মহামারিতে বিপর্যস্ত মধ্যবিত্ত

ঢাকা, রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২০ | ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭

মহামারিতে বিপর্যস্ত মধ্যবিত্ত

নাসরীন রহমান ৭:৩৬ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৪, ২০২০

print
মহামারিতে বিপর্যস্ত মধ্যবিত্ত

সাধারণ ছুটি তুলে নেওয়ার পর অনেকেই আশা করেছিলেন, করোনা বিপর্যয় কাটিয়ে এবার হয়ত সচল হয়ে উঠবে অর্থনীতি। কিন্তু উল্টো চিত্রই এখন হতাশার গহ্বরে নিমজ্জিত করছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের জীবনকে! বাংলাদেশে করোনার কারণে সাধারণ ছুটি ছিল ৩১ মে পর্যন্ত; এরপর ধীরে ধীরে অফিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সব খুলে দেওয়া হয়। কিন্তু গত একমাসের চিত্র আশার আলো জাগাতে পারেনি কারো মনে! ভালো নেই কেউ। চারিদিকে হতাশা, অস্থিরতা, অর্থসংকট! বিপর্যস্ত মধ্যবিত্ত। এমন দিন আর আগে আসেনি কখনো; করোনা বিপর্যস্ত করে দিয়েছে মধ্যবিত্তের জীবন, জীবিকা। টিকে থাকার লড়াইয়ে নেমেছে মধ্যবিত্ত!

করোনা নির্মূল হয়নি এখনো; বরং বীরদর্পে এগিয়ে চলছে! কিন্তু এরই মধ্যে সঞ্চয় ফুরিয়ে যাওয়া মধ্যবিত্তের জীবন খাদের কিনারে এসে ঠেকেছে। জীবন না জীবিকা প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে মানুষ জীবন বাঁচাতে নেমে পড়েছে জীবিকা টিকিয়ে রাখতে! করোনা সবকিছু পাল্টে দিয়েছে; এখন আর অন্যদিকে তাকানোর সময় নাই! মধ্যবিত্ত হিমশিম খাচ্ছে টিকে থাকার লডাইয়ে অবতীর্ণ হয়ে; এখন আর খুব ভালো থাকা নয়, কোনোমতে খেয়ে পড়ে টিকে থাকাই মুখ্য! টার্গেটের পেছনে দৌড়ানো নয় এখন জীবন টিকিয়ে রাখার দৌড়! এই পরিস্থিতিতে বেসরকারি অফিস, ব্যবসা খোলা থাকলেও অর্থনীতি তেমনভাবে গতিশীল হয়নি এখনো; অধিকাংশ শপিং মল, মার্কেট ক্রেতাশূন্য! কে বের হবে শপিং করতে? মানুষ এখন বিলাসী সামগ্রী কেনার চেয়ে বরং খাদ্যদ্রব্য, চিকিৎসা সামগ্রী, ওষুধ কিনতে ব্যস্ত! বিলাসী সামগ্রী যাও কেনাকাটা হচ্ছে অনলাইনে!

ওদিকে অধিকাংশ করপোরেট অফিসগুলো তাদের কর্মচারীদের পূর্ণ বেতন দিচ্ছে না; করোনার অজুহাত দেখিয়ে বেতন কেটে রাখছে ৩০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত! বেতন কমেছে, কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয় কমেনি বরং করোনায় উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে! তাই বাধ্য হয়ে কাটছাঁট করতে হচ্ছে সংসারের খরচের খাতার লিস্টিতে! এই অবস্থায় জীবনযাপন আরোও জটিল হয়ে পড়েছে তাদের।

নিম্নবিত্ত নেমে পড়েছে জীবনযুদ্ধে; এই মুহূর্তে তারা করোনার ঝুঁকি উপেক্ষা করে জীবিকাকে বেছে নিয়েছেন বাধ্য হয়েই! কারণ তাদের কাছে বিকল্প আর কিছু নেই। জীবন বাঁচাতে জীবিকা টিকিয়ে রাখতে হবে! ২৫ মার্চ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত কার্যত বন্ধ ছিল অর্থনৈতিক কার্যক্রম! যারা সরকারি চাকরি করেন শুধু তারাই ঠিকঠাক বেতন পেয়েছেন, পাচ্ছেন। এছাড়া বেসরকারি অফিসের কর্মী, ব্যবসায়ী, সংবাদপত্র অফিসের সাংবাদিক, নিম্নবিত্ত সবাই মোটামুটি অর্থকষ্টে আছেন। কীভাবে দিন কাটাচ্ছেন ভুক্তভোগীই জানেন।

সহসা অর্থনীতি চাঙ্গা হওয়ারও সম্ভাবনা নেই। অন্তত যতদিন করোনা নির্মূল বা সহনীয় পর্যায়ে না আসছে বা প্রতিষেধক আবিষ্কার না হচ্ছে। একদিকে করোনাভীতি অন্যদিকে জীবনযুদ্ধ! টানাপোড়নের জীবনে মধ্যবিত্তের এখন গলায় ফাঁস অর্থকষ্ট। স্ট্রেস আছে; পতন আছে, আশা নাই। এই জীবনই কি ছিল নিয়তিতে! আহারে জীবন। পকেটে টাকা নেই; চক্ষুলজ্জায় হাতও পাততে পারছেন না অনেকে। অন্যদিকে ভাড়া পরিশোধের জন্য বাড়ির মালিকের চাপ, জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে মধ্যবিত্তদের।

এক যুদ্ধক্ষেত্র যেন। মধ্যবিত্তের জীবন যুদ্ধ।

এক হিসাব বলছে, এরই মধ্যে ৫০ হাজারের বেশি লোক ফিরে গেছে গ্রামে। উঠতি মধ্যবিত্তের একটা অংশ কম ভাড়ার বাসায় চলে যাচ্ছেন। কেউ কেউ পরিবারকে গ্রামে পাঠিয়ে দিয়ে নিজে কম ভাড়ার মেসে গিয়ে উঠেছেন। ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বাড়িগুলোর ফটকে ঝুলছে টু-লেট!

আবার অনেক উচ্চবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত বাড়িওয়ালা ব্যাংক লোনের সুদের কিস্তি টানতে বাড়িভাড়া কমিয়েও ভাড়াটে পাচ্ছেন না। চিন্তায় তারাও। কী করে লোনের কিস্তি দেবেন। বাসা খালি থাকলে ভাড়া পাবেন না, ঢাকা শহরে অনেক বাড়িওয়ালা এই ভাড়ার টাকার ওপর নির্ভরশীল, এই টাকায়ই তাদের জীবন ব্যয় নির্বাহ হয়। আবার ব্যবসা-বাণিজ্য না থাকায় যেমন বিপাকে ব্যবসায়ীরা তেমনি অনেক দোকান মালিকও।

শায়লা আক্তার, বিপণি বিতানে তার নিজস্ব দুটি দোকান। স্বামী নেই, তিন সন্তান নিয়ে এই দোকান ভাড়ার টাকায়ই তিনি সংসারের খরচ চালান। কিন্তু করোনা শুরু হওয়ার পর থেকে ঠিকমতো দোকান ভাড়া পাচ্ছেন না, ভাড়াটিয়া ব্যবসায়ীকে ফোন করলে তারা বলছেন, কী করে ভাড়া দেব, তিন মাস মার্কেট বন্ধ ছিল। এখন যা খোলা, ব্যবসা নাই। নিত্য তাগাদা দিয়েও কাজ হচ্ছে না!

অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, এই করোনাকালে দেনাদার-পাওনাদার যেন ইঁদুর-বিড়াল দৌড় খেলায় মেতেছে। পাওনাদার তাগাদা দিচ্ছে দেনাদারকে, দেনাদার আরেকজনকে। এই হচ্ছে অবস্থা! কেউ ভালো নেই, কে কাকে উদ্ধার করবে? জীবন বাঁচাতে অনেকেই পেশার পরিবর্তন করছেন।

শ্রীপতি ধর, পেশায় পেশকর। কোর্ট বন্ধ থাকায় আয় নেই কোনো, এদিকে সংসারের খরচ। কী করবেন, বাধ্য হয়ে এই সময় ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায় নেমেছেন। গ্রাম থেকে আম এনে বিক্রি করছেন শহরে। তাতে বাসা ভাড়া না হলেও খাবার খরচ চলছে! করোনা মানুষের জীবনযাত্রার মান নামিয়ে দিয়েছে, বিআইডিএসের গবেষণা বলছে, করোনার প্রভাবে অর্থনৈতিক কর্মকা- স্থবির হয়ে পড়ায় দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ পরিবারের উপার্জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাজ হারিয়েছে ৩৬ শতাংশ মানুষ। আর নতুন করে দেশের ১ কোটি ৬৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের কাতারে যুক্ত হয়েছে।

করোনা মধ্যবিত্তকে নামাচ্ছে নিম্নবিত্তের কাতারে, আর নিম্নবিত্তদের নামাচ্ছে দরিদ্রের কাতারে। ভালো আছেন একমাত্র সরকারি চাকরিজীবীরা। করোনাকালে অর্থবিত্তের নৈমিত্তিক টানাটানির মধ্যে ছাপোষা মধ্যবিত্তের জীবন হিমশিম খেলেও সরকারি চাকরিজীবীদের অবস্থা এখনো সন্তোষজনক। মাস গেলেই মাইনে পাচ্ছেন, কোনো চিন্তা নেই তাদের। প্রস্তাবিত বাজেটেও সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সুখবরের দেখা মিলেছে।

সরকারি চাকুরেদের জন্য গ্রেড ভেদে প্রণোদনা আছে ৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থাৎ আগামী অর্থবছরের (২০২০-২১) বাজেটে তাদের জন্য বাড়তি বরাদ্দ থাকছে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বাবদ বরাদ্দ আছে ৬০ হাজার কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে সেটা দাঁড়াচ্ছে ৬৫ হাজার কোটি টাকা।

করোনার কারণে ১ম-৯ম গ্রেডের কোনো কর্মকর্তা মারা গেলে পেনশন সুবিধার বাইরেই তার পরিবার অন্তত ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা পাবে। এর মধ্যে করোনার কারণে বিশেষ প্রণোদনা ৫০ লাখ, চাকরিকালীন অবস্থায় মৃত্যুর জন্য আট লাখ, ১৮ মাস পর্যন্ত ল্যাম্প গ্রান্ট, কল্যাণ তহবিল থেকে গ্রুপ ইনস্যুরেন্সের টাকা, লাশ দাফনের জন্য পৃথক অনুদান, কল্যাণ তহবিল থেকে পরিবারের জন্য মাসিক ভাতা ইত্যাদি নানা সুবিধা রয়েছে।

প্রণোদনার বাইরে বেশির ভাগ সরকারি চাকুরেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর থেকে কাজ করতে হয়নি। উপরন্তু গত ৩১ মে থেকে সীমিত পরিসরে অফিস খুললেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অফিসগুলোতে অত্যন্ত কমসংখ্যক চাকুরেকে উপস্থিত থাকতে দেখা যাচ্ছে। এমনকি গাড়ি ব্যবহার না করেও উপসচিব ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তারা মাসে মাসে এ বাবদ ৫০ হাজার টাকা করে খরচ পাচ্ছেন!

টিকে থাকতে হলে মনোবল অটুট রাখতে হবে। ঘুরে দাঁড়াতে হলে আগে টিকে থাকতে হবে। আর সেজন্য মনোবল শক্ত রাখা জরুরি। এখন আর উচ্চাকাক্সক্ষা নয়, টিকে থাকার চিন্তা করতে হবে। পরস্পরের প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শন করতে হবে।

শুধু নিজেকে নিয়ে নয়, সকলকে নিয়ে ভাবতে হবে। একা বেঁচে থাকা নয়, সকলকে সঙ্গে নিয়েই বাঁচতে হবে তবেই করোণাত্তর পৃথিবী হবে এক মানবিক পৃথিবী। যে পৃথিবীতে সকলে সকলের জন্য এই প্রত্যয়ই হবে বেঁচে থাকার মূলমন্ত্র।

 

নাসরীন রহমান : কলাম লেখক

rahmannasrinbd@gmail.com