প্রতিবেশী সমাচার

ঢাকা, বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২০ | ২৮ শ্রাবণ ১৪২৭

প্রতিবেশী সমাচার

ডিনা চৌধুরী ৮:১১ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ০২, ২০২০

print
প্রতিবেশী সমাচার

দুনিয়াটা একধরনের গোলকধাঁধা। মানুষ খুব সুখে পাগল হয়। সুখের জন্য তারা যে কোনোকিছু করতে দ্বিধা করে না। প্রকৃত সুখ কীসে সেটা যদি মানুষ জানত, তাহলে জানমাল বাজি রেখে অসৎ পথে পা বাড়াত না। ভুলে যেত না সুন্দর পৃথিবীতে মানুষের বিচরণ খুব অল্প সময়ের জন্য। হাটতলায় বটতলায় জমে ওঠা মেলার মতো।

হঠাৎ একসময় সেই মেলা ভেঙে যায়। তাই ভেবে পাই না একজন মানুষের বা একটি পরিবাবের ধনসম্পদ কত দরকার! কখন যে কোন দুর্যোগ এসে কার দরজায় কড়া নাড়বে তা কেউ জানে না! মানুষ কেন শুধু শুধু সবকিছু আমার করে ভাবে! একটু গভীর চিন্তা করে দেখলেই সব মোহ কেটে যাবে। যদি এমনটি হত, ছোটবেলায় শোনা গল্পের দানবের মতো মানুষ অমর, তাহলেও কথা ছিল। আমিত্ব ভাবটা মানাত!

মানুষের আয়ু খুবই কম। সেই তুলনায় কচ্ছপের আয়ু অনেক বেশি। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু আগে ছিল পঞ্চাশ থেকে পঞ্চান্ন, এখন সেটা বেড়ে বাহাত্তর বছরে দাঁড়িয়েছে। গল্প আর বাস্তব জীবনের মধ্যে তফাতটা কেউ বুঝতে চায় না। মরীচিকার পিছু দৌড়াতে দৌড়াতে একসময় জীবনের ঘণ্টা বেজে ওঠে! এই বাস্তব সত্য মনে রাখলে অন্তত করোনাকালে সরকারি মাল দরিয়ামে ঢাল হত না। ত্রাণের মাল চুরি করে টাকার পাহাড় গড়ার চেষ্টা করত না কেউ। এত প্ল্যান প্রোগ্রাম সবই যে ক্ষণিকের এখনও কিছু মানুষের বোধগম্যে আসেনি। জীবনটা নদীর মতো, বহমান নদী যেমন পেছন ফিরে তাকাতে জানে না ভেসে চলাই তার কাজ। দূর থেকে বহু দূরে। কোনোদিন উল্টো দিকে বয় না!

মানুষের অন্তর থেকে ভক্তি শ্রদ্ধা বিশ্বাস ভালোবাসা দিনে দিনে উঠে যাচ্ছে। মনুষ্যত্বহীনতা দিনে দিনে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করছে। ফলাফল দাঁড়িয়েছে সমাজের সব স্তরে অনিয়ম আর অরাজকতা। একটি জীবনে শ্রদ্ধা ভালোবাসাই যদি না থাকে সেই জীবন হয়ে যায় অনুভূতিহীন পাথর। এমন একজনের কথা আজ বলব যে মানুষটি ভালোবাসার কারণে পৃথিবীতে বেঁচে থাকার আশাটুকু হারিয়েছিলেন।

আমার (অস্ট্রেলিয়ান) প্রতিবেশী এলিসন। কম করে হলেও ষাট বছরের সংসার ছিল তাদের! পাঁচ ছয় মাস হল স্বামী মারা গেছেন। স্বামীর প্রতি ভালোবাসার কারণে তার মধ্যে বেঁচে থাকার অনীহা দেখেছিলাম সেদিন! ওর ধারণা, ওপারে যেতে পারলেই তার স্বামীর সঙ্গে আবার দেখা হবে তার! প্রিয় মানুষটির সঙ্গে স্বর্গে গিয়ে আবার তারা আগের মতো একসঙ্গে থাকবে। একাকিত্বের জীবনে সেই মধুর ভালোবাসা ফুটে উঠেছিল এলিসনের চোখে-মুখে! দেখা হওয়ার দ্বিতীয় দিনে ও বলেছিল, তোমরা কি অলিভ খাও? খেলে আমার বাড়িতে অনেক আছে। আমার স্বামী গাছ লাগিয়ে রেখে গেছেন।

নতুন এসেছি অচেনা অজানা দেশে। যেখানে দেশের সেদ্ধ চাল ডাল খুঁজে পেতেই হিমশিম খাই। সুপার মার্কেট ভরা শুধু আতপ চাল যা রান্না করলে আঠাল ভাব আর কড়া একটা গন্ধ থাকে। ভাত খাওয়ার ইচ্ছাই দূর হয়ে যায়! এখন যেমন আনাচেকানাচে বাংলাদেশি ও ইন্ডিয়ান দোকান খুঁজে পাওয়া কোনো ব্যাপার না, পঁচিশ বছর আগে এমনটি ছিল না! সারা মেলবোর্নে একটি মাত্র ইন্ডিয়ান দোকান ছিল। তাও খুঁজে পেতে সময় লেগেছিল কয়েক মাস! যা হোক, ভাবতেই পারা যায় না সেখানে জলপাই গাছের সন্ধান ম্যালা! তাই সেদিন খুশিতে নেচে উঠেছিলাম আর কিছু না পাওয়া যাক, এই বিদেশ বিভুঁইয়ে প্রিয় জলপাই তো মিলেছে। সেটাই বা কম কীসের! আচার বানানোর পরিকল্পনা করে ফেললাম। কতক ঝাল, কতক হবে টক-মিষ্টি! দেশের জলপাই এই দেশে এত সহজে মিলবে ভাবতেই পারিনি। পরদিন সকালে যথারীতি ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাওয়ার পর দৌড়ে গেলাম এলিসনের বাড়িতে। আমি যাব বলে সে কেক বেক করতে ব্যস্ত! এদিকে আমার তর সইছে না। কতক্ষণে অলিভ গাছের কাছে নিয়ে যাবে! জানালা দিয়ে উঁকিঝুঁকি দিয়ে এলিসনের অলিভ গাছ দেখতে পেলাম না! ভাবলাম আছে হয়ত কোথাও দাঁড়িয়ে! এলিসন ওভেনে কেক বেক করতে দিয়ে, নিয়ে গেল তার স্মামীর লাগানো সারি সারি ওলিভ গাছের কাছে। বলল, যত খুশি ছিঁড়ে নাও। কিন্তু জলপাই গাছ কিছুতেই চোখে পড়ছে না। আমাদের দেশের জলপাই গাছ তো এমন না! তাই জিজ্ঞাসা করতেই ছোট ছোট ফল দেখিয়ে বলল, এই তো তোমার সামনেই রয়েছে।

দুটো ছিঁড়ে হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, নাও। ব্যাগ এনে দেব? হতবাক হয়ে জলপাই (!) গাছের দিকে তাকিয়ে রইলাম। জলপাই দেখে মনটা ভেঙে খানখান হয়ে গেল! ওকে বললাম, ব্যাগ দিতে হবে না। অন্য একদিন এসে নেব! কোথায় দেশের ডাসাডাসা বাঘা টক জলপাই আর কোথায় গমের দানার চেয়ে সামান্য বড় মুখে দিলে তাও আবার কষ আর তিতা!

আস্তে আস্তে এলিসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়তে লাগল! ওর বাড়িঘর দেখে মনে হল কত স্বপ্ন দিয়ে সাজিয়েছে! সুন্দর ঘর, সামর্থ্য অনুযায়ী নিজের হাতে মনের মাধুরী ঢেলে সাজানো! কেউবা আবার ঝাড়বাতি দামি আসবাবপত্র দিয়ে ডেকোরেশন করে। আবার কারো বাড়ির কোনায় সন্ধ্যামালতি ফুল আর ফলের একটি বাগান থাকলেই তারা খুশি। ছোট একটি জীবনে কতই না চাওয়াপাওয়া থাকে। যেমনটি অনেকেই করে থাকেন ছেলেমেয়ে আর কতগুলো সুটকেস নিয়ে অজানার উদ্দেশে পাড়ি জমায়। নিজের মাতৃভূমি, নিজের মানুষ, প্রিয় মুখগুলোকে পেছনে ফেলে! আরও ভালো কিছুর আশায় বিদেশে বিভুঁইয়ের হাতছানি উপেক্ষা করতে পারে না!

যা বলছিলাম। স্বামীর রেখে যাওয়া বাগান দেখাশোনা করে সময় চলে যায় এলিসনের। বয়সের ভারে নিজেই চলতে পারে না। কোনার টবে লাগানো অর্কিড গাছে ফুল ফুটে ঝলমল করছে। তাতে কাঁপা হাতে পানি ঢেলে বাঁচিয়ে রাখছে সকাল বিকেল! অলিভ গাছ ছাড়াও বাড়ির পেছনে হরেক রকমের গাছ রয়েছে। সবজির বাগান পেয়ারা কমলা আপেল পিচ আঙুর গাছ! সাজানো গোছানো বাড়িটি দেখেই বোঝা যায় যতদিন তার স্বামী বেঁচেছিলেন বাড়িটিতে উপচেপড়া সুখ ছিল!

এলিসনের সঙ্গে পরিচয়ের সূত্রপাত রান্নাঘরের জানালা ঘেষে ওর বাগান দেখা গিয়ে। একদিন দেখলাম আপেল আর পিচফল পেকে টসটস করছে! কী যে সুন্দর লাগছিল বলার মতো না! তাই টুলের ওপর দাঁড়িয়ে উঁকি দিতেই চোখ পড়ল এলিসনের চোখে। আমাকে দেখে সেও এগিয়ে এল! জিজ্ঞাসা করল, তোমরা বুঝি নতুন এসেছ?

বললাম, হ্যাঁ, আমরা নতুন এসেছি। ভাঙাচোরা ইংরেজিতে অনেক কথা হল তার সঙ্গে। তারপর থেকে প্রায়ই কথা হত। একসময় এলিসনের সঙ্গে খুব ভাব হয়ে গেল। ভালোই কাটতে লাগল দুজনের। আগেই বলেছি, মাস ছয়েক হল এলিসনের স্বামী না ফেরার দেশে চলে গেছেন। কথা প্রসঙ্গে জানা গেল তাদের একটি মাত্র ছেলে প্রতি সপ্তাহে এসে মায়ের খোঁজখবর নিয়ে যায়! এত বড় বাড়িতে সে একা হয়ে গেছে সেই কারণেই হয়ত আমাকে এত পছন্দ করে। ও কেক বানিয়ে আমাকে দিত। আমি তরকারি রান্না করে তাকে দিতাম!

ওর সঙ্গে যখন আমার পরিচয় হয়েছিল তখনি বেশ বয়স ছিল। বয়স হলে কী হবে চেহারা দেখে আন্দাজ করা যায় যুবতীকালে ভীষণ সুন্দরী ছিল! বুড়ো হয়েছে তাও মুটিয়ে যায়নি। এখনো একহারা ছিপছিপে চেহারা নিয়ে দিব্যি চলাফেরা করছে। কম করে হলেও পঁচাত্তর বছর বয়স তার কিন্তু বেশ গোছানো স্বভাবের মানুষ। তার কাছে শুদ্ধ ইংরেজি শিখেছিলাম! ইংরেজি না পারার কারণে খুব একটা কথা বলতে চাইতাম না! এলিসন বুঝতে পেরে একদিন বললেন, তোমাকে আরও বেশি বেশি কথা বলতে হবে! বিশ্বাস করো তোমার ইংরেজি খুবই ভালো হচ্ছে। শুধু প্রতিদিন আমার সঙ্গে আর একটু বেশি বেশি করে কথা বলবে দেখবে তোমার ইংরেজি আরও ভালো হয়ে যাবে! মনপ্রাণ দিয়ে বোঝাবার কী চেষ্টা তার।

ভালোই চলছিল আমাদের! একদিন আমার এক বন্ধুর কথায় খুব ভয় পেয়ে গেলাম। তিনি বললেন, সাবধান তুমি ওনাকে খাবার দাও বেশ ভালো। কিন্তু যদি কখনও ওর নিজের খাবার খেয়েও হঠাৎ অসুখ করে তাতেও নাম হবে তোমার দেওয়া খাবারের! ওর ছেলেমেয়েরা তোমার নামে আদালতে অভিযোগ করে বারোটা বাজিয়ে দেবে! আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ছাড়াও মা বাবা ছেলে মেয়ে ভাই বোন কথায় কথায় একজন অন্যজনের বিরুদ্ধে নাকি মামলা করে বসে!

তার ওপর বিয়ে ভাঙার মামলা তো রয়েছেই! সেই কারণে এদেশের ল’ ইয়াররা খুব পয়সাওয়ালা হয়! তাই ভয়ে আস্তে আস্তে ওকে খাবার দেওয়া বন্ধ করে দিলাম! ওর বাড়িতে যাওয়াও কমিয়ে দিলাম। ওর ছেলেটি নাকি খুব একটা সুবিধার নয়! এদেশের বয়স্করা খুব একাকিত্ব জীবন কাটায়। তাই কাউকে পেলে খুব সহজেই আপন করে নেয়। এলিসনকে দেখে মনে হয়েছিল স্বামীর কাছে যাওয়ার জন্য দিন গুনছে! কথায় কথায় শুধু স্বামীর প্রসঙ্গ! তার স্বামী নাকি স্বর্গে বসে তাকে দেখছে!

তবুও বেড়ার ফাঁকা দিয়ে মাঝে মধ্যে কথা হত আমাদের। এদেশে এসে আস্তে আস্তে জীবনের ব্যস্ততা বেড়ে গেল অনেক। তাই আগের মতো করে আর খবরাখবর নেওয়া হয়ে ওঠে না। অনেকদিন এলিসনের বাড়িটি খুব সুনসান। ওকে গাছে পানি দিতে দেখিনি। এলাকার একজনকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম, এলিসন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আছে। ওর বাড়িটি তালা দেওয়ায় জনমানুষের সাড়াশব্দ নাই। সবসময় বাড়িটির দিকে তাকিয়ে থাকি। ওর ছেলেকে পেলে জিজ্ঞাসা করব এলিসন কেমন আছে, কবে বাড়ি ফিরবে। বেশ কয়েক মাস পরে একদিন হঠাৎ দেখলাম ওর ছেলে বাড়িটি পরিষ্কার করছে। এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, তোমার মা মানে এলিসন কেমন আছে!

ছেলে বলল, মম মারা গেছে। শুনে ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে ভেঙে যেতে লাগল। ওর সঙ্গে কাটানো দিনগুলোর কথা খুব মনে হতে লাগল। এলিসনের কথা অনুযায়ী এখন সে তার স্বামীর কাছে স্বর্গে গিয়ে হয়ত ভালোই আছে!

এক মাসের মধ্যেই বাড়িতে ভড়ৎ ংধষব বোর্ড ঝুলতে দেখা গেল! মায়ের সম্পত্তি ছেলে পাবে সেটাই স্বাভাবিক! তাই ওর ছেলে বাড়িটি বিক্রি করে দিচ্ছে! মনে হল, মায়ের মৃত্যুর অপেক্ষার দিন গুনছিল বুঝি! বাড়িটা বিক্রির সঙ্গে সঙ্গে এলিসনের ষাট-পঁয়ষট্টি বছরের সংসারের অবসান ঘটবে। তার কোনো অস্তিত্বই আর থাকবে না। চিরদিনের জন্য মুছে যাবে এলিসন নামের কোনো এক যুবতী স্বামী সন্তান নিয়ে একদিন এই বাড়িতে সংসার জীবন শুরু করেছিল। জীবন বড়ই অদ্ভুত। যতই অনুভব করা যায় ততই অবাক হতে হয়।

ডিনা চৌধুরী : প্রবাসী লেখক