ভিন্ন পরিসরে বিশ্ব পরিবেশ দিবস

ঢাকা, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২০ | ২৩ আষাঢ় ১৪২৭

ভিন্ন পরিসরে বিশ্ব পরিবেশ দিবস

ইমরুল কায়েস ৭:৫৩ অপরাহ্ণ, জুন ০৪, ২০২০

print
ভিন্ন পরিসরে বিশ্ব পরিবেশ দিবস

`বৈচিত্র্যই সুন্দর’ প্রকৃতি নানা প্রাণী ও উদ্ভিদকুলে ভরপুর; তাই প্রাকৃতিক পরিবেশ মাত্রই সুন্দর। জলবায়ু, পরিবেশ ও মানুষ একে অপরের সঙ্গে অতি নিবিড়ভাবে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। আবার পরিবেশের প্রত্যেকটি জীব প্রজাতির মধ্যে রয়েছে আন্তঃসম্পর্কীয় নির্ভরশীলতার পারস্পরিক যোগাযোগ। নির্ভরশীলতায় মানুষ সবচেয়ে বেশি পরিবেশের উপর জবরদস্তি করে থাকে সেই সঙ্গে অপরিণামদর্শী শোষণ।

যেমনটি সম্প্রতি জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন ‘মানুষের তৎপরতা জীববৈচিত্র্যে বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবর্তন এসেছে বিভিন্ন প্রাণীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের এবং বাস্তুতন্ত্র প্রক্রিয়া বিকৃত করেছে মানুষ। এ প্রক্রিয়াই পৃথিবী নামের গ্রহটির স্বাস্থ্য রক্ষা করে এবং মানুষ নির্ভর করে এমন অনেক সেবার নিয়ন্ত্রণ এ প্রক্রিয়ার হাতেই।’

প্রাণবৈচিত্র্য ঠিক না থাকলে পৃথিবী নামক গ্রহের স্বাস্থ্য ঠিক থাকবে না; আর মানুষের সুস্থতা নির্ভর এই গ্রহের স্বাস্থ্যের ওপর যা প্রতিনিয়ত ধ্বংস করে ফেলছি। কোভিড-১৯ মোকাবেলা ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বড় সংকটকে নিয়ে এবারের বিশ্ব পরিবেশ দিবস বিশ্ব সম্প্রদায়ের জন্য আরো ভিন্ন ভাবনার পরিসর মেলে ধরবে।

এবারের বিশ্ব পরিবেশ দিবস বিগত বছরসমূহের চেয়ে ভিন্ন বৈশি^ক প্রেক্ষাপটে একটি সামগ্রিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিপাদ্যে পালিত হবে। বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২০-এর ভিন্নধর্মী সময় প্রাসঙ্গিক প্রতিপাদ্য হলো ‘জীববৈচিত্র্য’। এ দিবস জাতিসংঘের একটি ‘ফ্লাগশিপ’ কর্মসূচি। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ২৭তম অধিবেশনে বিশ্বের জনসাধারণকে পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ে সচেতন করার উদ্দেশ্যে প্রতি ৫ জুন বিশ্বপরিবেশ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সেই ১৯৭৪ সাল থেকে ঐ দিনটি বিশ্ব পরিবেশ দিবস হিসেবে বর্তমানে ১৫০টি দেশে পালিত হচ্ছে এবং বিষয়টি সমন্বয় ও দেখভালের জন্য ‘জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি’ নিয়োজিত। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির বর্তমান গুরুত্বের বিষয় সমুদ্র দূষণ; বর্ধিত ও অপরিকল্পিত জনসংখ্যা বৃদ্ধি; বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির বিষয়ে সচেতনতা; টেকসই খাদ্য উৎপাদন এবং বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত অপরাধ রোধ করা। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির এ বছরের স্লোগান হলো ‘সময় এখন প্রকৃতির’।

পরিবেশ দিবস এবার বিশেষভাবে পরিবেশ বিষয়ে প্রচলিত সম্মেলন ও ডিসকোর্সগুলোকে ভেঙে ‘জীববৈচিত্র্যে’ রক্ষায় কাক্সিক্ষত সাফল্য অর্জনকারী দেশ কলম্বিয়াকে আয়োজক করা হয়েছে এবং যৌথভাবে জার্মানি সঙ্গে রয়েছে। প্রতিপাদ্যের সঙ্গে মিল রেখে এবং জলবায়ু বিষয়ে সচেতন দেশসমূহকে সামনে এনে বিশ^কে একটি বার্তা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কলম্বিয়া বিশ্বের অন্যতম ‘মেগাডাইভারসি’ দেশ হিসেবে তালিকাভুক্ত এবং গ্রহের জীববৈচিত্র্যের প্রায় ১০ শতাংশ বজায় রাখা, কলম্বিয়া পাখি এবং অর্কিড প্রজাতির বৈচিত্র্যের প্রথম এবং গাছপালা, প্রজাপতি, মিঠা পানির মাছ এবং উভচর উভয় ক্ষেত্রে প্রথম স্থান অর্জন করে।

এন্ডিয়ান ইকোসিস্টেমগুলোতে দেশটিতে বিভিন্ন প্রজাতির স্থানীয় উল্লেখযোগ্য প্রজাতির উচ্চ জৈববৈচিত্র্যের কয়েকটি ক্ষেত্র রয়েছে। এটিতে আমাজন রেইনফরেস্ট এবং চোকা বায়োগ্রাফিক্যাল অঞ্চলের আর্দ্র পরিবেশের অংশ রয়েছে। ফলে এবারের বিশ্ব পরিবেশ দিবস বিগত দশকের চেয়ে পরিসরে ও বার্তায় এগিয়ে।

পেনডেমিক করোনা এবার বিশ্ব সম্প্রদায়কে আবার জোরালোভাবে ভাবার এবং নতুন উন্নয়ন পন্থা বের করার চিন্তা গ্রথিত করেছে। পরিবেশে প্রাণসমূহের বসবাসের সাজুয্য রক্ষা না করলে মানুষের অস্তিত্ব চরম হুমকির মুখে পড়েছে। বাস্তু-পরিবেশের জলে ও স্থলে মানুষ ছাড়া বিভিন্ন প্রজাতির ‘ফ্লোরা’ ও ‘ফোয়ানা’ বিগত দশকগুলো থেকে বিলুপ্তির পথে। আইইউসিএন (International Union for Conservation of Nature)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী সারা বিশ্বে ৩১ হাজার জীব প্রজাতি বিলুপ্তির হুমকিতে রয়েছে যা মোট প্রজাতির ২৭ শতাংশ।

১৭৫০ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত ৫৭১টি বা তারচেয়েও বেশি পশুপাখি বিলুপ্ত হয়েছে। পৃথিবী তার বনাঞ্চল হারিয়েছে ৮০ ভাগ। আর এভাবে চলতে থাকলে ১০০ বছরে যা বাকি আছে তার ৫০ ভাগ হ্রাস পাবে। ১৯৩০ সাল থেকে মৎস্য সম্পদও কমেছে ৪ দশমিক ১ শতাংশ এবং এর কারণ মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধি। পরিবেশ সংরক্ষণের স্থানিক জ্ঞানসমূহ ও এ বিষয়ের ভালোমন্দ বোঝাপড়া ছাড়াই একটি আধিপত্যশীল মানুষ্য উন্নয়ন সংস্কৃতি চলমান রাখা পৃথিবীর ভূ-পৃষ্ঠের ও জলের নিচের প্রাণপ্রজাতির জীবনযাপন এবং বংশ বিস্তারে বড় হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। পরিবেশ জ্ঞানকে থোড়াই কেয়ার করে একমুখী প্রবৃদ্ধি ভালো ফল বয়ে আনেনি।

গত সপ্তাহে বিশ^বায়ুম-ল ও আবহাওয়া সম্বন্ধীয় সংস্থা প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায় শিল্প বিপ্লবের সময় থেকে তাপমাত্রা ১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। বিশ্ব এখন বিপর্যয়কর জলবায়ু সংকটে নিপতিত। যা থেকে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণপ্রজাতি অস্তিত্ব সংকটে পড়ছে। গাছপালা ও অন্যান্য উদ্ভিদ প্রজাতির নির্বিচারে ধ্বংস করার ফলে দুর্বিষহ উত্তাপের শিকার হবে মানুষ। মানুষ ডাঙায় বসবাস করায় ঝুঁকির পরিমাণ বেশি। কারণ সমুদ্রের তুলনায় স্থলভাগের তাপমাত্রা উচ্চগতিতে বাড়ছে।

পাশাপাশি আগামী দিনে সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যা বাড়বে আফ্রিকা ও এশিয়ার উষ্ণতম অঞ্চলসমূহে। জনসংখ্যার ঘনত্ব ও প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থানের বিপর্যয় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ সময় সাড়ে ৭ ডিগ্রি পর্যন্ত তাপমাত্রা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন ও কোভিড-১৯ মোকাবেলা করা এবং জীবন জীবিকা টিকিয়ে রাখতে গেলে অতীতের চেয়ে আরো বৃহৎ পরিসরে কাজ করার জরুরি উদ্যোগ নিতে হবে।

বিশ্ব পরিবেশ দিবস এ জাতিসংঘের ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তি বাস্তবায়নের একটি ধাপ সম্পন্ন করে সিবিডি (Convention on Biological Diversity) হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালের অক্টোবরে। কিন্তু করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে এ কনভেনশন পিছিয়ে গেল ২০২১ পর্যন্ত। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) পূরণে ‘জীববৈচিত্র্য’ ও পরিবেশ সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এসডিজির ১৭টি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ৭টি সরাসরি পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের প্রাণ বৈচিত্র্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এসডিজির লক্ষ্য-২ এ ক্ষুধামুক্ত তথা জিরো হাঙ্গার ফসল ও উদ্ভিদ প্রজাতি সংরক্ষণ ও বংশবিস্তার ঘটানো ছাড়া সম্ভব না।

লক্ষ্য-১৪ ও ১৫-তে সমুদ্রের জলজ প্রাণী ও জীবন সংরক্ষণ এবং ভূ-পৃষ্ঠের মাটি ও প্রাণসমূহের নিরাপদে বেঁচে সরাসরি পরিবেশ ও প্রতিবেশ এবং জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। পরিষ্কার ও নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা লক্ষ্য-৭ এবং ক্লাইমেট এ্যাকশন এসডিজির ১৩ নম্বর লক্ষ্য যা বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মূল উদ্দেশ্যকে প্রতিফলিত করছে।

তাই বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২০-এর এবারের প্রতিপাদ্য-‘জীববৈচিত্র্য’ এসডিজি বাস্তবায়নে একটি সম্মিলিত লক্ষ্যের সমষ্টি। পেছনের পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্যগুলো ছিল পরিবেশের এক একটি একক উপাদানের সংরক্ষণ নিয়ে।

এ বছর সব উপাদানের সাম্যাবস্থা আনয়নের জন্য একটি যুতসই প্রতিপাদ্য নিয়ে পালিত হবে। পরিবেশের উপাদান জল, হাওয়া, মাটি, পানি, সূর্যের আলো সবগুলোর সহনশীল ও প্রাণবান্ধব উপস্থিতি থাকলে জীবের বসবাস স্বাভাবিক ও নিরাপদ হয় ফলে জীববৈচিত্র্য রক্ষা পায়। আবার এটি সঠিক নিয়মে থাকলে পরিবেশের উপাদানসমূহ স্বাস্থ্য সহায়ক হয়ে ওঠে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট, হেলথ এ্যান্ড দ্য গ্লোবাল এনভায়রনমেন্টের ডিরেক্টর আরবানস্টাইন এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন ‘স্বাস্থ্যকে পরিবেশনীতির সঙ্গে বিচ্ছিন্ন করে দেখা একটা বিপদজনক বিভ্রম।’

করোনা মহামারির অর্ধবছরে মানুষ যখন ঘরে বন্দি হল পরিবেশ তখন নিজের মতো করে গুছিয়ে ওঠার অবকাশ পেল। পরিবর্তিত প্রতিবেশ ও পরিবেশের চিত্র পাল্টে গেছে। বায়ুদূষণ কমেছে টোকিও, দিল্লি ও ঢাকার মতো দূষিত বায়ুর শহরের আকাশ নির্মল এবং বায়ুদূষণের মান কমে এসেছে। সমুদ্র সৈকতসমূহে করোনার কারণে মানুষের আনাগোনা ছিল না ফলে সমুদ্র প্রকৃতি তার আপন সাজে সমুদ্রের নীল তিমি সৈকতে ভিড়ছে, গাছে গাছে ফুটেছে ফুল; আবর্জনা না থাকায় কমেছে পরিবেশ ও জল দূষণ।

করোনার অবকাশে বাস্তুতন্ত্রের প্রাণ-প্রতিবেশ নতুন করে সজীব হয়েছে। পরিবেশ দিবস এই প্রাণবৈচিত্র্যের দাবি রাখে। বিশ্ব পরিবেশ দিবস জোরালো দাবি রাখে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, টেকসই ও পরিবেশসহনশীল প্রযুক্তির ব্যবহার এবং প্রতিবেশের সকল জীব সত্তার দূষণমুক্ত জীবন যেন আপন আলয়ে ঠিক রেখে মানুষ বিচরণ করে। কেননা সব সৃষ্টির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখেই উন্নয়নের দিকে অগ্রসর হওয়া উচিত। করোনা পরিস্থিতিতে সারা পৃথিবীর মানুষ বিশুদ্ধ বায়ুতে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে ‘সত্যিই সময় এখন প্রকৃতির’।

 

ইমরুল কায়েস : গবেষক ও সরকারি কর্মকর্তা