নারীর মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধে নারী

ঢাকা, মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট ২০২০ | ১৯ শ্রাবণ ১৪২৭

নারীর মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধে নারী

ডিনা চৌধুরী ৭:৩০ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৩, ২০২০

print
নারীর মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধে নারী

দাদি শুধু মাকে বলতেন, যা করো ভেবে চিন্তে করিও। বেড়ারও কান আছে। মা বলতেন আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকলেও ওরা আমাদের ছাড়বে না। তাই মরতে হলে কিছু কাজ করেই মরব। মানুষকে দিয়ে, খাইয়ে আনন্দ পেতেন মা। মনে পড়ে, যেদিন মিলিটারিরা গোয়ালন্দ ঘাটে উঠে এল, সে কী এলোপাতাড়ি বৃষ্টির মতো গুলি। আমরা বাড়ির উঠোনে মাটির ওপর বারান্দার ডোয়া ঘেঁষে শুয়ে পড়েছিলাম।

শুনেছি ওদের সামনে আশপাশে যা কিছু ছিল ব্রাশফায়ার করে উড়িয়ে দিয়েছিল। নিরীহ মানুষ ও পশুর রক্তে হোলি খেলতে খেলতে গোয়ালন্দ ঘাট দখল করেছিল। সেইদিন আমাদের বাড়িতে একদল হিন্দু পরিবার এসে আশ্রয় নিয়েছিল। মা তাদের চাল ডাল হাঁড়ি দিয়ে বলেছিলেন, আমাদের চুলায় তোমরা রান্না করে খাও। যখন পরিস্থিতি একটু ঠা-া হবে তখন তোমরা চাইলে বাড়ি ফিরে যেও।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে দেশ স্বাধীন হল। স্বাধীনতা কথাটা বলতে-লিখতে যতটা সহজ আসলে কথাটার ওজন বিশাল। যা কারও বইবার ক্ষমতা নেই। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল স্বাধীনতা। শুধু আমাদের গ্রামের আশপাশের কথাই যদি ধরি। গ্রামের মেয়েদের ইজ্জতহানি, লুটপাট, গ্রামকে গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছিল। রাজবাড়ি শহরে চালিয়েছিল গণহত্যা। গোয়ালঘরের কুয়া ভর্তি ছিল শুধু লাশ আর লাশে। সে যে কী বীভৎস দৃশ্য। রাতের আঁধারে হিন্দু পরিবার বিলীন হয়ে গেল। বাপ-দাদার ভিটেমাটি ছেড়ে শুধু জীবন নিয়ে ভারতে পালিয়ে গেলেন।

জমিজমা ঘরবাড়ি, গরু-ছাগল জায়গার জিনিস জায়গাতেই পড়ে রইল। হারিয়ে গেল শুধু চিরচেনা মানুষগুলো। চোখের নিমিষে লুটপাট হয়ে গেল তাদের বাড়িঘর সবকিছু। রাজবাড়ি শহরে আমার চাচা শ্বশুর সেই সময়ের বিত্তবান প্রভাবশালী ব্যক্তি থাকা সত্ত্বেও। পরিবারের একজনকে হারিয়ে ফেললাম। তিনি আমার ভাশুর ফেলা চৌধুরী। খোরশেদ আলী চৌধুরী, ফেলা চৌধুরী যদিও অনেক পরে এসে আমার শ্বশুরবাড়ির আত্মীয় হলেন। খোরশেদ আলী চৌধুরীর সেই সময় অত্র এলাকায় এবং রাজবাড়ি শহরে লাখপতি নামেও পরিচিত ছিলেন।

বিহারি-মিলিটারিরা ভালো করে জানত, তাই তাকে ভয় করে চলত। কাকার কারণে আমাদের গ্রামের ওপর দিয়ে যদিও কাঁটার আঁচড়ও কেউ দিতে পরেনি। তবে চোখের পলকে বিহারিরা ফেলা ভাইকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। তারপর আর খুঁজে পাওয়া গেল না। যুদ্ধে গিয়ে এমন অনেক ছেলে আর ফিরে আসেনি। লাল সবুজের পতাকা পাওয়ার জন্য গ্রাম বাংলার প্রতিটি ঘরের প্রতিটি মানুষকে কোনো না কোনোভাবে মূল্য দিতে হয়েছিল সেই সময়ে।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিগত প্রায় পাঁচ দশকে জ্ঞানীগুণীরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য লিখে গেছেন। তবুও দু’একটি কথা বলতেই হয়। যুদ্ধের সময় যদিও আমি খুবই ছোট। ক্লাস টুতে পড়তাম বোধহয়। তবে কিছু কিছু ঘটনা এখনো আমার মনকে নাড়া দেয়। আমরা হলাম বীরের জাতি তাই রক্ত গরম করা কোনোকিছু ভুলে থাকতে বেশিদিন পারি না! লড়াই করতে আমরা কোনোদিন পেছনে ফিরে তাকাইনি। তাই অন্যায় দেখলেই রক্ত টগবগ করে ওঠে। তাই তো ভুলে যাইনি পাকিস্তানিদের জঘন্যতম বর্বরতা। ভুলে যাইনি ইতিহাসের জঘন্যতম অধ্যায়। যতদিন চন্দ্র সূর্য এই পৃথিবী থাকবে ততদিন কখনও ভুলব না মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস।

আগেই বলেছি, যুদ্ধ চলাকালে অনেক কর্মকা- চলত আমাদের বাড়িতে। ছোটবেলা থেকে মাকে দেখে আসছি সকাল-বিকাল কেরোসিনের স্টোভে চা বানাতে। এমনিতেও চা খেতে আমাদের বাড়িতে অনেকেই আসতেন। মা তাদের খাইয়ে তৃপ্তি লাভ করতেন। তারপর আমার বাবা এসেছেন ঢাকা থেকে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে গ্রামের অনেক মানুষ আমাদের বাড়িতে খবর শুনতে ভিড় জমাতে শুরু করলেন। বিকাল হতে না হতেই বাড়িটি জমজমাট হয়ে উঠত। অনেককে দেখেছি নিজের বাড়ির রেডিও না শুনে আমাদের বাড়িতে এসে জড়ো হতো। সেটাও মা-চাচার আতিথেয়তার কারণে। মাকে দেখতাম পাতিল ভর্তি করে চা বানিয়ে সকলকে পরিবেশন করতে। তাই রাতের খাবারের পর বাড়িতে আড্ডা জমে উঠত।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, আকাশবাণী কলকাতার খবর শুরু হতেই সকলে চুপ হয়ে যেতেন। ঘরের বারান্দা উঠানে মানুষে ভরে যেত। বারান্দায় পাতা হত সারি সারি চেয়ার। ঢালাও মাদুর পাতা হত উঠানে। সবার মধ্যে সে যে কী উত্তেজনা বিরাজ করত। কখন কোন খবর আসে তাই নিয়ে। আমাদের ছেলেরা কোথাও কোনো অপারেশনে পাকিস্তানিদের ধরাশায়ী করলে নিঃশ^াস বন্ধ করে সকলে শুনত। এত মানুষের সমাগম অথচ খবর চলাকালে কেউ টুঁ শব্দটি করত না। পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাজিত হতে শুনলে সকলে হৈহৈ রৈরৈ করে উঠত।

দেশকে শত্রুমুক্ত করেছিলেন আমাদের দামাল ছেলেরা। শুধু ছেলেরা বললে ভুল হবে। যুদ্ধ করেছেন আমাদের দেশের নারীরাও। দাঁত ভাঙা জবাব দিয়েছিলেন সেদিন পাকিস্তানি মিলিটারি বাহিনীকে। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে বাংলার মানুষ রুখে দাঁড়িয়েছিল। যার হাতে যা ছিল তাই নিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সেইদিন পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর। মান অপমানে বাঙালির গায়ের রক্ত টগবগ করে ফুটে উঠেছিল সেদিন। কুরুচিপূর্ণ পাকিস্তানিরা তা বুঝতে পারেনি। বাঙালিরা কেমন জাতি তারা কী করতে পারে। ওরা ভেবেছিল বাঙালি নারীরা শুধু ভাত রাঁধতে জানে। তাই তো সেইদিন যে যেখানে ছিলেন সেইখান থেকে নারীরাও দাঁতভাঙা জবাব দিয়েছিলেন।

পাকিস্তানি বাহিনী কাপুরুষের মতো কৌশল অবলম্বন করেছিল। ব্যবহার করেছিল অসৎ ও বেঈমান কিছু বাঙালিকে। এমন বেঈমান প্রতিটি জেলায় ছড়িয়ে রয়েছে এখনও। যাদের বাংলার সন্তান বলতে রুচিতে বাঁধে। এই বিশ্বাসঘাতক বাঙালি নামের শত্রুরা প্রতিটি ঘরে ঘরে হানা দিয়েছিল। আমাদের এলাকাও তার থেকে বাইরে ছিল না। শকুন হয়ে ঠুকরে দিয়েছিল শ্যামল সবুজ গ্রাম বাংলাকে। মায়ের মুখে শুনেছি, মা-বোনদের ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেলার কথা। জঘন্যতম অধ্যায় সৃষ্টি করেছিল তারা। যুগে যুগে মানুষ ভুল করে মানুষের কাছে আবার ক্ষমা চেয়ে তা শুধরে নিতে দেখেছি।

এই তো কিছুদিন আগে অস্ট্রেলিয়ান প্রাইম মিনিস্টার ক্ষমা চাইলেন এদেশের এবঅরিজিনদের কাছে। কিন্তু পাকিস্তানিরা যা করেছে তা ক্ষমারও অযোগ্য। তারপরেও ক্ষমা না চেয়ে ইতিহাসের খাতায় আবারও তারা প্রমাণ করল মনুষ্যত্বহীন জঘন্যতম জাতি হিসেবে। যতক্ষণ না তারা তাদের সংসদে ক্ষমা চাইছে ততক্ষণ এদের প্রতি ঘৃণার পরিমাণ একচুলও কমানো উচিত হবে না। শেষ...

 

ডিনা চৌধুরী : প্রবাসী লেখক

kanija.c@bigpond.net.au