যেদিন জাতির পিতা জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়েছিলেন সেদিনটিকে বাংলাদেশি ইমিগ্রান্ট ডে ঘোষণা করার উদ্যোগ ছিল উল্লেখযোগ্য। মার্চে সারা পৃথিবী যখন কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত তখনই আমরা ইউনাইটেড স্টেট পোস্টাল সার্ভিস কর্তৃক মাসব্যাপী জাতির পিতা স্মারক ডাকচিহ্ন প্রকাশ করি। আজ আমরা পৃথিবীর নানান প্রান্তে বসবাসরত মানুষের কাছে জাতির জনকের লেখা গ্রন্থ ও তাকে নিয়ে লেখা বিভিন্ন প্রকাশনাসহ বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থগুলো পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছি। সকলের অংশগ্রহণেই এটি সার্থক হবে। বইমেলা উপলক্ষে চিকিৎসক, লেখক ও কবি হুমায়ুন কবির সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিন ‘ঘুংঘুর’ বের করছে বিশেষ সংখ্যা। এই সংখ্যার অতিথি সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ড. আজফার হোসেন।

প্রজন্ম এখন প্রযুক্তিনির্ভর। অনেক অ্যাপ এখন সহজ করে দিয়েছে জনজীবন। এমন একটি চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়নের স্বপ্নই ছড়িয়ে দিতে চাইছে নিউইয়র্কের বইমেলা। সময় ঘনিয়ে এলে এর বিস্তারিত জানিয়ে দেওয়া হবে ওয়েবসাইটে। কবিতা, গান, আবৃত্তি, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, ভার্চুয়াল আড্ডা, বই প্রদর্শনী, বিক্রয় সব মিলিয়ে প্রাণে প্রাণে ছড়িয়ে পড়বে এই আয়োজনÑ এমনটাই আশা করছেন আয়োজক ও বইপ্রেমী সকলেই।

নিউইয়র্ক/ ০৯ আগস্ট ২০২০
ফকির ইলিয়াস : সাহিত্যিক ও কলাম লেখক
oronik@aol.com