মহামারির শিক্ষা

ঢাকা, মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট ২০২০ | ২০ শ্রাবণ ১৪২৭

মহামারির শিক্ষা

সাধন সরকার ৭:৪৪ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ০৭, ২০২০

print
মহামারির শিক্ষা

মহামারির ইতিহাস সবসময় বেদনাদায়ক। মহামারি এসেছে যুগে যুগে। প্রতিটি মহামারি মানবজাতিকে কোনো না কোনো শিক্ষা দিয়ে গেছে। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা যে ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না! করোনা মহামারির বৈশি^ক সংকটেও উন্নত দেশসমূহের মধ্যে একে অপরকে বাণিজ্যযুদ্ধে পেছনে ফেলার চেষ্টা থেমে নেই! করোনাভাইরাস দুনিয়াতে কেন আগমন ঘটল তার আত্মজিজ্ঞাসা ও কারণ বিশ্লেষণ করা জরুরি। মানব জাতি কি কোনো মহামারি থেকে শিক্ষা নিয়েছে? আধুনিক বিশ্বে ১৬৬৫ সালে ‘বুবোনিক প্লেগ’ ছড়িয়ে পড়ে লন্ডনে।

ধারণা করা হয়েছিল প্রাণী থেকে ছড়িয়ে ছিল এই রোগ। তারপর ১৮১৭ সালে রাশিয়া থেকে পানিবাহিত রোগ কলেরা ছড়িয়ে পড়ে। সারা পৃথিবীতে কলেরায় তখন কয়েক লাখ মানুষ প্রাণ হারায়। ১৮৫৫ সালে চীন থেকে ছড়িয়ে পড়ে মহামারি প্লেগ রোগ। এই মহামারি শেষ না হতেই ১৮৮৯ সালে শুরু হয় রাশিয়ান ফ্লু। ভয়াবহ এই ফ্লু ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের দেশসমূহে। মারা যায় প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ। ১৯১৮ সালে দেখা দেয় শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ মহামারি। নাম স্প্যানিশ ফ্লু। সারা বিশ্বে মারা যায় প্রায় ৫ কোটি মানুষ। ১৯৫৭ সালে চীন থেকে ছড়িয়ে পড়ে এশিয়ান ফ্লু। এতে মারা যায় এক লাখেরও বেশি মানুষ। এরপর এইডস, ইবোলা, নিপাহ, মার্স, সোয়াইন ফ্লু, সার্সসহ সাম্প্রতিককালের ভাইরাসের আবির্ভাব তো আছেই। ইতিহাস বলে, পৃথিবীতে আসা মহামারি ভাইরাসের প্রায় ৭০ ভাগই কোনো না কোনোভাবে প্রাণী থেকে ছড়িয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ছোঁয়াচে রোগগুলোর ৬০ ভাগের বেশি এসেছে বিভিন্ন প্রাণী থেকে। প্রাণ-প্রকৃতির ভারসাম্যহীনতাই যুগে যুগে প্রাণঘাতী ভাইরাস তৈরির উপযোগী পরিবেশ তৈরি করেছে। প্রাণ-প্রকৃতির প্রতি কেন এত অত্যাচার? যাচাই-বাছাই না করে প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংস করে উন্নয়ন কীসের জন্য? অমূল্য সম্পদ মাটির প্রতি কেন যথেচ্ছাচার? প্রকৃতিবিনাশী কর্মকাণ্ড করে কেন জলবায়ুর বিরূপ পরিবর্তনকে বরণ করে নেওয়া হচ্ছে? প্রশ্ন হতেই পারে, জীবাণু অস্ত্রের প্রতিযোগিতা মানবজাতির জন্য কি হুমকিস্বরূপ নয়? দূষণে কেন প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি? পৃথিবীর ফুসফুস খ্যাত আমাজন বনের আয়তন কেন কমে যাচ্ছে? বাছবিচারহীনভাবে কেন বনভূমি উজাড় করা হচ্ছে?

এসব কারণে প্রকৃতি মানবজাতির সঙ্গে অভিমান করেছে। আর এসব কারণেই হয়তবা বর্তমান সময়ে মহামারির মতো বৈশ্বিক সংকটের শুরু! পৃথিবীতে যত মহামারি ও রোগ ব্যাধির আবির্ভাব ঘটে তা প্রকৃতি বিরুদ্ধতারই ফল। ভারসাম্য জীববৈচিত্র্যপূর্ণ পরিবেশে রোগের বিস্তার কম হয়। জীববৈচিত্র্যই কোনো না কোনোভাবে বাস্তুতান্ত্রিক সেবা দেওয়ার মাধ্যমে পৃথিবীতে মানবজাতিকে টিকিয়ে রেখেছে। ১৯৯২ সালের ধরিত্রী সম্মেলনে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হলেও পরবর্তীকালে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে! প্রকৃতি লোভী ও যুদ্ধবাজ মানুষদের পছন্দ করে না। বন্যপ্রাণী হত্যা ও এর ওপর অত্যাচারের ফলে প্রাণ-প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।

বনভূমি ধ্বংসের ফলে পৃথিবী থেকে অনেক বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অনেক বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হওয়ার পথে। এই পৃথিবী শুধু মানুষের নয়, সব সৃষ্টির মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে জীবনযাপন টেকসই হয় না। করোনাকালের এই বৈশ্বিক সংকট থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। করোনায় পশুপাখিও আক্রান্তের খবর মিলেছে। বাঘ, বিড়ালও করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে।

সার্বিক বিচারে করোনাকালে দুই ধরনের পরিবর্তন ব্যাপকভাবে দৃশ্যমান। একটি হল অর্থনৈতিক পরিবর্তন, অপরটি হলো প্রাকৃতিক পরিবর্তন। বিশ্বব্যাপী অধিকাংশ দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পকলকারখানা বন্ধ থাকার ফলে অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়লেও প্রকৃতি যেন ঠিক ততটাই ইতিবাচক! করোনাকালে চারপাশের স্থবিরতায় প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান যেন আপন মনে লীলা করছে পৃথিবীর সঙ্গে! মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ নিয়ে উন্নত দেশগুলোর মধ্যে নেই কোনো রেষারেষি! ভিন্নভাবে চিন্তা করলে করোনা যেন প্রকৃতির জন্য আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে!

অপরূপ সাজে সেজেছে প্রকৃতি! সৈকতের পাড়ে ডলফিনগুলো পেয়েছে অবাধ স্বাধীনতা! পৃথিবীর বড় বড় শহরগুলোর আকাশে নেই চিরচেনা কোনো দূষণ। শহরের আকাশ জুড়ে যেন নীল রঙের ছড়াছড়ি! গোটা পৃথিবীর পরিবেশ যেন বদলে গেছে। শহরে বায়ুদূষণ নেই, নেই শব্দদূষণও। প্রভাতে পাখির কলরব অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি। গাছপালাগুলো যেন নতুন সাজে সেজেছে। প্রকৃতিজুড়ে যেন সবুজ রঙ খেলা করছে। গাড়ির কালো ধোঁয়া নেই, বাতাসে নেই ভারি সীসা। পেট্রোল পোড়া গন্ধ নেই। পৃথিবীর একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনও যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া বিভিন্ন নদী-খালে এখন বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ। বড় বড় দুর্যোগ থেকে বাঁচিয়েছে সুন্দরবন। রক্ষাকবচ হিসেবে সুন্দরবন সবসময় আমাদের সহায় হয়েছে।

কিন্তু দুঃখের বিষয় সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের ওপর কত অত্যাচার! সুন্দরবন যেমন আমাদের রক্ষা করছে, তেমনি সুন্দরবনকেও রক্ষা করতে হবে আমাদের। করোনাকালে পর্যটকশূন্য সুন্দরবনে জেগে উঠেছে প্রাণ-প্রকৃতি। করোনাকালে স্থবির হয়ে পড়া পৃথিবীর মানুষগুলো যখন ঘরে বসে নিজেদের সুরক্ষা করছে ঠিক তখনই প্রকৃতি যেন নিজের মতো করে তার রূপ পরিগ্রহ করছে। বাতাসে মাত্রাতিরিক্ত দূষণ নেই। নেই শিল্পকারখানাগুলোর তরল দূষণও। ওজোন স্তরের ক্ষয়ের সম্ভাবনাও এখন ক্ষীণ! জীবাশ্ম জ্বালানির দহন ছাড়া পৃথিবী কেমন হতে পারে তার একটা চিত্র পৃথিবীতে এখন দেখা যাচ্ছে। এ যেন এক জীবাশ্ম জ্বালানিহীন নতুন পৃথিবীর ছবি। করোনাকালে হঠাৎ-ই পৃথিবীর নদ-নদী, খাল-দ্বীপসহ সার্বিক প্রকৃতি-পরিবেশের পুরো চিত্রে যেন ইতিবাচক বদল ঘটেছে।

পৃথিবীর বড় বড় কার্বন নিঃসরণকারী দেশ যেমন চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, ভারত, জার্মানি পৃথিবীর মাত্রাতিরিক্ত তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখে চলেছে। তবে বলা যায়, করোনার কারণে গত চল্লিশ বছরে এখনকার মতো চীনে এত কম কার্বন নিঃসরণ হয়নি। বায়ু দূষণমুক্ত চীন শহর দেখেছে এ প্রজন্মের তরুণরা! দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণের হার একেবারেই কম। কিন্তু তাই বলে জলবায়ুগত দুর্যোগ উন্নত দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোই জলবায়ুগত দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। উন্নত দেশের কার্বন নিঃসরণের বলি হচ্ছে পুরো বিশ্ব!

প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংস করে নয়, সহাবস্থান করে এগিয়ে যেতে না পারলে কোনো উন্নয়নই টেকসই হবে না। শতাব্দীর পর শতাব্দী বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব আমাদের সে শিক্ষাই দিয়ে যাচ্ছে!

করোনাকালে পৃথিবীর প্রকৃতি-পরিবেশের যে অভাবনীয় ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে তা অর্থের বিচারে নিরূপণ করা সম্ভব নয়। ধারণা করা হচ্ছে, সবকিছু স্বাভাবিক হলে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ব্যাপক চাপ পড়বে প্রকৃতি-পরিবেশের ওপর! তবে এটা আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে, প্রকৃতিকে আমরা যেমনটা দেব অনুরূপভাবে প্রকৃতিও আমাদের তেমনটাই ফেরত দেবে। ১৯৮৬ সালে ইউক্রেনের চেরনোবিলের পারমাণবিক দুর্ঘটনার কথা সবার জানা। ভয়াবহ এই তেজষ্ক্রিয় দূষণে সমগ্র ইউক্রেন যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল!

এখনো পর্যন্ত চেরনোবিলে বসবাসের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। তবুও সেখানে প্রকৃতি নিজেই তার শূন্যস্থান পূরণ করেছে। চেরনোবিলে এখন বন্যপ্রাণী অবাধ বিচরণসহ প্রাণ-প্রকৃতির সুন্দর মেলবন্ধন সৃষ্টি হয়েছে। আর তা সম্ভবপর হয়েছে প্রকৃতিকে নিজের হাতে ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমে। সুতরাং প্রকৃতি অনেক সময় নিজের ক্ষতি নিজেই পূরণ করতে সক্ষম হয়! তবে শুধু প্রকৃতি ভালো রাখলেই হবে না, প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করে মানুষের জীবন-জীবিকাও সচল রাখতে হবে।

প্রকৃতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো মানুষ। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সার্বিক অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখা যেমন দরকার তেমনি প্রকৃতিও রক্ষা করা দরকার। পৃথিবীকে বাসযোগ্য করতে হলে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভেবে বর্তমান বাস্তবতায় পরিবেশগত সমস্যা মোকাবেলায় সবুজ অর্থনীতির অঙ্গীকার সবচেয়ে বেশি জরুরি। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে গুরুত্ব দিয়ে প্রতিবছর এর ব্যবহার বাড়ানোর প্রতি জোর দিতে হবে। প্রকৃতি ধ্বংস করে নয়, প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করেই এগিয়ে যেতে হবে, তা না হলে হয়ত করোনার মতো ভয়াবহ আবার কোনো দুর্যোগ এসে অর্থনীতিকে পিছিয়ে দিয়ে প্রকৃতিকে জাগিয়ে তুলে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থান করার শিক্ষা দিয়ে যাবে।

দুই.

মহামারি করোনা সম্পূর্ণ ছোঁয়াচে রোগ। যার ফলে এর সংক্রমণ দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। হাসপাতালগুলো করোনা পরিস্থিতি সামাল দিতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। নতুন সংক্রমিত করোনা রোগীদের বেশিরভাগই বাড়িতে অবস্থান করে ডাক্তারের পরামর্শ ও সকল নিয়ম-কানুন মেনে করোনা মোকাবেলা করছেন। ফলে রাজধানী শহরে তো বটেই, জেলা ও উপজেলা শহরের বাসাবাড়িতে এখন ব্যাপক মাত্রায় করোনা বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। করোনা রোগীর ব্যবহৃত মাস্ক-গ্লাভস-পিপিই বাসাবাড়ির সাধারণ বর্জ্য-আবর্জনার সঙ্গে এখন মিলেমিশে একাকার!

ব্যবহৃত করোনা সুরক্ষাসামগ্রী এখন রাস্তাঘাটে, শহরের অলিতে-গলিতে, ফুটপাতে, ড্রেনে, হাসপাতালের আশপাশে দেখা যাচ্ছে। বাসায় থেকে যেসব রোগী সঙ্গনিরোধের নিয়ম মেনে করোনা চিকিৎসা করে চলেছেন, স্বাভাবিকভাবেই ওই বাসার অন্য সদস্যরাও সম্ভাব্য সংক্রমণ থেকে বাঁচতে করোনা সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করছেন। ফলে বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত সুরক্ষাসামগ্রীর মাত্রাতিরিক্ত বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। এসব ব্যবহৃত করোনা সুরক্ষাসামগ্রী সাধারণ বা গৃহস্থালি বর্জ্যরে সঙ্গে মিশিয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাছে দেওয়া হচ্ছে। পরিচ্ছন্নতাকর্মী বাসাবাড়ির বর্জ্য সংগ্রহ করার সময় ও সংগ্রহ করার পর বর্জ্য নাড়াচাড়ার মাধ্যমে এসব করোনা সুরক্ষাসামগ্রীর (মাস্ক-গ্লাভস-গগলস-পিপিই) সরাসরি সংস্পর্শে আসছেন। ফলে করোনার এই সময়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি হচ্ছে।

আবার না বুঝে ঢালাওভাবে বহু লোক গ্লাভস ও পিপিই ব্যবহার করছেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের থেকে বারবার বলা হচ্ছে, সবার পিপিই ও গ্লাভস ব্যবহার করার দরকার নেই। কিন্তু কে শোনে কার কথা! যার ফলে তৈরি হচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত করোনা বর্জ্য। করোনায় পলিথিন আগ্রাসনও থেমে নেই! রাস্তাঘাটে পলিথিনের তৈরি গ্লাভস, পিপিই, মাস্কসহ নানা ধরনের করোনা সুরক্ষাসামগ্রী পাওয়া যাচ্ছে। পলিথিন আর প্লাস্টিকের তৈরি এসব করোনা সামগ্রী দেদারসে বিক্রি হচ্ছে। যদিও বিশেষজ্ঞদের থেকে বলা হচ্ছে, পলিথিনের তৈরি গ্লাভস ও পিপিই করোনাভাইরাস থেকে রক্ষা করে না।

আবার অনেক ক্ষেত্রে নকল সুরক্ষাসামগ্রী বিক্রি হচ্ছে। ভাইরাসে অনাক্রান্তরাও করোনা সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করছেন। আবার ব্যবহৃত এসব করোনা বর্জ্য অসচেতনভাবে যত্রতত্র ফেলে দেওয়া হচ্ছে। ফলে বর্জ্য সংগ্রহকারীসহ চলাফেরা করা জনসাধারণের জন্যও ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। মাটিতে পড়ে থাকা ব্যবহৃত মাস্ক-গ্লাভস জনস্বাস্থ্যের জন্য মোটেও নিরাপদ নয়। কারণ করোনাভাইরাস অন্তত দুই-তিনদিন পর্যন্ত বাঁচতে পারে। করোনাকালে ব্যবহৃত সুরক্ষাসামগ্রীর সঠিক ব্যবস্থাপনায় জোর না দিলে তা মাটি ও পানির সঙ্গে খাদ্যচক্রে প্রবেশ করতে পারে।

মনে রাখা দরকার, করোনাভাইরাস মোকাবেলার সমন্বিত উদ্যোগের মধ্যে সুরক্ষাসামগ্রীর সঠিক ও টেকসই ব্যবস্থাপনা জড়িত। রাজধানী ঢাকা শহরের দুই সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা গৃহস্থালি বর্জ্যরে সঙ্গে একইভাবে করোনা বর্জ্যও সংগ্রহ করে সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনে (এসটিএস) নিয়ে যাচ্ছে। সেখান থেকে এই বর্জ্য চলে যাচ্ছে ভাগাড়ে। ব্যবহৃত করোনা সুরক্ষাসামগ্রী মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়ায় সর্বক্ষেত্রে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে এবং হচ্ছে। বেসরকারি হিসাব মতে, দেশে প্রতি মাসে এখন মাস্ক, গ্লাভসসহ মোট প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হচ্ছে প্রায় ১৫ হাজার টনের বেশি। হাসপাতালগুলোতে এখন মেডিকেল বর্জ্য অনেকাংশে কমে গেছে, বেড়ে গেছে করোনা সুরক্ষাসামগ্রীর বর্জ্য।

বলে রাখা দরকার, সাধ্যের মধ্যে ভালো সুতির মাস্ক পড়ে তা বারবার ধুয়ে ব্যবহার করা যায়। আবার পিপিই সচরাচর ব্যবহার না করে, বারবার সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিরাপদ থাকা যায়। অন্যান্য সুরক্ষাসামগ্রী জীবাণুমুক্ত করেও বারবার ব্যবহার করা যায়। কিন্তু অনেকেই এগুলো মানছেন না! করোনাকালে বায়ুদূষণ কমলেও প্লাস্টিক ও পলিথিন সামগ্রীর ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় পরিবেশের ক্ষতি কমেনি। এসব পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে বলে মনে করি।

হাতেগোনা কয়েকটি হাসপাতাল ব্যতীত বেশিরভাগ হাসপাতাল তৈরি বর্জ্য কোনো প্রকার জীবাণুমুক্ত না করেই ফেলে দেয়। করোনাকালে বাসাবাড়ি ও হাসপাতালের সুরক্ষাসামগ্রীর বর্জ্য জীবাণুমুক্ত করার পর ফেলে দেওয়া সবচেয়ে বেশি জরুরি। বাসাবাড়ির বর্জ্যকে দুই ভাগে ভাগ (সাধারণ বর্জ্য, করোনা সুরক্ষাসামগ্রীর বর্জ্য) করতে হবে। অতঃপর করোনা ব্যবহৃত সুরক্ষাসামগ্রী আলাদা একটি ব্যাগে ভরে জীবাণুমুক্ত করা যেতে পারে। জীবাণুমুক্ত (ক্লোরিনের সলিউশনসহ অন্যান্য রাসায়নিক) করার অনেক ধরনের রাসায়নিক এখন হাতের মুঠোয় পাওয়া যায়। পরিবেশ আইনে হাসপাতালের বর্জ্য জীবাণুমুক্তকরণের পর ফেলে দেওয়ার কথা থাকলেও তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না। হাসপাতালগুলোতে মেডিকেল বর্জ্যরে টেকসই ব্যবস্থাপনার ওপর এখনই জোর দেওয়া দরকার।

অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মেডিকেল বর্জ্য সংগ্রহ করে তা ধ্বংস করে থাকে। করোনাকালে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনও স্বল্প পরিসরে করোনায় ব্যবহৃত সুরক্ষাসামগ্রী আলাদাভাবে সংগ্রহ করতে শুরু করেছে। করোনার এই মহামারিতে সার্বিকভাবে ব্যবহৃত সুরক্ষাসামগ্রীর সঠিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা না গেলে পরিস্থিতি ভয়ানক রূপ নিতে পারে। ব্যবহৃত করোনা সুরক্ষাসামগ্রী আলাদাভাবে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাছে দেওয়ার জন্য এবং জীবাণুমুক্ত করে নির্দিষ্ট স্থানে রাখার জন্য জনসাধারণকে সচেতন করতে হবে। সিটি করপোরেশনকে এ ব্যাপারে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ও জনবল বাড়িয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলায় এগিয়ে আসতে হবে।

সাধন সরকার : কলাম লেখক ও পরিবেশকর্মী

sadonsarker2005@gmail.com