নায়কের নাম কৃষক

ঢাকা, শনিবার, ৩০ মে ২০২০ | ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

নায়কের নাম কৃষক

মুবিন হাসান খান অয়ন ৭:০৫ অপরাহ্ণ, মে ১৬, ২০২০

print
নায়কের নাম কৃষক

বাংলাদেশের মানুষকে এই করোনাকালে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে খাদ্যের। আর এই খাদ্যের জোগান দিয়ে থাকে আমাদের কৃষকরা। করোনার মতো মহামারিতেও যদি আমরা কৃষকের গুরুত্ব না বুঝি তবে আমাদের এর ফল ভোগ করতেই হবে।

বাংলাদেশ কৃষি নির্ভরশীল দেশ এবং এদেশের ৭০ ভাগ লোক কৃষির ওপর নির্ভরশীল। আমাদের কৃষি খাতগুলো মূলত ধান, পাট, তুলা, আখ, ফুল ও রেশম গুটির চাষসহ বাগান সম্প্রসারণ, মাছ চাষ, সবজি, পশুসম্পদ। কিন্তু বর্তমানে কৃষির ওপর থেকে আমাদের সমাজের মানুষ নিজেকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে কৃষির ব্যাপকতা থাকলেও শহরাঞ্চলে এর ব্যাপ্তি নেই বললেই চলে। আমাদের সমাজ উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে হতে হয়তো ভুলেই গেছে, আজকের টেবিলের রেজালা করা মুরগির লেগ পিসটা কোথা থেকে এল কিংবা যে বাসমতি চালের ভাত খাচ্ছে সেটাই বা আসছে কোথা থেকে।

কারণটা জানার দরকার নেই তাদের, কারণ তারা তো এখন ডিগ্রিধারী সুশীল সমাজের লোক। আজ এই করোনা নামক মহামারিতে এই সুশীল সমাজের প্রধান কাজ হচ্ছে ঘরে বসে অর্থনীতি আর খাদ্য সংকটের আশঙ্কা নিয়ে সমালোচনা করা।

বাংলাদেশের গ্রাম এলাকায় ৫৯.৮৪ শতাংশ লোকের কৃষি খামার থাকলেও শহরে রয়েছে মাত্র ১০.৮১ শতাংশ লোকের কৃষিখামার রয়েছে। এর কারণ কী? শহর মানেই বুঝি আমরা উন্নত জীবনব্যবস্থা। তবে এই শহর ব্যবস্থাই কি বাধাগ্রস্ত করছে আমাদের কৃষি খাতকে? যেখানে বাংলাদেশ কৃষি নির্ভরশীল দেশ সেখানে কৃষক এবং কৃষির প্রতি এত অবহেলা সত্যিই খুব হতাশাজনক।

যেখানে কৃষিকাজ বাংলাদেশের সবচেয়ে সম্মানজনক পেশা হওয়ার কথা আজ সেখানে কৃষককে প্রায় তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের সঙ্গেই দেখা হয়। আজ বাংলাদেশে কৃষিপণ্য আমদানি করা লাগে। এর কারণ কী? কারণ হচ্ছে আমরা কৃষকদের মর্যাদা দিতে পারি না। আমাদের বাবা-চাচাদের গল্প শুনলে দেখা যায় তাদের সফলতার পেছনে পরিশ্রমের অংশ হিসেবেও রয়েছে কৃষিখাত।

হয়তো লক্ষ করলে দেখা যায় কৃষকের এক ছেলে আজ ঢাকা ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগে পড়ালেখা করছে কিন্তু সে তার বাবার পরিচয় দিতে লজ্জা পায়। যদি এভাবে চলতে থাকে আগামী প্রজন্মের কৃষক কারা হবে? তবে কি বাংলাদেশ আর কৃষির ওপর নির্ভরশীল থাকতে পারবে না? তাহলে হয়তো দেখা যাবে কৃষকের যেই ছেলে আর্থিক সহায়তার অভাবে পড়ালেখা করতে পারেনি সেই হয়তো বা লাঙ্গল হাতে মাজায় গামছা বাঁধবে। তবে এতে কি কৃষির প্রসার হবে?

সেদিন লোকাল বাসে করে ভার্সিটিতে যাচ্ছিলাম। এক লোক আমাকে জিজ্ঞেস করল, আমি কী করি? যখন জানতে পারল যে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করি তখন সে তার নিজের সিট ছেড়ে দিয়ে আমাকে বসতে দিতে চাইল। কারণ তার ধারণা আমরাই দেশের ভবিষ্যৎ। আচ্ছা, আজকের এই তরুণ প্রজন্মই যদি শুধু দেশের ভবিষ্যৎ হয় তবে এই কৃষকরা কী হবে? এরা তো দেশের সম্পদ। কারণ এদের জন্যই তো আমরা বেঁচে আছি। চালের দাম যখন কেজিতে ১৫ টাকা বাড়ে তখন আমরা সরকারের সমালোচনা করতে পারলেও কৃষকের মূল্য দিতে পারি না।

চুন থেকে পান খসলেই আমরা সমালচনায় বেরিয়ে পড়ি। অথচ বাংলাদেশে আবাদি জমির পরিমাণ কত তা হিসাব করি না। দেশের বর্তমান সময়ে করোনার প্রভাবেও আমরা এখনও কৃষকের উপরেই নির্ভরশীল। আজ যদি কৃষক ধান কাটতে মাঠে না নামে তবে কাল চালের দাম বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরীকের মৌলিক চাহিদা ৫টি। তার মধ্যে প্রথম এবং প্রধান হচ্ছে খাদ্য। এই খাদ্যই যদি না আসে তবে আমরা তরূণ প্রজন্ম দেশের ভবিষ্যৎ হয়ে কী করব? হয়তো বা চাষাবাদের জমিগুলোতে বড় বড় ইন্ডাস্ট্রি বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ব কিংবা উন্নত পার্ক আর অট্টালিকা করে গ্রামীণ সম্পদকে শহরায়নে পরিণত করব।

আর কৃষক হারাবে আশা, জাতির বাড়বে হতাশা। সত্যিকার অর্থেই কি তখন উন্নয়নশীল সমাজের সুশীল বাসিন্দা হব? বাংলাদেশে এই করোনা মহামারির মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার হবে খাদ্য সংকট মোকাবেলায়। অথচ এদেশে খাদ্য সংকট মোকাবেলায় সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে কৃষকরাই। এমনকি এই সংকটময় মুহূর্তেও থেমে নেই কোনো কৃষক। কাঁচি হাতে নেমে পড়েছে ধান কাটতে। এদের কি করোনার ভয় নেই? অবশ্যই আছে। তবুও আমরা এদের মূল্যায়ন করতে পারি না। এখনই সময় কৃষকদের মূল্যায়ন করার। দেশে করোনা যোদ্ধা হিসেবে ডাক্তার, পুলিশ, প্রশাসন, ব্যাংকার করোনা যোদ্ধা হিসেবে বিবেচিত হলেও কৃষকের অবদান কারও থেকে কম নয়। কারণ সব যোদ্ধার খাদ্যের দায়ভার যেন কৃষক একাই নিয়েছে।

মুবিন হাসান খান অয়ন : জেড. এইচ. সিকদার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, শরীয়তপুর

mhasanayon@gmail.com