পারিপার্শ্বিকতা ও নারীর উচ্চশিক্ষার পরিসর

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২০ | ১৮ আষাঢ় ১৪২৭

পারিপার্শ্বিকতা ও নারীর উচ্চশিক্ষার পরিসর

জেলি আক্তার ৭:২২ পূর্বাহ্ণ, জুন ৩০, ২০২০

print
পারিপার্শ্বিকতা ও নারীর উচ্চশিক্ষার পরিসর

শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। বাক্যটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। যে জাতি যত বেশি শিক্ষিত সে জাতি তত উন্নত। পরিবার হচ্ছে শিশুর প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। মা হচ্ছে প্রথম শিক্ষক। পারিবারিক শিক্ষা প্রতিটা শিশুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার থেকে শিশুর অনেক কিছু শেখার থাকে। পরিবার থেকে শিশুটি শেখে সততা, ভদ্রতা, নম্রতা, নৈতিকতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, যাবতীয় গুণাবলি। নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধসম্পন্ন হলে তা দেশ ও জাতির জন্য সুফল বয়ে আনবে। অন্যদিকে নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ফলে সৃষ্টি হবে সামাজিক বিশৃঙ্খলা।

তাই পরিবার থেকে নৈতিক শিক্ষা শিশুদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। তাদের সামনে যা করা হয়, যা শেখানো হয় তারা তাই শেখে। সেক্ষেত্রে একটি পরিবার শিশুর ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। পরিবারের সেই ছোট্ট শিশুটি ছেলে কিংবা মেয়ে যেই হোক না কেন। তবে হ্যাঁ যখন একটা পরিবারের প্রথম শিক্ষক একজন মা, তাহলে অবশ্যই মাকে শিক্ষিত হওয়া প্রয়োজন। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছিলেন আমাকে শিক্ষিত মা দাও, আমি শিক্ষিত জাতি দেব।

বাক্যটির গভীরতা উপলব্ধি করার মতো যদি পরিবারের মা শিক্ষিত হয় তাহলে সন্তানকে শিক্ষিত করে তুলবে। মায়ের থেকে পাওয়া শিক্ষা নিয়েই বেড়ে উঠবে শিশু। একসঙ্গে থাকতে গেলে পরিবারে নানা ঝামেলা হবে কিন্তু মা শিক্ষিত হলে, বাবা শিক্ষিত হলে তারা বুঝবে শিশুর সামনে পারিবারিক সমস্যা, জটিলতা কী ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ন্যাশনাল ট্রমা কাউন্সেলিং সেন্টারের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ইশরাত শারমীন রহমান বলেন, ‘পারিবারিক নির্যাতন দেখে বেড়ে ওঠা শিশুরা এমন ধারণা নিয়ে বেড়ে ওঠে যে অন্যকে আঘাত করা খুব স্বাভাবিক ঘটনা। সুতরাং শিক্ষিত বাবা মা এই কথা বুঝতে পারবে পারিবারিক সমস্যাগুলো শিশুদের সামনে দ্বন্দ্ব কলহ করে নয়, সমঝোতা আড়ালেও করতে পারবে। এতে শিশুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।’

গ্রামাঞ্চলে লোকমুখে প্রচলিত ‘মাও গুণে ছাও’। অর্থাৎ মা যেমন হবে তার সন্তানও তেমন হবে। মায়ের কাছ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা শিশুদের মাঝে প্রতিফলিত হবে, মা যেমন গুণের অধিকারী তেমন গুণের অধিকারী হবে তার সন্তান। তাহলে আমরা বুঝতেই পারছি, আজকের শিশু যখন আগামী দিনের ভবিষ্যৎ তাহলে আগামী দিনের সেই শিশুদের ভবিষ্যৎ সুন্দর করতে একজন মাকে অবশ্যই শিক্ষিত হওয়া প্রয়োজন।

অতীব জরুরি। মায়ের গুণের কথা বলছি কিন্তু এই গুণ অর্জনের জন্য তাকে শিক্ষিত হতে হবে প্রতিটা মেয়ে একদিন মা হবে। আজ যদি তারা তাদের শিক্ষা ক্ষেত্রে অর্ধেক পথ থেকে ফিরে আসে তাদের শিক্ষা জীবনটা অসম্পূর্ণ থেকে যায় তাহলে মায়ের কাছ থেকে আমরা কতখানি গুণ আশা করতে পারি। একটা মেয়ের উচ্চশিক্ষা অর্জনের পথে কখনো কখনো পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এখনো খেয়াল করলে দেখতে পাব, একটা মেয়ের পড়াশোনা শেষ করতে তার বয়স হিসাবটাই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায় একটা ছেলে চাকরি পেতে তার বয়স বত্রিশ হয়ে যাক কিংবা পঁয়ত্রিশ কিংবা চল্লিশ হয়ে যাক তাতে তেমন কোনো সমস্যা নেই। ছেলেদের বয়স বিবেচনায় রাখা না হলেও একটা মেয়ের বয়স বিশের ঘর অতিক্রম করলেই সমস্যা!

অসুস্থ হলে আমরা মহিলা ডাক্তার খুঁজব কিন্তু উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া মেয়ের বিয়ের সময় আগে বয়স হিসাব করব। আমরা সুন্দরী রূপবতী গুণবতী শিক্ষিত মেয়ে খুঁজব; কিন্তু মেয়ের বিয়ের সময় আগে বয়স হিসাব করব।

বাহ, কী ধ্যানধারণা আমাদের! যখন বিশ বছর বয়সে এসে একটা মেয়ে তার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করে তার জানার পরিধিটাকে বাড়িয়ে তোলে ঠিক তখনই কতিপয় লোক বলে মেয়ের বিয়ে দিচ্ছেন না কেন? বয়স তো কম হলো না। সময় থাকতে বিয়ে দিন নয়তো পস্তাবেন। আর এত পড়াশোনায় কী হবে? কিছু দিন পর ভালো ঘর-বর পাবেন না। আরও কত কথা।

বাংলাদেশের সমাজে নারীদের গর্ভধারণ একটি অতি সাধারণ বিষয়। উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে গ্রামে প্রতি ১০০ বিয়ের মধ্যে ৯০টি বিয়েতেই প্রথম বছরেই মা হয়ে যান নারীরা। তাহলে স্বামী-সন্তান শ্বশুর-শাশুড়ি সমাজ-সংসার সামলিয়ে কতজন পারে উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে? হয়তো পারে কয়েকজন, কিন্তু ব্যতিক্রম কখনো উদাহরণ হয় না। তাহলে আমরা কি বলতে পারি না, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি অনেক সময় উচ্চশিক্ষায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। পারিপার্শ্বিক এমন পরিস্থিতির কারণে মাঝপথে থেমে যায় একটা মেয়ের স্বপ্ন। থেমে যায় উচ্চশিক্ষা অর্জনের আশা আকাক্সক্ষা।

নানান গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে পদচারণা বর্তমান মেয়েদের। বর্তমান মেয়েদের শিক্ষার হার বেড়ে চলেছে তাই আমাদের সবার উচিত দেশ ও জাতির উন্নতির জন্য মেয়েদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেওয়া। শিক্ষার হার বেড়ে যাওয়ার মতো যেন বেড়ে যায় উচ্চশিক্ষার হার। আপনার-আমার সকলের চাওয়া হোক একটাই পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি যেন উচ্চশিক্ষা অর্জনের পথে অন্তরায় হয়ে না দাঁড়ায়।

জেলি আক্তার : শিক্ষার্থী, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ

কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ

jellyakhter403@gmail.com