রক্ষাকবচ সুন্দরবন ও কৃতঘ্ন আমরা

ঢাকা, শনিবার, ৪ জুলাই ২০২০ | ১৯ আষাঢ় ১৪২৭

রক্ষাকবচ সুন্দরবন ও কৃতঘ্ন আমরা

সোহাগ ফেরদৌস ৭:৪৪ অপরাহ্ণ, জুন ০২, ২০২০

print
রক্ষাকবচ সুন্দরবন ও কৃতঘ্ন আমরা

বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা সুন্দরবন বাংলাদেশের জন্য প্রকৃতির উপহারস্বরূপ। যা বিশ্বের প্রাকৃতিক বিস্ময়াবলির অন্যতম। বাংলাদেশ ও ভারতের অংশ মিলে এর আয়তন ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার। বাংলাদেশের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট ও পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায় এর বিস্তৃতি। বাংলাদেশে ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার ও পশ্চিমবঙ্গে এর বাকি অংশ।

অসংখ্য জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডার আমাদের এ সুন্দরবন। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট যে কোনো জলোচ্ছ্বাস-ঘূর্ণিঝড় থেকে আমাদের বাঁচাতে সবার আগে বুক পেতে দেয়। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে আবারও নিজের বুক পেতে দিয়ে উপকূলীয় জীবন ও সম্পদ রক্ষা করল সুন্দরবন। ম্যানগ্রোভ বনটি অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় আম্পানের ক্রোধ নিজেই মোকাবিলা করেছে। এটাই প্রথম নয়, এর আগেও এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়েছে একাই।

দেশকে বাঁচাতে গিয়ে প্রচুর ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে প্রাকৃতিক বনটির। নিজের মধ্যে লালিত সন্তানসদৃশ অনেক গাছপালা ও অসংখ্য প্রাণীর জীবনের বিনিময়ে রক্ষা করেছে আমাদের। প্রতিবারই নিঃস্বার্থভাবে কাজটি করে সুন্দরবন। ঝড়ের পরপরই সুন্দরবন রক্ষার দাবিও ওঠে বিভিন্ন মহল থেকে। পরে আমরা বিস্মৃত হই সুন্দরবনের সেই একা লড়ার কথা। এর আগেও ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বরে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডরের কবল থেকে রক্ষা করেছিল দেশকে। বিবিসির তথ্য অনুযায়ী ১৯৬০-২০১৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হেনেছে ৩৩টি ঘূর্ণিঝড়। আর ‘ওয়েদার আন্ডারগ্রাউন্ড’নামের একটি ওয়েবসাইটের তথ্যানুযায়ী ৩৫টি সুপার সাইক্লোনের ২৬টিই উৎপত্তি হয়েছে বঙ্গোপসাগরে। আর যার বেশ কিছু সরাসরি আঘাত হেনেছে বাংলাদেশ উপকূলে। আবার অনেকগুলোর প্রভাব পড়েছে উপকূলে।

সর্বশেষ আম্পানের আঘাতে দেশের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ভেসে গেছে চিংড়ি ঘের। ঝরে পড়েছে কয়েকশ শত কোটি টাকার মৌসুমি ফল। ফসলেরও ক্ষতি হয়েছে অনেক। সরকারি হিসাব মতে, আনুমানিক ১১০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে এ ঝড়ে। মৃত্যু হয়েছে অন্তত ২২ জনের। একবার ভাবুন তো সুন্দরবন না থাকলে এই ক্ষতির পরিমাণ কেমন হতো!

যে বুক চিতিয়ে আমাদের রক্ষা করল তারও ক্ষতি হয়েছে অনেক। সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রী শাহাব উদ্দিন জানিয়েছেন সুন্দরবনের ক্ষতি নিরূপণে পৃথক চারটি কমিটি করা হয়েছে। এ কমিটির প্রতিবেদন এলেই বোঝা যাবে এ ঝড়ে কী পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে আমাদের এ পরম বন্ধু। এ ক্ষতি প্রাকৃতিকভাবে সুন্দরবন নিজেই কাটিয়ে উঠতে পারে। হয়তো বছরখানেকের মধ্যেই ফিরে পায় নিজের স্বরূপ। তবে বারবার যাদের আগলে রাখে এই সুন্দরবন তাদের দ্বারা হওয়া ক্ষতি সে কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারে না আর। ২০০ বছর আগেও সুন্দরবনের মোট আয়তন ছিল ১৬ হাজার বর্গকিলোমিটারেরও বেশি আর তা এখন ১০ হাজারে নেমেছে।

আমার প্রথম সুন্দরবন দর্শন ২০০৫ সালে, বাবার হাত ধরে। আমাদের বংশের একটি অংশ বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘদিন থেকেই বাস করছে। তাদের বাড়ি বেড়াতে গিয়েই দেখা সুন্দরবনের। উপজেলা সদর থেকে দীর্ঘপথ হেঁটে জিউধরায় আত্মীয়ের বাড়িতে যাই। বিকেলে বাবা আমাকে সুন্দরবন দেখাতে রওনা হলেন। যোগাযোগ ব্যবস্থার দশা তখন খুবই ভগ্ন। চিংড়ি ঘেরের পাড় দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম আমরা। তখন ঘেরগুলো কেবল মাটি কেটে তৈরি করা হচ্ছিল চাষের জন্য। এরকম মাটির স্তূপের পাশে পড়ে থাকা একটুকরো পুরনো ক্ষয়ে যাওয়া কাঠ হাতে নিয়ে বাবা বললেন, ‘এটা পাকা কাঠ’। এক সময় সুন্দরবন এদিকেও ছিল। তারপরেও সুন্দরবনের দেখা পেতে হেঁটেছি অন্তত সাড়ি তিন কিলোমিটার। বাবার সেদিনের কথা মতে, সুন্দরবন দখল করে গাছপালা উজাড় করে মানুষ বসতি তৈরি করায় ধীরে ধীরে সুন্দরবন সরে যাচ্ছে সাগরের দিকে।

প্রতিনিয়ত আমরা ধ্বংস করে চলছি সুন্দরবন নামক আমাদের নিঃস্বার্থ বন্ধুকে। শুধু কী বন কেটে উজাড় করছি, জাতীয়ভাবেও সুন্দরবন ধ্বংসের আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে। সুন্দরবনের অদূরবর্তী রামপালে গড়ে উঠছে বিশাল প্রকল্পের তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র। যদিও বারবার সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুল্লির উচ্চতা হবে ২৭৫ মিটার। যার ধোঁয়া সুন্দরবনের জন্য ক্ষতিকর হবে না। কিন্তু এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য প্রতি বছর ৪ দশমিক ৭২ মিলিয়ন টন কয়লা আমদানি করতে হবে। এর জন্য ৮০ হাজার টন ক্ষমতাসম্পন্ন ৫৯টি মালবাহী জাহাজের প্রয়োজন হবে।

যা চলাচল করবে সুন্দরবনের মধ্যকার নদী দিয়ে। শুধু কী তাই, কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন ১৪২ টন বিষাক্ত সালফার ডাইঅক্সাইড ও ৮৫ টন বিষাক্ত নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড নির্গত হবে। যার ফলে পরিবেশ আইন ১৯৯৭ এ বেধে দেওয়া পরিবেশগত স্পর্শকাতর এলাকার সীমার (প্রতি ঘনমিটারে ৩০ মাইক্রোগ্রাম) তুলনায় এসব বিষাক্ত গ্যাসের মাত্রা অনেক বেশি হবে (প্রতি ঘনমিটারে ৫৩ মাইক্রোগ্রামের বেশি)। যার ফলে এসিড বৃষ্টি, শ্বাসতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতিসহ গাছপালা জীবজন্তুর জীবন বিপন্ন হবে। সুন্দরবন থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরত্বের এ তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে আরও একবার ভাবতে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল ‘আম্পান’।

২০১৭ সালের ১৬ মার্চ সুন্দরবন নিয়ে দুঃখজনক একটি মন্তব্য করেছিলেন বাগেরহাটের একজন সংসদ সদস্য। তিনি বলেছিলেন, ‘সুন্দরবন যে দেশে নাই, সে দেশ কি চলে না?’। এই বরেণ্য সংসদ সদস্য ইতোমধ্যে গত হয়েছেন। তিনি ১৯৬০ সাল-পরবর্তী ৩৩টি ঘূর্ণিঝড়ের সাক্ষী হয়েও তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে সুন্দরবনের ক্ষতি প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে এমন মন্তব্য করতে পেরেছিলেন। তিনি কখনো ভেবেছেন সুন্দরবন না থাকলে হয়তো তার বাগেরহাটই থাকবে না।

২০০৮ সালে খুলনা উপকূলের সাবেক এক সংসদ সদস্যকে একটি সভায় বলতে শুনেছি ‘এই সুন্দরবনের পাশ দিয়ে ছোটবেলায় হেঁটেছি আর এর কাঠ চোরাকারবারিদের রুখতে এমপি হওয়ার স্বপ্ন দেখেছি।’দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য এই এমপির দলের লোকদের এবং তার আত্মীয়দের বিরুদ্ধে সুন্দরবনের কাঠ ও বাঘের চামড়া পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে বহুবার। তাকে কখনো কাছে পেলে এর উত্তর জানার ইচ্ছা আছে।

এদিকে বিশ্ব উষ্ণায়ন সমুদ্রকে স্ফীত করে তুলছে। এই উচ্চ পানিতল সমুদ্রতল থেকে মাত্র ৩০ ফুট উঁচু সুন্দরবনকে অনায়াসেই নিমজ্জিত করতে পারবে। কেননা সারা বিশ্বে প্রতিবছর সমুদ্রতল ২ মিলিমিটার করে বেড়ে চলছে, আর সুন্দরবনের অংশে প্রতিবছর ৩ দশমিক ১৪ মিলিমিটার করে বাড়ছে। এভাবে চললে এ শতাব্দীর মাঝামাঝি সুন্দরবনের অধিকাংশ অংশই পানির তলায় তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি দ্বীপ সাগরে হারিয়ে গেছে সুন্দরবনের মানচিত্র থেকে। ১৯৬৯ সাল থেকে ২০০১ সাল অবধি সময়কালে এখানে আমরা হারিয়েছি ১৫০ বর্গকিলোমিটার অঞ্চল। যদিও কিছুটা আমরা ফিরেও পেয়েছি।

সিডর, আইলা, বুলবুল, মোরা, ফনি, সর্বশেষ আম্পানের আঘাত থেকে বারবার রক্ষা করা সুন্দরবনকে বাঁচাতে হবে আমাদের বাঁচার স্বার্থেই। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মোকাবিলা করতে হবে বাঁচার তাগিদেই। তাই সুন্দরবন রক্ষায় এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে সংশ্লিষ্টদের।

 

সোহাগ ফেরদৌস : কলাম লেখক