চামড়া, পাট ও মাটির আগামী

ঢাকা, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৮ আশ্বিন ১৪২৭

চামড়া, পাট ও মাটির আগামী

সাঈদ চৌধুরী ৬:০২ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ০৬, ২০২০

print
চামড়া, পাট ও মাটির আগামী

বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় আন্দোলন টেকসই উন্নয়নের ধারাকে সামনে এগিয়ে নেওয়া। টেকসই উন্নয়ন বলতে বড় একটি জায়গাজুড়ে রয়েছে পরিবেশের সুরক্ষা! পরিবেশ সুরক্ষার কথা এলেই সবার প্রথমে সামনে আসবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বড় চ্যালেঞ্জ প্লাস্টিক ও পলিথিন জাতীয় পণ্য। এই প্লাস্টিক যখন একটি সমস্যার নাম তখন আমাদের সম্পদগুলোই প্রাপ্তির জায়গা সৃষ্টি করতে পারে। মাটি, পাট এবং চামড়া আগামী বিশ্বের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় টেকসই উন্নয়নের ধারক হবে। পচনশীল সিনথেটিক প্লাস্টিক নিয়ে নতুন করে ভাবার জায়গা করার চেয়েও ভালো চিন্তার প্রকাশ ঘটাতে পারে এই তিন উপাদান। অথচ এখানেই আমরা কোনো উন্নয়ন ঘটাতে পারছি না!

চামড়া নিয়ে এবারও বড় ধরনের হতাশার জায়গা সৃষ্টি হল। ঈদের দিন রাতে গাজীপুরের শ্রীপুরের কয়েকটি বাজার ঘুরেছি। কোথাও দেখিনি চামড়া ব্যবসায়ীরা স্বস্তিতে আছে! সরকার নির্ধারিত দাম তো নয়ই বরং চামড়া ফেলে দিতে হয়েছে অনেক জায়গায়! খাসির চামড়া দুই থেকে তিন টাকা এবং গরুর চামড়া বিক্রি করতে হয় পঞ্চাশ টাকায়! তখন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা পড়ে যান বিপাকে। পয়সা না উঠলেও চামড়া তারা ফেলে দেন বিভিন্ন জায়গায়! রাজশাহীতে পদ্মানদীতে চামড়া ফেলে দেওয়ার দৃশ্য আমাদের ভাবিয়েছে। চামড়ায় এভাবে দর পতন ও অবহেলার কারণে একটি শ্রেণির মানুষ ঈদকে ঘিরে যে তাদের ক্ষুদ্র ব্যবসার একটি বড় বাজার সৃষ্টি করে তারা জীবিকা নির্বাহ করত তাদের সমস্যা হয়েছে বহু। অনেক মাদ্রাসা চামড়ার টাকায় চলতে পারত অনেক দিন। বিশেষ করে এতিমখানাগুলোর বর্তমান চিত্র খুব নাজুক। তাদের প্রতিদিনকার খাবার জোগানোর ক্ষেত্রে বড় একটি ধাক্কা লেগেছে এই চামড়ার দর পতনের কারণে! গত বছরও এভাবেই লিখেছিলাম। অথচ চামড়ার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে প্লাস্টিক, রাবারের ব্যবহার অনেকটাই কমিয়ে ফেলা সম্ভব। 

যদি প্লাস্টিকের বদলে চামড়া বা পাটের ব্যাগ সস্তাতে তৈরির ব্যবস্থা করা যায় তবে টেকসই উন্নয়ন যেমন ত্বরান্বিত হবে তেমনি আমাদের চামড়া শিল্পের উন্নয়নও দ্রুতগতি হবে। পাটের ক্ষেত্রে ভাবনা একই। পাটের সরকারি ফ্যাক্টরি বন্ধ করে দেওয়া হল। এক সময়ের সোনালি আঁশ এখন অযতনের পণ্য! শুধু অযতন বললে ভুল হবে মনোযোগও নেই বললেই চলে। পাটের পলিথিন নিয়ে আসার কথা ছিল বাজারে। তার জন্য গবেষণাও হয়েছে অথচ এখনও মুখ দেখল না সে গবেষণার।
এক সময় এমন ছিল যখন দড়ি বা রশি বলতেই পাটের দড়ি বোঝানো হত। এখন সামান্য গরু ছাড়ল বাঁধতেও ব্যবহার করা হচ্ছে প্লাস্টিকের রশি! এগুলো পচে যায় না যার কারণে যখন ছিঁড়ে যায় তখন এ রশিগুলো ফেলে দেওয়া হয় মাটিতেই। পরিবেশ দূষণের এ ক্ষেত্রগুলো কোনো জরিপে আসেইনি কখনও!

এভাবে আর কত? পাট, চামড়া, মাটির বস্তু তৈরিতে এখন থেকেই ভাবনা শুরু করতে হবে। নতুন নতুন চিন্তা যোগ করার ক্ষেত্রে ভাবতে হবে এমন বিষয় যাতে একদিকে পণ্যের দাম কম হয় অন্যদিকে খুব বেশি প্রয়োজনীয় হয়। আমাদের চারপাশের সব প্রয়োজনীয় বস্তু এখন প্লাস্টিকের দখলে। পাট দিয়ে শুধু ব্যাগ নয়, উদ্যোগ নিতে হবে নিত্য প্রয়োজনীয় বস্তু তৈরিতে পাটের ব্যবহার বাড়ানো। টিভির কাভার, মোবাইল ব্যাগ, কম্পিউটার রাখার ব্যাগ, কাচের প্রলেপ যুক্ত পাটের বোতল, অফিসিয়াল বিভিন্ন ধরনের পণ্য তৈরি করা না গেলে পাটের জনপ্রিয়তা আনা সম্ভব হবে না। এর সঙ্গে সরকারের নীতিমালারও কিছু পরিবর্তন করতে হবে। পরিবেশ সুরক্ষার জন্য গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গে আইন ও নীতিমালায় যদি সাধারণ মানুষের ব্যবহার্য পণ্যগুলো কী ধরনের হবে তা বলে দেওয়া যায় সে বিষয়টি হতে পারে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। যেমন বলা যেতে পারে, প্লাস্টিক বেশি ব্যবহার করলে সরকারকে কর দিতে হবে প্রতি বোতল বা পণ্যের জন্য নির্দিষ্ট হারে এবং পাটের, চামড়ার বা মাটির তৈরি জিনিস ব্যবহার করলে সরকার প্রণোদনা বা ঋণ সুবিধা অথবা নির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারে ছাড় দেওয়ার বিষয়ে ভাববে তবে সাধারণ মানুষ এগুলো ব্যবহারে উৎসাহ দেখাবে এবং ব্যবহার বাড়াবে।

সাঈদ চৌধুরী, শ্রীপুর, গাজীপুর