ভয় নেই, পাশে আছি

ঢাকা, শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২০ | ২২ শ্রাবণ ১৪২৭

ভয় নেই, পাশে আছি

মাজহার মুনতাসসির ৭:৪১ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৩, ২০২০

print
ভয় নেই, পাশে আছি

বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা গেছে করোনা আক্রান্তকে এলাকা থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে, বাড়িতে থাকলেও করোনার রোগীর কোনো খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে না, স্বামী করোনা আক্রান্ত শুনে পালিয়ে গেছে স্ত্রী, চিকিৎসা করায় মাঝরাতে চিকিৎসককে বের করে দিল বাড়িওয়ালা, আক্রান্ত বাবা-মাকে রাস্তায় ফেলে গেল সন্তান! আক্রান্ত সন্তানকেও বাবা-মা জঙ্গলে ফেলে গেছে এমন সংবাদও চোখে পড়েছে।

এবার একটু ভিন্ন গল্প বলি। কিছু সাহসী ও মানবিক মানুষের গল্প। চাকরির সুবাদে ২০১৪ সাল থেকে রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার বেগুনবাড়িতে থাকি। শিল্পাঞ্চল হওয়ায় এটা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। করোনার সংক্রমণ রোধে সরকার প্রথম দফায় গত ২৬ মার্চ থেকে ১০ দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। তখন ঢাকা ফাঁকা হয়ে যায়। ঈদ উৎসবের মতো। আমি যে বাসায় থাকি, সেটাও ফাঁকা হয়। ৪ এপ্রিল ঢাকাসহ পুরো দেশেই গার্মেন্টসসহ অনেক কারখানা খোলার কারণে কর্মীরা পরিবহন বন্ধ থাকা সত্ত্বেও কর্মস্থলে ফিরতে শুরু করে। এভাবে কিছুদিন চলায় এবার গার্মেন্টসসহ সকল কারখানা বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হল। আবার বাড়ি ফিরে যায় অধিকাংশ কর্মী, অন্যরা ঢাকায় থেকে যায়। এরপর থেকেই বাড়তে থাকে সংক্রমণ।

গত মে মাসের মাঝামাঝিতে হঠাৎ করে শরীরে হালকা জ্বর জ্বর অনুভব করছি। সঙ্গে হালকা কাশি। রোজার মাস, ক্ষুধাও কমে গেছে। দুপুর বেলায় খুব দুর্বল লাগত। ইফতারের পর আবার সুস্থ। এসময়টায় নাপা এক্সট্রা খাওয়া শুরু করলাম। দেখলাম কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। পরে ১৯ মে করোনার নমুনা দিয়ে এলাম। ২২ মে রিপোর্ট এল করোনা পজিটিভ। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। কী করব, কোথায় যাব কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।

থানা থেকে ফোন এল, কী ব্যবস্থা নেওয়া যায় একটু পরে জানাবে। আমার বাড়িওয়ালা ও অফিসে অবহিত করলাম। হাসপাতালে যাওয়া মানে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা। সংক্রমণের শুরু থেকে হাসপাতালেই রোগী বেশি মারা যাচ্ছে। সংবাদে জেনেছি। সবার সুরক্ষার কথা চিন্তা করে হাসপাতালে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। নিজেকে খুবই অসহায় মনে হচ্ছিল। গায়ে শক্তি পাচ্ছিলাম না। হাসপাতালে গেলে চিত্র কেমন হবে কল্পনা করে আতঙ্কিত হচ্ছিলাম। আমার করোনা হয়েছে সহকর্মীসহ অনেকে জানতে পেরে খোঁজ নিচ্ছেন, সাহস দিচ্ছেন।

রাত ১০টা। এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি আমাকে নিয়ে। একটু পর বাসার ম্যানেজার কল দিয়ে বললেন, আমার জন্য অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করা হচ্ছে, ঢাকা মেডিকেল বা মুগদা হাসপাতালে পাঠানো হবে। বললাম, ঠিক আছে। তার কিছুক্ষণ পর আরেকটা কল এল। রিসিভ করতেই অপর প্রান্তে থাকা ব্যক্তি বললেন, সাংবাদিক সাহেব বলছেন? বললাম, জি। তিনি বললেন, আমি রিপন, দক্ষিণ বেগুনবাড়ি বাড়িওয়ালা কমিটির সাধারণ সম্পাদক। আপনার করোনা হয়েছে শুনেছি। শ্বাসকষ্ট বা বুকে ব্যথা আছে! ‘না’ বলায় তিনি বললেন, যদি এগুলো না থাকে তাহলে বাসায় থেকে ঘরোয়া চিকিৎসা নিতে পারেন। আপনি চাইলে আমরা ব্যবস্থা করে দেব।

বুকের জগদ্দল পাথরটা নেমে গেল। নিজেকে একেবারেই হালকা মনে হল। বললাম, আমিও বাসায় থেকে চিকিৎসা নেওয়াটা ভালো মনে করছি। রিপন সাহেব বললেন, তাহলে বাসায় থাকেন। আপনার সব দায়িত্ব আমরা নিলাম। থানার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তারাও একমত। ভয় পাবেন না সাংবাদিক সাহেব। আপনার যেকোনো সময় যেকোনো প্রয়োজনে কল দেবেন। আপনার পাশে আছি।

এই সময় খোলা কাগজের ডিজিএম মনির হোসেন, নির্বাহী সম্পাদক শাহনেওয়াজ খান ভাই জানালেন নীলসাগর গ্রুপের চেয়ারম্যান ও খোলা কাগজের সম্পাদক আহসান হাবীব লেলিন স্যার আমার জন্য বসুন্ধরার করোনা বিশেষায়িত হাসপাতালে বেডের ব্যবস্থা করেছেন। জানালাম এখানকার বাড়িওয়ালা কমিটি আমাকে বাসায় রেখে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন। তারাও এটাতে মত দেন। বলেন এই সময়টায় হাসপাতালে না গিয়ে ঘরোয়া চিকিৎসা নেওয়াটাই উত্তম।

আমার সাবেক সহকর্মী, যুগান্তরের সহ-সম্পাদক সাঈদ আল হাসান শিমুল কল করে ক্রাইম রিপোর্টার ও ডাক্তার সাফির নাম্বার দিলেন। তখন রাত ১২টা বাজে। বললেন, কল দেন উনি রিসিভ করতে পারেন। এত রাতে ফোন দিতে গিয়ে বিব্রত লাগছিল। এসময় একটা নম্বর থেকে কল এল। রিসিভ করতেই বললেন, আমি সাফি। শিমুল আপনার কথা বলছিল। তার কল পেয়ে মনে হল, সুস্থ হয়ে গেছি। উনি বিস্তারিত জেনে বললেন, আপনার হয়ত করোনা ভুল রিপোর্ট এসেছে। রিপোর্ট যেহেতু এসেছে কিছু ওষুধ দিচ্ছি, খান। দেখবেন ৩-৪ দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে যাবেন।

রাতেই রিপন ভাই, আমার বাড়িওয়ালা নুরুল ইসলাম ভাইসহ অন্যরা ফ্লোরে আমাকে আলাদা করে দিলেন। যাতে অন্যরা সংস্পর্শে না আসে। পরের দিন বাড়িওয়ালা আমার জন্য ওষুধ, চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছু পাঠিয়ে দেন। বলেন, কোনো চিন্তা করবেন না সাংবাদিক সাহেব। আল্লাহ ভরসা, সুস্থ হয়ে যাবেন। যে কোনো প্রয়োজনে বলবেন। দ্বিধা করবেন না। ওই দিনই বিকালে খোলা কাগজ সম্পাদক আহসান হাবীব লেলিন স্যার কল করে আমার খোঁজখবর নেন। চিন্তা করতে নিষেধ করেন এবং বলেন যে কোনো প্রয়োজনে যেন তাকে ফোন দিই।

বাড়িওয়ালা ঈদের দিন ্তার বাসা থেকে রান্না করা খাবার, সেমাই পাঠান আমার জন্য। তারপরের দিন সম্পাদক স্যার বাসা থেকে খাবার পাঠান। শাহনেওয়াজ ভাইয়াও খাবার পাঠাতে চেয়েছেন। নিষেধ করেছি, আমার এখানে যে খাবার আছে তা খেতে আমার কয়েকদিন লেগে যাবে। মাই টিভির নূর ভাই, আনসারী ভাই কয়েকজন বড় ভাইয়ের পক্ষ থেকে অনেকগুলো ফল নিয়ে আসেন। আমার বাসার ম্যানেজার জসীম ভাইয়ের কথা না বললেই নয়। যাকে যে কোনো প্রয়োজনে কল দিয়েছি, সঙ্গে সঙ্গে পেয়েছি।

কথাগুলো এজন্য বললাম করোনা আক্রান্ত একজন মানুষ নিঃসঙ্গ অবস্থায় খুবই অসহায় বোধ করে। তার প্রতি নির্দয়, অমানবিক আচরণ নয়। তার প্রতি মানবিক হোন, তাকে সাহস দিন। বলুন, কোনো ভয় নেই, আপনার পাশে আছি। আপনি সুস্থ হয়ে যাবেন। ‘ভয় নেই, পাশে আছি’ কথাটা যে কত বড় প্রতিষেধক, যারা করোনা আক্রান্ত হননি বুঝতে পারবেন না। আমার তো মনে হয় করোনা আক্রান্ত রোগীর জন্য কথাটি সুস্থ হওয়ার জন্য ৮০ ভাগ প্রতিষেধক।

মাজহার মুনতাসসির : সাংবাদিক