ফেসবুকনির্ভর অপচিকিৎসা

ঢাকা, মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট ২০২০ | ১৯ শ্রাবণ ১৪২৭

ফেসবুকনির্ভর অপচিকিৎসা

সাহাদাৎ রানা ৯:২১ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১১, ২০২০

print
ফেসবুকনির্ভর অপচিকিৎসা

সারা বিশ্বে এখন আতঙ্কের নাম করোনাভাইরাস। আতঙ্কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন এক চ্যালেঞ্জও। করোনা বিশ্ববাসীকে চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড় করিয়েছে। সেই চ্যালেঞ্জের মধ্যেই যেন প্রতিদিন, দিন পার করছে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ। এর বিরূপ প্রভাবে থমকে গেছে প্রায় ছয়শ’ কোটি মানুষের জীবনযাত্রাও। এমন পরিস্থিতির মূল কারণ প্রতিদিনই সারা বিশ্বে করোনায় আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে।

কঠিন এমন অবস্থা থেকে বিশ্ববাসী কবে নাগাদ মুক্তি পাবেন তা কেউ বলতে পারছে না। কারণ এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাস প্রতিরোধে কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি। আপাতত করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ঘরে থাকাটা সবচেয়ে বেশি নিরাপদ। এটাই একমাত্র পথ। তাই সেই পথেই হাঁটছে পুরো বিশ্ব। বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। এমন খবরে সবার মধ্যে কাজ করছে অস্বস্তি ও ভয়। অস্বস্তি রয়েছে আরও বেশকিছু জায়গায়। বিশেষ করে করোনার ওষুধ আবিষ্কার না হওয়ায় মানুষ বিভিন্নভাবে পরামর্শ নিয়ে ওষুধ খাওয়ার চেষ্টা করছে। আর এক্ষেত্রে ফেসবুক হচ্ছে সবচেয়ে বড় মাধ্যম। যেখানে প্রায় সব বিষয়ে পাওয়া যাচ্ছে সমাধান!

বর্তমানে করোনা সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও বিভিন্ন জনের মতামত পাওয়া যাচ্ছে। অনেকে আবার অতি উৎসাহী হয়ে দিচ্ছেন বিভিন্ন ধরনের প্রেসক্রিপশন। যেন অনেকে পেশায় ডাক্তার না হয়েও হয়ে যাচ্ছেন ডাক্তার। মজার বিষয় হল, এমন কোনো বিষয় নেই যে রোগের চিকিৎসা পাওয়া যাচ্ছে না ফেসবুকের কল্যাণে। চিকিৎসা সম্পর্কে সামান্যতম জ্ঞান না থাকলেও নিজের ইচ্ছেমতো যে কোনো রোগের প্রেসক্রিপশন দেওয়া হচ্ছে। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে করোনা।

করোনাভাইরাসের এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট প্রতিষেধক আবিষ্কার না হলেও মানুষ বিভিন্ন বিষয় অনুসরণ করে সমাধানের চেষ্টা করছে। এখানে শঙ্কার বিষয় হল এমন অনেক রোগী আছেন যারা ফেসবুকের প্রেসক্রিপশন ফলো করে নানা ধরনের সমস্যায় পড়ছেন। এমনও হয়েছে করোনা হয়নি, কিন্তু আতঙ্কে ফেসবুক দেখে করোনার কথিত বিভিন্ন ওষুধ খেয়ে বিভিন্ন ধরনের জটিলতায় পড়েছেন। শঙ্কার বিষয় হল এমন রোগীর সংখ্যা করোনা বৃদ্ধির সঙ্গে দিন দিন বাড়ছেই। আর এমনটা হচ্ছে ফেসবুকের অবাধ ব্যবহারের কারণে।

বর্তমান নাগরিক জীবনে সচেতন মানুষ মাত্রই ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল। ব্যস্ত জীবনে তাই ইন্টারনেট ছাড়া চলা অনেকটা কঠিন হয়ে পড়ছে আমাদের জন্য। এমন প্রয়োজনীয়তা অবশ্য বাস্তবতার নিরিখে। কারণ ইন্টারনেট আমাদের সামনে আজ অসীম তথ্যভা-ারের দ্বার উন্মোচন করেছে। বিশেষ করে মুঠোফোনে ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়ায় ইন্টারনেট ব্যবহারের পরিধি আরো বিস্তৃত হয়েছে। এর বড় একটা অংশ জুড়ে রয়েছে ফেসবুকে।

এখন শুধু একটি নির্দিষ্ট বয়সের মানুষই ফেসবুক ব্যবহার করেন না। বরং এখন অপ্রাপ্ত বয়সের মানুষ থেকে শুরু করে সবাই যার যার প্রয়োজন মিটিয়ে থাকেন ফেসবুককে মাধ্যম করে। যুক্ত থাকেন দিনের অনেকটা সময়। সহজ কথায় বর্তমানে ফেসবুক হচ্ছে সময়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগমাধ্যম। এই মাধ্যমের সঙ্গে জড়িত দেশের প্রায় কয়েক কোটি মানুষ। প্রতিদিন একজন সচেতন মানুষ ঘুম থেকে উঠে ঘুমুতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ফেসবুকের মাধ্যমে দেশের খবর থেকে শুরু করে আত্মীয়স্বজন সবার সর্বশেষ খবর রাখেন।

শুধু তাই নয় অনেক ক্ষেত্রে ফেসবুকের কারণে সমাজে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তনের ঘটনাও ঘটছে। বিশেষ করে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডও পরিচালিত হয় ফেসবুকের মাধ্যমে। বিভিন্ন গ্রুপ খুলে গঠনমূলক উদ্যোগ বাস্তবায়ন ও বিস্তার সম্ভব হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল মানুষে মানুষে বন্ধন সৃষ্টিতে ফেসবুক রাখছে অগ্রণী ভূমিকা।

আলোর নিচে যেমন অন্ধকার থাকে তেমনি ফেসবুকের কিছু অপব্যবহারও রয়েছে। বিশেষ করে করোনাকালে তা আবারও নতুন করে সামনে এসেছে। ইদানীং আরও একটি বিষয় আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। তা হল আমাদের অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের ফেসবুক ব্যবহারের বিষয়টি। ফেসবুক ব্যবহারে দোষের কিছু নেই। তবে সম্প্রতি আমাদের অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানদের ইন্টারনেট ও ফেসবুকের প্রতি অতি আসক্তি রীতিমতো ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।

এটা বলার অপেক্ষা রাখে না ইন্টারনেট আমাদের সবার কাছে অসীম তথ্যভাণ্ডার; যা আমাদের সন্তানদের জন্য যেমন শিক্ষা ও বিনোদনের দ্বার উন্মোচিত করেছে তেমনি ফেলেছে অস্বস্তিতেও। নেতিবাচক কিছু কর্মকাণ্ডে এসব অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেমেয়েরা জড়িয়ে পড়ায় উঠেছে প্রশ্ন। সাম্প্রতিক সময়ে ইন্টারনেটের অপব্যবহারের কারণে শিশু-কিশোর, যুবক-যুবতীসহ নানা বয়সী মানুষ আজ অনেকটা হুমকির মুখে। বিশেষ করে প্রযুক্তির নেতিবাচক ব্যবহারে সমাজে বাড়ছে ধর্ষণ, নির্যাতন ও যৌন হয়রানির মতো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা।

এর জন্য ইন্টারনেট বা প্রযুক্তি কোনোভাবেই দায়ী নয়। দায়ী আমরা। বিশেষ করে যখন অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানরা ব্যবহার করছে ইন্টারনেট বা ফেসবুক। তারা ফেসবুকে যা ইচ্ছে লিখছে, শেয়ার করছে। ফেসবুক ছাড়াও রয়েছে অসংখ্য সামাজিকমাধ্যম। এসব সাইটে সম্পৃক্ততা তাদের নানাবিধ ঝুঁকিতে ফেলছে। অকারণে অপরিচিত মানুষ আপন হয়ে নানা ক্ষতিসাধন করছে। অপরাধের পথে পা রাখতে উৎসাহিত করছে। তাদের ব্যবহার করছে টোপ হিসেবে। এক গবেষণায় দেখা গেছে সারা দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর একটি বড় অংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে।

 আর সাইবার অপরাধের দিকে এখন বেশি ঝুঁকছে ১৮ বছরের কম বয়সীরা। এর কারণ আর কিছুই নয়, এই বয়সটা আসলে ভীষণভাবে রোমাঞ্চমুখী। ফলে তারা অগ্রপশ্চাৎ না ভেবেই ভুল পথে পা রাখে। এটা সত্যিই আমাদের জন্য শঙ্কার কথা। তবে শুধু যে অপ্রাপ্ত বয়স্করা ফেসবুকের অপব্যবহার করছে তা কিন্তু নয়। অনেক সচেতন মানুষও যা খুশি লিখছে ফেসবুকে। এর মধ্যে রয়েছে অনেক উসকানিমূলক লেখাও। যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে সমাজ ও রাষ্ট্রে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

বাস্তবতা হল করোনায় আপাতত কিছু স্বাস্থ্যবিধি দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে গরম পানিতে গার্গল করা, প্রয়োজনে উষ্ণ গরম পানি বা চা খাওয়া, বেশি করে ভিটামিন সি জাতীয় খাবার খাওয়া, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করা বা বারবার হাত ধোয়া। এগুলো ইতিবাচক পরামর্শ। তবে এসব বিষয়েও অনেকে ফেসবুকে পরামর্শ দিচ্ছেন। এসব পরামর্শ অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু এর বাইরে গিয়ে অনেকে নিজেদের ইচ্ছেমতো ওষুধের নাম লিখে দিচ্ছেন। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। শুধু তাই কোনো কিছু না বুঝে তা শেয়ার করছেন অনেকে। পাঠিয়ে দিচ্ছেন ফেসবুক বন্ধুদের ইনবক্সে।

অনেকে না বুঝে সেই ওষুধ সেবনও করছেন। তাই এ বিষয়ে ফেসবুক ব্যবহারকারীদের আরও সচেতন হতে হবে। ফেসবুকে দেখে কোনো ওষুধ সেবন করা যাবে না। যদি কারো কোনো প্রকার সমস্যা হয়, তাহলে অবশ্যই তাকে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বিনা কারণে ডাক্তারের কোনো পরামর্শ ছাড়া ওষুধ খেলে ক্ষতি হবেই। তাই এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে। এখানে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। তবে এই অবস্থার অবসানের জন্য এখনই কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

প্রয়োজন ফেসবুক ব্যবহারের সীমারেখা টানার। ফেসবুকে যা খুশি লিখে স্ট্যাটাস দেওয়া বন্ধ করতে হলে ফেসবুককে একটি নীতিমালার মধ্যে আনতে হবে। কোনো বয়সী মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করতে পারবে, কারা পারবে না তা থাকতে হবে নীতিমালার মধ্যে। থাকতে হবে রেজিস্ট্রেশন। বিশেষ করে অপ্রাপ্ত বয়স্করা যেন ফেসবুক ব্যবহার করতে না পারে সে বিষয়টির দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। আর কী ধরনের স্ট্যাটাস দেওয়া যাবে, যাবে না তাও উল্লেখ থাকবে সেখানে। তবে ফেসবুকের অপব্যবহার অনেকটা কমে আসবে। বিশেষ করে করোনার সময়ে ওষুধ বিষয়ে ফেসবুকের মাধ্যমে অহেতুক আর আতঙ্ক সৃষ্টি হবে না।

 

সাহাদাৎ রানা : সাংবাদিক ও কলাম লেখক

shahadatrana31@gmail.com