তবুও মানব থেকে যায়

ঢাকা, শনিবার, ৩০ মে ২০২০ | ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

তবুও মানব থেকে যায়

স্বপন নাথ ১২:০২ অপরাহ্ণ, মে ১৯, ২০২০

print
তবুও মানব থেকে যায়

সারকথা পরিষ্কার, মানুষের মৌলিক অধিকারের বিষয়ে নজর দিতে হবে। যারা মানুষ ও প্রাণী হত্যায় অস্ত্র তৈরি, ব্যবহার ও ব্যবসা করে, তারাও জানে পৃথিবীর কোনো না কোনো এলাকার মানুষের বিপক্ষে এসব অস্ত্র ব্যবহৃত হবে। তারা জেনে-বুঝেই এসব মরণাস্ত্র তৈরি ও বাজারজাত করে। ফলে, নতুন নতুন হত্যাকারী দল ও গোষ্ঠী তৈরি হয়।

বস্তুত, কোভিড-১৯-এর আক্রমণে অতি অল্পসময়ে অনেক মানুষ এ পৃথিবী থেকে অপ্রত্যাশিত বিদায় নিয়েছেন। যা কেউই মেনে নিতে পারছে না। এ মৃত্যু মেনে নেওয়ারও নয়। অকালে মৃত্যু হলে মেনে নেওয়া কঠিন। সকলকেই এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে। এ অনিশ্চিত জীবনের বাঁকে এ বিষয়ে কারো কোনো হিসাব থাকে না। তবে এ করোনাকালে অনেকের মনে এ হিসাব জেগেছে। তাই আতঙ্ক, শঙ্কায় দিনযাপন করছে সকলে। প্রতিমুহূর্তে মৃত্যু ভয়ে ভীত, সন্ত্রস্ত থাকতেই হচ্ছে। মানুষ বাঁচানোর যুদ্ধে রয়েছেন চিকিৎসক, স্বেচ্ছাসেবক ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন। 

নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও এত শঙ্কা কেন? এ নিয়ে সামাজিক আচরণেরও সমূহ পরিবর্তন ঘটেছে। আগামীতে হয়ত এ বিষয়ে আরও পরিবর্তন দেখা যাবে। সে অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে আমাদের। এ সময় মারা গেলে কেউ লাশের কাছে আসতেও নিষেধ রয়েছে। আপনজনও কাছে যাচ্ছে না, দূরে থেকেই অন্তরের কষ্ট নিজের ভেতরে সামলাচ্ছে। বিস্মিত হতে হয়, একালে এসে প্রতিষ্ঠিত সামাজিক মৃত্যু হঠাৎই অসামাজিক হয়ে গেল। পৃথিবীতে এমন দুঃসময় এর আগে এসেছে কিনা ইতিহাসে এমন উদাহরণ পাওয়া যায় না। হয়ত এসেছে তা আমরা জানি না। এমন অমানবিক মৃত্যু যুদ্ধেই শুধু লক্ষণীয়। যা হোক যে কোনো বয়সে, কালে যে কোনো মৃত্যুই কষ্টের ও এক অনিবার্য ঘটনা।

জন্ম হলে অবশ্যই মৃত্যু নির্ধারিত। পবিত্র কোরআনে উল্লেখ আছে, ‘কুল্লু নাফসিন যায়িকাতুল মাউত।’ (সুরা আল-ই-ইমরান ১৮৫) অর্থাৎ, প্রতিটি প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। শ্রীগীতা-য় বলা হয়েছে, Ñ‘জাতস্য হি ধ্রুবো মৃত্যুধ্রুর্বং জন্মমৃতস্য চ’। [২/২৭] অর্থাৎ, যার জন্ম হয়েছে, তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী, আর যার মৃত্যু হয়েছে তার জন্ম নিশ্চিত। এ মৃত্যু নিশ্চিত হয়েও জীবনের তাগিদে নানা তত্ত্বকথার সৃষ্টি হয়েছে। পৃথিবীর মাঝে মানুষের তা এক সৃজনশীলতারই প্রকাশ এবং তা কেউই অস্বীকার করার সুযোগও নেই। ফলে, মৃত্যু নিয়ে চিন্তা ভাবনা অশেষ। যেমন দুজন কবির কয়েকটি চরণ উল্লেখ করছি।
ক.
‘তবু কারো মৃত্যু পাখির চেয়ে হাল্কা
তবু কারো মৃত্যু পাহাড়ের চেয়ে ভারি।’
খ.
‘যত বর্ষ বেঁচে আছি তত বর্ষ মরে গেছি
মরতেছি প্রতি পলে পলে
জীবন্ত মরণ মোরা মরণের ঘরে থাকি
জানি না মরণ কাকে বলে।’
কবির কথা সত্য বলেই কোনো কোনো মৃত্যু আমাদের মেনে নিতে কষ্ট হয়। যেমন এ করোনা সংকটে সকল মৃত্যুর ভার আমরা বহনে অক্ষম। আমরা আরও নিশ্চিত, সংখ্যায় যা-ই হোক প্রতিটি ব্যক্তির জীবনে কত ঘটনা ও ইতিহাস জড়িত রয়েছে, এর কি আর শেষ আছে। মহাভারতে যুধিষ্ঠিরের কাছে একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছিল, ‘কিমাশ্চর্য্যম’ অর্থাৎ, আশ্চর্য কী? এর উত্তরে যুধিষ্ঠির বলেছিলেন-
‘অহন্যহনি ভূতানি গচ্ছতি যম মন্দিরম।
শেষাস্থিরত্বামিচ্ছন্তি কিমাশ্চর্যমতপরম॥’
অর্থাৎ, প্রতিদিন জীব সকল যম মন্দিরে গমন করছে। আর যারা বাকি আছে তারা ভাবছে- অমর হয়ে গেল, এর চেয়ে আর কী আশ্চর্য আছে। বস্তুত, আগেও এ বিষয়ে প্রচুর বাণী রয়েছে ও লেখালেখি হয়েছে। এ মুহূর্তের মৃত্যু নিয়েও অনেক সাহিত্য, ঘটনাকেন্দ্রিক কাহিনী, স্মৃতিকথা লেখা হবে। তা পাঠ করে আগামীদিনের মানুষ হাহাকার ও দুঃখ প্রকাশ করবে। তারা নতুনভাবে জ্ঞান অর্জন করবে। মৃত্যুর কারণ জানবে, বুঝবে। শুরু থেকেই জন্ম-মৃত্যু একই আসনে বিরাজমান; তবুও মৃত্যু খুব হতাশার, বেদনার। এ জীবনে আমরা মৃত্যু, বেদনা, হতাশা কোনোটাকেই এড়াতে পারি না। নিশ্চিত সব জেনেও সকলেই সুন্দর এ-প্রকৃতির মাঝে বেঁচে থাকতে চাই। কবিয়াল বিজয় সরকার জীবনের এমন হতাশা ও দুঃখে বলেছেন, -‘এ পৃথিবী যেমনি আছে তেমনি ঠিক রবে/ সুন্দর এই পৃথিবী ছেড়ে একদিন চলে যেতে হবে।’ অথবা তারই অন্য একটি গানের কথা- ‘পোষা পাখি উড়ে যাবে সজনী/ একদিন ভাবি নাই মনে।’ আবার কোনো কোনো ব্যক্তি বাণী রেখেছেন, তার মৃত্যুতে কেউ যেন দুঃখ প্রকাশ না করে। কবি গিয়াস উদ্দীনের কথা- ‘মরিলে কান্দিস না আমার দায়’। সুফি কবি রুমিও তার মৃত্যুতে কারো খোদ বা দুঃখবোধ প্রকাশ আশা করেননি। তিনি মৃত্যু বিষয়টিকে অন্যত্র স্থানান্তরই ভেবেছেন।

তিনি বলেন,
When I die/ when my coffin is being taken out/ you must never think/ I am missing this world/ don’t shed any tears/ don’t lament or feel sorry/ I’m not falling into a monster’s abyss/ when you see my corpse is being carried/ don’t cry for my leaving/ I’m not leaving/ I’m arriving at eternal love.
কবি হেনরি স্কট হল্যান্ডও বলেন, ‘অবশেষে মৃত্যু কিছুই না/ এটি হিসেব করতে নেই/ মৃত্যুতে কিছুই ঘটে না/ ভিন্ন কক্ষে বিচ্যুত হওয়া মাত্র।’ ফলত, মৃত্যুর আগে প্রাপ্ত জীবনকে অর্থবহ করাই তাদের মূল কথা। এর মাধ্যমেই অর্জন হবে মরণের মহত্ব।
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের জাফ ম্যাকমাহানও জীবনকে মহিমান্বিত করার কথা বলেছেন। মূলত, একজন ব্যক্তির মৃত্যুকে অর্থময়তা দান করে তার পরিজনরা, যারা বেঁচে থাকে। তারা মৃত ব্যক্তির বেঁচে থাকা ও অনুপস্থিতির মধ্যে এক তুলনা এনে বিষয়কে মূল্যায়ন করে। সেক্ষেত্রে ওই ব্যক্তির জীবনের গুণাগুণের মাপকাঠিতে জীবন ও মৃত্যুর যথার্থতা নিরূপণ করা হয়। জাফ দেখিয়েছেন প্রাণময় জীবনের কৃতিই মৃত্যুকে মহত্ব দান করে। এ লেখা তৈরির সময় একটি ব্যতিক্রমী লেখা পাঠ করতে সুযোগ হয়। আমরা জানি জন্ম-জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে রয়েছে সময় ও পরিসর। ফলে, এর মূল্যায়নে বিষয়টি প্রাসঙ্গিক হতে পারে। দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘দর্শন’ শিরোনামার লেখায় সময় ও পরিসরের একটি ছক দেখিয়েছেন।
Zero মুহূর্ত-স্থায়ী ঘটনা = Zero,
বর্তমান মুহূর্ত = Zero মুহূর্ত
অতএব বর্তমান মুহূর্তস্থিত ঘটনা =  Zero।
কিন্তু বর্ত্তমানের ঘটনাকেই আমরা বাস্তবিক বলিয়া নির্দেশ করি
বর্তমানের ঘটনা = 0
...শুদ্ধ কেবল বর্তমান মুহূর্তটুকু-ডানাছাঁটা বর্তমান মুহূর্ত-নিছক বর্র্তমান মুহূর্ত-বাস্তবিকতার নির্ভরস্থল নহে; তবে কি? না ভূতকালের স্মৃতিগর্ভ এবং ডানাওয়ালা সর্বাঙ্গ সুন্দর বর্তমান মুহূর্ত-বাস্তবিকতার নির্ভরস্থল। ভূতকালের স্মৃতি এবং ভবিষ্যৎকালের প্রতীক্ষা গর্ভ এমন যে যে বর্তমান মুহূর্ত-এই সর্বাঙ্গ সুন্দর বর্তমান মুহূর্ত-বাস্তবিকতার নির্ভরস্থল। ...আপাতত বাস্তবিক না হইলেও আমরা বলি যে, ‘এ ঘটনাটি really ঘটিয়াছে’, বা এ ‘ঘটনাটি  we really take place’; বর্তমানের লক্ষণদৃষ্টে আমরা ভবিষ্যতের ৎবধষষু অবধারণ করি এবং তাহা দৃষ্টে ভূতকালের ৎবধষষু-ও অবধারণ করি। (পারিবারিক স্মৃতি-লিপি পুস্তক)।
আগেও বলেছি নিশ্চিত বিষয় জেনেও এ নিয়ে কত কথা ও গান। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মৃত্যুকে বন্ধু ভেবেছিলেনÑ ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলি’তে ‘মরণরে তুহু মম শ্যাম সমান’। আবার তিনিই বলেছেন এ সৌন্দর্য বিরাজিত জগৎ ছেড়ে যেতে চান না। এখানে কী এক মায়ার বাঁধন। শুধু কী তাই, এ জগতে তিনি ফুল ফোটাতে চেয়েছেন। অবশ্য তিনি তা ফোটাতে সফলও হয়েছেন। তিনি লিখেছেনÑ ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে/ মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই/...মানবের সুখে দুঃখে গাঁথিয়া সংগীত/ যদি গো রচিতে পারি অমর-আলয়।/ তা যদি না পারি তবে বাঁচি যত কাল/ তোমাদেরি মাঝখানে লভি যেন ঠাঁই/ তোমরা তুলিবে বলে সকাল বিকাল/ নব নব সংগীতের কুসুম ফুটাই।’ তা করেছেন তিনি। এরপরেও বিভিন্ন রেখায় জীবন-মৃত্যু, অস্তিত্ব-অনস্তিত্ব নিয়ে রবীন্দ্রনাথ তার দর্শন ও উপলব্ধি প্রকাশ করেছেন সাহিত্যে, কবিতায়।
তবে মৃত্যু সম্বন্ধে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি আমরা লক্ষ করি। রয়েছে ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ। মনীষীগণ এ বিষয়ে ভাবতে ভাবতে মৃত্যুর সংজ্ঞার্থ নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা বোধ করেছেন। এই যে মানবসমাজে অস্তিত্বের উপস্থিতি ও অনুপস্থিতি এ প্রসঙ্গে যত দুশ্চিন্তা। এক্ষেত্রে মৃত্যু কাকে বলে ভাবার সঙ্গে অবশ্যই জীবনের একটা সম্পর্ক রয়েছে। সেখানেই তারা প্রবেশ করেছেন অবশেষে। পি ভ্যান ডার ফাল্ক ও ই জে জঙ্কম্যান বলেছেন, -‘এটুকু বলা যায় যে, জীবন অর্থ বহির্জগতের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা এবং স্বল্প হলেও বাহ্যিক উদ্দীপনার সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা থাকা। যদি মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ বিনষ্টির জন্য সেটা সম্ভব না হয় তাহলে ব্যবহারিক সংজ্ঞায় জীবনাবসান হয়েছে এবং রোগীকে মৃত বলে মেনে নেওয়া হবে। অনেকে এটা নাও মানতে পারেন, কিন্তু বিজ্ঞানের জগতে মস্তিষ্কের মৃত্যু (Brain Death) ও মৃত্যু সমার্থক। আমেরিকায় Uniform Determination of Death Act সমরূপে মৃত্যু নির্ধারণ করার প্রণীত আইন-এর সংজ্ঞায় একই কথা বলা হয়েছে। এর ওপরে মস্তিষ্কের মৃত্যুর মাপকাঠি নির্ধারণে নেদারল্যান্ডের হেলথ কাউন্সিলের মতে মস্কিষ্কের শাখা-প্রশাখাসহ সকল ক্ষেত্রে অনিবর্তনীয় কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে গেলে তাকে মস্তিষ্কের মৃত্যু বলা হবে।’ (অনুবাদ : মনসুর মুসা)।
চলবে...
স্বপন নাথ : উপ-পরিচালক, নায়েম, ঢাকা
rudro71@gmail.com