স্বাস্থ্যখাতে বদলে যাওয়া বিশ্বের প্রতিচিত্র

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২০ | ২৫ আষাঢ় ১৪২৭

স্বাস্থ্যখাতে বদলে যাওয়া বিশ্বের প্রতিচিত্র

ফকির ইলিয়াস ৮:১১ অপরাহ্ণ, মে ৩০, ২০২০

print
স্বাস্থ্যখাতে বদলে যাওয়া বিশ্বের প্রতিচিত্র

বদলে যাচ্ছে বিশ্বের স্বাস্থ্যখাত। এটি এখন একটি মুখ্য ইস্যু। আমেরিকায় লেগেছে এর বড় ধাক্কা। এক লাখেরও বেশি মৃতের সংখ্যা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ট্রাম্প প্রশাসন। কী হবে কী হতে পারে, এই শঙ্কা সর্বত্র। সব মিলিয়ে যে বিষয়টি এখন প্রধান আলোচনার বিষয় তা হল মানুষের স্বাস্থ্য। আমেরিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়বে আমেরিকার স্বাস্থ্যসেবা। ক্রমান্বয়ে বাকিরাও তা অনুসরণ করতে পারেন কিংবা করতে হতে পারে। টেলিমেডিসিন বিষয়টি হতে পারে অন্যতম ব্যবস্থা। যে চিকিৎসাগুলো অডিও-ভিডিও মাধ্যমে সারা যাবে, সেদিকেই গুরুত্ব দেবেন চিকিৎসকরা।

অপারেশন, ফিজিক্যাল থেরাপিসহ অন্যান্য চিকিৎসায় যেখানে সরাসরি রোগীকে উপস্থিত থাকতে হবে সেটাকে বিবেচনা করা হবে আরজেন্ট প্রায়োরিটি হিসেবে। শিশুদের চিকিৎসা বিষয়টিও প্রথম সারির প্রাধান্য পাবে। মার্কিনিদের হেলথ ইনস্যুরেন্স বিষয়টিকে আরও গুরুত্ব দেওয়া হবে। কেউ আমেরিকা ভিজিটে এলে তাকে হেলথ ইনস্যুরেন্স কিনে আসতে হবে। যারা নতুন ইমিগ্র্যান্ট হয়ে আসবেন তাদেরও ইনস্যুরেন্স কিনে, প্রিমিয়াম পরিশোধ করে আমেরিকায় আসতে হবে। কর্মক্ষেত্রের মাধ্যমে ইনস্যুরেন্স পাওয়ার বিষয়ে সাহায্য করবে অঙ্গরাজ্য সরকার।

যারা সিনিয়র সিটিজেন তাদের চিকিৎসা সাহায্য আরও বাড়ানো হবে। নার্সিং হোমগুলোকে ঢেলে সাজানো হবে। খুব জরুরি না হলে, সিনিয়ররা নিজ নিজ বাড়িতে থেকেই ‘হোম হেলথ এইড’ রাখতে পারবেন। অগ্রজ আইনানুযায়ী তারা সকল সমর্থন পাবেন সরকারের। এবারের এই প্যানডেমিক সংকটকালে কোন কোন গোত্র, বর্ণ, অরিজিনের মানুষ বেশি আক্রান্ত হয়েছেন তা খতিয়ে দেখা হবে। স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টি গবেষণায় এনে আগামীর কার্যক্রম চালুর কথাটিও ভাবা হচ্ছে। কারণ বর্ণবৈষম্যের কারণে এই মহামারিকালে কেউ নিগৃহীত হয়েছেন কিনা তা খুবই গুরুত্ব পাচ্ছে রাজনৈতিক আলোচনায়। পর্যাপ্ত ওষুধ প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করতে বলা হবে ড্রাগ মেন্যুফেকচারিং কোম্পানিগুলোকে। অতীতে বিশ্বের মহামারিকালে গোটা বিশ্বে লোকসংখ্যা ছিল কম।

সেই বিবেচনায় প্রাকৃতিক পরিবেশ ছিল বিশুদ্ধ। চলমান বিশ্বের জনসংখ্যার নিরিখে ওষুধগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে গভীর গবেষণা চালাবে বিজ্ঞানাগারগুলো। বড় বড় ওষুধ কোম্পানিগুলোকে বিশেষ সহায়তা দিয়ে কাজ ত্বরান্বিত করা হবে। আমেরিকায় নির্মিত ওষুধগুলোকে চিকিৎসায় প্রাধান্য দিতে হবে। ‘আমাদের ওষুধই হবে বিশ্বের সেরা ওষুধ’ নীতিটি জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর হতে চাইছে মার্কিন মুলুক। ‘স্বাস্থ্যপরিষেবায় নতুন যুগ’ স্লোগানটি মুখ্য করতে চাইছে আমেরিকা। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, হেলথ এন্ড হাইজিন ইস্যু, ফুড প্রসেসিংয়ে বিশেষ নজরদারি, পথঘাটে ময়লা-আবর্জনা ইস্যুতে জেল জরিমানা ইত্যাদি বিষয়ে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ব্যক্তি মালিকানাধীন ছোট ছোট হাস-মুরগির ফার্মগুলো বন্ধ করার জন্য ইতোমধ্যে বিল উত্থাপিত হয়েছে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে। ছোট পোল্ট্রি ফার্মগুলোও যাতে এফডিএ (ফুড এন্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন) দ্বারা সত্যায়িত হয় সেই বিষয়টিতে কড়াকড়ি আনাই এর মূল উদ্দেশ্য। ডাক্তার ছাড়াও নার্স, প্যারামেডিক, নার্স প্রেকটিশনার, ফিজিশিয়ান এসিস্টেন্টদের চাকরির গুরুত্ব আরও বাড়ানো হবে। এই খাতে বাজেট বড় করা হবে। তাদের সুযোগ-সুবিধায়ও আনা হবে ব্যাপক সংযোজন। আমেরিকার হাসপাতালগুলোকে বাজেট বরাদ্দ, বাড়িয়ে দেওয়া হবে। চিকিৎসার জন্য রুমগুলোও ঢেলে সাজানো হবে। নতুন ইকুইপমেন্ট কেনা হবে। বড় আকারে ভবন বানিয়ে হাসপাতালের কাঠামো পরিবর্তন করা হবে, সেই অঙ্গরাজ্যের জনসংখ্যার অনুপাতে।

স্বাস্থ্যখাতের বদলে যাওয়া বিষয়ে সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট হাকম্যান বলছেন, ‘আমরা এখন যুদ্ধকাল পার করছি। এটা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়। একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে ঢেলে সাজাতে হয়। আমি মনে করি আমরা যদি মানুষই বাঁচাতে পারলাম নাÑ তাহলে সমরাস্ত্র পুষে লাভ কী? আমরা অস্ত্র নির্মাণ খাতে ব্যয় বাড়িয়ে রেখেছি। অথচ স্বাস্থ্যখাতে আমাদের প্রস্তুতি একেবারেই নিম্নপর্যায়ের! এই কোভিড-১৯ যুদ্ধের শুরুতে আমাদের পর্যাপ্ত মাস্ক, গ্লাভস, পিপিই, ভেন্টিলেশন ছিল না। আমেরিকার মতো দেশে এমনটি ভাবা যায়? তা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। এটা প্রমাণিত হয়েছে, স্বাস্থ্যখাত ভেঙে পড়লে শিক্ষা, বাণিজ্য, যোগাযোগ, সমাজ সবই ভেঙে পড়ে। তাই স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ আমাদের বাড়াতেই হবে।’

আমরা সকলেই জানি, আমেরিকায় চিকিৎসা ব্যবস্থা অনেক উন্নত এবং চিকিৎসকরাও অনেক যোগ্যতাসম্পন্ন। কিন্তু সাধারণ আমেরিকান জনগণের জন্য নিজেদের চিকিৎসা অনেক ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই যেতে হয়।

অন্যান্য দেশে যেভাবে সমন্বিত চিকিৎসা পদ্ধতি রয়েছেÑ আমেরিকায় এর চেয়েও ভালো ব্যবস্থা আছে। যদিও ইনস্যুরেন্সের নিয়ম মেনেই হয় সবকিছু। এখন এই ব্যবস্থাটি আরও কার্যকর ও সহজ করার সময় এসেছে। কাজ শুরু হয়েছে সেই লক্ষ্যেই। বিশেষ করে আমেরিকা ভুলে যায়নি, বিংশ শতাব্দীতে ঘটে যাওয়া দুটি বিশ্বযুদ্ধ, ৩০’র দশকে তীব্র আর্থিক মন্দার কথা। এর কারণে বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া ‘গ্রেট ডিপ্রেশন’ বা মহা অবসাদ, অথবা ৮০’র দশকে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর পতনে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, আর্থিক ব্যবস্থায় এনেছিল বড় পরিবর্তন।

একবিংশ শতাব্দীতে করোনা মহামারি কি সে রকমই বড় কোনও পরিবর্তন নিয়ে আসবে? প্রশ্নটি নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়ে গেছে আন্তর্জাতিক বুদ্ধিজীবী, গবেষক মহলে। প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, করোনা মহামারির এই তা-ব থেকে শিক্ষা নিয়ে বৃহৎ শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর অথবা বিবাদমান দেশগুলোর নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন ইতিবাচক পদক্ষেপ নেবে কি? প্রশ্নটি উঠে এসেছে স্বাস্থ্য সঙ্কটের এ নিদারুণ বাস্তবতায় কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ থেকে। উদাহরণস্বরূপ, দীর্ঘ বৈরিতা ভুলে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইরান পারস্পরিক সহযোগিতার পথে হাঁটছে। ফিলিপাইন সরকার করোনা সঙ্কট শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানকার কমিউনিস্ট বিদ্রোহীদের সঙ্গে চলতে থাকা যুদ্ধের বিরতি ঘোষণা করেছে। এ সবই হয়ত সাময়িক, কিন্তু এটা জেনেও অনেকেই মনে করছেন করোনা মহামারির অবসানের পর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে, সামাজিক ক্ষেত্রে একটা বড় পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী।

বিশ্বের অনেক দেশই বিশ্বব্যাপী মহামারির কারণে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক ও আর্থিক সঙ্কট প্রশমনের জন্য ব্যবসা-বাণিজ্য ও শ্রমিক কর্মচারীদের জন্য অভূতপূর্ব ত্রাণ সাহায্য ঘোষণা করছে। এসব মানুষকে মানবতার স্বমহিমায় ফিরে আসাকেই নিশ্চিত করছে। এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি আমেরিকাতেই হয়েছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়ও এত আমেরিকানের প্রাণহানি হয়নি বলে জানাচ্ছে পরিসংখ্যান। ভয়াবহ এই পরিস্থিতির মধ্যে দাঁড়িয়ে করোনা পরবর্তী পৃথিবীর অর্থনীতি কেমন হবে তা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা। আলোচনা করছেন একে অপরের সঙ্গে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অব স্টেটস মাইক পম্পেও বলেছেন, এই পরিস্থিতিতে বিশ্বের অর্থনীতিকে কীভাবে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় তা নিয়ে আলোচনা চলছে।

তিনি বলেছেন, এ বিষয়ে আমরা অস্ট্রেলিয়া, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে তথ্য ও উপযুক্ত পদ্ধতিগুলো নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছি। বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খল কীভাবে মসৃণগতিতে চালানো যেতে পারে, কীভাবে আমাদের অর্থনীতি আবার শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে তা নিয়ে আলোচনা চলছে। ভবিষ্যতেও যদি এই ধরনের কোনও ঘটনা ঘটে তাহলে কীভাবে এর মোকাবেলা করব তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি ভাবনাটি হচ্ছে, করোনাকাল অতিক্রম করার পর বিশ্বে একটা বড় দুর্ভিক্ষ আসবে না তো? বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী করোনাভাইরাস মহামারির কারণে বিশ্বব্যাপী প্রায় সাড়ে ছাব্বিশ কোটি লোক মারাত্মক খাদ্যাভাবের মুখোমুখি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গত বছর বলা হয়েছিল যে বিশ্বে ১৩ কোটি লোক খাদ্য ঘাটতির সম্মুখীন হবে। যা আজকের হিসেবে তার দ্বিগুণ। নিউইয়র্কভিত্তিক হাঙ্গার প্রজেক্ট বা ক্ষুধা প্রকল্পের উদ্যোগে পালিত বিশ্ব ক্ষুধা দিবসের প্রাক্কালে বিশ্লেষণটি পাওয়া গেছে।

এখন যে প্রতি ৯ জনের মধ্যে ১ জনের পর্যাপ্ত খাবার নেই, তার মানে ৮২ কোটি লোক ক্ষুধার মধ্যে টিকে আছে, এই পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটতে পারে। প্রকল্পের মুখপাত্রী সারা উইলসন বলেন, ‘আমরা জানি এটা স্বাস্থ্য সংকটকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে, এটা হচ্ছে ক্ষুধার সংকট যা ব্যক্তি জীবনকে মারাত্মকভাবে পর্যুদস্ত করছে।’ আশঙ্কা করা হচ্ছে অর্থনৈতিক অভাব, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং খাদ্য সরবরাহে বড় রকমের বাধা কোভিড-১৯ এর সঙ্গে যুক্ত এ অনাহার মহামারির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির নির্বাহী পরিচালক জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে বলেছেন, এখনও কোন দুর্ভিক্ষ হয়নি তবে আমরা অল্প কয়েক মাসের মধ্যে ঐতিহাসিক পরিমাপের একাধিক দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন হতে পারি।

আমেরিকার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, খাদ্য নিরাপত্তার ওপর কোভিড-১৯ এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে সিরিয়া ও ইয়েমেনের মতো মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার দেশগুলোর ওপর। যেখানে এ রোগের ক্ষতিকর প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে সেখানকার সংঘাত।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির কর্মকর্তারা বলছেন সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে আমরা অনুমান করছি প্রায় ৩৬টি দেশে দুর্ভিক্ষ হতে পারে এবং এর মধ্যে দশটি এমন দেশ রয়েছে যেখানে প্রায় দশ লক্ষ লোক অনাহারের কাছাকাছি রয়েছে। পাকিস্তানে অ্যাকশান এগেইনস্ট হাঙ্গারের কান্ট্রি ডিরেক্টর জেনিফার অ্যাঙ্ক্রম বলছেন তাপদাহ, পঙ্গপাল এবং বন্যার কারণে সেখানে তীব্র খাদ্যাভাব দেখা দিতে পারে। পাকিস্তানের মতো কিছু আফ্রিকান রাষ্ট্রও এ সমস্যার সম্মুখীন।

মানুষের স্বাস্থ্যই এখন বিশ্বে মূল বিবেচ্য বিষয়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশেও বরাদ্দ বাড়ানো উচিত। ইউরোপও আমেরিকাকে অনুসরণ করবে সন্দেহ নাই। আজকের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ারও উচিত, মানুষের স্বাস্থ্যখাতকে প্রাধান্য দেওয়া। কারণ সকল উন্নয়নই মানুষের জন্য। মানুষ না বাঁচলে উন্নয়ন দিয়ে কী হবে? কথাটি সবাইকে মনে রাখতে হবে।

 

ফকির ইলিয়াস : সাহিত্যিক ও কলাম লেখক

oronik@aol.com