ঋতু বন্দনা : মধুমাস জ্যৈষ্ঠ

ঢাকা, শনিবার, ৩০ মে ২০২০ | ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ঋতু বন্দনা : মধুমাস জ্যৈষ্ঠ

ইমরুল কায়েস ৭:১২ অপরাহ্ণ, মে ১৬, ২০২০

print
ঋতু বন্দনা : মধুমাস জ্যৈষ্ঠ

সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা ও রাতে, রূপ শুধু ঝরে ঝরে পড়ে; বারো মাসে। শতরূপে শতবার সাজে এক বাংলার প্রকৃতি : আকাশ, নদী, পাহাড়-ঝর্ণা, সমতল, অরণ্য ও বনানী। ফলে, ষড়ঋতুর রূপ মহিমায় তের পার্বণের ঝলকে ঝলমলিয়ে উঠে বাংলাদেশ। তেমনটি বলা হয় প্রখ্যাত লোকসঙ্গীত শিল্পী কালিদাস গুপ্তের জনপ্রিয় গানে ‘বারো মাসে তেরো ফুল ফোটে, বছরে ফোটে ঘোলা সই’।

এ যেন স্বপ্নের ডরিমনের রাজ্য। ‘ঋতুসংহার’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ যেমনটি বলেছেন ‘...শুধু তোমাদের’ পরে ছয় সেবাদাসী ছয় ঋতু ফিরে ফিরে নৃত্য করে আসি...’। এক অদ্ভুত রূপ বদলের ফলে প্রতি দুই মাস অন্তর আলাদা নৈসর্গিক মনোলোভা পট ভেসে ওঠে।

বৈশাখের শেষে; জ্যৈষ্ঠ বাংলা বছরের দ্বিতীয় মাস। এর দ্বারা গ্রীষ্মের সমাপ্তি ঘটে। সূর্যের প্রখর তাপে হাওর, নদী, বাঁওড় জল শুকিয়ে মেঘ জমাট বাঁধে বর্ষার প্রস্ততি সাজে। গ্রামবাংলার পথে প্রান্তরে শোভা পায় সোনালু ফুল। চারদিক টসটসে লালে ছাপিয়ে দেয় লীলাবতী কৃষ্ণচূড়া! এই দুই ফুলের নয়নকাড়া সৌন্দর্য জ্যৈষ্ঠকে করে আরও মনভোলানো। সাজো সাজো মহিমায় প্রকৃতির আনাচে-কানাচে ভরে উঠে নানা জাতের বাহারি সুস্বাদু ফলে। এমন ফলের অধিক সরবরাহ থাকায় সবার কাছে মাসটি ‘মধুমাস’নামেই পরিচিত। রোদে তেতে ওঠা তৃষ্ণার্ত মানুষ পিপাসা মেটায় বিভিন্ন প্রজাতির রসালো ফল দিয়ে। প্রাণকে শীতলতার পরশ বুলিয়ে দেয় গ্রীষ্মের ফুটি, বাঙ্গি, তরমুজ।

রঙ বাহারি ফলের ম ম গন্ধে ভরিয়ে তোলে চারপাশ। গাছে গাছে সবুজ কচি পাতার ফাঁকে দোল খায় সিঁদুর রঙা আম, জাতীয় ফল কাঁঠাল। পাকা আম-কাঁঠালের বর্ণময় শরীর দেখে চোখ জুড়ায়, মনভরে ও খেলে স্বাদ মেটে। কবি আব্দুল মান্নান মল্লিক ‘রসের সাগর জ্যৈষ্ঠ’ কবিতায় যেমনটি বলেছেন ‘পাকা ফলের গন্ধে ভ্রমর গুনগুনিয়ে উড়ে, কাঠবিড়ালী ফল খেয়ে যায়, গাছের ডালে চড়ে’।

প্রকৃতি পসরা মেলে বসে জামরুল, লিচু, কালোজাম, ক্ষুদিজাম, আনারস, আমলকী, আতা, করমচা, বেল, গাব, ডেউয়া, লটকন, আতা, দেশি খেজুর ও গোলাপজাম ইত্যাদি ফল। পাকা তাল না পাওয়া গেলেও মেলে কাঁচা তাল। অনেকেরই প্রিয় খাবার কাঁচা তালের শাঁস। এমন নানা ফলের স্বাদে কোনোটা টক, কোনোটা মিষ্টি, কোনোটা নোনতা আবার কোনোটা পানসে।

থোকায় থোকায় গাছের শাখায় কী সুন্দর! দোল খায় কালো জাম। জসীম উদদীনের ‘মামার বাড়ি’কবিতায় ‘ঝড়ের দিনে মামার দেশে; আম কুড়াতে সুখ; পাকা জামের শাখায় উঠি, রঙিন করি মুখ’। সত্যিই, জামের ডাল ধরে ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে জাম পাড়তে কার না সুখ হয়? মধুমাসের ফলগুলোর মধ্যে অন্যতম স্থান দখল করে আছে লিচু। লিচুচোর কবিতা কে না পড়েছে ‘... পুকুরের ঐ কাছে না লিচুর এক গাছ আছে না...’। লিচু ফলটি গন্ধ ও স্বাদের জন্য সবার কাছে খুবই জনপ্রিয়। আরও আছে সাদা, লালচে সাদা দেশি জাতের জামরুল। এ ফলও জ্যৈষ্ঠের তৃষ্ণা মেটায়। গাঢ় সবুজ পাতার ফাঁক দিয়ে বাতাসে দোল খাওয়া থোকায় থোকায় জামরুল দেখলেই মনটা ভরে যায়।

বৈশাখের বর্ষবরণের পরে জ্যৈষ্ঠ উৎসবে পিছিয়ে নেই। দিনাজপুর-রংপুর অঞ্চলে লিচুর মৌসুমে মেলা বসে। তেমন একটি মেলা রংপুরের পীরগাছার শাহরিয়ার-গাজীর মেলা। এ মেলা বিশেষভাবে লিচুর জন্যে জমে। মেলা চলাকালীন মেয়ে-জামাই শ^শুরবাড়িতে আসে। নতুন-পুরাতন মেয়ে জামাইবাড়ি ও আত্মীয়-স্বজনের কাছে আম-দুধ সঙ্গে মৌসুমি ফল পাঠানোর একটি প্রথা আছে।

বাঙালির চিরায়ত রীতি অনুযায়ী জ্যৈষ্ঠ মাসেই মেয়ে-জামাই, নাতি-নাতনিকে ফল দিয়ে আদর-আপ্যায়নের ব্যবস্থা করে থাকেন গ্রামে বাস করা বাবা-মায়েরা। বিভিন্ন প্রজাতির ফলের সমারোহ থাকে বলেই হয়তো জ্যৈষ্ঠ মাসে আয়োজন করা হয় জামাই ষষ্ঠীর। গ্রাম ও শহরে জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষে ষষ্ঠী তিথিতে সনাতন ধর্মের নারীরা ষষ্ঠী পূজা করেন। ঘর ও মন্দিরের বাইরে বট, করমচার ডাল পুঁতে প্রতীকী অর্থে অরণ্য তৈরি করে এ পূজা করা হয়। এ জন্য জামাই ষষ্ঠীকে অরণ্য ষষ্ঠীও বলা হয়।

ছয়ঋতুর বাংলাদেশ যার রূপের শেষ নেই। জ্যৈষ্ঠ তার মধুর রসে বাঙালিকে দেয় প্রাণ সঞ্জীবনী। এই মাসে বর্ষার প্রস্তুতি হয়। বর্ষা কৃষকের জন্য ফসল বোনার; আর জ্যৈষ্ঠ তার দূত। জ্যৈষ্ঠের ‘লিচু চোর’ কবিতার স্রষ্টা কাজী নজরুল ইসলাম বসুধায় এসেছেন। আসছে ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ কবির জন্মজয়ন্তী। এই কবির ভাষায় ‘এ কি অপরূপ রূপে মা তোমার হেরিনু পল্লী জননী, ...রৌদ্রতপ্ত বৈশাখে তুমি চাতকের সাথে চাহ জল, আম কাঁঠালের মধুর গন্ধে জ্যৈষ্ঠে মাতাও তরুতল...’। মধুমাসে সবার জীবন হোক মধুময়।

 

ইমরুল কায়েস : গল্পকার ও সরকারি কর্মকর্তা