হাঁসফাঁস গরম!

ঢাকা, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১০ আশ্বিন ১৪২৭

হাঁসফাঁস গরম!

শেখ আনোয়ার ৭:১৯ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ০৭, ২০২০

print
হাঁসফাঁস গরম!

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে গ্রীষ্মের গরমে কাজ করা অসহনীয় হয়ে উঠেছে মানুষের। তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশেও। তাপমাত্রা বাড়ায় অসহনীয় গরমে হাঁসফাঁস মানুষ। একদিকে ভ্যাপসা গরম। অন্যদিকে করোনা। যেন গোদের উপর বিষফোঁড়া। এবারের এই গরমে করোনা সংক্রমণ এড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম, মাস্ক, পিপিই, হ্যান্ড গ্লাভস ইত্যাদি ব্যবহারের কারণে গরম একটু বেশিই অনুভূত হচ্ছে। ব্যাপারটা নিয়ে গবেষকরা বলছেন, ‘এতে তৈরি হচ্ছে মাইক্রোক্লাইমেট। দিন দিন পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। একটানা সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করে এভাবে ৮ ঘণ্টার পুরো একটা শিফটে কাজ করা সত্যিই অস্বস্তিকর।

যা মনোবলকে প্রভাবিত করে।’ গবেষকরা আরও বলেন, ‘অতিরিক্ত গরম মানুষের জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা কমিয়ে দেয়। দক্ষ কর্মীদের মেধা ও শ্রম পুরোটা আদায় করতে আজকাল করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মস্থলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের দিকে জোর দিয়ে থাকে।’ যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া অফিসের অধ্যাপক রিচার্ড বেটস হুঁশিয়ার দিয়ে বলেন, ‘জলবায়ুর পরিবর্তনকে মোকাবেলায় দ্রুত পদক্ষেপ না নেওয়া হলে বিশ্বের উষ্ণতম অঞ্চলগুলো আরও বেশি গরমের পরিস্থিতি দেখতে শুরু করবে। এই তাপ এখনকার চেয়ে প্রায় ৪গুণ বেশি তীব্রতর হতে পারে। যা মানুষের জন্য হবে খুবই অসহনীয়। এতে ঝুঁকিতে পড়বে লাখ লাখ মানুষের জীবন।’ এ বছরের শুরুতে প্রকাশিত এক সমীক্ষায় এমন সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে তথ্য। যাতে বলা হয়েছে, ‘তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার ফলে ২১০০ সালের মধ্যে প্রায় ১০২ কোটি মানুষের জীবনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’ 

এমনিতেই এখন গরমে দিনের বেলায় রোদের তেজে পথ চলতে অতিষ্ঠ লাগে। হাঁসফাঁস করে প্রাণ। একটু পরিশ্রমেই দেহজুড়ে নামে অবসাদ, ক্লান্তি। চুপচুপে ঘামে-ময়লায় শরীরটাকে নিজের কাছেই অচ্যুত, নোংরা মনে হয়। অন্যদিকে করোনা সংক্রমণের আতঙ্ক, মৃত্যু ভয়ে দিশেহারা মানুষ। সব মিলিয়ে একটা বিচ্ছিরি অবস্থা নয় কি? আগামীতে যদি এই তাপমাত্রা চারগুণ বেশি হয়, তাহলে কী অবস্থা হবে? ভাবা যায়? সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ‘আগামী দিনে বিশ্বে লাখ লাখ মানুষ গরমের বিপজ্জনক অবস্থায় পৌঁছে যাবে। বিপজ্জনক তাপমাত্রার কারণে অনেক মানুষ মারাও যেতে পারে।

বিশেষ করে বিভিন্ন খামারের খোলা জায়গা, কারখানা, হাসপাতাল, ফ্ল্যাট বাড়ি, ও দালানের ভেতরে কর্মরত মানুষদের হিট স্ট্রোকের প্রভাব বেশি ঘটতে পারে। এসব কর্ম এলাকায় বাতাসে আর্দ্রতা বেশি হওয়ায় মানুষের দেহ ঠিকভাবে ঠা-া হতে পারে না। শরীরের অতিরিক্ত তাপমাত্রা কমানের জন্য মূল অঙ্গগুলো তখন কাজ করতে না পারায় কার্যক্রমও বন্ধ করে দেয়। ফলাফল হিট স্ট্রোক। বিশেষজ্ঞের মতে, ‘এসময়ে আবহাওয়ায় আর্দ্রতা বেশি থাকার কারণে অতিরিক্ত ঘাম হয়। এতে শরীরের ভেতরের পানি সমতার ব্যাঘাত ঘটে। ফলে পানি শূন্যতার কারণে মাথাব্যথা, দুর্বলতা, চামড়া খসখসে হওয়া, কাজে অমনোযোগিতা ইত্যাদি দেখা দেয়।’

তবে গরমের সময়ে শুধু সতর্ক থেকে অনেক বিপদ এড়ানো সম্ভব। বিশেষজ্ঞের মতে, ‘হিট স্ট্রোক থেকে বাঁচতে, সর্বক্ষণ সতেজ থাকতে হলে, কাজ শুরু করার আগে প্রচুর পরিমাণে তরল পানি পান করে নিতে হবে। নিয়মিত বিরতি নেওয়া এবং বিশ্রাম নেওয়ার পরে আবার প্রচুর তরল পান করতে হবে। সূর্যের আলো এড়িয়ে চলতে হবে।’ বিশেষ করে সকাল ১২টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত রোদের তীব্রতা বেশি থাকে। এ সময় জরুরি কাজ না থাকলে বাইরে বের না হওয়াটাই ভালো। বাইরে বের হলে অবশ্যই ছাতা ব্যবহার করা, যাতে সরাসরি রোদের মধ্যে থাকতে না হয়। এ সময় চওড়া কিনারাযুক্ত টুপি, হ্যাট, ক্যাপও ব্যবহার করা যেতে পারে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের গ্রামের কৃষক রোদ থেকে কিভাবে রক্ষা পেতে হয় তা ভালোভাবে জানেন।

যারা মাঠে-ঘাটে কাজ করেন, তারা মাথায় মাথাল জাতীয় টুপি ব্যবহার করেন। রোদ বৃষ্টি তাড়ান। এ অভ্যাস চিরায়ত বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য। এটা তাদের রোদ থেকে রক্ষা করে থাকে। পুষ্টি বিজ্ঞানীরা ব্যাখ্যা করেছেন, ‘এই গরমে টিকে থাকতে হলে বারো থেকে পনের গ্লাস পরিমাণ পানি কিংবা পানীয় খাবার খেতে হবে। যার মধ্যে থাকতে পারে স্বাভাবিক পানি, ফলের রস, শরবত, লাচ্ছি, সফট ড্রিংকস, চা-কফি, তরমুজ, শসা ইত্যাদি।’ ক্যাফেইনড, কার্বোনেট পানীয় গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হবে। কম চিনি দিয়ে লেবুর সরবত, ডাবের পানি, জামের রস, জাম্বুরার জুস, লেবুর পানি বেশি বেশি গ্রহণ করতে হবে।

মিষ্টি জাতীয় খাবার এবং তাপ উৎপাদনকারী খাবার যেমন- গুড়, চিনি, মধু এবং পালং শাক, গোল মরিচ, মুলা, পেঁয়াজ, রসুন, বিট, আনারস, পাকা আম, নারকেল ইত্যাদি খাওয়া কমাতে হবে। অতিরিক্ত গরম মসলাযুক্ত, লবণাক্ত, চিপস, ভাজাপোড়া, ভাজি ইত্যাদি খাওয়া কমিয়ে চর্বি ছাড়া খাবার গ্রহণ করা স্বাস্থ্যসম্মত। তেলে ভাজা খাবার এ সময়ে হজমে সমস্যা তৈরি করতে পারে। এ থেকে পেটে গণ্ডগোলসহ ত্বকেও দেখা দিতে পারে নানারকম প্রদাহ। সবচেয়ে ভালো হয় প্রাণীজ উৎস বাদ দিয়ে উদ্ভিদ উৎস বিশেষ করে তাজা এবং কাঁচা সবজি খাওয়া।

গরমে ডাল ও ডালের তৈরি খাবার বেশি খাওয়া ভালো। ছোলা সিদ্ধ, ছোলা ভাজা, মটরশুটি অনেক কাজের। কারণ এসবে আছে এসেনশিয়াল ফ্যাটি এসিড, যা এসময় শরীরের জন্য বেশ উপকারী। গরমের খাদ্য তালিকায় টাটকা শাকসবজি ও ফলমূল নিয়মিত রাখা জরুরি। কারণ শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন, ফ্লুইড, মিনারেলস ইত্যাদি সরবরাহ করে শাকসবজি ও ফলমূল। প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় সালাদ রাখার অভ্যাস করা উচিত। অতিরিক্ত মসলা জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলা দরকার। এই গরমে গরু বা খাসির মাংস সপ্তাহে বড়জোর দুদিন খেতে পারেন। এর বেশি নয়। তবে চর্বিযুক্ত মাংস এড়িয়ে চলতে হবে।

কথায় বলে, মাছে-ভাতে বাঙালি। তাই মাছ তো খেতেই হবে। বড় মাছ খাওয়ার চেয়ে ছোট মাছ খাওয়া গরমে বেশি উপকারী। সপ্তাহে অন্তত একদিন মাছ-মাংস ছাড়া শুধু নিরামিষ খাওয়ার অভ্যাস করার চেষ্টা করুন। মিষ্টি বা মিষ্টি জাতীয় খাবার যতটা সম্ভব কম খাবেন। দুধ খেতে পারেন। তবে তা হতে হবে পাস্তুরাইজড অর্থাৎ ননীমুক্ত। গরমে অতিরিক্ত ঘাম থেকে পরিত্রাণের জন্য লেবু বা লেবু জাতীয় খাদ্য ভিনেগার বেশি গ্রহণ করা স্বাস্থ্যসম্মত।

এছাড়াও আরও কিছু বিষয় রয়েছে যা অনুসরণ করলে গরমে সুস্থ থাকা সহজ হয়। সব সময় সুতির কাপড় পরা উচিত। যে কোনো ধরনের ব্যায়াম বা হাঁটার শুরুতে এবং শেষে পানি খেতে হবে। অতিরিক্ত গরম থেকে আসার পর, ঘরে রাখা স্বাভাবিক পানিতে অবশ্যই চোখে এবং নাকে পানির ঝাপটা দিতে হবে। মুখের এবং শরীরের লালচে ভাব কমার জন্য একটু খোলা জায়গায় বসা, বাতাস করা যেতে পারে। কিছুক্ষণ পর এক গ্লাস মোটামুটি ঠাণ্ডা স্যালাইন পানি খেলে সঙ্গে সঙ্গে উপকার পাওয়া যায়। মনে রাখবেন, পানির তৃষ্ণা পাওয়ার আগেই পানি পান করা উচিত। এতে শরীর থেকে অতিরিক্ত ফ্লুইড বের হয় না। করোনাকালে গরমে বরফ ঠা-া পানীয় খাবেন না।

রোদ থেকে তেতে জ্বলে পুড়ে এসে হঠাৎ করে ঠাণ্ডা পানি খাবেন না। গোসলে ঢুকবেন না। একটু জিরিয়ে নিয়ে পানি খান। গোসল করুন। রোদ থেকে এসে দুম করে আইসক্রিম, কুলফি, ফ্রিজের ঠাণ্ডা পানি, বরফ পানি ভুলেও খাবেন না। যে কোনো জ্বরকে ভাইরাস ফিভার, এমনিই সেরে যাবে ভেবে রোগ দীর্ঘদিন পুষে রেখে বিপদ ডেকে আনবেন না। চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, করোনা ইত্যাদি টেস্ট করান। সাদা বা হালকা রঙের ঢিলেঢালা পোশাক পরুন। রোদে ছাতা বা সানগ্লাস নিন। একটানা রোদে হাঁটবেন না বা কাজ করবেন না। এতে ত্বকের ক্ষতি হয় এবং ত্বক পুড়ে যায়। মাঝে মধ্যে বিশ্রাম নিন।
এমনিতেই করোনার কারণে এই গরমে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার প্রতি আরও বেশি নজর দেওয়া দরকার।

এসময় শরীর ঘামে বেশি। শরীরে ঘাম আর ময়লা মিশে চ্যাটচেটে আঠালো অবস্থা তৈরি করে। এতে শরীরে ফাঙ্গাস, ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া ইত্যাদির উপদ্রব শুরু হতে পারে। আর কে না জানে, ব্যাকটেরিয়ার প্রভাবে ঘাম থেকে দুর্গন্ধের উৎপত্তি হয়। এ থেকে রক্ষা পেতে গরমে প্রতিদিন অন্তত দুবার সাবান দিয়ে ভালো করে গোসল করুন। সুস্থ থাকতে করোনাকালে প্রতিদিন বাইরে থেকে এসে মুখমণ্ডল ও হাত-পা ভালো করে সাবান দিয়ে ধুয়ে গোসল করতে ভুলবেন না। সব সময় সামাজিক দূরত্ব রক্ষায় সচেষ্ট হোন। নিজে বাঁচুন। অন্যকে সচেতন করুন। করোনা মহামারি ঠেকান।

শেখ আনোয়ার : বিজ্ঞান লেখক ও গবেষক
সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
xposure7@gmail.com