শিক্ষার উদ্দেশ্য ভালো মানুষ হওয়া

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২০ | ২৫ আষাঢ় ১৪২৭

শিক্ষার উদ্দেশ্য ভালো মানুষ হওয়া

হাছিবুল বাসার মানিক ৭:১৪ অপরাহ্ণ, জুন ০১, ২০২০

print
শিক্ষার উদ্দেশ্য ভালো মানুষ হওয়া

শিক্ষার বিষয়টা শুধু পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া কিংবা সার্টিফিকেট অর্জন করা নয়। মূল উদ্দেশ্য ভালো মানুষ গড়ে তোলা, শেখার মধ্য দিয়ে কোনো বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করা, যেকোনো সমস্যাকে মোকাবেলা করা ও গভীরভাবে বিচার-বিশ্লেষণের ক্ষমতা অর্জন, মানবিকতা, মূল্যবোধ, দেশপ্রেম সবকিছুই শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত। এমনকি কমিউনিকেশন স্কিলের মতো বিভিন্ন সফট স্কিল ও হার্ড স্কিলও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কিন্তু এখন আমরা দেখতে পাই, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা কেবল ভালো ফলাফল বা জিপিএ-৫ কেন্দ্রিক প্রতিযোগিতার দিকেই ধাবিত হচ্ছেন। মানবিক গুণাবলি ও দক্ষতা অর্জনের বিষয়টি গৌণ হয়ে পড়েছে। আমরা বিভিন্ন উন্নত দেশের চেয়ে আর্থ-সামাজিক দিক দিয়ে কিছুটা পিছিয়ে আছি, ফলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা হয়ত মনে করেন, ভালো ফলাফল করলে দেশের বাইরে চলে যাওয়া যাবে। এ কারণে তারা ভালো জিপিএ অর্জন করতে আগ্রহী হয়ে থাকেন। বর্তমানে শিক্ষকতাকে শুধু চাকরি ভেবে অনেকে নির্দিষ্ট বিষয় পড়ানোর বাইরে বাড়তি কিছুতে মনোযোগ দিতে চান না।

তবে মানের দিক দিয়ে আমাদের শিক্ষকদের ঘাটতি আছে বলে আমি মনে করি না। কারণ প্রাথমিকেও এখন অসংখ্য মাস্টার্স ডিগ্রিধারী শিক্ষক আছেন, যেমনটা আগে ছিল না। আগে যারা শিক্ষকতায় আসতেন, শিক্ষকতাকে মহান ব্রত ভাবতেন। অনেকে এখন শিক্ষকতাকে স্রেফ অন্য পাঁচটা চাকরির মতো ভাবেন। আগেকার শিক্ষার্থীদের পড়ার ধরনের সঙ্গে এখনকার শিক্ষার্থীদের পার্থক্য অনেক। শিক্ষার মান নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠলেও সূক্ষ্ম বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়া সহজ কোনো উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। কলেজে ভর্তির ক্ষেত্রে এখন আগের মতো ভর্তিযুদ্ধ নেই।

যেহেতু পুরো বিষয়টা অনলাইনে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, তাই একজন শিক্ষার্থী চাইলেই যেকোনো কলেজে ভর্তি হতে পারে না, তাকে বেশকিছু অপশন মাথায় রাখতে হয়। তবে নির্দিষ্ট কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি ঝোঁক সবসময়ই লক্ষ্য করা যায়। মনে রাখা দরকার, সচরাচর যেগুলোকে ভালো প্রতিষ্ঠান বলা হয়, তারা দীর্ঘদিন ধরে নিয়মশৃঙ্খলা, পাঠদানে ভিন্নতা ও ভালো ফলাফলের কারণে সুনাম অর্জন করেছে বলেই সেগুলোকে আমরা ভালো বলছি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল, একজন শিক্ষার্থী যদি পরিশ্রমী হয়, আন্তরিকতার সঙ্গে পড়াশোনা করে, তবে তার পক্ষে যেকোনো প্রতিষ্ঠান থেকেই ভালো করা সম্ভব। প্রতিবছরই প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হওয়াসহ নানাবিধ সাফল্যের কথা শুনতে পাই আমরা।

কাজেই জিপিএ-৫ এবং ভালো প্রতিষ্ঠানের নামের পেছনে না ছুটে লক্ষ্য স্থির করে প্রকৃত শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনে মনোযোগ দিতে হবে। মানবসম্পদ ও মেধাবী প্রজন্ম হিসেবে গড়ে ওঠার যাত্রায় ফলাফল ও প্রতিষ্ঠানের দিক দিয়ে জেতার চেয়ে শেখাটা বেশি জরুরি। শিক্ষার্থীদের শুধু পুঁথিগত শিক্ষায় আবদ্ধ করে রাখলে সৃষ্টিশীলতার বিকাশ ঘটবে না। তাদের বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নিতে সহায়ক পরিবেশ দিতে হবে। পূর্ণ জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই যথেষ্ট নয়। জিপিএ-৫ পাওয়া মানেই শুধু মেধাবী নয়। শুধু মুখস্থবিদ্যা নয়, সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল হতে হবে। একমাত্র মেধাবীরাই পারে তাদের মেধা আর মননকে কাজে লাগিয়ে দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে।

অভিভাবকরা কিংবা শিক্ষকরা শুধু জিপিএ-৫ বা প্রথমের পেছনে না ছুটে যদি তাদের সন্তানরা বা শিক্ষার্থীরা কী শিখল, কতটুকু শিখল, কী কী ঘাটতি আছে, কতটুকু শেখানো দরকার এ বিষয়ে গুরুত্ব দেন তাহলে সেই সন্তান প্রকৃত দক্ষতা অর্জনে সক্ষম হবে। শিশুদের দিয়ে জিপিএ-৫ পাওয়া বা প্রথম হওয়ার প্রতিযোগিতায় না গিয়ে তাদের প্রকৃত মানুষ বানানোর ব্রতে মনোনিবেশ করি। তাতেই দেশের মঙ্গল হবে।

হাছিবুল বাসার মানিক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

mdhasibulbashardu2018@gmail.com