যে মৃত্যু পাথরের চেয়ে ভারি

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২০ | ২৮ শ্রাবণ ১৪২৭

যে মৃত্যু পাথরের চেয়ে ভারি

সাইফুজ্জামান ৭:৪৬ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১০, ২০২০

print
যে মৃত্যু পাথরের চেয়ে ভারি

মৃত্যু আমাদের সংকুচিত করে। কত আর শোকগাঁথা লিখব? মন ভারাক্রান্ত। স্মৃতিচারণ করতে করতে ক্লান্ত। ব্যতিক্রম ছাড়া আমি সাধারণত মৃত মানুষকে দেখতে যেতে চাই না। স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করুক তাদের সঙ্গে কাটানো আনন্দের অনুভূতি। হাসপাতাল আমার খুব অপছন্দের জায়গা। অসুস্থ হলে হাসপাতালে যেতে হয়। চারপাশের ডেটলের গন্ধ ট্রলিতে সাদা চাদরে মোড়া মৃতদেহ দেখে বিচলিত হই।

অসুস্থ কাউকে দেখতে যাওয়ার চেয়ে তাদের রোগ আরোগ্য করা আমার কাছে উত্তম মনে হয়। করোনাকালে সামাজিকতার দায় থেকে আমাদের মুক্ত করে দিচ্ছে। চাইলেই তো সব সামাজিকতা মুক্ত হওয়া যায়। সাহিত্যাঙ্গনের কীর্তিমান আলম তালুকদার চলে গেলেন। গত ৮ জুলাই সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মৃত্যু হয় তাঁর। প্রথমে হৃদরোগের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। পরে করোনা পজিটিভ রিপোর্ট পাওয়া যায়।

১৯৫৬ সালের ১ জানুয়ারি আলম তালুকদার টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইলে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতৃপ্রদত্ত নাম নুর হোসেন তালুকদার। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অতিরিক্ত সচিবের দায়িত্ব পালন শেষে অবসরে গিয়েছিলেন। আলম তালুকদার নামে তিনি সমধিক পরিচিত ছিলেন। প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ১১৫। ১৯৬৮ সালে দেয়াল পত্রিকার মাধ্যমে তার লেখালেখি শুরু। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি কাদেরিয়া বাহিনীর সদস্য হয়ে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি নিজেকে অবশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিতেন। ১৯৮২ সালে প্রথম ছড়াগ্রন্থ ‘ঘুম তাড়ানো ছড়া’ প্রকাশিত হয়।

তার রচিত উল্লেখযোগ্য ছড়াগ্রন্থ : খোঁচান ক্যান, চাঁদের কাছে জোনাকি, ডিম ডিম ভূতের ডিম, ঐ রাজাকার, যুদ্ধে যদি যেতাম হেরে, বাচ্চা ছড়া কাচ্চা ছড়া, ছড়ায় ছড়ায় আলোর নাচন, জাদুঘরের ছড়া, ছড়ায় ছড়ায় টক্কর, প্যাঁচাল না আলাপ, সিন্ধুতলে বিন্দু জ্বলে, আমার ছড়া মজার ছড়া, অন্ধকারের কলস ভেঙে, চলছে গাড়ি ছড়ার বাড়ি, আদিম কালের চাদিম ছড়া, ছড়া পড়লে চুল পাকে না, ছড়া চমচম ছড়া ঝমঝম, গন্ধরাজের গন্ধে ব্যাকুল, এমন ছড়া তেমন ছড়া, ভূত আছে ভূত নাই, ভূতের হাসি। তিনি যে সব পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছিলেন তার মধ্যে রয়েছে পালক এওয়ার্ড (১৯৯৬), চোখ সাহিত্য পুরস্কার (২০০০), অগ্রণী ব্যাংক শিশু সাহিত্য পুরস্কার (১৪০৫), জসীম উদদীন পুরস্কার (২০০১), কবি কাদের নওয়াজ পুরস্কার (২০০৪), স্বাধীনতা সংসদ পুরস্কার (২০০৬), আলোক আভাষ সাহিত্য পুরস্কার (২০০৬), শিল্পাচার্য জয়নুল পুরস্কার (২০০৮), সাহস সম্মাননা (২০১০), ফুটতে দাও ফুল সম্মাননা পদক (২০১১)।

সাহিত্যে জাতীয় পর্যায়ে অবদান রাখার জন্য আলম তালুকদার টাঙ্গাইল সাহিত্য সংসদ পুরস্কারে ভূষিত হন। আলম তালুকদারকে ঘিরে অসংখ্য স্মৃতি মনের মধ্যে হানা দিচ্ছে। তিনি যখন যুগ্ম সচিব তখন জাতীয় জাদুঘরের সচিব হিসেবে নিয়োগ পান। তার কক্ষ গমগম করতো প্রকাশক, সাহিত্যিক আর তিনি যে সব স্থানে কাজ করেছেন সেখান থেকে আসা অসংখ্য মানুষের ভিড়ে। দাফতরিক কাজ, আড্ডা চলতো সমানতালে। তিনি অনেককে উৎসাহিত করতেন লিখতে ও গ্রন্থ প্রকাশে। জাদুঘর হয়ে ট্যারিফ কমিশন তারপর পাবলিক লাইব্রেরি ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তার মধ্যে আমলাসুলভ গাম্ভীর্য কিংবা কোনো আড়াল ছিল না। আজিজ মার্কেট তার পদচারণায় মুখর থাকত। সাহিত্য আড্ডা, অনুষ্ঠান, এমনকি ফেসবুক আড্ডায় নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন। আড্ডাকে সরস করে তুলত ছড়া ও জোকসের ভা-ার। তার স্মরণশক্তি ছিল অসাধারণ। পরোপকারী ছিলেন। সমাজসেবা, বই প্রকাশ, দুস্থ মানুষদের সাহায্য প্রদানে তার আগ্রহ ছিল। প্রতিবছর বইমেলা এলে দাপিয়ে বেড়াতেন।

তার সঙ্গে দেখা হলে স্মৃতিচারণ করতেন আর তার পরিকল্পনার কথা জানাতেন। চারপাশে ঘিরে থাকা স্বার্থান্বেষী, গম্ভীর ও দুঃখী মানুষের ভিড়ে তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম। আজও জানা হয়নি হাসি দিয়ে দুঃখ ঢেকে রাখতেন কিনা? তার ভেতর সুন্দর ও অভিমান দুই ছিল। সমাজ ও সমকাল তার ছড়ায় উঠে এসেছে। চারপাশের অসঙ্গতি ও অন্ধকারের দিকে আলো ফেলেছেন ছড়ায় হায়রে কুলীন চামড়ায়/ মশা মাছি কামড়ায়/ বই রাখি আলনায়/ বউ থাকে কালনায়/ পুরস্কারের ভাবনায় বসত করি পাবনায়। পাবলিক লাইব্রেরির প্রবেশমুখে শোভা পাচ্ছে আলম তালুকদারের ছড়া পড়িলে বই আলোকিত হই/ না পড়িলে বই অন্ধকারে রই। মানুষের পক্ষে কেবল সম্ভব বিয়োগ বেদনা ভুলে থাকা।

প্রিয়জন হারাবার বেদনা সে সহজে ভুলে যায় না। বিস্মৃতির দখলে চলে যায় তার অনেক কিছুই। আলম তালুকদার বেঁচে থাকবেন তার সৃষ্টিতে। কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সাহিত্য আড্ডায়, উৎসব পার্বণে আমরা তাদের মিস করব। গর্বের মানুষের জন্মদিন, মৃত্যুদিনে স্মরণ শুধু নয়, জীবনের প্রতিক্ষণে তাদের সৃষ্টিকে জাগ্রত রাখা আমাদের দায়িত্ব। জীবন চলার পথে আমরা যেন তাদের মনে রাখি। কৃতি মানুষের সৃষ্টি দুর্যোগ দুর্বিপাকে পথ দেখায়। আলম তালুকদারের স্মৃতির প্রতি শোক ও শ্রদ্ধা অর্পণ করছি।

 

সাইফুজ্জামান : প্রাবন্ধিক, কবি; উপকীপার জাতীয় জাদুঘর

saifuzzaman.bnm@gmail.com