ধনতন্ত্রের মুলা ও শ্রমিক শোষণ

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২০ | ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ধনতন্ত্রের মুলা ও শ্রমিক শোষণ

হাসনাত মোবারক ১:৫৬ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ০৬, ২০২০

print
ধনতন্ত্রের মুলা ও শ্রমিক শোষণ

তৈরি পোশাক শিল্পকারখানার লক্ষ লক্ষ শ্রমিক মৃত্যুর উপত্যকায় দাঁড়িয়ে থেকেও কর্মে যোগ দিতে গিয়েছিল। কেন? চাকরি হারানোর ভয়ে! সমবেত শ্রমিক শ্রেণিরা তো মালিক পক্ষের চেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ। হ্যাঁ, তাতে কী? বাংলাদেশের শ্রম বাজারের শ্রমিকদের মজুরি খুব সামান্য। অল্প মজুরিতেই শ্রম পাওয়া যায়। এজন্য শ্রম বাজারে মালিকপক্ষের দাম্ভিকতার অন্ত নাই। তারা শ্রমিকদের বলে থাকে ‘ভাত ছিটালে কাকের অভাব হয় না’। তাই বাংলাদেশের শ্রমিকরা কখনোই মালিক পক্ষের বিরুদ্ধে গর্জে উঠতে পারেনি। যদিও শ্রমিকরা সমবেত হয়ে শ্রমসেবা দেয়। এই অল্প মজুরিতে শ্রমিকদের ব্যক্তিত্ব বা মেধাসত্ত্ব নষ্ট হয়। এতে শ্রমিক শ্রেণি আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। অন্যদিকে পুঁজিবাদীদের পুঁজি আরও বেড়ে চলে। মালিকপক্ষের শোষণের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না শ্রমিক শ্রেণি। মালিকপক্ষ আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। পরবর্তীকালে একেকটা মালিকপক্ষ দানবে রূপান্তরিত হয়।

সোভিয়েত সংস্কৃতির বিশিষ্ট লেখক অ্যাকাডেমিশিয়ান আনাতোলি লুনাচারস্কি লিখেছিলেন , ‘মার্কসবাদীরা অদৃষ্ট কিংবা আকস্মিকতার পূজারি নন। আমরা জানি, বিপ্লব ঘটানো যায় নাÑ বিপ্লব অবশ্যম্ভাবী হয়ে ঘটে, তাই আমরা বেশ ভালোভাবে বুঝি, বিপ্লব হয় অসংগঠিত, বিশৃঙ্খল হয়, নয় তো, ব্যাপকভাবে সমস্ত অংশগ্রহণকারীর দ্বারা না হলেও, অগ্রগামী বাহিনীর মানসিক শক্তি দিয়ে বিপ্লবকে নির্দিষ্ট খাতে বইয়ে দেওয়া হয় এবং পরিচালিত করা হয়।’

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম সেক্টর তৈরি পোশাক শিল্প। তৈরি পোশাক শিল্প কারখানায় দেশের সবচেয়ে বেশি মানুষের কর্মসংস্থান। নিকট অতীতে দেখেছি পোশাক শিল্পকারখানার কর্মরত শ্রমিকদের অসন্তোষ। কর্মক্ষেত্রে তাদের জানমালের নিরাপত্তা নেই।

কর্মক্ষেত্রে নিশ্চয়তা নেই। মালিকপক্ষের ইচ্ছামত যখন-তখন কর্মীদের ছাঁটাই করার প্রবণতা নতুন নয়। শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, জীবনকে মৃত্যুর কোলে ঠেলে দিয়ে তারা শ্রম দিয়ে আসছে। নানান প্রতিকূলতার মধ্যেও শ্রমসেবা প্রদান করে। বিনিময়ে খুব সামান্য মজুরি পায়। শ্রম হারানো ভয় এতই প্রকট মৃত্যুকেও পরোয়া করেনি। তাদের শ্রমের বিনিময়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। সেই মুদ্রা দিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল হয়। অথচ দাবি দাওয়া আদায়ের জন্য শ্রমিক শ্রেণি যখন মাঠে নামছে। প্রত্যেকবার ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছে। বাংলাদেশে সুসংগঠিত কোনো শ্রমিক ফেডারেশন নেই। যার দরুন এখানে আন্দোলন সংগ্রাম ফলপ্রসূ হয়নি। তাই এখানে বিপ্লবের প্রশ্নই ওঠে না। কথামালার রাজনীতিতে মিথ্যার ফুলঝুরিতে পোশাক শিল্প কারখানার শ্রমিকরা নিষ্পেষিত হচ্ছে। পোশাক শিল্পকারখানার অধিকাংশ ব্যবসায়িক নেতা ধনিকতন্ত্র সরকারের অঙ্গে পরিণত হয়েছে। তাই তারা শ্রমিক শোষণ করে পার পেয়ে যাচ্ছে।

শিক্ষাবিদ যতীন সরকার লিখেছেন, আসলে এ-কালীন বুর্জোয়াদের ‘সত্য’ নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। তাদের দর্শন সত্যের সন্ধান করে না, যা দিয়ে নিজেদের মতলব হাসিল করা যাবে তা-ই ‘সত্য’Ñ এর বাইরে সাধারণ সত্য বলে কিছু নেই। এরই নাম ‘প্র্যাগমটিজম’ বা কার্যসিদ্ধিবাদ। নানারকম গালভরা নাম দিয়ে যত দর্শনের কথা তারা বলুক না কেন, আসলে তাদের সব দর্শনই ওই কার্যসিদ্ধিবাদের রকমফের মাত্র। যা দিয়ে তাদের কার্যসিদ্ধি হবে না, এমন সব দর্শনকেই একালের ধনতন্ত্রীরা প্রত্যাখ্যান করে।

ইতোমধ্যে- বিশ শতকের নব্বই শতকের গোড়াতেই যখন সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে বিপর্যয় ঘটে গেল, যখন আগেকার একচেটিয়া ধনতন্ত্রী সাম্রাজ্যবাদের পরিণতি ঘটেছে বহুজাতিক ধনতন্ত্রে, তখন তো এই ধনতন্ত্রের বাহকরা খুশিতে বেগবান হয়ে উদ্বাহু নৃত্য শুরু করে দিল। তাদের এক পোষমানা ‘দার্শনিক’ ফুকুয়ামা বললেন যে ইতিহাসের ‘সমাপ্তি’ ঘটে গেছে। এই সমাপ্তি মানে ধনতন্ত্রেরই শাশ্বত হয়ে থাকা। তাই মার্কসবাদীদের শ্রেণিসংগ্রাম- টংগ্রামের কথা সব ভুয়া।’

লাগামহীন ঘোড়সওয়ারের ন্যায় বাংলাদেশের নাকের ডগায় ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে ধনতন্ত্রের মুলো। বৈদেশিক রেমিট্যান্সসহ নানান জাতীয় প্রণোদনার প্রেমাস্পদে ভরপুর বঙ্গজননীর গর্ভজাত সন্তানরা। যে সব কথা বলতে গিয়ে উপর্যুক্ত দুজন মনীষীর বক্তব্য টেনেছি। এর মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। সারা বিশ্ব যখন থুত্থুরে বৃক্ষের মতো নুয়ে পড়ছে। জনবহুল বাংলাদেশের ক্ষুধার্ত, অভুক্ত মানুষের পেটের কাছে অর্থনৈতিক টার্মস কুলিয়ে উঠছে না।

যার দরুন বাংলাদেশের রাজনৈতিক শক্তির মদদদাতা ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কাছে সরকারের নতি স্বীকার হতে দেখেছি বহুবার। কেননা আগে জীবনের জন্য মানুষ রাজনীতি কর?ত। আর এখন ব্যবসার জন্য রাজনীতি করে। আর এজন্যই এমন দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে ঘর থেকে লক্ষ কোটি কোটি শ্রমিককে বের করিয়ে ঢাকামুখী করার পরও সরকারেরর পক্ষ থেকে কোনো হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হয়নি। এর গূঢ় রহস্য উদঘাটনের সময় এখন নয়। বরং নির্দ্বিধায় বলা যায় সরকারের টার্মস এন্ড পলিসির পতন ঘটছে।

করোনা ভাইরাসের মহামারি প্রকোপ থেকে প্রতিরোধের লক্ষ্যে সরকার প্রথম দফা ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি অফিস সাধারণ ছুটির নির্দেশ প্রদান করে। পরে পরিস্থিতি বিবেচনায় এনে দ্বিতীয় দফায় ১১ এপ্রিল পর্যন্ত ছুটি বর্ধিত করে। আর এমতাবস্থায় অর্থনৈতিক প্রেমাস্পদে ভরপুর দেশের সবচেয়ে বেশি মানুষের কর্মক্ষেত্র তৈরি পোশাক কারখানার ৫ এপ্রিল শ্রমিকদের কর্মে যোগদানের নির্দেশ দেয়। পোশাক শিল্পকারখানার ব্যাপারে সরকারের চরম ঔদাসীন্য। একদিকে রয়েছে সমন্বয়হীনতার ঘাটতি। অন্যদিকে সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজের কতটুকু মেরে নিজ পকেটে ওঠানো যায় সেই চিন্তা। যদিও গার্মেন্টস কারখানা বেসরকারি মালিকানাধীন সেক্টর। তথাপি দেশ ও জাতীয় দুর্যোগের কথা বিবেচনা রাখা দরকার।

গত ৪ ও ৫ এপ্রিল দেশের নানান প্রান্ত থেকে গার্মেন্টস কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের ঢাকামুখী অবস্থান দেখে দেশের সচেতন নাগরিকরা উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেন। লাখে লাখে মানুষ রাস্তায়। রাস্তায় গাড়ি ঘোড়া নেই। এমতাবস্থায় পদব্রজে তারা পিঁপড়ের সারির মতো পিলপিল করে হাঁটতে থাকে। এগিয়ে যাচ্ছিল ঢাকামুখী। সোশ্যাল মিডিয়াসহ মেইনস্ট্রিমের মিডিয়াতে এমন দৃশ্য প্রচার হতে থাকে। সমালোচনার ঝড়ের কবলে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয় পুনরায় ছুটি প্রদান করে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত। অথচ বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তৈরি পোশাক শিল্প কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের বিশেষ প্রণোদনা হিসেবে ৫ হাজার কোটি টাকা প্রদানের আশ্বাস সেন। যদিও সেটা বিশেষ শর্তযুক্তভাবে।

করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ হিসেবে সামাজিক দূরত্ব বজায় ও সচেতনতা গড়ে তোলাটা জরুরি। এর জন্য সরকার প্রশাসনকে কঠোর অবস্থান নিতে বলছে। অন্যদিকে পোশাক শিল্পকারখানা খোলা রাখার ব্যাপারে সরকার নির্বিকার। এহেন অবস্থায় সোশ্যাল মিডিয়া ও গণমাধ্যমে বিষয়টি তোলপাড় শুরু হয়। দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এমন নীতিবিবর্জিত সিদ্ধান্তকে ধিক্কার জানান। যার ফলে কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে। বাধ্য হয়ে বিজিএমইএর সভাপতি পুনরায় কারখানা খোলার সময় বর্ধিত করেন। কারখানা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় তুলছে পোশাক শিল্প কারখানার নেতাদের বিরুদ্ধে। পরিপাটি ও শুদ্ধ ভাষায় কথা বলে লক্ষ কোটি শ্রমিকদের মোটিভেশনাল স্পিচের মাধ্যমে যিনি মাঠে নামিয়েছিলেন। তাকে যারা গালমন্দ পাড়ছেন। তাদের উদ্দেশে জার্মান বস্তুবাদী দার্শনিক লুডউইগ ফয়েরবাখ-এর নিম্নোক্ত মতবাদটি উপস্থাপন করছি। ‘প্রাসাদে ও কুটিরে মানুষের চিন্তা বিভিন্ন। ক্ষুধা ও ক্লেশের ফলে যদি তোমার দেহে খোরাক কিছু না থাকে, তাহলে তোমার মস্তিষ্ক, মানস ও হৃদয়েও নৈতিকতার জন্য কোনো খোরাক থাকবে না।’

হ্যাঁ, ড. রুবানা হকের মতো মানুষ প্রাসাদে থেকে কুটিরে থাকা মানুষের মনোকষ্ট কেমনে বুঝবেন। বৈশ্বিক দুর্যোগ করোনা ভাইরাসের জন্য বিশ্বের উন্নত দেশগুলোই যখন নতজানু। এহেন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকারখানার নেতাদের কা-জ্ঞানহীন সিদ্ধান্তের ফলে হাজার হাজার শ্রমিককে রাস্তায় দিনাতিপাত করতে হল। এই দুদিনে যারা সংক্রমণের শিকার হল, এর মাধ্যমে কমিউনিটি সংক্রামক বাড়বে। এর জন্য কি পোশাক শিল্প কারখানার মালিকরা দায়ী থাকবে! আন্তর্জাতিক শ্রম আদালতে গিয়ে বিচারের দাবি করছি না। লক্ষ-কোটি শ্রমিক ও মেহনতি জনতার কাঠগড়ায় বিচার হওয়া উচিত।

ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সরকার বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজের ঘোষণা দিয়েছে। এই প্রণোদনা কাদের পেটকে শীতল করবে সেটা নিয়েও ভাবার আছে। করোনা ভাইরাসের এমন মহামারিতে জনবহুল বাংলাদেশের নিরন্ন মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণ নিয়ে বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা ঘটেছে। এই যে এত টাকাপয়সার দেনদরবারে শতাব্দীর সবচেয়ে করুণাত্মক একটা ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। এমন ক্রান্তিলগ্নেও যেন দুর্নীতিবাজদের কর্মকা- দূর অতীতকে যেন হার না মানায়। বড় কেলেঙ্কারি ঘটে যেন যায়।

এখন পরিস্থিতি যেখানে গিয়ে দাঁড়িয়েছে এমতাবস্থায় ভাবাভাবির সময় নেই। ধরো তক্তা মারো পেরেক। এমন তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মানুষকে বাঁচাতে এগিয়ে আসতে হবে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে। যদি, অথবা, এটা করলে এটা হত, পারতÑ এমন সম্ভাবনাসূচক শব্দ লেখার বা বলার সময়ও এখন না। এখন সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার। সেটা প্রমাণিত দুর্নীতিবাজদের মাল ক্রোক করে হোক আর সমুদ্রের তলদেশে ডুবুরি নামিয়ে মণিমুক্তো তুলে এনে হোক আর যেভাবে হোক। ক্ষুধার্ত আর অনাহারির মুখে দু’মুঠো অন্য তুলে দিতে হবে।

হাসনাত মোবারক : সাহিত্যিক ও কলাম লেখক
hasnatmobarak@gmail.com