কী এক দুঃসহ কাল!

ঢাকা, শনিবার, ১৯ জুন ২০২১ | ৫ আষাঢ় ১৪২৮

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

কী এক দুঃসহ কাল!

আরাফাত শাহীন
🕐 ১১:৪১ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ৩১, ২০২০

কী এক দুঃসহ কাল!

পবিত্র ঈদুল আজহা আগামীকাল। মুসলিমদের অন্যতম বৃহৎ এই ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবে একটা সাজ সাজ রব পড়ে যায়। সাধারণত ঈদের কয়েকদিন আগে থেকেই এর আমেজ পাওয়া যেতে থাকে। কিন্তু এবারের বিষয়টা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমরা একটা অস্থির সময় পার করে চলেছি। এর পূর্বে ঈদুল ফিতর আমরা সুস্থিরভাবে পালন করতে পারিনি। পৃথিবীজুড়ে চলে আসা ভয়ঙ্কর মহামারি সমস্ত কার্যক্রমকে ভয়ানকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ঈদুল ফিতরের নামাজ ঈদগাহে গিয়ে আদায় করতে পারিনি। হয়ত এই ঈদেও সবাই একত্রিত হতে পারব না। মনের মধ্যে একটা খুঁতখুঁতানি থেকেই যায়। ঈদের সময়ে ঈদগাহে গিয়ে নামাজ আদায় করে পরস্পরের সঙ্গে বুকে বুক না মেলালে ঠিক শান্তি পাওয়া যায় না। আর এভাবেই তো আবহমানকাল ধরে আমাদের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বজায় থেকেছে।

কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে বাংলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে বেশ বড়সড় একটা পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। এই পরিবর্তন বুঝে নিতে হলে বড় কোনো বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই। গ্রামের ক্ষুদ্র চাষিরা ঈদকে সামনে রেখে বেশ কয়েক বছর ধরে বাণিজ্যিকভাবে গরু-ছাগল পালন করে থাকে। একটা সময় এই কাজে শুধু গ্রামীণ কৃষকেরা অংশ নিলেও বর্তমানে উচ্চশিক্ষিতদের একটা বড় অংশ পশু পালনের সঙ্গে জড়িত; এখানে তাদের জীবন ও জীবিকা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কোরবানির গরু ক্রয়-বিক্রয়ে যে বিশাল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ চলে তাতে এসমস্ত ক্ষুদ্র চাষি ব্যাপক লাভবান হন এবং একটা বছর তারা নিশ্চিন্তে পার করতে পারেন। কিন্তু এবার তাদের জন্য সময়টা বড় কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক চাষি গরু বিক্রি করতে পারছেন না। কিংবা পারলেও লোকসান দিয়ে বিক্রি করতে হচ্ছে। আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। বেকারত্বের পরিমাণ বেড়েছে বহুগুণ। এই অবস্থায় খামারিরা যদি ক্ষতির সম্মুখীন হন তবে সেটা বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

মানুষের মধ্যে সহিষ্ণুতার পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে এসেছে। আমি বাড়িতে আসা অব্ধি দেখে আসছি, আশপাশের গ্রামগুলোতে মানুষের মারামারি, হানাহানি। একদিকে মানুষ করোনার আতঙ্কে কুঁকড়ে যাচ্ছে, অপরদিকে এই হানাহানি মানুষকে শঙ্কিত করে তুলছে। আসলে মানুষের মনে কোনো শান্তি নেই। সরকারি চাকরিজীবী বাদ দিলে অধিকাংশ মানুষই তাদের চাকরি হারিয়েছে। আবার অনেকেই বেতন পাচ্ছে না ঠিকমতো। স্বভাবতই মানুষের স্বভাবে পরিবর্তন এসেছে এবং মানুষ পূর্বের চেয়ে অধিকমাত্রায় হিংস্র  হয়ে উঠেছে। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার প্রথম দিকে বিশ্বব্যাপী মানুষে মানুষে সংঘাত কিছুটা কমে এসেছিল। মনে মনে ভেবেছিলাম, মানুষ হয়ত এবার শান্তির দিকে অগ্রসর হবে। কিন্তু বাস্তবে মোটেও তা হয়নি।

পৃথিবীর দিকে দিকে পূর্বের জ্বলে থাকা আগুন সাময়িক নির্বাপিত হলেও এখন পুনরায় আবার ব্যাপক তেজের সঙ্গে জ্বলে উঠতে শুরু করেছে। করোনার সূচনা হয়েছিল চীন থেকে। তাই ভেবেছিলাম, মানুষের মৃত্যু এবং ধ্বংসলীলা দেখে তারা হয়ত শান্তির দিকে এবার এগিয়ে আসবে। কিন্তু কিসের কী! তারা তাদের সামরিক শক্তিকে নিয়োজিত করেছে ভারতের দিকে। আবার ভারতও কম যায় না। তারাও পুরোপুরি যুদ্ধপ্রস্তুতি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেশী শক্তিশালী দেশদুটোর এমন তৎপরতায় শঙ্কিত হয়ে পড়েছি আমরা; আমাদের মতো ছোট্ট দেশগুলো। আবার আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদেশের মানুষকে গুলি করে হত্যা করছে। আমাদের দিক থেকে কোনো প্রতিবাদ পর্যন্ত নেই। আমরা কেউ সুখে নেই; বুকের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী অসুখ বাসা বাঁধছে যেন।

আমাদের এই ছোট্ট সোনার দেশটা বহুকাল ধরেই দুর্নীতিতে বিশ্বে প্রথম কাতারে অবস্থান করছে। সাধারণত কোনো বিষয়ে প্রথম কিংবা দ্বিতীয় হলে আমরা বড্ড খুশি হই। আমাদের সন্তানেরা স্কুলে ভালো ফলাফল করলে দারুণ উল্লসিত হই। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে দুর্নীতিতে প্রথম কিংবা দ্বিতীয় হয়ে আমরা বড় লজ্জিত হয়েছি। আমাদের যখন বিশ্বদরবারে এভাবে উপস্থাপন করা হয় তখন জাতি হিসেবে লজ্জায় মাটির সঙ্গে মিশে যাই। মনে করা হয়েছিল, শিক্ষার হার বাড়াতে পারলে দুর্নীতির পরিমাণ কমে আসবে। কিন্তু সে আশার গুড়ে বালি। দশ বছর আগের তুলনায় বর্তমানে দেশে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা নিশ্চয়ই অনেক বেশি। কিন্তু আপনি হিসাব করে দেখবেন, দশ বছর আগের চেয়ে বর্তমানে দুর্নীতির পরিমাণ কয়েকগুণ বেশি। তাহলে শিক্ষার মূল্য রইল কোথায়? বরং বড় বড় চেয়ারে বসে আমরা নিশ্চিন্তে বড় বড় দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছি। দেশের জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পড়াশোনা করে আমরা তাদের বুকেই লাথি মারছি। একটু লজ্জা করা কি উচিত নয়?
অতীতে দুর্নীতি চোখের আড়ালে আবডালে হলেও বর্তমানে সেটা এমনই প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে যে সরকারকে বাধ্য হয়ে হার্ডলাইনে যেতে হয়েছে। কিন্তু কয়জনকে ধরে শায়েস্তা করা সম্ভব? করোনার এই মহামারির সময়ে এসে অনেক বড় বড় দুর্নীতিবাজ তাদের গর্ত ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এসে যেভাবে দুর্নীতির মাধ্যমে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে তাতে সমগ্র জাতিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বড় বড় নেতাদের আনুকূল্য নিয়ে দুর্নীতি করে বহুবার পার পাওয়া শয়তানদের কয়েকজন এবার ধরা খেয়েছে। কিন্তু এতেই কি সমস্যার সমাধান হবে? কিংবা যাদের ছত্রছায়ায় এসব কাজ সংঘটিত হয়েছে তাদের কি ধরা সম্ভব হবে? হাসপাতালে নকল মাস্ক সরবরাহ করা, করোনার রোগীদের ভুয়া রিপোর্ট দেওয়াÑ এগুলো তো মানুষ হত্যার সমপর্যায়ের অপরাধ। এদের বিচার কি আমরা দেখতে পাব?

একদিকে করোনা মহামারি আমাদের জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে অপরদিকে মড়ার ওপর খাড়ার ঘা’র মতো দেশে বন্যার প্রকোপ শুরু হয়েছে। আমাদের দেশের জন্য বন্যা কোনো নতুন বিষয় নয়। নদীমাতৃক এই দেশের মানুষ প্রতি বছরই বন্যার মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মোকাবেলা করে টিকে রয়েছে। কিন্তু বন্যা যখন মাত্রা অতিক্রম করে যায় তখন বড় সমস্যা দেখা দেয়। বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার বেশ আগেভাগেই বন্যা আঘাত হেনেছে। ইতোমধ্যে উত্তরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলা বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। মানুষ সেখানে অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করে চলেছে। সেখানে খাবার, পানি, ওষুধের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। একদিকে আমাদের দুর্নীতিবাজ মহাজনরা সুইস ব্যাংকে টাকার পাহাড় গড়ে তুলছে অপরদিকে অসহায় মানুষ মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে না পেরে ধুঁকে ধুঁকে মরছে। কর্মের মাধ্যমে যে অভিশাপ আমরা জোগাড় করে চলেছি কীভাবে তার প্রায়শ্চিত্ত করব! আমি ভেবে বের করতে পারি না।

একদিকে করোনার কারণে পৃথিবীর দিকে দিকে মানুষ অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ভোগ করে চলেছে; অপরদিকে মানবসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়তে গিয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে মানুষের প্রাণশক্তি। কোথাও বন্যা এসে আঘাত হানছে, কোথাও অনাবৃষ্টি দীর্ঘমেয়াদি রূপ নিচ্ছে, কোথাও ফসলের ক্ষেতে পঙ্গপালের আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়ছে মানুষ। কীভাবে এই দুঃসহ সময়ে মানুষ টিকে থাকবে? প্রাকৃতিক দুর্যোগের চেয়েও মানুষ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাদের নিজেদের কর্মকাণ্ড দ্বারা।

পৃথিবীর বুকে যুদ্ধ এক দীর্ঘমেয়াদি বিষফোঁড়া হিসেবে অবস্থান করছে। কেউ লড়ছে স্বাধীনতার জন্য, আবার কেউ বৃহৎ শক্তির তাঁবেদার হয়ে মানুষের রক্ত ঝরাচ্ছে। দক্ষিণ-এশিয়া বলুন, মধ্যপ্রাচ্য বলুন, আফ্রিকা বলুন- সবখানে মানুষের রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে সমানতালে। মানুষ তাদের পাপের দ্বারা পৃথিবীকে বড্ড ভারী করে তুলছে। এই পৃথিবী আর কতদিন মানুষের পাপের বোঝা বহন করতে পারবে?

সত্যি বলতে- আমরা এক দুঃসহ কাল অতিক্রম করছি। চারিদিকে নানা ধরনের অশান্তি এবং অরাজকতা বিরাজ করছে। পৃথিবীর কোনো অংশে অশান্তির আগুন লাগলে সেটা এসে আমাদের গায়েও লাগে; কারণ এই বিশাল মহাবিশ্ব থেকে নিজেদেরই আলাদা ভাবতে পারি না। দিকে দিকে মানুষের মধ্যে একটু শান্তির জন্য হাহাকার বিরাজ করছে। মানুষ একটা নতুন ভোরের প্রতীক্ষায় কাঙালের মতো অপেক্ষা করে রয়েছে। এই যে চারিদিকে নানা অনাচার এবং অশান্তি এর জন্য তো আমরা নিজেরাই দায়ী।

আমাদের মধ্যে অনেকেই চায় না পৃথিবীতে শান্তি বিরাজ করুক। পরাশক্তিগুলো পৃথিবীর দিকে দিকে অশান্তির বীজ বপন করে রেখেছে। তারা চায় মানুষ নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করতে করতে ধ্বংস হয়ে যাক। মানুষ যতদিন না তার মানবিক মূল্যবোধ অর্জন করতে পারবে; অপর মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান দিতে না পারবে ততদিন শান্তির দেখা পাওয়া যাবে না। করোনা মহামারি একটি প্রাকৃতিক ঘটনা। তাই এতে হয়ত আমাদের কোনো কর্তৃত্ব থাকতে না পারে; কিন্তু মানুষ হিসেবে যেগুলো আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি সেগুলো অবশ্যই মানুষের কল্যাণে লাগাতে হবে। আমরা যদি বোবা, বধির ও অন্ধ হয়ে থাকি তাহলে পৃথিবীতে শান্তি আসবে কীভাবে?

আরাফাত শাহীন : শিক্ষার্থী
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
smshaheen97@gmail.com

 
Electronic Paper


SA Engineering