আঁধার পেরিয়ে সূর্য উঠুক

ঢাকা, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৪ আশ্বিন ১৪২৭

আঁধার পেরিয়ে সূর্য উঠুক

সামসুজ্জামান ৬:১৩ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ০৫, ২০২০

print
আঁধার পেরিয়ে সূর্য উঠুক

বিশ্ব অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখেছে এ দেশ এ জাতি কখনও মাথা নত করেনি কোনো অপশক্তির কাছে। তৎকালীন ভারতবর্ষে ইংরেজ বেনিয়ারা জোর করে বাঙালিদের দিয়ে নীল চাষ করাত। যার ফলে শুরু হয় ‘নীল বিদ্রোহ’। এই বিদ্রোহে বেনিয়ারা মাথা নত করে সুড়সুড় করে পালিয়ে যায়। আর কখনও পারেনি নীল চাষ করাতে। এ নিয়ে কবি সৈয়দ শামসুল হক তার লেখায় বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন। সুকান্ত ভট্টাচার্য তার ‘মর্মর’ কবিতায় লিখেছেনÑ সাবাস বাংলাদেশ, এ পৃথিবী/ অবাক তাকিয়ে রয়/ জ্বলে পুড়ে ছারখার/ তবু মাথা নোয়াবার নয়।

এ দেশ আমাদের সর্ব অহংকার। অবাক বিস্ময়ে বিশ্ব মানচিত্রে ছোট দেশটির দিকে তাকিয়ে থাকে সারা বিশ্ব। আমাদের অনেক গবেষক বিদেশে বসে যখন নতুন কিছু আবিষ্কার করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয় তখন গর্বে বুকটা ভরে যায়।

সারা বিশ্ব আজ করোনা মহামারির শিকার। প্রাণঘাতী নতুন এই ভাইরাস নিয়ে সকলেই আতঙ্কিত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এই মহামারির প্রতিষেধক আবিষ্কারে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। স্বাস্থ্য খাতে বাড়িয়েছে বাজেট। আমাদের দেশেও খুব জোরেসোরে চলছে এই ভাইরাসের প্রতিষেধক আবিষ্কারের চেষ্টা। সরকারও এই খাতে বিশেষ বরাদ্দের ব্যবস্থা করেছেন। ভাইরাসটি এতই মারাত্মক, আক্রান্ত ব্যক্তির স্পর্শে এলেই সে আক্রান্ত হয়ে যাবে। এছাড়া হাঁচি, কাশি থেকেও এ ভাইরাস অন্যের শরীরে প্রবেশ করে তাকে আক্রান্ত করছে।

মানুষের এমন চরম দুঃসময়ে আমাদের দেশের এক শ্রেণির অর্থলোভী করোনাকে হাতিয়ার করে নমুনার পরীক্ষার নামে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে রক্ত নিয়ে পরীক্ষা না করিয়েই দিয়েছে ভুয়া পরীক্ষার সনদ। যারা কাজটি করছে সে সব প্রতিষ্ঠানের নেই কোনো বৈধ কাগজপত্র। সাহেদ, সাবরিনা এবং শারমিন এ ব্যবসা করতে গিয়ে ‘বিখ্যাত’ কিংবা ‘কুখ্যাত’ হয়ে গেছেন। রিজেন্ট হাসপাতাল এবং জেকেজির নাম এখন বিশ্ববাসী জানে। জানে এদের কার্যকলাপ সম্পর্কেও।

উপমহাদেশের প্রখ্যাত শিল্পী ভূপেন হাজারিকার কণ্ঠের আওয়াজ ঠিকই ছিল, আবার ভুলও ছিল। তিনি দরাজ গলায় যেমন গেয়েছিলেন ‘মানুষ মানুষের জন্যে/ জীবন জীবনের জন্যে’ তেমনি একই গানের অন্য কলি ছিল ‘মানব কখনও হয় না দানব/ দানব কখনও হয় না মানব’/ যদি দানব কখনওবা হয় মানব, লজ্জা কি তুমি পাবে না’? সাহেদের অপকর্মের কথা লিখতে গেলে একটি বই হয়ে যাবে। র‌্যাবের অভিযানে উদ্ধার করা ল্যাপটপ থেকে তার সংগ্রহ করা ১৬ হাজার নমুনার মধ্যে ১৪ হাজার ৬শ’ নমুনার ভুয়া সনদ দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। নমুনা প্রতি আদায় করা হয়েছে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত। প্রতারকরা পথভ্রষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের আশীর্বাদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিভাগের কতিপয় দুর্নীতিপরায়ণ লোকের সহায়তা পেয়েছে। বৈশ্বিক ক্রান্তিলগ্নে বৃদ্ধ ভিক্ষুক নাজিমুদ্দিন যখন ভিক্ষার দশ হাজার টাকা তুলে দেন সরকারের হাতে, চিকিৎসক মহিউদ্দিন করোনা রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যান না ফেরার দেশে তখন বর্বর প্রতারকের দল লড়াইরত সকল শ্রেণির মানুষের মহতী কাজগুলোকেই মøান করেনি, বিশ্বে বীর জাতির সুনাম ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছে।

স্বাস্থ্য দফতরের মন্ত্রীও ছিলেন নিশ্চুপ। দুপুর আড়াইটার স্বাস্থ্য বুলেটিনই ছিল একমাত্র করোনার চিকিৎসা!

সাহেদ, সাবরিনা ও শারমিন গংয়ের জন্য বীরের জাতি খ্যাত আমাদের লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যাচ্ছে। কারণ এদের কীর্তিকলাপ সারা বিশ্বের মিডিয়াগুলো ফলাও করে প্রচার করছে। আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর তা এখন আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, গুরুত্বপূর্ণ দফতরটি কি একেবারেই এতিম। এর দেখভালের জন্যে কেউ নেই। এত অঘটন ঘটার পর এই দফতরের মহাপরিচালককে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার একার পক্ষে অবৈধ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চুক্তি করা সম্ভব হয়নি। আমরা মিডিয়ায় দেখছি রিজেন্টের সঙ্গে চুক্তির সময় সংশ্লিষ্ট দফতরের মন্ত্রী মহোদয়ও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাহলে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে মন্ত্রী নিশ্চয়ই এ ব্যাপারে জ্ঞাত ছিলেন। অবশ্য তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, মহাপরিচালকের অনুরোধে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। একজন মন্ত্রীর মুখে এমন কথা অশোভনীয়। কারণ তিনি সেই দফতরের প্রধান। দফতর সম্পর্কে সমস্ত দায়ভার তাকেই নিতে হবে।

মানুষের বেঁচে থাকার জন্যে স্বাস্থ্য বিভাগ অত্যাবশ্যক। কিন্তু কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে এসেছে। এই বিষধর সাপের দাঁত তুললেই সমস্যার সমাধান হবে না। একে একেবারে মেরে দিতে হবে। তার জন্য যা প্রয়োজন তা সরকারকে করতেই হবে। কারণ দফতরটি নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই।

শুধু মহাপরিচালককে দায়ী করলেই হবে না। এখানে যে সিন্ডিকেট কাজ করছে তা সমূলে উচ্ছেদ করে নতুন আঙ্গিকে সাজাতে হবে গুরুত্বপূর্ণ বিভাগটিকে। আর সাহেদ, সাবরিনা, শারমিনের মতো দুর্বৃত্তদের খুঁজে বের করে ফাঁসির দড়িতে ঝোলাতে হবে। কত অমানবিক ব্যাপার, সাহেদের অ্যাম্বুলেন্স পথচারীকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে আহত ব্যক্তিকে সেই অ্যাম্বুলেন্সে করে তার হাসপাতালে এনে ভর্তি করাত। হাতিয়ে নিত মোটা অংকের টাকা। এই দানবের যে সব কাহিনী বেরিয়ে আসছে তাতে আল্লাহর আরশ পর্যন্ত কেঁপে যাবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এমনই ভঙ্গুর অবস্থায় পৌঁছেছে যে, ঢামেকে লাশের ব্যবসা নিয়ে মারামারি পর্যন্ত হচ্ছে। সেখানকার ডাক্তাররা কর্মচারী সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে গেছে।

সাহেদের বুকের পাটা আছে বলতে হয়। র‌্যাবের তদন্ত কর্মকর্তার জিজ্ঞাসাবাদের সময় যে বলেছে স্যার, জামিনে আসার পর অনেক গল্প শোনাব। তবে আমরা জানি না, সাহেদের বিষয়টি কতদূর গড়াবে। ইতোপূর্বে আমরা দেখেছি ক্যাসিনোর লাল ঘোড়ার দৌড়। পাপিয়ার অবৈধ ব্যবসা মামলার গতি। হলমার্ক কেলেঙ্কারি, সাংবাদিক হত্যার ফাইল গায়েব। এ কারণে সন্দেহ একটা থেকেই যায়।

দেশ আজ দ্রুত উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে। এমন সময় এত বড় ধাক্কা সামলে উঠতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ একান্তই কাম্য। না হলে আমাদের বীরের উপাধিটি মøান হয়ে যাবে। রাতের আঁধার কাটিয়ে ঝলমলে দিনের আলো আমাদের দেখতেই হবে।

সামসুজ্জামান : কলাম লেখক
shamsuzzaman07@gmail.com