করোনা রোগী মানে ‘অচ্ছুত’ নন

ঢাকা, শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২০ | ১৯ আষাঢ় ১৪২৭

করোনা রোগী মানে ‘অচ্ছুত’ নন

গোপাল অধিকারী ৭:৩২ অপরাহ্ণ, মে ৩১, ২০২০

print
করোনা রোগী মানে ‘অচ্ছুত’ নন

জাতি হিসেবে আমাদের অনেক গর্ব। ভাষা আন্দোলনে বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যুদ্ধে নেমে বিজয় ছিনিয়ে আনা গণঅভ্যুত্থানসহ অনেক ইতিহাস। আমাদের কিছু নেতিবাচক অধ্যায়ও আছে। গ্রামে অনেক কথাই শোনা যায়। যেমন বাঙালি অতিচালাক জাতি, বাঙালি এক লাইন বেশি বোঝে চলে, বাঙালি স্বার্থবাদী, বাঙালি লেট অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের থেকে দেরিতে আসে ইত্যাদি ইত্যাদি। যে কারণে কেউ কোনো অন্যায় করলে ‘জাতে বাঙাল’ এই কথা বলে গালি দিতেও শোনা যায়। যা লজ্জাজনক।

একসময় ভাবতাম এগুলো মনে হয় শুধু গ্রামের নিরক্ষরদের মধ্যেই আছে। এখন দেখি এই বোঝার ব্যাপারটা অনেকের মধ্যেই আছে। আসলে এমন ভালোকে মন্দ করে বোঝা কলঙ্কিতই করেছে। বিশ্বব্যাপী এক প্রকার যুুদ্ধই চলছে বলা যায় যার এক প্রান্তে সকল দেশের জনগণ আর অপর প্রান্তে করোনা। যুদ্ধে তবু একটি স্বস্তির জায়গা থাকে কিন্তু করোনার কাছে কেউ যেন স্বস্তি পাচ্ছে না। সকলের মধ্যে রয়েছে মানসিক চাপ। করোনার ভয়াল ধাবার শিকার বিশ্বের প্রায় ২১০টি দেশ। প্রভাব পরেছে আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক, শিক্ষা ও অর্থনীতিসহ সকল কিছুর উপর। প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে করোনাভাইরাসে মৃত্যুর সারি। কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না। বিশ্বের মোড়ল রাষ্ট্রগুলোও করোনার কাছে আজ পরাজিত।

গত ৩১ ডিসেম্বর চীনের মধ্যাঞ্চলীয় হুবেই প্রদেশের উহান শহরে প্রথম করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি ধরা পরে। তারপর থেকেই চলছে তা-ব। করোনাকালে আমার দেখা সেরা সহযোগিতা পাচ্ছে দেশের মানুষ। সরকার এই সংকটময় সময়ে যা দিয়েছে তা মাইলফলক। কিন্তু এ সময়ে জনমনে দেখা দিচ্ছে বিষাদময় সংবাদ। এ সংকটময় সময়ে বাঙালির সেই কলঙ্কিত বিষয়টি আবারও অনুধাবন করতে পারলাম। সেটি হল করোনা রোগীকে কলঙ্কিত মনে করা। পত্র-পত্রিকা বা টেলিভিশন চ্যানেলে অনেক খবরই দেখছি, করোনা রোগীকে খাবার দিচ্ছে না। ঘর ভাড়া দিচ্ছে না।

সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয়, করোনা রোগে কেউ মারা গেলে তার পরিবারের সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করছে না। মনে হচ্ছে করোনা হওয়া অর্থই সে যেন সমাজের নিকৃষ্ট মানুষে পরিণত হয়েছে। যার কারণে অনেকে এই রোগে আক্রান্ত হলেও কাউকে বলছে না। মনে হচ্ছে এ রোগটা হওয়া অর্থই যেন নির্ঘাত মৃত্যু আর সমাজ থেকে বিচ্ছেদ। কিন্তু কেন? আসলে কি রোগটি এমন? ভাব সম্প্রসারণ পড়েছি, ‘পাপকে ঘৃণা করো, পাপীকে নয়।’

অর্থাৎ একজন যদি চুরি করে তাহলে তার সেই চুরি বিদ্যাকে ঘৃণা করতে হবে। কারণ সেই চুরি করাটা পাপ। কিন্তু আমরা যদি চোরকে ঘৃণা করি তাহলে সে কখনও ভালো পথে আসবে না। সে যদি ভালো পথে না আসে তাহলে কিন্তু সমাজে চুরির ঘটনা ঘটতেই থাকবে। তাহলে বিষয়টা কী হল? তাকে কিন্তু ভালো হওয়ার সুযোগ দেওয়া হল না। সামাজিকভাবে সে যেন এই অপরাধে জড়িত না থাকে সেটা বলা যেতে পারে বা শাস্তি দেওয়া যেতে পারে কিন্তু তাকে অবহেলা করার মধ্যে কোনো কৃতিত্ব আছে বলে আমার মনে হয় না। বরং চোরকে যদি কেউ কোনো পরামর্শ দিয়ে ভালো পথে আনতে পারে সেটাই সফলতা। করোনার ক্ষেত্রেও কিন্তু একই পরামর্শ। তাচ্ছিল্য করার কোনো কারণ দেখি না।

হোম কোয়ারান্টিনে থাকার অর্থ অপরাধ নয়। যে রোগের যে চিকিৎসা। করোনা রোগে কেউ আক্রান্ত হলে তাকে আলাদা রাখা উচিত। তার সংস্পর্শে এলে রোগের বিস্তার ঘটতে পারে বা বাড়ির অন্য সদস্যদের মধ্যে রোগটি সংক্রমিত হতে পারে। রোগীর সুস্থতা ও পরিবারের সুস্বাস্থ্য চিন্তা করে এ প্রতিকার। তাহলে কেন করোনা হলেই সমাজের নিকৃষ্ট মানুষ তাকে ভাবা হচ্ছে! বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তেই এমন প্রচার-প্রচারণা বা প্রবণতা রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামে এটি বেশি ভাবা হচ্ছে। কারণ গ্রামের অধিকাংশ মানুষ নিরক্ষর।

কিন্তু প্রত্যেক মানুষেরই স্ব স্ব মর্যাদা নিয়ে বাঁচার অধিকার রয়েছে। তাছাড়া এমন প্রবণতার কারণে অনেকের মধ্যে আতঙ্ক বা চাপ কাজ করছে। ফলে আগে থেকেই অসুস্থ রোগীরা এ মনোবৃত্তি করতে করতে মারা যাচ্ছে বা যেতে পারে। আমার মনে হয় আমাদের সকলের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। করোনায় আক্রান্তকে নয় বরং সংকটকালে যারা চাল চুরি বা জনগণের টাকা পকেটে ভরছে তাদের ঘৃণা করা উচিত। আমরা যদি চাল চোরকে ঘৃণা না করে সঙ্গ দিতে পারি, সমাজে ধর্ষণ করে তাকে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারি তাহলে করোনা রোগীর ক্ষেত্রে কেন বৈষম্য! কেউ কি ইচ্ছে করে করোনায় আক্রান্ত হয়েছে? প্রত্যেকেরই কিন্তু নিজ নিজ জীবনের মূল্য আছে। করোনা একটি রোগ এবং এই রোগ নির্মূল করা যাবে না তাও না। বিশ্বের অনেক দেশের অনেকেই সুস্থ হয়েছে। বাংলাদেশেও সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন অনেকে।

গণমাধ্যম করোনার জন্য আলাদা বার্তা বিভাগ করেছে বা গুরুত্ব্সহকারে সার্বিক অবস্থা তুলে ধরছে। বিবেচনায় বলে করোনায় আক্রান্তকে এখন আমাদের বেশি মূল্যায়ন করা উচিত তার ও আমাদের সুস্বাস্থ্যের জন্য। সঠিক নিয়ম ও সর্তকতা অনুসরণ করলে করোনা বাংলাদেশে তেমন ক্ষতি করবে না বলে আশা করা যায়। চীনা গবেষণায় বলা হচ্ছে, উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্ম ও বর্ষা মৌসুমের সময় করোনা ঝুঁকি কমে যাবে। উত্তর গোলার্ধ বেশ কয়েকটি দেশ রয়েছে। তবে এশিয়া মহাদেশের পূর্ব তিমুর, ইন্দোনেশিয়া ও মালদ্বীপ রয়েছে এই দক্ষিণ গোলার্ধে।

আর এশিয়ার বাকি দেশগুলোর অবস্থান উত্তর গোলার্ধে। উইকিপিডিয়া বলছে, বাংলাদেশের অবস্থান উত্তর গোলার্ধে। আর এই গোলার্ধে গ্রীষ্ম ও বর্ষা মৌসুমে কমে যাবে করোনার ঝুঁকি। চীনা গবেষকদের মতে, এই গোলার্ধ করোনার ভয়াল থাবা থেকে মুক্তি পেতে পারে। তাই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশে করোনার ঝুঁকিটা কিছুটা হলেও কম। প্রত্যাশা করি সকলে মিলে সচেতনতার মাধ্যমে করোনার বিদায় ঘণ্টা বাজিয়ে দেওয়ার। পৃথিবীটা মানুষের জীবনের অনুরূপ। সুখ-দুঃখ আর আনন্দবেদনা নিয়েই জীবন। সুখও দীর্ঘস্থায়ী নয় আবার দুঃখও দীর্ঘস্থায়ী নয়। সেই ধারাবাহিকতায় করোনাও দীর্ঘস্থায়ী নয়।

সকলে মিলে আইন ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলি। আইন না মানা গুরুতর অপরাধ। আইন তো আমাদের জন্যই। একসময় দেশে ক্যান্সার হলে, যক্ষ্মা হলে রক্ষা ছিল না। এখন এই মরণব্যাধিরও ওষুধ আবিষ্কার হয়েছে। এখন আর যক্ষ্মা রোগীকে কেউ আলাদা মনে করে না। আমরা করোনা আক্রান্ত পরিবারের প্রতি সদয় হই, তাদের খোঁজ-খবর নেই। করোনা দূর করতে শক্তি ও সাহস দিই। পাশাপাশি করোনা যেন আমাদের মাঝে দূরত্বের সৃষ্টি না করে সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। আমরা সাময়িক সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে পারি। তবে এ অজুহাতে আমরা যেন নির্দয় না হই। করোনা আমাদের শিখিয়ে যাচ্ছে রাগ-হিংসা-ঈর্ষা কোনোটাই আমাদের নয়। মন্দ অভ্যাসগুলো ভালো কিছু করতে সাহায্য করে না। কেউ কি এমন সংবাদ পেয়েছেন কোন এলাকায় কোন মানুষের হিংসার কারণে করোনা থেকে মুক্তি পেয়েছেন? পায়নি কিন্তু বরং কোনো অসামাজিক মানুষ করোনায় মারা গেলে লোকমুখে প্রচার হবে লোকটি খুব অসামাজিক ছিল তাই সৃষ্টিকর্তা তাকে তুলে নিয়েছেন। সমাজের অসঙ্গতিগুলো দূর করার দায়িত্ব সকলের। বিশেষ করে সমাজের গুণিজন বা দায়িত্বশীল সুনাগরিক রয়েছে আমাদের সকলের উচিত যারা করোনাকে নিয়ে এমন প্রবণতার পরিচয় দিচ্ছে তাদের বোঝানো।

করোনা অর্থ কলঙ্কিত নয়। করোনা রোগ নিরাময়যোগ্য। শুধু করোনা নিয়েই নয়, সমাজের সকল অসঙ্গতির বিষয়ে সঠিক পরামর্শ তুলে ধরা আমাদের সকলের দায়িত্ব। আমার মনে হয় করোনা নিয়ে এই বিকৃত তথ্য আরও বাড়তে থাকবে। তবে এমন অসচেতনতামূলক কথা বাড়তে দেওয়া যাবে না। করোনা রোগীর মনোবল হারানো যাবে না। পাপকে ঘৃণা করে, পাপীকে ভালো পথে সুস্থ জীবন গড়তে উৎসাহিত করি। তাহলেই সমাজে বিস্তৃতি পাবে না অপসংস্কৃতি বা অসঙ্গতি। সকলের মর্যাদা হবে সমান। সরকারের প্রতি অনুরোধ, করোনা রোগীর সামাজিক মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষায় সচেষ্ট থাকুন। সর্বশেষ একটি সত্য ঘটনা দিয়ে শেষ করব।

আমার বাড়ির পাশের বাড়িতে ঢাকা থেকে একজন করোনা রোগী আসছে এমন কথায় সকলে তৎপর। চারদিকে ঢাকঢোল করোনা রোগী আসছে। পাড়ার যুবকরা তার পরিবারকে ডেকে ঘরবন্দি জীবনযাপনের নির্দেশ দিয়েছে। কথার বিকৃতি ঘটে পরে শোনা গেল আমার বাড়িতে করোনা রোগী। আমার বাড়ি লকডাউন। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা ছিল ঢাকা ফেরত বাড়ি থেকে ওই পরিবারের সন্তানকে নিজ বাড়িতে নিরাপত্তার জন্য নিয়ে আসে। অথচ কোনো নমুনা পরীক্ষা ছাড়াই তার পরিবারকে ঘরবন্দি করে রাখা বা করোনা রোগী বানানো কি অপরাধ নয়? এই যে গুজব বা আইন লঙ্ঘন বা ঘৃণা এগুলো কারোই কাম্য নয়। মনে রাখতে হবে নমুনা সংগ্রহ করলেও সে করোনা আক্রান্তকারী নাও হতে পারে। কারণ পরীক্ষা করা হয়েছে অনেকের সকলেই কিন্তু রোগী নয়।

রোগী তারাই যাদের প্রশাসন থেকে চি?িহ্নত করা হবে। মানুষের জীবন অর্থই রোগ-ব্যাধি সুস্থতা সবকিছু মিলে। তবে বর্তমানে চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতির কারণে কোনো রোগই আর রোগ নয়। যেকোনো রোগেরই স্বাস্থ্যবিধি বা ওষুধ খেলে মুক্তি মেলে। কিন্তু বিভিন্ন রোগে আমাদের অতিরঞ্জিত মনোভাব ক্ষতির কারণ। কিন্তু একটু রঞ্জিত মনোভাব ক্ষতি করতে পারে অনেক কিছুই। আসুন সকলে মিলে করোনা রোগীর খোঁজ-খবর নিয়ে সুরক্ষার উদ্যোগ নিই। প্রিয় মানুষগুলোকে বাঁচতে অনুপ্রেরণা দিই।

 

গোপাল অধিকারী : সাংবাদিক ও কলাম লেখক

gopalodikari1213@gmail.com