চলে যাচ্ছেন হাসির মানুষরা

ঢাকা, রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২০ | ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭

চলে যাচ্ছেন হাসির মানুষরা

শফিক হাসান ৭:৪৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৩, ২০২০

print
চলে যাচ্ছেন হাসির মানুষরা

গত সপ্তাহে আজকের এই দিনে ছাপা হয়েছিল আলম তালুকদারের লেখা। বেঁচে থাকলে আজ মঙ্গলবারেও তার লেখা ছাপা হত। তিনি নেই, লেখাও নেই। খোলা কাগজের রম্য সাময়িকী বাংলাওয়াশের প্রায় শুরুর দিককার লেখক আলম তালুকদার। লিখতেন নিয়মিত। প্রকাশিত লেখার কপি হাতে পেলে শিশুর সারল্যে উদ্ভাসিত হতেন। ছিলেন আগাগোড়াই হাসির মানুষ। আরেকজন হাসির মানুষ সাজ্জাদ কবীর।

তিনিও মূলত রম্য লেখক ছিলেন। স্যাটায়ার ম্যাগাজিন ‘উন্মাদ’-এর প্রধান নির্বাহী তিনি। সম্প্রতি গত হয়েছেন। তবুও সম্পাদক আহসান হাবীব উন্মাদের প্রিন্টার্স লাইনে তার নাম-পদ বহাল রেখেছেন। নামটা মুছে দিতে গেলে হয়ত বুক কাঁপে, মন ভাঙে। সুস্থ-সবল, জলজ্যান্ত মানুষের নাই হয়ে যাওয়া জীবিতের জন্য ভীষণ পীড়াদায়ক। আলম তালুকদার ও সাজ্জাদ কবীর চলে গেছেন ধরাধাম ছেড়ে। ফেসবুকে রয়ে গেছে তাদের আইডি। স্বজন-প্রিয়জনের বুকে ব্যথা-বিদীর্ণ হাহাকার। মৃত্যুর হিমশীতল স্পর্শ সবাইকে গ্রহণ করতে হবে। তবুও অকালে স্বজন হারানো ভীষণ বেদনার। এই হাহাকার মর্মমূলে বাজে। হাসির মানুষদের এই আচানক চলে যাওয়া কী বার্তা দেয়? জাতির জীবনে হাসি-আনন্দ কমে আসছে! হয়ত হ্যাঁ, হয়ত না। সব প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসা পেরিয়েও আমাদের রোদন কমে না। হৃদ-গহনে বেদনার যে চুঁইচুঁই ক্ষরণ তাতে সান্ত¡নার প্রলেপ পড়ে না এতটুকুও।

যিনি ছড়াকার, তিনিই রম্যকার!

তিনিই আবার আলম তালুকদার!

একই সঙ্গে ছড়াকার ও রম্য রচয়িতার কম্বিনেশন সচরাচর দেখা যায় না। কেউ কেউ রম্য ছড়া লেখেন বটে, কারো কারো ছড়ায় রম্য-রসের স্বাদ মেলে। কিন্তু দুটি পৃথক পরিচয়ে স্বতন্ত্র, এমনটি বোধ করি আর মিলবে না। এটা ঠিক, দক্ষ একজন ছড়াকারের মধ্যে থাকে শ্লেষ ও ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপের ছলে চাবুক হানার গুণ। ঠাট্টাচ্ছলে কঠিন কথা বলার ক্ষমতা অর্জনই বড় ছড়াকারের বৈশিষ্ট্য। ছড়া যেমন ‘কঠিন’ কর্ম, অন্যদিকে রম্যরচনাও খুব একটা সহজ কম্মো নয়। আলম তালুকদার সেই বিরলপ্রজ লেখকÑ একই সঙ্গে ধারণ করেছেন ছড়াকার ও রম্য রচয়িতার তকমা।

উভয় ক্ষেত্রেই স্বতন্ত্র মহিমায় ভাস্বর টাঙ্গাইলের কৃতি সন্তান। সাবেক এই আমলার চিন্তাধারা ছিল পরিষ্কার, অবস্থান সুসংহত। বুদ্ধিজীবীর নামে বুদ্ধি বেনিয়া হয়ে ওঠেননি বলেই ছিলেন হাজারো অনুরাগীর প্রিয়জন হয়ে। মাটি ও মানুষের সান্নিধ্যে। একদিকে রসরচনার মাধ্যমে জাতির মননে রস ঢেলে তাজা রেখেছেন, অন্যদিকে রোদ-বৃষ্টিতে দিয়েছেন ছড়ার চনমনে আমেজ। ছড়ায় সৃষ্টি করেছেন স্বতন্ত্র ধারা, অনুপম বলয়। তার কয়েকটি ছড়া ব্যাপক জনপ্রিয়। ফিরছে মানুষের মুখে মুখে, খবরের কাগজের ফিচার আইটেমে! তার জনপ্রিয় ছড়ার একটি হচ্ছে

পড়িলে বই

আলোকিত হই,

না পড়িলে বই

অন্ধকারে রই।

এই ছড়ার বক্তব্য তথা আবেদন কখনো ফুরাবার নয়। স্বতঃস্ফূর্ত বয়ানে চিরন্তন সত্য উচ্চারণ করেছেন আলম তালুকদার। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, ছড়াটি যে তার অনেকেই জানে না। রেফারেন্স হিসেবে প্রচুর ব্যবহার হলেও রচয়িতার নাম মুখে আনেন এমন মানুষের সংখ্যা নগণ্য। কেউ কেউ আবার অজ্ঞানতাবশত ‘প্রবাদ’ মনে করে কিঞ্চিৎ পরিবর্তন করেও পরিবেশন করছেন। যা একেবারেই অনুচিত। জাতীয় গণগ্রন্থাগারের ফটকের ডানপাশে ইট-পাথরের ওপরে মুদ্রিত এই ছড়া শোভা পাচ্ছে। চোখে পড়ে সবার, সহজেই। ছড়াটা কালের কষ্টিপাথরে খোদাই হয়ে গেল! বলা হয়, কোনো শিল্পীর একটি পঙ্ক্তি টিকে গেলে তিনি অমর হয়ে যান, পরিচিত হন জীবনশিল্পী হিসেবে। সমকালে আলম তালুকদার যে দ্যুতি দেখিয়েছেন তাতে ভবিষ্যতে বাংলা ভাষায় তার টিকে থাকা নিয়ে অন্তত সংশয় থাকার কথা নয়। আরেকটি ছড়ায়ও মাত করেছেন এই রসিকজন

শব্দ ছাড়া হয় না কিছু

শব্দ হল গুণ,

শব্দে জাগায় ভালোবাসা

শব্দ করে খুন।

ছড়াটিও হয়ে উঠেছে ‘শিক্ষণীয়’ । এমন সহজ সত্য হয় না। ছড়াটি তাই সমকালের হয়েও চিরকালের। বাংলাদেশের হয়েও সারা বিশ্বের। বস্তুত আজকের হানাহানি, সংঘাতের পেছনে রয়েছে অসুস্থ মানসিকতা, শব্দের যত্রতত্র প্রয়োগ ও অপব্যবহার। পারস্পরিক সম্পর্কে অনমনীয়তার কারণেই দেশে-বিদেশে বেড়ে চলেছে দ্বন্দ্ব-সংঘাত। শব্দ যেমন ভালোবাসা জাগাচ্ছে, খুনও করে চলেছে আকছার। চাইলে যে কেউ সহজেই গুণটির অধিকারী হতে পারে, বজায় রাখতে পারে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ। কিন্তু তা হয় না, নিজের মত ও অবস্থানকে বড় করে দেখতে গিয়ে মানুষ বিশৃঙ্খলাই বেশি পছন্দ করে! যে কারণে ভালোবাসার চেয়ে ঘৃণার চাষ হচ্ছে তুলনামূলক বেশি। এমন সরল সত্যই উচ্চারণ করেছেন সজ্জন আলম তালুকদার। এমন অসংখ্য ছড়া রয়েছে তার। যা পাঠান্তে পাঠক আর আগের মানুষটি থাকেন না!

রম্যসাহিত্যের বিরান প্রান্তরে আলম তালুকদার নিয়ত ফুটিয়ে চলেছেন রকমারি ফুল। বরাবরই রম্য রচয়িতার সংখ্যা স্বল্প। সেই অর্থে হয়ত পাঠকও কম। অল্প কয়েকজন লেখক রম্যসাহিত্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সাহিত্যের অন্যান্য ক্ষেত্রের তুলনায় এ জমিন বন্ধ্যা। আলম তালুকদারের বেশ কয়েকটি রম্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। খটোমটো শুষ্ক জীবনে রম্যরস খুবই দরকারি। যদিও জোগান অপ্রতুল! আলম তালুকদার প্রায় প্রতি সপ্তাহেই বিভিন্ন কাগজে পাঠকের উদ্দেশে নিবেদন করে গেছেন সৃষ্টিসম্ভার, রসাধার।

বরেণ্য এ লেখকের সম্ভারে ছিল যৌনগন্ধী কৌতুকসহ সব ধরনের কৌতুক-চুটকির বিপুল সংগ্রহ। কৌতুকের সঙ্গে কৌতুক জোড়া দিয়ে যে কোনো বিষয়ে লহমায় লিখে ফেলতে পারতেন রম্যরচনা। এমন পারঙ্গমতাও বড় লেখকের পরিচায়ক। ছড়া-রম্যরচনার বাইরেও রয়ে গেছে তার রচনার বিপুল ভাণ্ডার। এত বেশি বিষয়ে বিপুল পরিমাণ লিখেছেন, অবাক না হয়ে উপায় থাকে না। ধ্যানজ্ঞানে শুধু লেখা থাকলেই এমনটা সম্ভব।

নিজের পরিচয় দিতেন ‘অবশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও শিশুসাহিত্যিক’ হিসেবে। তার ফেসবুক প্রোফাইলে দেখা মেলে এমন পরিচয়-বর্ণনার। শিশুসাহিত্যিক না হয় বোঝা গেল ‘অবশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা’ কী? সেটা কি ক্ষয়ে যাওয়া মূল্যবোধ ও চলমান অপ্রত্যাশিত ঘটনাপ্রবাহের জন্য! সত্য-মিথ্যা যা-ই হোক, এটা সত্য একাত্তরে তিনি যে অস্ত্র ধরেছিলেন সেটা ছাড়েননি জীবনের শেষপর্যন্ত। অস্ত্রের রূপান্তর ঘটেছে শুধু। মুক্তিযুদ্ধ উত্তরকালে কলম হাতে নতুন করে সমাজ বিনির্মাণের চেষ্টা চালিয়েছেন। যাবতীয় অনাচার-অসঙ্গতির বিরুদ্ধে সোচ্চার আলম তালুকদারের কলম, কি বোর্ড। কলাম, গল্প, ছড়াসহ যে কোনো রচনায় রেখেছেন হালকা চালে গভীর চিন্তার ছাপ। তার মননের ছোঁয়া, লেখার ধারে যদি ঋদ্ধ হতে না পারি সেটা নিজেদেরই ব্যর্থতা ও কূপমণ্ডুকতার নেতিবাচক দৃষ্টান্ত।

সম্ভবত ২০০৪ সালে আলম তালুকদারের সঙ্গে আমার সরাসরি কথা হয়। প্রথম পরিচয় খুব একটা সুখকর ছিল না। চট্টগ্রামে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতা মাস্টারদা সূর্যসেনের স্মৃতি বিজড়িত একটি অডিটোরিয়াম প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয়েছিল বইমেলার। সেখানে অতিথি হিসেবে এসেছেন ঢাকার কয়েকজন বরেণ্য লেখক। আনিসুল হক, মোহিত কামাল, আলম তালুকদার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের বক্তা, আমন্ত্রিত অতিথি। কবি আবু হাসান শাহরিয়ার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় তখন নিজের বই বিক্রি করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। মেলাসহ বিভিন্ন জায়গায় বই বিক্রির জন্য প্রতিনিধি ছিল।

স্টলের সামনে দাঁড়ালে বিক্রয়কর্মী ভদ্রলোক নিজের পরিচয় জানিয়ে বললেন, স্যারের (আবু হাসান শাহরিয়ার) আসার কথা ছিল। শেষপর্যন্ত আসতে পারেননি। ঘনায়মান সেই সন্ধ্যায় বিক্রি-বাট্টা নিয়েও বেশ হতাশা ব্যক্ত করেছিলেন তিনি। অর্থনৈতিক সংকটের কথা বললে তিনি পাল্টা যুক্তি দেখালেন, রুচির সংকট; পাঠে অনীহা। কিছুক্ষণ পরে তার পাশে গিয়ে বসলেন লেখক-সাংবাদিক আনিসুল হক। চট্টগ্রামে বসবাসকারী আমার মতো ক্ষুদে মানুষের কাছে এরা ‘ঢাকার দূত’। স্বপ্নের মানুষ। আলো ছড়ানো বড় লেখক। আগ বাড়িয়ে আনিসুল হককে নিজের পরিচয় দিলাম, জানালাম বন্ধুসভা করার কথাও। নাম শুনে তিনি বললেন, এই নামে তো লেখক হওয়া যাবে না, ভাই!

তাহলে কী নামে হওয়া যাবে?

ছেঁকে ধরলাম আনিসুল হককে। তিনি বললেন, চিন্তাভাবনা করে বলতে হবে।

আমার যে এখনই চাই!

এমন ছেলেমানুষি আবদার ও অত্যাচার লক্ষ করে আলম তালুকদার হাঁক ছাড়লেন এই, তোমার হয়েছে?

স্থান ত্যাগ করতে করতে বললাম, হল আর কই? আপনার জন্যই তো পারলাম না!

কথায় আঞ্চলিকতার টান পেয়ে বললেন, তোমার বাড়ি কি ফেনী?

জানিয়ে দিলাম ফেনী নয়, তবে প্রতিবেশী জেলায়।

মঞ্চের বক্তৃতায় আলম তালুকদার ফিরলেন নিজের মজার চরিত্রে। ব্যাকরণ প্রসঙ্গে অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বললেন, পদ-কে যদি আমরা পা বলি ছোটরা সহজে শিখবে না?

চমৎকৃত হলাম এমন যুক্তিতে।

আনিসুল হকের বক্তব্যও চমক দিল। দর্শক-শ্রোতাদের লক্ষ করে তিনি বললেন, ‘দেখেছেন ভাই, আমি কেমন ছোটলোক; প্রধান অতিথি হব বলে সারারাত ট্রেন জার্নি করে এসেছি!’

আনিসুল হক জনপ্রিয় সাহিত্য বনাম চিরায়ত সাহিত্যের কথা বলতে গিয়ে টানলেন হুমায়ূন আহমেদ প্রসঙ্গ। বললেন, হুমায়ূন আহমেদ পাতায় পাতায় ছোট ছোট ‘গল্প’ পরিবেশন করেন। সেখানে থাকে চটক ও চমক। তুলনামূলক বিচারে গিয়ে বললেন, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের চিলেকোঠার সেপাই খুব ভালো বই। এই বই পুরোটা পড়েছেন কে? কেউ যদি পড়ে থাকেন আমি তার পা ছুঁয়ে সালাম করব।

কিছুক্ষণ অডিয়েন্স নীরব থাকলে একপর্যায়ে হাত তুললেন প্রয়াত কথাসাহিত্যিক, লিটল ম্যাগাজিন ‘কথা’ সম্পাদক কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর। শেষপর্যন্ত আনিসুল হক প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছিলেন কিনা কৌতূহল থাকলেও জানা হয়নি। প্রতিবেশী কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরকে জিজ্ঞেসও করা হয়নি পরে দুজনের আলাপ হয়েছে কি হয়নি! এখন তিনিও চলে গেছেন সব প্রশ্নোত্তর পর্বের বাইরে। জাহাঙ্গীর ভাই রেখে গেছেন শুধু ‘কথা’ । তার অনুপম লিটল ম্যাগাজিন। বছর কয়েক আগে ঢাকা থেকে কর্মস্থল চট্টগ্রামে যাওয়ার পথে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান।

ওই অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে কবি শাহিদ আনোয়ার সাজিয়েছিলেন জ্ঞানগর্ভ কথামালা। এমনকি আনিসুল হকের মোহিতো কামাল উচ্চারণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন। বলেছিলেন, আমরা তো বলি মোহিত কামাল, জানি না আনিসুল হক কীভাবে উচ্চারণ করেন!

বিরাগ (!) দিয়ে আলম তালুকদারের সঙ্গে পরিচয়ের সূচনা হলেও পরে সেটা অনুরাগে রূপ নিয়েছে। একই শহরের বাসিন্দা বলে দেখা হয়ে যেত চলতে-ফিরতে। দৌড়ও তো ছিল অভিন্ন গন্তব্যে। পথ চলার চেষ্টা করেছি এই বটবৃক্ষের ছায়ায়-মায়ায়! তার পরামর্শ পেতাম প্রতিনিয়ত। লেখালেখি থেকে শুরু করে সম্পাদনা সব ক্ষেত্রেই অভিজ্ঞতার নির্যাস দিয়ে ঋদ্ধ করতেন বরাবর।

সাজ্জাদ কবীরের সঙ্গে প্রথম দেখা হয় চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমিতে। আহসান হাবীব উন্মাদের লেখক-কার্টুনিস্টদের নিয়ে আয়োজন করেছেন কার্টুন প্রদর্শনীর। শূন্য দশকের শুরুতে আমাদের তখন লেখালেখির হাতেখড়ি। চোখের সামনে সাজ্জাদ কবীরকে দেখতে পাওয়া যেন স্বপ্নের মানুষকে কাছ থেকে ছুঁয়ে দেখতে পারার আনন্দ। উন্মাদে তার কত গল্প পড়েছি। বিশাল বিশাল সেই সব গল্প পড়া শুরু করলে যেন শেষই হত না। অনেক বড় করে লিখতেন। গল্প, গল্পের ভেতরে গল্প, গল্পের বাইরের গল্পসহ পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাঠককে দেখিয়ে ছাড়তেন। শুধু যে রম্যগল্প লিখতেন তা নয়। অনুবাদ করতেন। জড়িত ছিলেন প্রেস ব্যবসার সঙ্গে। একদিন কালি ও কলম পত্রিকায় ভাষাবিষয়ক লেখা দেখে পুলকিত হলাম। ভাষার বিকৃতি, অপব্যবহার, শব্দের ব্যূৎপত্তি নিয়ে তিনি যে অনুপুঙ্খ প্রবন্ধ লিখলেন তাতে নিজের বড় একটি ভুল ভাঙল। উন্মাদে রম্য লেখা মানুষরা চাইলে ‘কঠিন’ লেখাও লিখতে পারেন! কাঁটাবনে সৈকত হাবিবের ‘প্রকৃতি’তে তার নিয়মিত আনাগোনা। দেখা হলেই স্মিত হেসে বলতেন, ‘কেমন আছ?’ মৃদুভাষী ভদ্রলোকের অল্প কথাই যেন ভালোলাগার অনুরণন তুলত কানে, ছন্দ তুলত মনে।

করোনার আগ্রাসন না থাকলে এতদিনে সম্পন্ন হয়ে যেত আমাদের বড় একটি কাজ। আলম তালুকদারকে জানিয়েছি, সেই অনুযায়ী প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন তিনি। অন্যদিকে পরিকল্পনা ছিল, সাজ্জাদ কবীরকে সময় করে বলব। এমন ভাবনার বাস্তবায়ন ঘটেনি শেষপর্যন্ত। হায়, কে জানত সেই সময় আর আসবে না! বড় কাজে সাজ্জাদ কবীরের চিহ্নটুকু রাখতে পারব না। শেষপর্যন্ত আলম তালুকদারের অংশগ্রহণও নিশ্চিত করা যায়নি। এত যে মজার মানুষ তিনি, বুঝিয়ে দিতেন পদে পদে। আমাদের বন্ধু হিরন্ময় হিমাংশু, তালুকদার নামেই সমধিক পরিচিত। তালুকদারকে নিয়ে কিছু লিখলে তিনি তাকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলা হল কিনা সংশয়ে ভুগতেন। তিনিও যে তালুকদার! শেষমেষ একদিন বললেন, ‘যাকে উদ্দেশ্য করেই বলো, পুরো নাম লিখবে’। একদিন মেসেনজারে বললেন, ‘তুমি বোধহয় কোনো খেলা খেলছ, হে!’

প্রকৃতির স্বেচ্ছাচারী আচরণে মানুষ অসহায়। বিধির লীলাখেলা ডিঙিয়ে মানুষ অপরকে নিয়ে কতটুকুই আর খেলতে পারে, আলম ভাই? পৃথিবীতে মানুষ বড় অসহায়। বাঁধভাঙা অশ্রু, লোনাজল প্লাবিত হৃদয়ে আমরা শুধু স্মরণ করতে পারি হাসির মানুষদের। যারা আমাদের দোলা দিতেন নানাভাবে, অগ্রজ হিসেবে দিয়ে যেতেন স্নেহচ্ছায়া।

 

শফিক হাসান : সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

shafique_hasan79@yahoo.com