মানবপাচার

ঢাকা, মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট ২০২০ | ১৯ শ্রাবণ ১৪২৭

মানবপাচার

অলোক আচার্য ৭:৩৮ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ০৩, ২০২০

print
মানবপাচার

মহাবিশ্বের পৃথিবী নামক গ্রহে মানুষই সবচেয়ে দামি সম্পদ, আবার মানুষই বোঝা। মানুষের এ বৈপরীত্য অবস্থানের দায় মানুষের। জীবন ও জীবিকার তাগিদে মানুষ এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে পাড়ি জমায়। জীবনের উচ্চাকাক্সক্ষা পূরণ, বেকারত্ব ঘোচাতে, পরিবারকে সাহায্য করতে অনেকে দালালের প্রলোভনে মানবপাচারকারীর খপ্পরে পড়ে। উন্নত জীবনের স্বপ্ন সবাই দেখে। তবে অবৈধভাবে বিদেশে পাড়ি দিয়ে যারা সেই স্বপ্ন দেখে তাদের পরিণতি হয় ভয়ঙ্কর।

ভালো চাকরির আশায় দালালের হাত ধরে তাদের যাত্রা শুরু হয়। মূলত ঘর থেকে বের হওয়ার পর থেকেই তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ দালালের হাতে দিয়ে দেয়। তাদের গন্তব্য হয়ত উন্নত কোনো দেশ। তারা এক হাত থেকে আরেক হাতে, এক চক্রের কাছ থেকে আরেক চক্রের কাছে বিক্রি হয়। বড় অঙ্কের টাকা দিয়ে কেউ তার গন্তব্যে পৌঁছায়, কেউ মাঝ সমুদ্রে ভাসতে থাকে, আবার কারও ঠিকানা হয় জেলে। লিবিয়া হল ইউরোপ পাচারকারীদের ট্রানজিট পয়েন্ট।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের তথ্য মতে, ২০১৮ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৯ সালের মে মাস পর্যন্ত ১৭ হাজার অভিবাসী সাগরপথে ইউরোপে ঢুকেছেন। লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশি নৃশংসভাবে হত্যার শিকার হওয়ার পর মানবপাচার এবং পাচারকারী নিয়ে আলোচনা তীব্র হয়। দেখা যায় এদের জাল দেশ এবং দেশের বাইরেও সক্রিয়। দেশের বিভিন্ন জেলায় মানবপাচারকারীর চক্র ছড়িয়ে রয়েছে। কারা অবৈধ অভিবাসী হয়ে দেশের বাইরে পাড়ি জমাতে চায়? উন্নত দেশের স্বপ্নে বিভোর, ভাগ্যাহত যুবক-যুবতী দালালের মাধ্যমে মূলত ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যাওয়ার প্রলোভনের শিকার হয়। তাদের এমনভাবে বোঝানো হয়, যেন একবার এসব দেশে পাড়ি দিতে পারলেই জীবন সার্থক হয়ে যাবে।

তারা উন্নত জীবনের স্বপ্নে অথবা বর্তমান জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা থেকে অবৈধ পথে ঝুঁকি নেওয়ার ফল একবারের জন্যও ভাবে না। আর ভাবলেও তাদের স্বপ্নের কাছে তা হার মানে। এরকম পরিস্থিতির মধ্যেই বৈশি^ক মানব পাচার পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে বাংলাদেশের। সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে, বাংলাদেশকে দ্বিতীয় স্তরে (টায়ার-২) উন্নীত করা হয়েছে। গত তিন বছর ধরে দ্বিতীয় স্তরের পর্যবেক্ষণ তালিকায় ছিল বাংলাদেশ। উল্লেখ্য, প্রতি বছর বিশ্বের দেশগুলোকে চারটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে ট্রাফিকিং ইন পারসন (টিআইপি) শীর্ষক এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। ক্যাটাগরিগুলো হল স্তর-১ (টায়ার-১), স্তর-২ (টায়ার-২), স্তর-২ পর্যবেক্ষণ তালিকা (টায়ার-২, ওয়াচলিস্ট) এবং স্তর-৩ (টায়ার-৩)।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বাংলাদেশে বেশি মানব পাচারকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ভাগ্যাহত এসব যুবক-যুবতীদের বিশ্বাসকে পুঁজি করেই মানব পাচারকারীরা তাদের এই অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। গাড়ি বাড়ির মালিক হয়ে বিলাসী জীবনযাপন করছে। অন্যদিকে অনিশ্চিত জীবনের আশায় ক্ষুধায় তৃষ্ণায় সাগরে মারা যায় অবৈধ অভিবাসীপ্রত্যাশীর অনেকে। আজ পর্যন্ত অনেকেই মারা গেছে। তবুও থামছে না এই মরণের খেলা। দালাল চক্র নানাভাবে প্রলোভনের মাধ্যমে তাদের বিদেশে যেতে রাজি করায়। যার মধ্যে একটি হল পৌঁছানোর পরে টাকা এরকম প্রলোভন দেখানো। যাতে প্রথমেই তার সম্মতি আদায় করা যায়। অত্যন্ত কৌশলী এবং চাতুর্যপূর্ণ এসব দালাল চক্রের সদস্য। একবার সম্মতি পেলেই বাকি কাজটুকু দালালরাই করে। স্বাভাবিকভাবে যারা অবৈধভাবে বিদেশে পাড়ি জমাতে চায় তারা সমাজের অভাবগ্রস্ত বা দুর্দশাগ্রস্ত বেকার যুবক বা যুবতী।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে রামরু ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইএমও সূত্রে জানা যায়, গাদ্দাফি পরবর্তী গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্থ লিবিয়ার অর্থনীতি কার্যত তেলনির্ভর। কাজের সন্ধানে এশিয়া ও আাফ্রিকার অনেক দেশ থেকেই তরুণরা অবৈধ পথে দেশটিতে পাড়ি জমায়। একপর্যায়ে তাদের বেশিরভাগেরই লক্ষ্য থাকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে ইউরোপের কোনো দেশে যাওয়া। এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে পুরো রূপে মানবপাচারকারীর বিশাল চক্র সক্রিয় রয়েছে।

এই চক্র এত বড় এবং শক্তিশালী তাদের মাধ্যমে পাচার হওয়ার সময় ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবি হয়ে বহুসংখ্যক বাংলাদেশি মৃত্যুবরণ করলেও থামেনি অবৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা বা পাচারকারী চক্রের দৌরাত্ম্য। মানবপাচার বন্ধ করতে বিভিন্ন সময় সরকারের পক্ষ থেকে সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তি প্রচার করছে। বিদেশে চাকরির ক্ষেত্রে যাচাই করে তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য জনগণকে সতর্ক করছে। লোভও এক্ষেত্রে কাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তারপরও দালালের খপ্পরে পড়ে প্রাণ দিতে হচ্ছে। ব্যক্তির সঙ্গে জড়িত পরিবারকে নাকাল হতে হচ্ছে। ভিটেবাড়ি বিক্রি করে জিম্মিকারীদের অর্থের জোগান দিতে হচ্ছে।

পরিবারের ভালোর কথা চিন্তা করে পরিবারকে বিপদে ফেলে দিচ্ছে এসব অবৈধ অভিবাসীপ্রত্যাশী। কারণ পাচারের এক পর্যায়ে তাদের জিম্মি করে পরিবারের সদস্যদের কাছে মোটা অংকের চাঁদা দাবি করা হয়। প্রিয়জনের জীবন বাঁচাতে সেই অর্থ পরিশোধও করা হয়। তারপর কেউ ফেরে আবার কেউ ফেরে না। অবৈধ মানবপাচার মূলত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর একটি বড় সমস্যা। এর কারণও মূলত একই রকম। দেশে কর্মসংস্থানের পর্যাপ্ততা একটি বড় কারণ। যা দারিদ্র্য সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ মানবপাচারের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। আমরা যখন উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন দেখছি তখন অবৈধ মানবপাচার একটি সমস্যা। আইনের কড়াকড়ি এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু কেবল আইন প্রয়োগই যথেষ্ট হবে না। যারা অবৈধ অভিবাসীপ্রত্যাশী বা দালাল চক্র সহজেই যাদের এই পথে প্রভাবিত করতে পারে তারা আর্থিকভাবে দরিদ্র।

জীবন ও জীবিকার যুদ্ধে তারা পরাজিত। এসব জীবন যুদ্ধে পরাজিত মানুষদেরই দালালরা স্বপ্ন দেখায়। কিন্তু সেই স্বপ্ন যদি দেশ তাদের দেখাতে পারে তাহলে তারা বিদেশে অবৈধভাবে পাড়ি দেওয়ার কথা চিন্তা করবে না। এর পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নানাবিধ কার্যক্রম হাতে নিতে হবে।

 

অলোক আচার্য : সাংবাদিক ও কলাম লেখক

sopnil.roy@gmail.com