বাউলের পোড়া গৃহ ও বিবেকের হাতগুলো

ঢাকা, শনিবার, ৩০ মে ২০২০ | ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

বাউলের পোড়া গৃহ ও বিবেকের হাতগুলো

ফকির ইলিয়াস ৭:৩৩ অপরাহ্ণ, মে ২০, ২০২০

print
বাউলের পোড়া গৃহ ও বিবেকের হাতগুলো

নিউইয়র্ক নগরীতে এই কঠিন করোনাকালে গৃহবন্দি আছি। মার্কিন মুলুকে ডেথটল নব্বই হাজার অতিক্রম করেছে! এই সংখ্যা বেড়েই চলেছে। কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা বলা খুবই কঠিন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলছেন, ‘ভ্যাকসিন অর নো ভ্যাকসিনÑ উই আর ব্যাক!’ মানে তিনি সবকিছু খুলে দিতে চান। কিন্তু কীভাবে? তা নিয়ে বিতর্ক চলছে প্রতিদিন। এমন করুণ সময়ের মাঝেই খবর এল, সুনামগঞ্জের উজানধল গ্রামের বাউল রণেশ ঠাকুরের সাধ-ভজনের ঘরটি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে! সেই ঘরে দুটি ভেড়া ছিল।

ওগুলোকে বের করে দিয়ে আগুন লাগানো হয়েছে ঘরে। ওই ঘরে বাউলের গান-বাজনার যন্ত্রগুলো ছিল। ছিল তার বই-পুস্তক। ছিল নিজের লেখা বাউল গানের পাণ্ডুলিপি। সবই পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে। গ্রামবাসীর চেষ্টায় প্রায় তিন ঘণ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এখন ভিটে শুধু ধ্বংসস্তূপ! কী বিষাদ সংবাদ!

মানুষ যখন এই মর্মান্তিক সময়ে প্রকৃতির বুকে ঠাঁই খুঁজছে, তখন কিছু অমানুষ পুড়িয়ে দিতে পারে একজন ভূমিসন্ন্যাসীর ভিটে? ভূমিসন্ন্যাসী কথাটি কেন বললাম, তার একটা ব্যাখ্যা দিই। আমি বাউল রুহী ঠাকুরকে চিনতাম সেই ১৯৭৬ সাল থেকেই। রুহী ঠাকুর, রণেশ ঠাকুরের বড় ভাই। রুহী ঠাকুর ছিলেন শাহ আব্দুল করিমের প্রথম সারির খলিফা। মনে পড়ছে ১৯৭৭ সালে সিলেটের কাজীর বাজারে বাউল গানের আয়োজন করেছিলেন আমার নানাভাই মোহাম্মদ মকন।

যিনি কাজীর বাজারের একজন বড় ব্যবসায়ী ছিলেন। সিলেটের অন্যতম দানশীল ব্যক্তিত্ব মোহাম্মদ মকন ছিলেন আমার প্রয়াত নানাজানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সেই সুবাধে আমি ছিলাম মোহাম্মদ মকনের প্রিয় নাতি। তার আয়োজনেই মালজোড়া গানের আসরে প্রথম দেখা হয় বাউল রুহী ঠাকুরের সঙ্গে। বাউল আব্দুল করিমের সঙ্গে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ময়মনসিংহ এলাকার আরেক কৃতি বাউল আলী হোসেন সরকার।‘

দুই নয়নে হবে ধারা গো, আমি মুছব কত অঞ্চলে, প্রাণ জ্বলে/ সে কি আর আসিবে গো কলঙ্কিনী না মরিলে’ মারমী বাউল সাধক শেখ ভানু’র লেখা গানটি সেদিনই প্রথম শুনি রুহী ঠাকুরের কণ্ঠে। সেই থেকেই এই পরিবারের সঙ্গে আমার পরিচয়। এরা এমন একটি পরিবার, যারা ভোগ-লালসা পরিহার করে মৌলিক বাউল-সন্ন্যাসবাদে বিলীন হয়েই কাটিয়েছেন সারা জীবন। কয়েক বছর আগে বাউল রুহী ঠাকুর প্রয়াত হন কঠিন রোগ-শোক সয়ে। এরা দুই ভাই-ই ছিলেন বাউল আব্দুল করিমের আসরের প্রথম সারির শিষ্য। এসব সিলেট বিভাগের বাউলসমাজের সবাই জানেন। সেই বাউলের সাধনার ঘরটি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে! যা ভাবতেও আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল। সংবাদটি বাংলাদেশের অন্যতম মিডিয়াগুলোতে স্থান পায়। ১৮ মে সকালে নিউইয়র্কের সময়ে আমি ফেসবুকে নিউজটি শেয়ার করে একটি স্ট্যাটাস দিই।

অনেকেই নিউজটি শেয়ার করেন। তীব্র প্রতিবাদ জানান। সমস্ত দিন আমার কাটে ভীষণ হতাশায়। কী হচ্ছে বাংলাদেশে! লকডাউন চলছে। চারিদিকে মৃত্যুর আনাগোনা! এর মাঝেই এমন নৃশংস কাজ কে করল! ওই দিনশেষে রাতের বেলায়ই আমাকে টেক্সট করেন অনুজ প্রতিম সাদিকুর রহমান সুফিয়ান। তিনি বলেন, ইলিয়াস ভাই, আমি রণেশদার জন্য একটি ঘর বানিয়ে দিতে চাই! কী অপার মানবতা! আমার শহরেই থাকেন সুফিয়ান!

নিউইয়র্ক অভিবাসী বাংলাদেশি আমেরিকান, সুনামগঞ্জের আরেক সাহসী কৃতিসন্তান তিনি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের নির্ভীক সৈনিক, ২০০২-২০০৩ সালের সাস্টিয়ান (শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র) ছিলেন। সেই আলোই তাকে এগোতে সাহস দিয়েছে। এরপরেই তার সঙ্গে ফোনে আমার কথা হয়।

তিনি আমাকে জানান, সংবাদটি তাকে খুবই বিচলিত করে তোলে। এরপরেই তিনি তার পিতা-মাতার নামে করা দাতা সংস্থা ‘হাফিজুর-হালেমা ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন-এর পক্ষ থেকে এককভাবেই এই ঘোষণা দেন। তরুণ কর্মবীর সুফিয়ান বলেন, বিশ্বব্যাপী এই চরম মহামারিকালে, কে বা কারা বাউল রণেশ ঠাকুরের ঘরটি জ্বালিয়ে দিয়েছে। তার দুটি ভেড়াকে ঘর থেকে বের করে দিয়ে, আগুন ধরানো হয়েছে! যা আজকের মানবিক ইতিহাসে অত্যন্ত গর্হিত এবং মর্মান্তিক কাজ। আমি ঘৃণিত কাজটির প্রতিবাদ করতে গিয়েই বাউলের সাধনার ঘরটি বানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

সাদিকুর রহমান সুফিয়ান বলেন, বাউল গান বাংলা সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাউল রণেশ ঠাকুর-হাসন রাজা, রাধারমণ, শাহ আব্দুল করিম, ফকির দুর্বিন শাহ সুনামগঞ্জের অনেক বাউলের সুযোগ্য উত্তরসূরি। আমরা এই মাটিকে উদার হাওরের উন্মুক্ত বুক বলেই জানি। সেই মাটিতে এমন অনাচার আমাকে চরমভাবে ব্যথিত করেছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে সকল যোগাযোগ সম্পন্ন করে কাজে হাত দেবো। এই ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডের বিচার চাই। দ্রুত দোষীদের আইনের আওতায় আনা হোক।’

এরপরে আরও কয়েক দফা আমার সঙ্গে কথা বলেন সুফিয়ান। ইতোমধ্যে তিনি বাংলাদেশে বাউল রণেশ ঠাকুরের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। কীভাবে কী করা হবে এর পরিকল্পনা জানিয়ে দেন রণেশ ঠাকুরকেও। ১৯ মে’র ভোর ছিল আমার জন্য আরও উজ্জ্বল। আমাকে ইংল্যান্ড থেকে ফোন করেন এই সময়ের বিশিষ্ট গীতিকার, বাউল সাধক, সমাজ সংস্কারক কবি সৈয়দ দুলাল। তিনি বলেন, ‘ইলিয়াস ভাই, বাড়িটি আমি বানিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে পোষণ করেছিলাম। কিন্তু যেহেতু আমার আরেক ভাই বাড়িটি বানিয়ে দেবেন, তাই

আমি এই মহান বাউলকে বাদ্যযন্ত্রের একটি প্যাকেজ উপহার দিতে চাই। কবি সৈয়দ দুলালের সঙ্গে আমার দীর্ঘ কথা হল। তার এই আগ্রহ আমাকে আপ্লুত করল আরেকবার! এর মাঝেই আমার জন্য অপেক্ষা করছিল আরও চমক! ফেসবুকে ঢুকেই দেখি, আমাদের আরেক সাহসী যোদ্ধা অমি রহমান পিয়াল আমাকে একটি ঘোষণা ট্যাগ করেছেন।

অমি রহমান পিয়াল আমাদের জন্মযুদ্ধের বীর ফ্রন্টলাইনার। ‘জন্মযুদ্ধ ৭১’ নামে একটি ওয়েবসাইটের অন্যতম কারিগর তিনি। এই ওয়েবসাইটে www.jonmojuddho.com আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অনেক তথ্য-উপাত্ত আছে। যা তরুণ প্রজন্মের যে কেউ পড়ে, দেখে নিজেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ করতে পারেন। পিয়ালকে স্যালুট করি বিভিন্ন কারণে। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের চেতনায় শাণিত সন্তান তিনি। গণ আদালত থেকে গণজাগরণ মঞ্চে তিনি ছিলেন সোচ্চার কণ্ঠ। যার কারণে তাকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল। এখন সুইজারল্যান্ডে নির্বাসিত জীবনযাপন করেন। পিয়াল তার ঘোষণায় জানান, তার নিজের হাতের একটি রিস্ট ব্যান্ড তিনি নিলামে বিক্রি করে দিয়েছেন। এটি কিনে নিয়েছেন আমার প্রিয় শহর নিউইয়র্কেরই একজন কৃতি চিকিৎসক ডা. ফেরদৌস খন্দকার। ডা. খন্দকার এই করোনা মহামারিকালে বিশাল ভূমিকায় কাজ করেছেন। নিজে হাসপাতালে রোগী দেখা ছাড়াও প্রায় প্রতিদিন করোনা নিয়ে বিভিন্ন লাইভ অনুষ্ঠান করেছেন ফেসবুকে, টিভিতে, অনলাইনে।

নিবন্ধ লিখেছেন, সাক্ষাৎকার দিয়েছেন বিভিন্ন মিডিয়ায়। তিনি স্কাইপসহ বিভিন্ন অনলাইন মিডিয়ায় রোগীকে শুশ্রƒষা দিয়েছেন বিশ্বের অনেক দেশে। এই রিস্ট ব্যান্ডটি কিনে নিয়েছেন এক লক্ষ এক টাকায় ডা. ফেরদৌস খন্দকার। অমি রহমান পিয়াল অর্থগুলো বাউল রণেশ ঠাকুরকে উপহার দিতে চান। আমি আবারও শ্রদ্ধায় নত হই এসব মানুষদের প্রতি! কী মমত্ববোধ আর ভ্রাতৃপ্রতিম ছায়ায় ঘেরা এই পৃথিবী! সৈয়দ দুলাল ও অমি রহমান পিয়াল দুজনেই তাদের প্রতিশ্রুত কাজগুলো করবেন। কিন্তু বাউল রণেশ ঠাকুর তার যে বইপত্র, পা-ুলিপি হারালেন তা কি আর ফিরে পাবেন? না, পাবেন না। তিনি যে মানসিক অশান্তির মাঝে নিমজ্জিত হলেন তা কি রিকভার করা যাবে? না, যাবে না। তারপরেও মানুষকে হাত বাড়িয়ে দিতে হয়। সাদিকুর রহমান সুফিয়ান, সৈয়দ দুলাল, অমি রহমান পিয়াল কিংবা ডা. ফেরদৌস খন্দকার’রা সেই কারণেই এই সমাজে এখনও আইকন। এখনও পুরোধা ব্যক্তিত্ব।

বাংলাদেশে বাউলরা নিগৃহীত হচ্ছেন। বাউল শরিয়ত সরকার এখনও জেলে আছেন। বয়াতি শরিয়ত সরকারের পরিবারের সদস্যদের ‘একঘরে’ করে রেখেছেন তার নিজ গ্রামের মসজিদের ইমাম ফরিদ হোসেন ও কয়েকজন মাতব্বর। এতে গ্রেফতার হওয়া এই বয়াতির পুরো পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তার স্ত্রী শিরিন বেগম, পুত্র অনিক (১২) ও যমজ দুই কন্যা অনিকা (৭) ও কনিকা (৭) ঘর থেকেও বের হতে ভয় পাচ্ছে। এসব শিশুদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ রয়েছে আগে থেকেই।

এ কোন বাংলাদেশে আমরা? এই কি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের বাংলাদেশ। বাউল রণেশ ঠাকুরের বাড়িতে কারা আগুন দিয়েছে, তাদের বিচারের আওতায় আনার জোর দাবি জানাই বাংলাদেশের সরকার ও প্রশাসনের কাছে। বাউল শরিয়ত সরকারের জামিন দাবি করছি। মনে রাখা দরকার, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ এই চার মূলনীতির পরিপ্রেক্ষিতে ৩০ লাখ মানুষ রক্ত দিয়েছিলেন। দুই লাখ নারী সম্ভ্রম বিসর্জন দিয়েছিলেন। আমরা এই মূলনীতির জ্যোতি থেকে সরতে পারি না। পারা অন্যায় হবে। বাংলাদেশে বাউল সমাজকে নিগৃহীত করা বন্ধ করতে হবে। আমরা ভুলে যাইনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর বিশাল জনসভায় গণসঙ্গীত গেয়েছিলেন এই বাউল রণেশ ঠাকুরের ওস্তাদ ও মুর্শিদ শাহ আবদুল করিম। আমাদের সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করা প্রতিটি মানুষের বিবেকি দায়িত্ব।

 

ফকির ইলিয়াস : সাহিত্যিক ও কলাম লেখক

oronik@aol.com